পাতা

হৃদ্য

হৃদ্য! অ হৃদ্য! কোথায় লুকিয়ে আছিস রে হারামি? শুনতে কি পাস না? হারামজাদাটার কাণ্ড দেখো ত–শুনেও শুনে না! হে আল্লাহ্, এমন অপদার্থ সন্তান যেন কারও কপালে না জুটে। রাগে আগুনজ্বলা জ্বলছে আর গজগজ করে পালাক্রমে কথাগুলো বলে যাচ্ছে গৃহিণী নিনা জোয়াদ্দার। এমুহূর্তে হৃদ্যকে পেলে বোধহয় সিদ্ধ ছাড়া আলুভর্তা বানিয়ে তবেই দম নিত বুঝা যায়।

একটু পর হৃদ্য কোথায় থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, আ-মা, আ-স-সি ট। রাঁধার কাজে ব্যস্ত নিনা ওর দিকে না দেখে আপনা-আপনি বলছে, হাতীর মতো হয়েছে খেয়ে তবু আজও ‘মা’ শব্দটাও সুন্দর করে উচ্চারণ করতে পারে না বেকুবের ডাহা। এত করে বলি, ‘আম্মা’ ‘আম্মা’ ডাকবি। আর ঐ হাবার নবাব ‘আম্মা’ বলতে গেলে মুখে গজায় তার গজেন্দ্রের দাঁত। বলবে ‘আমা’ ‘আমা’ যেন মনে হয় মা-হারা গাভির বাচ্চা ডাকছে ‘হামা’ ‘হামা’ করে–হাবা কোথাকার। কাঁচের একটা পাত্র হাতে দিয়ে বলছে, ধর, এটা নিয়ে শান্তার মাকে দিয়ে আয়। পারলে একটাকে চারটা করিস, তোর ত আবার সেই আদত।

হৃদ্য বার বছরের কাণ্ডজ্ঞানহীন বালক। নিনা জোয়াদ্দারের স্বামী জিরান খন্দকার বার বছর আগে আঁস্তাকুড়ে পেয়েছিল তাকে! হয়তো কোনেক কুমারিত্বহারা কলঙ্কের ত্যাগত ফল। নিনা একসময় তাকে সন্তানের মতো দেখেছে ঠিক, ইদানীং তবে চাকরের চেয়েও বেশি অবজ্ঞা দেখা যাচ্ছে। ঘর থেকে কিছু হারিয়ে গেলে, হৃদ্য হারামজাদাটার কারবার। স্বামীর কোনো শুভকাজে অশুভ হলে, হৃদ্য হারামিটাকে দেখে গেলে ত অমন হবেই। সদাই আনতে গিয়ে কিছু ভুলে আসলে বা হারিয়ে এলে (স্বামীকে লক্ষ করে) কত বলছি তোমাকে, এ হারামিটাকে সঙ্গে নিয়ো না, তুমি আমার কথা শুনলেই ত হয়। কদমে কদমে সে নিনার কাছে অপরাধী, যেন তার হালের বলদের গোঁজকাটা পরম শত্রু। ধীরে ধীরে নিনার এমনই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে সে, পারলে গলাটিপে হত্যা করে এমুহূর্তেই আপদ তাড়ায়। তবে তার সেই সামর্থ্য আছে বলে মনে হয় না। কারণ জিরান হৃদ্যকে সন্তানের মতো ভালবাসে। তাই সমস্ত অত্যাচার স্বামীর অগোচরেই হয়? এমন কথা আমরা পরিষ্কার বলতে পারব না। সমস্ত অত্যাচারই যে স্বামীর গোচরে হয়, একথাও আমরা তর্জনি হাঁকিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি না। এব্যাপারে আমাদের বক্তব্য নিখুঁত করা গেল না…

