জনমনোকালকাহিনী
গদ্য কবিতাটি তারিখে ফয়সল অভি লিখেছেন · ১৫ মিনিট পড়ার সময় ·
উৎসর্গ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে শিশুরা হারিয়েছে পিতা
পঁচিশে মার্চের ভোরে গুমগুমে আওয়াজে
শিশু জাগে ত্রাসে..শক্তি খোঁজে মায়ের বুকের মাঝে..
মা বলে: বাছারে, স্বাধীনতার বাজনা বাজে।
শিশুর অবাক প্রশ্ন: স্বাধীনতা কি মা?
স্মৃতি হাতড়ে মা বলে: রাজা ছিল ভিনদেশী..
দেশ জুড়ে ভীতি.. বড়ো জুলুমের দিন গেছে বাছা।
তারপর..জনকের মতো নেতা এক ন্যায্য দাবি তুললেন..
জুলুমের বিরুদ্ধে বললেন: জয়বাংলা।
তারপর..কত রক্ত..কত সংগ্রামের পথ..যুদ্ধ..
তোর বাবা যুদ্ধে গেল।
আমাদের শঙ্কিত দিন..শঙ্কিত রাত..
অবশেষে একদিন রাজা আর তার
জঙ্গীবাহিনী মানল হার।
স্বাধীনতা এল। শুধু তোর বাবা এলনারে..
অবোধ শিশুর প্রশ্ন: এ ক্যামন স্বাধীনতা মাগো..
স্বাধীনতা এরকম
কেন?
জনতার জন্মের অনেক আগে জন্মেছিল
জনতার অভিলাষ..জন্মেচিল নিয়তি ও ইতিহাসপাড়ি।
জন্ম বড়ো স্বপ্নচারী..সে স্বপ্নের পথ ধরে
জাতিধারা বহুদূর..বহু ভ্রান্তি-ক্রান্তি ঘুরে ভাঙা ঘরে
সূর্যের পা বলেই ভোর হয়।
আমাদের ভোরগুলো যদি অস্বীকার করি যদি
সঠিক মাত্রায় হৃদয়ের কথা বলতে না পারি যদি
কবিতার নামে যা-তা লিখে পাতা ভর্তি করি যদি
ঐতিহাসিক সত্যকে মিথ্যা বলি, তবে তো বেজন্মা
আমি। তবে তো কলঙ্ক আমি জনতার নামধারী।
যার মানে পাপ হচ্ছে, যার মানে খুন হচ্ছে
অভ্র স্বপ্নগুলো। জনোমনোকালঘেরা
আমার ্ঐতিহ্য, ভাষা, আমার শ্যামল রক্তকলা
আমি কি লুকোতে পারি চিরকালের অমল গন্ধমালা!
না, সত্য ও রক্ত লুকোবার তো নয়ই, অধিকন্তু
দিন যত যায় ততই সে স্পষ্ট থেকে স্পষ্ট ঢেউ।
আজ লিখতে বসেছি তার কথা..
আজ লিখতে বসেছি স্বপ্নগুলো.. রক্তমাখা।
তখন ভারত অবিভক্ত।
তখন বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলা ষড়যন্ত্র কবলিত।
তখন বৃটিশ শাসনের কাল।
তখন বাংলার মাঠ নীল চাষে জখমিত।
তথাপি কৃষক থেকে সিপাহি-জনতা
বিদ্রোহের আগুনে দীক্ষিত।
তথাপি ’বৃটিশ হটাও ’ মন্ত্রে
জনপদ যুথবদ্ধ।
বিদ্রোহের জের ক্রমে ভারতবর্ষের
জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরে।
একদিকে গান্ধীজির অহিংস মন্ত্রণা..
অন্যদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র..
সঙ্গে কায়েদে আযম
ও অন্যান্য।
সময়টা সেই সময় যখন বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
ভয়াল বিস্তার.. নাৎসি বিভৎসতা.. তার জের
ছড়িয়ে পড়েছে বিহার-উড়িষ্যা থেকে বঙ্গে..
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনও তুঙ্গে।
প্রাণবাজি গেরিলা অপারেশন সারাদেশে।
প্রাণ দেন বীরকন্যা প্রীতিলতা।
ফাঁসি দেয়া হয় মাস্টারদা সূর্যসেনকে।
ফাঁসি হয় ক্ষুদিরামের.. অত:পর ইংরেজদের
আর চায়নি জনতা।
দেখেশুনে বৃটিশকে ’ভারত ছাড়ো ’র সিদ্ধান্তে যেতে হয়
নতি স্বীকারের আগে তারা ভারতকে ভাগ করে
মহাচাতুরীর চালে। বাংলা বিভাজিত হয়ে নব্য দু’দেশের
ভাগে পড়ে। পশ্চিমবাংলা ইন্ডিয়ার, আর পূর্ববাংলা
’পাকিস্তান ’ নামে নতুন রাষ্ট্রের.. যেখানে পশ্চিম ও পূর্বে
ব্যবধান বিস্তর-দুস্তর.. এই ইতিহাস
উনিশশ’ সাতচল্লিশের..
এই শুরু আমাদের।
শুরু যে মোটেও ভালো হয়নি তা
বোঝা যাচ্ছিল সামান্য দিন যেতে না যেতেই।
পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধন কেবল ধর্মজালে কেবল ভ্রাতৃত্ব নামে চালানো গেলনা বেশিদিন। অন্ধ বৈষম্যের খড়গে
পূর্ববাংলার মানুষ দ্রোহী হলো ক্রমে। ক্রমে
ভাষার দূরত্বসহ বহুবিধ জুলুমের ধারা
আন্দোলন পর্যন্ত গড়ালো সেই ’বৃটিশ হটাও ’ এর মতো
রাজপথে রক্ত দিলো শফিক, সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। এ ইতিহাস উনিশশ’ বায়ান্নর
একুশে ফেব্র“য়ারির।
এ ফেব্র“য়ারি জনতাকে নিয়ে গেল দাবি আদায়ের
রক্তাক্ত সংগ্রামে।
বায়ান্নর রক্তাক্ত অধ্যায় বেয়ে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান..