নিনা যেটা অনুভব করতে পারে না বা পারলেও বর্তমানে ভুলে গেছে, সেটা জিরান কীভাবে ভুলতে পারে! সেটা আমাদের জ্ঞানে আসে না। তাদের একসময় কেটেছিল খুব অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে। আজ বলতে গেলে পাহাড়সমান সম্পদের মালিক তারা। সংসারে কিন্তু কে কার উছিলায় টাকা কামাই করে, কে কার উছিলায় বড়লোক হয়, কে কার উছিলায় উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারে না। এখানে তবে স্পষ্ট ধারণা হয়, হৃদ্যের উছিলায় জিরান খন্দকার আজ উন্নতির চূড়ায়। কেননা, যেদিন হৃদ্যকে ঘরে আনে সেদিনই চাকরিতে বিরাট পদোন্নতি জিরানের, সামান্য শ্রমিক থেকে তত্ত্বাবধায়ক এবং তার কিছু দিনের মধ্যে একেবারে প্রধান পরিচালক–প্রায় চার হাজার লোকের প্রতিনিধি।

অতঃপর জিরানের কর্মদক্ষতায় এবং সততায় মুগ্ধ হয়ে কোম্পানিটির মালিক অচিরেই অন্যত্র একটা নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে এবং জিরানকে সেখানে সমান অংশে অংশীদার করে। এভাবে লটারির মতো একের পর এক ভাগ্যচক্রের চাকা ঘুরে জীবনটা তার দ্রুত পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এ কথাটা আমরা জিরানের বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় জিরানের মুখ থেকেও বহুবার শুনতে পাই : আমি একজন প্ল্যাস্টিকসামগ্রী প্রস্তুতকারক কোম্পানির শ্রমিক ছিলাম মাত্র। আমাদের দাম্পত্য বিরাট এক শোকাবহে অতিক্রম করছে। ডাক্তার সাফ বলে দিয়েছে, নিনার গর্ভধারণক্ষমতা অক্ষম। নিনা দিশেহারা, আমি নিরুপায় তবে একেবারে ভেঙে পড়ি নি। মানতের কোথাও কার্পণ্য করি নি। যে যেখানে বলেছে ছুটেছি এবং যেটাই করতে বলেছে করেছি। অবশেষে আমরা হতাশ। মা-বাবা ভাবছে আমার একটা সদগতি হওয়া দরকার। এমন সময় আমার সংসারে হৃদ্যের আগমন। আমি মাটি ধরলে তা কবে সোনা হয়ে যাচ্ছে আমিও সেটা টের পাচ্ছি না। শুরু হল আমার সোনালি দিন, নতুন অধ্যায়, নতুন ভোর। এ ভোরের কথা আমি আমরণ ভুলতে পারি না।

সত্যি, এ ভোরের কথা আমরাও ভুলতে পারব না। কারণ এ ভোরে হৃদ্যকে ডাস্টবিনের আবর্জনায় তলিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছিল জিরান। আরেকটু হলে কুকুরের আহার হত বোধহয় এ মনুষ্যশিশুটি।

খুব ভোরে ওঠে জিরানকে বাস চাপতে হত চাকরির পথে। একদিন জনশূন্য বাস স্টপে এসে দেখতে পায়, পাশে ডাস্টবিনে কাকের আন্দোলন। পরিষ্কার কানে আসছে একটি নবজাতকের কান্না! এদিক-ওদিক সবদিকে দেখল কোথাও কেউ নেই। ডাস্টবিনে লক্ষ করে দেখে নাড়ি পেঁচানো এমাত্র জন্ম নেওয়া একটি রক্তাক্ত শিশু। তাড়াতাড়ি তার কাপড়ের থলিটা দিয়ে বেড়িয়ে উঠিয়ে নেয় কোলে। একদৌড়ে বাড়ি এসে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বলে, মাকে ডেকে যা করতে হয় করো। আমার বাস ধরতে হবে, দেরি হলে দায়িত্বের অবহেলা হয়। এ নাও টাকা কয়টা, ওষুধপত্তর লাগতে পারে; বাবাকে দিয়ে আনিও। আমি তাড়াতাড়ি আসছি, ফিরে এসে সব বলব। নিনা অবাক।

জিরান চাকরি থেকে সন্ধেবেলা ফিরে এসে সব বলল। সকলে শুনে আশ্চর্য হল। জিরানের পিতা বলল, দেখ বাবা, সৎপথ অবলম্বন করে যে চলতে পারে তাকে কখনো আল্লাহতালা অপূর্ণ রাখে না। আর এ কথাটা যে ভুলে যায় সে কখনো মানুষ হতে পারে না। এধরণের সন্তানকে যারা আশ্রয় দেয় তাদের সংসার অচিরেই স্বর্ণময় হয়। দেখিস, তোর সংসারও একদিন ফুলেফলে ভরপুর হবে।

বাবার কথা সত্য। হৃদ্য বছর চারেকে পড়লে নিনা গর্ভবতী হয় এবং প্রথম ছেলেসন্তানের জন্ম দেয় তারপর দ্বিতীয় কন্যাসন্তান। ছেলের নাম রাখা হয় শুভ এবং মেয়ের নাম সূচনা। শুভর জন্মের আগে জিরানের পিতা পরলোক গমন করে। ছেলের নিজসন্তানের কারও সুন্দর মুখ দেখা পিতার নসিব হয় নি। শুভর জন্মের কিছু দিনপর জিরানের মাও চলে যায়। তারপর ধীরে ধীরে নিনার কাছে হৃদ্য নামটা চোখের কাঁটায় পরিণত হতে থাকে এবং সূচনার জন্মের পর অসহ্য।

হৃদ্যের নামটা তবে জিরানের বাবার দেওয়া। ভদ্রলোক অল্পশিক্ষিত হলেও একজন শিক্ষিত লোকের জ্ঞান রাখত। তার কারণ, শিক্ষিত জনের সঙ্গে ওঠাবসা এবং বিভিন্ন বইপত্র অধ্যয়ন। যত দিন তিনি জীবিত ছিলেন কার ক্ষমতা ছিল হৃদ্যকে হুঁ বলে। এমন মায়া করতেন যে, যেন হারিয়ে-পাওয়া তাঁদেরই নাড়িছেঁড়া ধন। আর তিনিবা কেন, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে জিরান এবং পুত্রবধূ নিনাও ত কম করছে না। এটা স্বাভাবিক বিষয়, কেননা তাদের সংসারে তখন শুভ আর সূচনার মতো সুসন্তানের আগমনের সম্ভাব্যকোনো চিহ্নই ছিল না। ওদের অপ্রত্যাশিত আগমনে যেখানে খুশির জোয়ার বইছে সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া কুড়োর হাবাগিরি সহ্য করা যায় না–বিশেষ করে নিনার কাছে। আর এটাই সম্ভবত দুনিয়ার দস্তুর। যতই আপন হোক, আদরের বস্তু হোক; নিজসন্তানের মমতার কাছে কোনো কিছু বড় নয়। বলা বাহুল্য, এখানে ত হৃদ্য অসম্পূর্ণও বটে। অতএব, এটা জিরানের কাছে তেমন একটা গুরুত্বের ব্যাপার না হতে পারে কিন্তু নিনার কাছে লজ্জার বিষয়–বোঝার বিষয়। কারণ এ পৃথিবীতে মানুষ যেখানে নিজের বোঝা বইতে অক্ষম সেখানে পরের বোঝা বওয়ার প্রয়োজনীয়তা কি। সচরাচর মেয়েদের মন মনে হয় এমনই হয়?

হৃদ্য যে কারও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এক্ষমতা বিধাতা তাকে দান করে নি। যতই অন্যায় হোক, অত্যাচার হোক নীরবে সহ্য করবে। যতই মার খাক কখনো এক ফোঁটা চোখের পানি ঝরবে না; দেখা যায়, গাধাটা একটু পর আবার হাসচ্ছে। এ জীবটাকে সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় জ্ঞানহারা করার সঙ্গে সঙ্গে যেকোন অনুভূতিহারাও করেছে! স্কুলে পড়ার ক্ষমতা নেই কিন্তু স্কুলে যাওয়ার আগ্রহটা প্রবল। জিরান দুয়েকবার স্কুলে ভর্তি করেও সার্থক হতে পারে নি। শিক্ষকদের মন্তব্য, বাকপ্রতিবন্ধীও আজকাল পড়তে পারে–সুশিক্ষিত হতে পারে। অন্ধজনও শিক্ষিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে হৃদ্যের মধ্যে এ লৌকিকজ্ঞানটুকু আল্লাহতালা কর্তৃক প্রদত্ত হয় নি। সে মানুষের মতো সবকিছু করতে পারবে কিন্তু জ্ঞান খাটিয়ে কিছুই করতে পারবে না।