সে এক উত্তালকাল.. আর সেই কালজয়ী
গণজোয়ারের মাঝি কিংবদন্তীর নেতা
শেখ মুজিবুর রহমান।
পশ্চিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পূর্বের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে ত্যাগে ও নেতৃত্বে প্রাণপ্রিয় হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁকে ’বঙ্গবন্ধু ’ নাম দিলো বাংলার জনতা।
সে সময় আপামর জনতার একটাই শ্লোগান:
জয়বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু ও জনতা মিলে দাবি তুল্লো:
নির্বাচন চাই.. সাধারন নির্বাচন।
জনতার চাপে পশ্চিমের সামরিক জান্তা
সত্তুরের নির্বাচন দিলেন তো বটে.. কিন্তু পূর্বের নেতার হাতে ক্ষমতা ছাড়লেন না কিছুতেই।
পশ্চিমের জেনারেল আয়ুব খানের পর ইয়াহিয়া খান,
টিক্কা খান, চালালেন বিজাতীয় অদ্ভূত মহড়া.. খানসেনাদের অন্যায়ের অন্ধকারে লেলিহান পূর্ববাংলা।
আগুনিয়া পূর্ববাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের ’আলোচনা ’
নামে প্রহসন চল্লো দিনের পর দিন.. সব বুঝে –
শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দী আর মাওলানা ভাসানীর
সুযোগ্য উত্তরসুরি বঙ্গবন্ধু- আওয়ামীলীগের একচ্ছত্র নেতা-
সাত-ই মার্চ পল্টনের জনসমুদ্রে বল্লেন:
এবারের সংগ্রাম মুক্তির..এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার।
স্বাধীনতাকামী জনতার বুক ভরে গেল গর্বে।
চল্লো যার যা কিছু তা দিয়ে স্বাধীনতার প্রস্তুতি.. আর
স্বাধীন একটি সূর্যখচিত সবুজ পতাকার
অঙ্গীকার।
অন্যদিকে পশ্চিমারা গৃহবন্দী করে রাখল নেতাকে তাঁর
ধানমন্ডি বত্রিশ রোড বাড়িতে..যে বাড়িকে বলা যায়
ইতিহাসবাড়ি।
তখন নেতাকে একনজর দেখতে কর্মী আর জনতার ভিড়
বাড়ির পাঁচিল ঘিরে.. নেতা এসে দাঁড়াতেন বারান্দায়..
অভয়ের বানী শোনাতেন..বলতেন: ভয় নেই।
কিন্তু ভয়ঙ্কর রাত হামলে পড়ল দেশে..অতর্কিতে।
পশ্চিমা সশস্ত্র বাহিনীর পিশাচরা ইয়াহিয়ার নির্দেশে
ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধট্যাংক-কামানের গোলা নিয়ে
ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ’পরে।
সেদিন পঁচিশ মার্চ,উনিশশ’ একাত্তুর।
তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখে আত্মসমর্পণ করলেন স্বেচ্ছায় শত্র“র কাছে।
তবু তাঁর মানুষ বাঁচেনি।
সেই রাতে ট্যাঙ্কে পিষে কামানের গোলার আগুনে
পুড়িয়ে ঘুমন্ত লক্ষ মানুষকে পৈশাচিক উল্লাসে মারল
পশ্চিমের হায়েনারা।
রাজপথ থেকে ঘরে..অলিতে-গলিতে..হাটবাজারের মধ্যে..ছাত্রাবাস থেকে মসজিদেও..রেহাই পায়নি
বাংলার জনতা। সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে
মেরেছে নির্দ্বিধায়.. এই হত্যাযজ্ঞ..নাৎসি বিভৎসতার চে’
ভয়াবহ। শিশুনারীবুড়োনির্বিশেষে হত্যা আর
ধর্ষকামের হিংস্রতায়..
বাংলার প্রকৃতিসুদ্ধো
পৃথিবী স্তম্ভিত।
এ কাহিনী লিখে ফুরোবার নয়.. বাংলা ও বাঙালি
নিধনের সে এক বর্বরযজ্ঞ..সে এক তান্ডবপিষ্ট নগ্ন
মাতৃভূমি.. তান্ডবের যে ছবিতে আজও অগ্নি হয় হৃদি..
তার কথা বলি: নেহাৎ গাঁয়ের লোক, বাংলাদেশের অজ
দূরগাঁয়ে বাস.. বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানা নেই যার..
সে কি তার অপরাধ? সে কি তার মহাপাপ?
মানবধর্ম বলে: এ মোটেও পাপ না, অপরাধও না।
অথচ ধর্মের জালে ঝুলন্ত ভ্রাতৃত্ব নামের কলঙ্ক
পাকিস্তানের সৈন্যরা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে
লোকটারে.. যেহেতু সে বাংলায় কথা বলে।
এইসব দু:খচিত্র.. রক্তাক্ত স্মৃতির অশ্র“কাব্য..
লিখলে হয়তো মহাকাব্যেরও অধিক হবে..
তখন বয়স ষোল.. এস.এস.সি.র ছাত্রী.. স্মৃতি
প্রতারক নয়.. মনে আছে.. পাড়ার ডাক্তার
নিত্যহরি বাবু চব্বিশ ঘন্টা খোলা রাখতেন চেম্বার পাড়ার
মানুষের জন্য। যে পাড়ায় তাঁর তিনপুরুষের ভিটে.. ফেলে তিনি কোথায় যাবেন.. স্ত্রীপুত্রকন্যাকে নিয়ে..
যখন হঠাৎ মিলিটারি নামল শহরে.. এগিয়ে এলনা কেউ
সামান্য আশ্রয় দিতে.. বাবা কিন্তু দাঁড়ালেন পাশে..
’’ শান্তিকমিটি ’র রক্তচক্ষু চিরে.. নির্বিরোধী বলে
বাবার সুনাম ছিল.. ছিল অসময়ে পাশে যাবার স্বভাব..
হয়তো বা সেই ভেবে অ্যকশনে যায়নি কমিটি আর..
লুকিয়ে রইল আমাদের সঙ্গে নয়মাস ডাক্তার বাবুর
পরিবার.. কিন্তু লুটেরার হাতে তাঁকে যেতে না দিলেও
লুট হয়ে গেছে ভিটে.. ’শান্তিকমিটি ’র রাজাকারগুলো
হাতিয়ে নিয়েছে সব.. মনে হলে.. আজও ঘৃণায় জ্বলি।
আজও ঘৃণায় জ্বলি..