বলতে গেলে, এটাই দুর্ভাগ্য তার। তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন বিধি। সেজন্যে আমরা দুঃখ করব না, দুঃখ করব এজন্যে, প্রভু প্রতিবন্ধী সৃষ্টি করুক কিন্তু তাকে একটা ভাল আশ্রম দান করুক। আর এভাবে কোনো প্রসূতি হৃদ্যের মতো সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া গর্ভধনকে আবর্জনা-আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে শিয়াল-কুকুরের খাদ্য না করুক। কেননা তাদের সামান্য আনন্দপ্রাপ্তির মোহে অসামান্য বেদনার গল্পের পুনরাবৃত্ত না হোক। দোহাই…

হৃদ্য আজকাল খুবই অসুস্থ, পাণ্ডু ধরা পড়ছে তার। ডাক্তার বলছে, কিছু দিন বিশ্রামে থাকলে এরোগ তাড়াতাড়ি সেরে যেতে সক্ষম, সুতরাং চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু হৃদ্যের কপালে তা জুটলেই ত হয়। শুভ আর সূচনাকে প্রতিদিন স্কুলে নেওয়া-আনা, বাজারসাজার এবং ঘরের বিভিন্ন কাজকাম সে ছাড়া আর আছেইবা কে করার…

হৃদ্য, অ হৃদ্য, (নিনার নিত্যকড়াডাক শুনে সে চঞ্চল–ছটপট বিছানা থেকে ওঠে দৌড়ে আসে) যা, শুভদেরকে স্কুলে দিয়ে আয়। কোথাও দাঁড়িয়ে আবার তামাশা দেখিস না। তাড়াতাড়ি আসিস। (টাকা কয়টা হাতে দিয়ে) পারিস ত হারাইস, আসার সময় রঞ্জুর দোকান থেকে চারটা ডিম আর একটা পাউরুটি আনিস। পারলে চারটাকে ভেঙে একখানে করিস। কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যাবে না, তোর স্বভাবও তেমন পরিবর্তন হবার নয়। হৃদ্য কাঁপতে কাঁপতে বলল, আ-মা, আ-মা-র কে-ম-ন জা-নি লা-গ-চে যে। (হৃদ্যের কথাগুলো একটু তোতলাকারে) ‘কী বললি কামচোর’ বলে ঠাস করে গালে তার সজোরে এক চড় মারে নিনা। আরেকটা মারার আগে আগে ‘এঃ এঃ কর কি! কর কি!’ বলে জিরান তাড়াতাড়ি এসে হৃদ্যকে জড়িয়ে ধরলে জানতে পারে তার জ্বরোত্তাপের কথা। কপালে হাত রেখে : হায় হায় একি! ছেলেটা যে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে–মানুষ নাকি তুমি। জানোয়ারও ত জানোয়ারের প্রতি মমতা করে। কড়াগলায় বলছে, দেখ নিনা, আমি এগুলো আর সহ্য করব না। ইনসানিত বলতে কিছু যদি তোমার না থাকে–থাকতে পারে; কিন্তু আমার আছে, আমি এমন নির্দয় হতে পারব না। তারপর স্বামী-স্ত্রীতে তুমুল লড়াই…হৃদ্যের জন্মকথা…তাদের দরিদ্রতার কথা…উত্থানের কথা…ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা ওঠে আসে। নিনা কোনো কথা, কোনো মতবাদ শুনতে বা মানতে রাজি নয়। অতঃপর…প্রথমবার নিনা উত্তমমাধ্যম খেয়ে ‘থাক তোমার আদরের ছেলেকে নিয়ে’ বলে পাঁচ-সাত বছরের সন্তানদুটোকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। হায় রে মেয়েলোকের দেমাক! হৃদ্য জিরানের হাত একটা টেনে টেনে ‘ও-ঠ বা-বা, আ-মা চ-লে যা-য় গা, আ-মা-কে ফি-রা-তে হ-বে যে…জিরান অভিমানীকণ্ঠে–দূর হ জানোয়ার আমার সামনে থেকে। বলে দ্রুতপায়ে বের হয়ে গেল।