হরিপদ-হরিদাসীদের মারবার দৃশ্য মনে এলে..
বাংলা ছাড়া কোথাও কোনও ঠাঁই ছিলনা যাদের..
তথাপি যখন মসজিদের হুজুর বল্লেন: পালাও.. মিলিটারি
আসছে.. হাজার গ্রামবাসী প্রাণভয়ে দিগি¦দিক.. দৌড়াচ্ছে.. কিছু না বুঝে তারাও তাদের কন্যা দীপালিকে নিয়ে উঠোনে পা.. সগর্জনে মিলিটারি ট্রাক
ঢুকে পড়ল যমের মতো.. কালো-কালো বুটের ধাক্কায়
চৌচির জমিন.. ধূলোরা মুহূর্তে লাল.. রক্তধারায়..
অজস্র গুলিতে লাশ হয়ে গেছে হরিপদ-হরিদাসী..
সঙ্গে পালাতে না পারা আরও অনেক গ্রামবাসী..
দীপালিকে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে.. যেখানে অনেক
দীপালির আর্তনাদে.. বাতাস কেঁদেছে।
কেঁদেছে বাংলার মাঠনদীবঙ্গোপসাগরধারা..
বাংলার প্রতিটি গ্রাম.. ধূলোবালি.. জানে সেই কথা।
আজও শ্মশানজাগা সাক্ষী ধিকিধিকি তারা..
হায়েনার সাথে এদেশীয় শয়তানরা একাত্ম হয়ে
সাহায্য করেছে লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটতে.. তারা
নিজেরা লুটেছে সংখ্যালঘু পড়শির ঘর.. সচক্ষে আমরা
যারা দেখেছি সেসব.. পশুদের মুখ.. আমরা নিশ্চিত জানি.. দানবরা চিনতনা পথঘাট..
শয়তানরা চিনিয়েছিল। তাহলে আমরা আজ
কেন চাইবনা প্রকাশ্য বিচার? কেন প্রকাশ্যে চিহ্নিত
করে বলবনা: তুই রাজাকার.. তুই রাজাকার?
কিন্তু কি দুর্ভাগ্য.. রাজাকার হটাতে পারিনি..
তখনও.. এখনও..
সত্য এই।
সত্য এই, নিপীড়িত লক্ষ জনতা যখন
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ’জয়বাংলা ’ বলে স্বাধীনতাযুদ্ধে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে.. অন্যদিকে ইথারে বেজেছে
সেই সে ঘোষণা.. তাঁর পক্ষে জনৈক মেজর জিয়ার..
তখন সাতাশ মার্চ। তারপর থেকে ঘরে-ঘরে বেড়ে চলে
যুদ্ধের প্রস্তুতি.. অত্যাচারিত মানুষ ভাঙে সীমান্তের কাঁটাতার.. বাঁচার আশায়.. যাদের আশ্রয় দিয়েছিল
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত.. তখন ভারতের
প্রধান ইন্দিরাগান্ধী এক কোটি উদ্বাস্তুকে ঠাঁই দিয়ে
বাঁচিয়েছিলেন.. সুদীর্ঘ ন’মাস। অধিকন্তু ইন্দিরাজি
গড়েছেন বিশ্ব জনমত.. আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে..
যে সাহায্য না হলে এদেশ হতোনা স্বাধীন.. সত্য এই
তাঁর কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ।
সত্য এই
জাতির সে ক্রন্তি দিনে অদম্য প্রেরণারূপী নেতা
বঙ্গবন্ধু ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কন্ডেম সেলে।
তারা ভেবেছিল নেতা পায়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা চাইবেন..
কিন্তু নেতা বলেছেন: আমরা বীরের জাতি..
আমার মানুষ লড়ছে মুক্তির লক্ষ্যে..
আমরা হাসতে-হাসতে মরতে
জানি। সত্য এই।
সত্য এই, প্রিয় নেতা মুজিবের নামে হয়েছিল
মুজিবনগর। হয়েছিল স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র।
ভয়ঙ্কর দানবের সঙ্গে লড়তে গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছে
লক্ষ যোদ্ধা.. অকাতরে প্রাণ দিয়ে যারা
মুক্ত করেছে বাংলা। অকাতরে দিয়ে গেছে প্রাণ..
বাংলাদেশের জন্য বহু ভারতীয় সেন্য.. এই সত্য
কলুষিত করা মানে শত্র“র উল্লাসনৃত্যে তালিয়া বাজানো
কিংবা মিথ্যার সঙ্গে সখ্য।
অথচ আমরা যারা ভালবাসি ইতিহাসমালা..
ভালবাসি বাংলা.. আমরা নিতান্ত সাধারণ..
জনতার দল.. আমরা চেয়েছি সেই স্বাধীনতা..
যাতে নির্ভয়ে হাঁটতে পাই পথ.. দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন…
আর জীবনের অধিকার.. কিন্তু কি বলব দ:খের কথা..
আমাদের চাওয়াপাওয়া নিয়ে কোনওকালেই
ছিলনা সামান্য মাথাব্যথা শাসকের।
শত্র“ তো দূরের কথা।
তো.. বাংলাদেশ যখন চূড়ান্ত বিজয়ের পথে..
তখন শত্র“রা বসে এদেশীয় শয়তানদের সাথে।
বাঙালিকে মরণকামড় দিতে.. তারা ভয়ঙ্কর এক
শেষ আঘাতের নক্সা কাটে। তারা এদেশের
বুদ্ধিজীবি হত্যার তালিকা করে.. তারপর..
চৌদ্দ ডিসেম্বর, উনিশশ’ একাত্তুর
বাড়ি-বাড়ি গিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় বধ্যভূমিতে..
নৃশংসউল্লাসে হত্যা করে.. হৃদয়ে নমস্যদের।
লোমহর্ষক তান্ডব শেষ হয় তখন.. যখন
আত্মসমর্পণ ছাড়া পথ খোলা নেই তাহাদের..
তখন সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো মুক্ত.. আহ কি আনন্দ..
স্বাধীনতা.. প্রায় শহর পর্যন্ত.. অবশেষে..
উনিশশ’ একাত্তুর, ষোল ডিসেম্বর
ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে আত্মসমর্পণে রাজি
পাকবাহিনী প্রধান আমাদের
ঢাকার মাটিতে। আহ বিজয়ের সে আনন্দদিন
ভাষায় বর্ণণাতীত.. তবু বলি: হ্যাঁ, সেদিন থেকেই
বিশ্ব মানচিত্রে ’বাংলাদেশ ’ নামে এক
নতুন দেশের সূর্যখচিত পতাকা মুক্ত বিহঙ্গের মতো
ছাড়পত্র পেয়েছে ওড়ার।
তখনও অশ্র“ ও রক্তচিহ্ন.. সদ্যমুক্ত..
বাংলাদেশের শ্যামল জলেস্থলে।
তখনও ধ্বংসের ’পরে দাঁড়িয়ে মানুষ
উৎকন্ঠার প্রহর গুনছিল.. কখন ফিরবে
যুদ্ধফেরত সন্তান কিংবা স্বামী.. আর পিতার অধিক
স্বপ্নদ্রষ্টা নেতা ফিরবেন কবে.. দাঁড়াবেন
স্বাধীনবাংলার তৃষ্ণার্ত প্রান্তরে !
তখনও বিশ্বের সব দেশ দেয়নি স্বীকৃতি।
শুধু পরম মিত্র ভারত দাঁড়িয়ে পাশে।
ক্রমে রাশিয়া ও আরও কিছু দেশের স্বীকৃতি আসে।
দেশগুলো সমভাবে পাকিস্তানের কন্ডেম সেলে বন্দী
বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জোর দাবী তোলে। বিশ্বদাবীর চাপে
পাকিস্তান বাধ্য হয়ে ফাঁসির সিদ্ধান্ত পাল্টে
মুক্তি দেয় তাঁকে। সেদিন তারিখ:
দশ জানুয়ারি,
উনিশশ’ বাহাত্তুর।
সেদিন সমস্ত অশ্র“ আনন্দশ্র“ হয়ে মিলেছিল জনপদে..
সেদিন সমস্ত রক্ত নিশ্চয় মিলেছে বধ্যভূমি থেকে
ভূমধ্যসাগরে.. সেদিন প্রাণের ধারা বাতাসে-বাতাসে..
কান্নায় আপ্লুত নেতা জনতার সাথে একাকার..
বল্লেন: রবীন্দ্রনাথ, আপনার ‘রেখেছ বাঙালি করে
- মানুষ করনি ’ ভুল প্রমাণিত, দেখে যান
- আমার বাঙালি
- মানুষ হয়েছে আজ।
কিন্তু দুর্ভাগা আমরা দেখি
নেতার আবেগ যেন বা অজান্তেই ভুল হয়ে গেছে..
মাত্র বছর চারেক পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলায়..
বাঙালিকে স্বপ্ন দেখাতে-দেখাতে..
নেতা চেয়েছিলেন হৃদয় দিয়ে.. টেরও পাননি..
হৃদয় রাষ্টনীতি না.. শত্র“র জন্য নয় ক্ষমা।
যে ক্ষমায় ঘাতকের দল
নখর বিস্তার করে চলেছিল ভিতরে-ভিতরে।
মীরজাফর সমান খন্দকার মোশতাক ছিল দলে..
ছিল পাকিস্তানমনস্ক বিপথগামী কতিপয় সেনা..
যারা আঁতাত করেছে গোপনে-গোপনে..
তাঁকে হত্যা করে দ্রুত ক্ষমতায় যেতে হবে।
তাঁকে আগেই সতর্ক করেছে গোয়েন্দা, তিনি
হেসেই উড়িয়েছেন, দেশ ও মানুষ বড়ো ভালোবাসতেন
তিনি। বলতেন: আমার মানুষ কখনও আমাকে
মারবেনা.. মারতে পারেনা।
এত যে বিশ্বাস.. এত ভালোবাসা তাঁর
হয়তো হয়নি ঠিক.. কে বোঝায় হায়!
মীরজাফর কি মরে! যুগে-যুগে তারা ঢুকে পড়ে
দলের ভিতরে..
তারপরে..
ঝোপ বুঝে কোপ মারে!
নেপথ্যে ঘাতক ছিল.. স্বাধীনতার শত্র“র মতো..
আমাদের বীর সেনাদের অভ্যন্তরে..
পাকিস্তানী ভূত হয়ে!
উনিশশো পঁচাত্তুর, পনের আগস্ট
ফজরের প্রথম প্রহরে
ঘৃণিত ঘাতকদল ঢুকে পড়ে বত্রিশ রোডের
নেতার বাড়িতে.. তারা বাংলার নেতাকে সপরিবারে
হত্যা করে। এমন কি সন্তানসম্ভবা পুত্রবধূ, শিশুপুত্র
রাসেলও পায়নি প্রাণভিক্ষা!
কেবল প্রবাস বাঁচিয়েছে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসুরি
দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানাকে।
কেবল প্রবল ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুকে দেয়নি
প্রাণের সুরক্ষা!
সেদিন থেকেই আবারও আমাদের অন্ধকার
নেতৃত্ববিহীন দুর্ভাগ্যের শুরু। মেজর ডালিম আর
খন্দকার মোশতাক চক্র
খেলল নিষ্ঠুর খেলা।
সেদিনও ফজর প্রায়..
তিন নভেম্বর, উনিশশো পঁচাত্তুর
ঘৃণ্য উপায়ে জেলখানায়
হত্যা করল জাতীয় চার নেতা
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ
সহচরদের।
অত:পর অচিরেই
খন্দকার মোশতাকের পতন হলো।
প্রেসিডেন্ট সায়েম এলেন..
স্বল্পকালীন এসব সরকার এল আর গেল..
ভাগ্য খুলল না জনতার। তারপর এল হায় পুনরায়
সামরিক জেনারেলদের বেলা।
বলা যায় আবারও আমাদের
শুরু হলো কালবেলা।
উনিশশো সাতাত্তুরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান
ক্ষমতা নিলেন..