হৃদ্য বিছানায় শোয়ে কাঁদছে আর ভাবছে তার জন্মকথা। আজ চোখের পানি তার কে রোধ করে। জন্মের সকল কান্না, সকল দরদ আজ অনুভব হতে লেগেছে। বিধাতা মনে হয় আজ তাকে বোঝার ক্ষমতা এবং উপলব্ধি-অনুভূতি সকলপ্রকার জ্ঞান একসঙ্গেই দান করেছে! এদিকে জ্বরের তাপে শরীর চুর হয়ে যাচ্ছে। হুঁ-হাঁ করে করে জোরে জোরে গোঙাচ্ছে। ঘরে একজন পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ নেই। সে জানতে পেরে তাড়াতাড়ি এসে দেখল। ওষুধ খাইয়ে দিল তারপর মাথায় পানি ঢেলে সমস্ত শরীর মুছে দিয়ে জ্বরপট্টি লাগাল। কী খাবে জিজ্ঞেস করল। অবস্থা বেগতিক দেখে জিরানের কাছে ফোন করে হালত জানালে জিরান ‘আমি শিগগির আসছি’ বলে এসব সেবাশুশ্রূষা ঘনঘন করার আদেশ দিল।

হৃদ্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আজ দুদিন। তার সেবাযত্নের জন্যে আছে অষ্টাদশী কৃষ্ণসুন্দরী সুমনা নামের পরিচারিকাজনা। সাহেবকে বিব্রত দেখে সে নিনার কাছে ফোন করে হৃদ্যের অবস্থার কথা জানাল একবার। নিনা ‘মরুকগে’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। ফিরে আসার অনুরোধটা পর্যন্ত বুঝিয়ে বলার সুযোগ দিল না।

আজ চার দিন চলছে হৃদ্যের কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। পাশে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে জিরান। হৃদ্যের চোখ দিয়ে অঝরধারায় বয়ে যাচ্ছে অশ্রু। বলছে, বাবা। একি! হৃদ্যের আওয়াজ এভাবে স্পষ্ট হল কীভাবে! এ ত বিরাট কুদরতি কারবার! এখন একটুও তোতলাচ্ছে না যে! বাবা, আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে খুব শুভ আর সূচনার কথা। একবার তাদের দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে বাবা। ওদেরকে নিয়ে আস-না, একবার দেখি। আমি বাঁচব না ত আর। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। জিরান ধমক দিয়ে–কে বলছে তুই বাঁচবি না। আল্লাহ বাঁচাবে তোকে। তুই কি কারও দোষ করেছিস। আর তোর হয়েছেইবা কী, এমন অসুখবিসুখ স্বাভাবিক হয় বাবা। অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখাব তোকে, আমার কি টাকার অভাব আছে আজ। বলে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরে সেও কাঁদতে লাগল। সুমনাও কাঁদতে লাগল–কেঁদে কেঁদে বলল, সাব, মেমসাবকে একটা ফোন করেন-না আপনি। আপনি কইলে অবশ্য আইবে। হৃদুর অবস্থা আমারও ত ভাল লাগছে না। এঘরে জিরানের মায়ের পর সুমনাই একমাত্র হৃদ্যকে হৃদু বলে ডাকে।

জিরানের কল দেখে নিনা ফোন ধরছে না। মা বলল, ফোন ধরলে এমন কি গজব হবে শুনি, কী বলতে চাচ্ছে অন্তত সেটা ত শুনবি।
নিনা অসহ্যগলায় বলল, কী আর বলবে, হারামিটা হসপিটালে…মরলে ত বাঁচি।
মা বলল, এমন বলতে নেই রে নিনা, আল্লাহ্ তোকেও ছেলেপুলে দিছে। পরের ছেলের জন্যে এমন কথা বলতে নেই মা। অতীত ভুলে যাওয়া মানুষ অনেকবেশি কষ্ট পায়। এ কথাটা মনে রাখিস।