আর প্রেসিডেন্ট থাকলেন
চার বৎসরকাল.. সানগ্লাস ও সাফারি পরে
খাল কাটলেন অগণিত.. কঠোর শাসনে
বেঁধে রাখলেন দেশ.. তবু কাটা খাল দিয়ে
কুমিরের মতো ঢুকে পড়ল দালাল.. তারা তাঁর
অধীনস্ত সেনাদের তুলল বিষিয়ে.. বিভাজিত
সেনাদের এক ট্রুপ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁকে
গুলিতে ঝাঁঝরা করে মারল হঠাৎ উনিশশো একাশিতে।
যিনি রাজনীতিকে কঠোর করে তুলছিলেন ক্রমশ..
যিনি প্রায়শ: বলতেন: মানি ইজ নো প্রবলেম এবঙ
এই থিওরিতে গড়েছেন বিএনপি
করুণ মৃত্যু হলো তাঁর।
অত:পর ঘাতক সন্দেহে মৃত্যুদন্ড হলো
সেনাবাহিনীর মঞ্জুর এবঙ অনেকের।
অত:পর জিয়াউর রহমানের বিএনপি
ক্ষমতা ছাড়ল।
ক্ষমতায় বসলেন জেনারেল এরশাদ।
যথারীতি প্রেসিডেন্ট হয়ে গড়লেন দল..
নাম দিলেন: জাতীয় পার্টি।
উনিশশো একাশিতে শুরু করে প্রায় নয় বৎসর
চালালেন দেশ.. কবিতা ও দুর্নীতির
মহড়ায়.. মহোৎসবে।
ক্রমে.. জনতা বিদ্রোহী হলো..
তদ্দিনে উত্তরাধিকারসূত্রে বিএনপির নেত্রী
বেগম খালেদা আর আওয়ামীলীগ নেত্রী
শেখ হাসিনা। তদ্দিনে খাল কেটে ডেকে আনা
স্বাধীনতার দালালচক্র জামায়াত-শিবিরও দিব্যি
সিন্দাবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে রেখেছে পা।
অন্যদিকে
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে
দুই নেত্রীসুদ্ধো
সব দল প্রস্তুুত হয়েছে।
প্রস্তুত হয়েছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত জনমত..
ঢাকার রাস্তায় পিঠে ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক গণতন্ত্র
মুক্তি পাক’ লিখে নূর হোসেন দিয়েছে প্রাণ, প্রাণ দিয়েছেন ডাক্তার মিলন সহ আরও অনেক ছাত্রজনতা..
অবশেষে
এরশাদের পতন।
অবশেষে
গণতন্ত্রের বিজয়।
শেখ হাসিনা নতুন কনসেপ্ট রাখলেন..
সেই কনসেপ্টে তত্ত¡াবধায়ক সরকার হলো দেশে..
তাদের অধীন প্রহসন নয় সত্য নির্বাচন হলো..
জনতার রায় বিএনপি পেলো এবঙ আওয়ামীলীগ
মেনে নিল।
কিন্তু পাঁচ বৎসরের ম্যন্ডেটে বিএনপির রাজনীতি
লক্ষ্যমাত্রায় যায়নি.. উপ-নির্বাচন নিয়ে
প্রহসনে মেতেছিল বলে.. শেষ বর্ষে গিয়ে
ক্ষমতা ছাড়ার আগেই পতন ঘটে।
তাদের শাসনকালে এরশাদ খেটেছেন জেল..
দুই বৎসর দুর্নীতির দায়ে।
তাদের শাসনকালে রাজপথে মার খেয়েছেন
শহীদ জননী সহ বহু নেতাকর্মী।
তারপরের কাহিনী
উনিশশো ছিয়ানব্বুইর.. দ্বিতীয়বার দেশে
তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন হলো..
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর আওয়ামীলীগ
জনতার রায়
পেল।
বছর তিনেক শেখ হাসিনার সরকার
বহু ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলেও
পঁচিশ বর্ষকাল বহুবিধ চক্রজালে বেড়ে ওঠা
দালাল-রাজাকারের জাল ছিন্ন করে বেরুতে পারেনি..
উপরন্তু আইনি জঞ্জাল থেকে আদালতকে পৃথক
স্বাধীনতা দিতে পারেনি বলেই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয়
চার নেতা হত্যা-মামলার রায় আজও হয়নি কার্যকর..
আর শেষ দু’বছর সন্ত্রাসী দৌরাত্ম্যে নিজ দলে
বেড়েছে সন্ত্রাস.. তবু পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে
ক্ষমতা দিয়েছে তত্ত¡াবধায়কের হাতে।
কিন্তু বাস্তবতা এই
স্বাধীনতার ধারক দল হেরে গেছে
রাজনীতির নেপথ্য কুটকৌশলের কাছে.. বাস্তবতা এই
দেশে দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে
ঘাতক-দালাল দল..
বিএনপির মাথায় চড়ে।
অত:পর অসা¤প্রদায়িক দেশে আবারও চলল সেই
সংখ্যালঘুদের ’পরে উৎপীড়নের পালা।
আবারও আমরা দেখি সেই একই পাকি-কায়দায়
নিপীড়নের ভয়াল ছবি..
হাত-পা-মস্তক ছিন্ন কুঠারে-কুঠারে..
শত মানবের আহাজারি..
সকালে পত্রিকা খুলে
বিভীষিকায় শিউরে উঠি..
হায় এ কোন জঙ্গীরা কেড়ে নিচ্ছে সহধর্ম..
লক্ষ রক্তে কেনা দীপ্ত বাংলাদেশ..
কারা তারে দলিত করছে জঙ্গীবাদে?
অজর ’জয়বাংলা’ ধ্বনি..
কারা করে রূপান্তর
বিজাতীয় ’জিন্দাবাদে’?
সত্য বলবার অপরাধে
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে নির্মম কুঠারবিদ্ধ করা হলো
রমনার বটমূলে জঙ্গী বোমায় ছিন্নভিন্ন লাশ হলো
নিরীহ মানুষ। জনসভায় উড়িয়ে দেয়া হোল
নির্ভীক আইভি রহমান সহ বহু তাজা প্রাণ..
অর্থনীতিবিদ কিবরিয়া সহ খুন করা হোল শত..
যেন
বিচার-আচার নেই দেশে!
যেন এই দেশ আর সেই দেশ নেই!
যে দেশে সহজে পাশে বসতো বন্ধু ও পড়শি শর্তহীন।
যে দেশে পুতুলমার্কা ঠুঁটো জগন্নাথের রাজত্ব ফেঁসে যায়
মুক্ত দুর্নীতির জন্য.. সেই দেশে দ্যাখা যাক তবে
জনতার রায় কোনদিকে যায়.. দ্যাখা যাক তবে
সহজিয়া-সবুজিয়া শর্তহীন সম্পর্কের দিন ফের
আসে কি না পাশে.. বসে কি না হেসে..
জনতা ও শিশু ভালবেসে….
আমাদের দিন যায়.. হায় দিন চলে যায়..
জনতার ভাগ্য ঝোলে রাজনীতিবিদদের
অপরিনামদর্শী কৌশলে.. আমরা বুঝিনা ভালো, কবে
তাহাদের বোধদয়ে হবে জনতার ভালো! আমাদের
কাটা ঘায়ে নুন দিয়ে যদি তারা রাজভোগ পায়..
যদি জনতার চোখে ধূলো দিয়ে পার পেতে চায়..
সে বড়ো বোকামি! সে বড়ো মূর্খের চাল!
আমরা বুঝেছি আজ
জনতার রক্তে কেনা স্বাধীনতা নয় কোনও ধূর্তের পাঠ!
লক্ষ মা-বোন-শিশু ও শহীদের রক্ত ও ত্যাগের দামে
সে এসেছে। সে থাকবে চিরকাল.. চিরকাল।
আর কোনও অপালনের ফাঁকিঝুঁকি চলবেনা দেশে।
আগামীর প্রয়োজনে লিখছি তো বটে যা কিছু ঘটেছে।
সামনে কি ভাগ্য ভালো না মন্দ.. তা কেবল
ভাগ্যবিধাতাই জানে.. তা কেবল ভাগ্যবিধাতাই জানে।
আমার তো মন বলে: আহ কতকাল এই দেশে
জনতার দ্যাখা নেই হানাহানিহীন শান্ত সড়কের সাথে..
কতকাল দেখিনি তো ভালোবাসাময় শ্রেষ্ঠবেলার দিগন্ত
কে জানে সে আদৌ ফিরবে কি ফিরবেনা মাঠে!
কে জানে আগামী আদৌ পাশাপাশি বসবে কি
বসবেনা..হাতে হাত রাখবে কি রাখবেনা..
কে জানে তা..
কে জানে তা!
তবুও যখন দেখি
এই দেশে কত মুক্তিযোদ্ধা আজ
ফেরিওয়ালা কি রিক্সাওয়ালা.. এবঙ পঙ্গু হয়ে
বেঁচে যারা.. অধিকারবঞ্চিত তাহাদের রাষ্ট্র দেয়না
বীরের মর্যাদা.. তখন তো অর্ন্তদ্রোহে কেঁদে ওঠে আত্মা!
তখন তো বলতেই হয়:
নীতি পাল্টাও.. পাল্টাও সব..
নতুনের তরে ছেড়ে দাও ঘর।
যে ঘরে থাকবে আলো..
হৃদয় সমান খোলা..
যেন নদী .. যেন অপার প্রকৃতি ..
যার যেথানে থাকার ..
সে থাকবে ..
যথার্থেই ভালো।
যার যা বলার .. সে বলবে ..
অন্যকেও ভালোবেসে .. অন্যকেও মূল্য দিতে ..
এবার জানতে হবে ভাই। নতুন আসছে .. তারে
হৃদয়ের খোলা ঘর দাও ..
সে হোক সবার
প্রিয় হরবোলা।
সে হোক সবার প্রিয় ..
হাতে হাত রাখবার মাঠ ..
মাঠের নতুন ঘাস পদচিহ্নে হেসে বলুক শিশুকে:
এসো .. এসো ছায়াঘনমূলে ..
আজ শিশুতোষ দিন। আজ
দিন বদলের কালে কালো মুখগুলো যাতে
সত্যের থাপ্পড়ে আলোয় আসে .. আসে
প্রকাশ্য ধারায় ..
ভবিষ্য শিশুর জন্য এই দেশে এই মাঠে
এ আমার এষনাতুর অমল প্রার্থনা।
আরতো আমার বলবার নেই তত .. যত হলে
পালাবে এদেশ ছেড়ে অশুভ-অমঙ্গলের লম্ফ-ঝম্প।
পালাবে ক্লেদাক্তকাল চাঁড়ালের নষ্ট চাল ছিঁড়ে।
যথেষ্ট বয়স পেয়ে ছিনাল-জঞ্জাল যদি
না পারি পোড়াতে .. তবে তা নিজেরই দোষে ..
এ কথাই বলি জনতারে ..
এবঙ আমি তো
জনতার দলে।
কিন্তু মেধা কি আর তেমন অগ্নি ! যাতে জ্বলেপুড়ে
সোনা হবে মিথ্যে আর নীল স্বার্থের গহŸর! যাতে
দগ্ধ পদধ্বনিগুলো যাবে
শুশ্রƒষার গাঁয়! এই ভেবে এ রুগ্ন অঙ্গুলিতলে
বাতিঘর রূপে জ্বলছে বাংলাদেশ ..
জ্বলছে জ্যোøাগন্ধি বিদগ্ধ জন্মভূমি ..
যেন মৃত্যু অব্দি ঘুরে
তার কথা বলি।
যেন সেই পিতৃদত্ত অভয়ের মতো বলি:
ভয় নেই। ভয় নেই। আমরা বীরে জাতি ..
জাতি কিন্তু দেখে যাচ্ছে ..
আখের গোছাচ্ছে হর্তাকর্তাবিধাতারা! পালাবার জন্য
পথ করতেই তাহাদের পঞ্চশালা .. তা কি আর
জানেনা জনতা! পঞ্চবর্ষ যায়-যায় কালে
বসে তারা ..
সুচতুর হিসেব-নিকেষে!
শুধু কি না ভাগ্যদোষে জনতার ভাগে ধূলোমুঠি জোটে!
শুধু কি না জনপদের অবস্থা নিত্য খারাপের দিকে!
বলি হৃদয় তো হাঁদা নয় .. এ যে চতর্মুখ চক্রজাল ..