নিনা ফোন উঠাল। ওদিক থেকে জিরানের কান্নামিশ্রিতকণ্ঠ : হৃদ্য প্রতিমুহূর্তে তোমাদের কথা বলছে। তোমাদেরকে একবার দেখতে চাচ্ছে। বাঁচার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ডাক্তারেরাও তেমন একটা আশাবাদী নয়। তুমি তার কাছে ক্ষমা চাওয়া একান্ত দরকার। কারণ যার দোষ করে সে যদি ক্ষমা না করে আল্লাহরও ক্ষমতা নাই তাকে মাফ করে। সুতরাং আর বেশি কিছু বললাম না। বলে হাসপাতালের ঠিকানা দিয়ে বলল, যদি ইচ্ছে হয় এক্ষুনি আস। নিনা আর এক মিনিট দেরি না করে হাসপাতালে ছুটে এল। হৃদ্য নিনাকে ও শুভ-সূচনাকে দেখতে পেয়ে খুব আনন্দিত হল। শুভকে আর সূচনাকে জড়িয়ে ধরে বারবার চুমু খেল, খুব আদর করল। নিনাকে লক্ষ করে বলল, আম্মা, আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি, পারো ত আমাকে ক্ষমা করো আম্মা। কোনো জনমে যদি আবার আমার জন্ম হয়, তা হলে তোমার শুভসূচনারূপে যেন তোমার কোলে জন্ম নিই, আল্লাহ্র কাছে এটুকু চাইব। এ জীবনের অপূর্ণতা যেন সেই জীবনে পূর্ণ করতে পারি আম্মা। হৃদ্যের কথা শুনে নিনা অবাক। হৃদয়ের সমস্ত বিষ তার অমৃতে পরিণত হয় তৎক্ষণাৎ। সজোরে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, কে বলছে তুই আমার কোলে জন্ম নেস নি, তুই আমারই বুকের ধন, শুভ আর সূচনা তোরই আপন ভাইবোন। আমি তোর প্রতি অনেক অন্যায়-অবিচার করছি রে হৃদ্য, এ অপরাধিনী মাকে মাফ করে দে রে বাপ, একবার মাফ করে দে…
হৃদ্য কেঁদে বলল, আম্মা, আমি আল্লাহ্কে ত কোনদিন দেখি নি, তবে তোমাদেরকে দেখেছি। আমি তোমাদেরকে অনেকবেশি ভালবাসি। তুমি কোনদিন অনুভব করতে চাও নি আম্মা। তবে আল্লাহ্কে যদি কোনদিন দেখি–জিজ্ঞেস করব…
নিনা : আমি অন্ধ হয়ে গেছিলাম রে বাপ, তুই আমার সকল অন্ধতা দূর করে দিলি হৃদ্য, আমরাও তোকে অনেকবেশি ভালবাসি–বাসব–

হৃদ্যকে বোধহয় শুভ-সূচনার চেয়েও বেশি ভালবাসত জিরান। কারণ তার হারানোব্যথা জিরানকে পাগলের মতো করে দিল অনেকটা। নিনাও প্রায় তাই। আজ হাড়ে হাড়ে টের পারছে সে হৃদ্যের তাৎপর্য। হৃদ্য চলে যাওয়ার পর থেকে জিরান একবিন্দু সুখ উপলব্ধি করতে পারে নি কোনদিন, না করতে পেরেছে নিনা। সংসারে নেমে এল বিপর্যয়। আস্তে আস্তে জিরানের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্যে অবনতি দেখা দিল। তখন দুজনারই কিছু বুঝার বাকি রয় না : পুরোপুরি বুঝা গেল–তাদের সংসারে হৃদ্যই একমাত্র উন্নতির সিঁড়ি ছিল। কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে আবার চলে যায়। কারও জন্যে কিছু করতে পারে না, আবার অনেক কিছুই করে যায়। কিছু স্মৃতি, কিছু কথা অন্যদেরকে আজীবন কাঁদায়। হৃদ্য চলে গেল, রেখে গেল জিরানের সংসারে অনেক স্মৃতি-দুঃখকষ্ট-হাসিমাতি-নির্বুদ্ধিতা…