এ যে ঝুট-জালিয়াতি .. পাবলিক জানে।
’পাবলিক রাইটস’ নামে সংবিধানের নামে যত
কাটাকুটি .. যত বেআইনি রুল .. তাতে কি হৃদয় যায়
বনে! হৃদয় তো কথা বলে বাতাসের সনে! বলে:
তোমাদের বেঅইনি ধাক্কায় ভাঙবে তোমাদেরই
ভুলের ফানুস। দেখছোনা দূরাশার পানে
উড়িয়ে ঘৃণার ছাই রাস্তার মানুষ আজ
গাল দিচ্ছে খুব লোভ ও লালসাতুর
ক্ষমতার রাজপুত্তুরকে!
মিছে কথায় যে চিঁড়ে ভেজেনা মোটেও ..
মিছে নীলনক্সায় যে গদি সামলানো দায় ..
জনগণ আজ এসবই বোঝাতে চায়। চায়:
খারাপের দিকে যেতে-যেতেও .. হাওয়া ঘুরে যাক।
হৃদয়ের দু:খের ঠাঁই
হৃদয়ের থাক।
এই যে আমরা আজ
সংবাদের শীর্ষ ছুঁয়ে যাই
এই যে আমরা আজ
দু:খের সম্পর্কে জাগি
কারও পৌষ .. কারও সর্বনাশে ..
আমাদের এ ক্যামন বাঁচাবাঁচি!
এ ক্যামন অদ্ভূত ফাল্গুন মাস
আলাল-দুলাল কাটে শিল্পের আকাশ!
এ ক্যামন পায়ে পা বাঁধিয়ে
মাঠে ফাঁসিয়ে দেয়ার খেলা ..
আমাদেরই মাথার ’পরে কাঁঠাল খাওয়া বাপু
এবার বুঝতে হবে এসব কি আর চলতে দেওয়া ভালো!
বলি :
ভালো না, ভালো না বাপু
অযথা মাথার ’পরে
খাঁড়া ঝোলানোর খেলা।
বলি :
ভালো না, ভালো না এত
অযথা কবিতা ভুলে হিংসুক সংহারে যাওয়া।
এ বিশ্ব সংসার বড়ো তেতে ওঠা তৃষ্ণাপাত্র
তার শুভ-অশুভের কালে
জল দিতে ভুল হলে চলে!
আজ ’যত দোষ নন্দঘোষ’ দিনগুলো মারা গেছে বলে
লোভী হাতগুলো ছলেবলে ঢুকে পড়তে চাইছে ঘরে !
কিন্তু সমস্ত বিষাক্ত পাঁয়তারা গেছে ঝুলে!
আজ নিন্দুকের বাঁকা চোখ যত বাঁকা হোক
তবু ভালোবাসা হবে! তবু জয়ী হবে বলে
বাংলার মানুষ আবারও উঠছে জ্বলে .. আবারও বাংলায়
হৃদয়ের তৃষ্ণাপাত্র ভরা হবে বলে
জেগেছে শিকড়গুলো।
সমস্ত অপেক্ষাকাল
এবার তাহলে যাক স্বাধীনতাকালে ..
সমস্ত অপেক্ষাকাল
এবার তাহলে যাক স্বাধীনতাকালে।
পঁচিশে মার্চের ভোরে গুমগুমে আওয়াজে
শিশু জাগে ত্রাসে..শক্তি খোঁজে মায়ের বুকের মাঝে..
মা বলে: বাছারে, স্বাধীনতার বাজনা বাজে।
শিশুর অবাক প্রশ্ন: স্বাধীনতা কি মা?
স্মৃতি হাতড়ে মা বলে: রাজা ছিল ভিনদেশী..
দেশ জুড়ে ভীতি.. বড়ো জুলুমের দিন গেছে বাছা।
তারপর..জনকের মতো নেতা এক ন্যায্য দাবি তুললেন..
জুলুমের বিরুদ্ধে বললেন: জয়বাংলা।
তারপর..কত রক্ত..কত সংগ্রামের পথ..যুদ্ধ..
তোর বাবা যুদ্ধে গেল।
আমাদের শঙ্কিত দিন..শঙ্কিত রাত..
অবশেষে একদিন রাজা আর তার
জঙ্গীবাহিনী মানল হার।
স্বাধীনতা এল। শুধু তোর বাবা এলনারে..
অবোধ শিশুর প্রশ্ন: এ ক্যামন স্বাধীনতা মাগো..
স্বাধীনতা এরকম
কেন?
জনতার জন্মের অনেক আগে জন্মেছিল
জনতার অভিলাষ..জন্মেচিল নিয়তি ও ইতিহাসপাড়ি।
জন্ম বড়ো স্বপ্নচারী..সে স্বপ্নের পথ ধরে
জাতিধারা বহুদূর..বহু ভ্রান্তি-ক্রান্তি ঘুরে ভাঙা ঘরে
সূর্যের পা বলেই ভোর হয়।
আমাদের ভোরগুলো যদি অস্বীকার করি যদি
সঠিক মাত্রায় হৃদয়ের কথা বলতে না পারি যদি
কবিতার নামে যা-তা লিখে পাতা ভর্তি করি যদি
ঐতিহাসিক সত্যকে মিথ্যা বলি, তবে তো বেজন্মা
আমি। তবে তো কলঙ্ক আমি জনতার নামধারী।
যার মানে পাপ হচ্ছে, যার মানে খুন হচ্ছে
অভ্র স্বপ্নগুলো। জনোমনোকালঘেরা
আমার ্ঐতিহ্য, ভাষা, আমার শ্যামল রক্তকলা
আমি কি লুকোতে পারি চিরকালের অমল গন্ধমালা!
না, সত্য ও রক্ত লুকোবার তো নয়ই, অধিকন্তু
দিন যত যায় ততই সে স্পষ্ট থেকে স্পষ্ট ঢেউ।
আজ লিখতে বসেছি তার কথা..
আজ লিখতে বসেছি স্বপ্নগুলো.. রক্তমাখা।
তখন ভারত অবিভক্ত।
তখন বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলা ষড়যন্ত্র কবলিত।
তখন বৃটিশ শাসনের কাল।
তখন বাংলার মাঠ নীল চাষে জখমিত।
তথাপি কৃষক থেকে সিপাহি-জনতা
বিদ্রোহের আগুনে দীক্ষিত।
তথাপি ’বৃটিশ হটাও ’ মন্ত্রে
জনপদ যুথবদ্ধ।
বিদ্রোহের জের ক্রমে ভারতবর্ষের
জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরে।
একদিকে গান্ধীজির অহিংস মন্ত্রণা..