৪ বৈশাখ, ১৪২০, মানামা, আমিরাত।

বাকিটা পড়ুন 0

স্বাধীনচেতা নেতা

দুর্নীতি হায় চারদিকে ভাই
পাই না কোনো দিশ,
দুর্নীতি নয় এ যেন হায়
কালনাগিনীর বিষ।

কালো টাকার বিরাট পাহাড়
সামনে ওরা নত,
এলোচুলে পাক ধরেছে
টাক পড়েছে কত।

তবু ওদের দুর্নীতিতে
খ্যাতি জগৎজোড়া,
ওদের জোরে বাংলা আমার

বাকিটা পড়ুন 0

কষ্টে পাথর-মূর্তি

জানি না কেন কষ্ট পেলেও আজ আর এ দু’চোখ জলে ভরে না,
শত আঘাতের মাঝেও আজ অনুভূতিশূন্য নির্জীব পাথর,
তীব্র কষ্টের আচেঁ পোড়া এ মন ক্ষতগুলো তার মেলে ধরে না।
বেঁচে আছি আজ মৃতের মতো,চাই না আর অপার্থিব আদর!
জানি, এ …

বাকিটা পড়ুন 0

মেঘ তুই

আমার উঠোন ভিজিয়ে দিয়ে যাস কোথা তুই মেঘ
প্রেমের কদম ফুলেও যে তোর আঁচলভরা আবেগ
এ পাড়া আর ও পাড়াতে
যাস ছুটে তুই সই পাতাতে
আমার বুকে কান্নাতে ও মেঘ দে ঝরিয়ে সব উদ্বেগ।

বাকিটা পড়ুন 0

তুই কোথায়?

ও হে ভাই
আজ তুই কোথায়?
খোঁজেছি তোকে সবখানে
আজ তুই আকাশপানে।
আসবি না কি, কখন ও ফিরে?
এই পৃথিবীর ভীড়ে।
আকাশপানে তাকিয়ে খুঁজি তোকে,
আসবি না কি, এই পৃথিবীর বুকে?
তারা হয়ে আজ রয়েছিস জলন্ত,

বাকিটা পড়ুন 0

উদাস চোখ দুটি

উদাস চোখ দুটি
কি যেন খুঁজে বেরায়
স্টেশনের চত্বরে জনতার ভীরে
উৎসুক পল্লব ঝরে পরে
দুঃখ নিয়ে বুকে
তর্জনী কপালে ঠেকায়ে
চেয়ে দেখে সূর্যের হাহাকার
যেখানে নেই কোন প্রাণ ।
চোখের ভাষায়
অস্পষ্ট কথা নিয়ে

বাকিটা পড়ুন 0

যন্ত্রণা-মন্ত্র

রোদ্দুরে কান পেতে রই, যদি শুনি মেঘ-নাদ,
শুধুই বরিষা…
ফুল ঝরে যায়, ময়ূরও মেলে না পেখম,
গোলাপের অপ্রস্ফুটিত দলে বিষ ঢালে কীট;
আগুনের সাথে মিলিয়েছি বুক
জ্বালা তো করবেই…

বাকিটা পড়ুন 0

তুমি আসবে বলে

তুমি আসবে বলে আকাশটাকে
করেছি মেঘ মুক্ত
তুমি আসবে বলে রংধনুটা
আকাশে করেছি যুক্ত।

তুমি আসবে বলে নদীর পাড়ে
বুনেছি কাঁশফুল
তুমি আসবে বলে ভোরের সুর্য
উঁকি দিয়েছিলো ভুল।

তুমি আসবে বলে হৃদয় কুটির
নিয়ে রেখেছি ভাড়া

বাকিটা পড়ুন 0

চাই তপ্ত যৌবন

জীবনের অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায়
একটু একটু করে পথ-প্রান্তরে
নিরন্তর খুঁজে ফিরি- তারপর
না পাওয়ার বেদনায় প্রাণের কোষান্তরে
বিড় বিড় করে প্রান্তরে
যুগের শেষ দেখার অক্লান্ত সাধনায়
আমি ক্লান্ত শ্রান্ত এক হৃদয়
তপ্ত যৌবনকে খুঁজে পেতে
আমার নিরন্তর …

বাকিটা পড়ুন 0