অন্যদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র..
সঙ্গে কায়েদে আযম
ও অন্যান্য।
সময়টা সেই সময় যখন বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
ভয়াল বিস্তার.. নাৎসি বিভৎসতা.. তার জের
ছড়িয়ে পড়েছে বিহার-উড়িষ্যা থেকে বঙ্গে..
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনও তুঙ্গে।
প্রাণবাজি গেরিলা অপারেশন সারাদেশে।
প্রাণ দেন বীরকন্যা প্রীতিলতা।
ফাঁসি দেয়া হয় মাস্টারদা সূর্যসেনকে।
ফাঁসি হয় ক্ষুদিরামের.. অত:পর ইংরেজদের
আর চায়নি জনতা।
দেখেশুনে বৃটিশকে ’ভারত ছাড়ো ’র সিদ্ধান্তে যেতে হয়
নতি স্বীকারের আগে তারা ভারতকে ভাগ করে
মহাচাতুরীর চালে। বাংলা বিভাজিত হয়ে নব্য দু’দেশের
ভাগে পড়ে। পশ্চিমবাংলা ইন্ডিয়ার, আর পূর্ববাংলা
’পাকিস্তান ’ নামে নতুন রাষ্ট্রের.. যেখানে পশ্চিম ও পূর্বে
ব্যবধান বিস্তর-দুস্তর.. এই ইতিহাস
উনিশশ’ সাতচল্লিশের..
এই শুরু আমাদের।
শুরু যে মোটেও ভালো হয়নি তা
বোঝা যাচ্ছিল সামান্য দিন যেতে না যেতেই।
পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধন কেবল ধর্মজালে কেবল ভ্রাতৃত্ব নামে চালানো গেলনা বেশিদিন। অন্ধ বৈষম্যের খড়গে
পূর্ববাংলার মানুষ দ্রোহী হলো ক্রমে। ক্রমে
ভাষার দূরত্বসহ বহুবিধ জুলুমের ধারা
আন্দোলন পর্যন্ত গড়ালো সেই ’বৃটিশ হটাও ’ এর মতো
রাজপথে রক্ত দিলো শফিক, সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। এ ইতিহাস উনিশশ’ বায়ান্নর
একুশে ফেব্র“য়ারির।
এ ফেব্র“য়ারি জনতাকে নিয়ে গেল দাবি আদায়ের
রক্তাক্ত সংগ্রামে।
বায়ান্নর রক্তাক্ত অধ্যায় বেয়ে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান..
সে এক উত্তালকাল.. আর সেই কালজয়ী
গণজোয়ারের মাঝি কিংবদন্তীর নেতা
শেখ মুজিবুর রহমান।
পশ্চিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পূর্বের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে ত্যাগে ও নেতৃত্বে প্রাণপ্রিয় হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁকে ’বঙ্গবন্ধু ’ নাম দিলো বাংলার জনতা।
সে সময় আপামর জনতার একটাই শ্লোগান:
জয়বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু ও জনতা মিলে দাবি তুল্লো:
নির্বাচন চাই.. সাধারন নির্বাচন।
জনতার চাপে পশ্চিমের সামরিক জান্তা
সত্তুরের নির্বাচন দিলেন তো বটে.. কিন্তু পূর্বের নেতার হাতে ক্ষমতা ছাড়লেন না কিছুতেই।
পশ্চিমের জেনারেল আয়ুব খানের পর ইয়াহিয়া খান,
টিক্কা খান, চালালেন বিজাতীয় অদ্ভূত মহড়া.. খানসেনাদের অন্যায়ের অন্ধকারে লেলিহান পূর্ববাংলা।
আগুনিয়া পূর্ববাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের ’আলোচনা ’
নামে প্রহসন চল্লো দিনের পর দিন.. সব বুঝে –
শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দী আর মাওলানা ভাসানীর
সুযোগ্য উত্তরসুরি বঙ্গবন্ধু- আওয়ামীলীগের একচ্ছত্র নেতা-
সাত-ই মার্চ পল্টনের জনসমুদ্রে বল্লেন:
এবারের সংগ্রাম মুক্তির..এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার।
স্বাধীনতাকামী জনতার বুক ভরে গেল গর্বে।
চল্লো যার যা কিছু তা দিয়ে স্বাধীনতার প্রস্তুতি.. আর
স্বাধীন একটি সূর্যখচিত সবুজ পতাকার
অঙ্গীকার।
অন্যদিকে পশ্চিমারা গৃহবন্দী করে রাখল নেতাকে তাঁর
ধানমন্ডি বত্রিশ রোড বাড়িতে..যে বাড়িকে বলা যায়
ইতিহাসবাড়ি।
তখন নেতাকে একনজর দেখতে কর্মী আর জনতার ভিড়
বাড়ির পাঁচিল ঘিরে.. নেতা এসে দাঁড়াতেন বারান্দায়..
অভয়ের বানী শোনাতেন..বলতেন: ভয় নেই।
কিন্তু ভয়ঙ্কর রাত হামলে পড়ল দেশে..অতর্কিতে।
পশ্চিমা সশস্ত্র বাহিনীর পিশাচরা ইয়াহিয়ার নির্দেশে
ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধট্যাংক-কামানের গোলা নিয়ে
ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ’পরে।
সেদিন পঁচিশ মার্চ,উনিশশ’ একাত্তুর।
তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখে আত্মসমর্পণ করলেন স্বেচ্ছায় শত্র“র কাছে।
তবু তাঁর মানুষ বাঁচেনি।
সেই রাতে ট্যাঙ্কে পিষে কামানের গোলার আগুনে
পুড়িয়ে ঘুমন্ত লক্ষ মানুষকে পৈশাচিক উল্লাসে মারল
পশ্চিমের হায়েনারা।
রাজপথ থেকে ঘরে..অলিতে-গলিতে..হাটবাজারের মধ্যে..ছাত্রাবাস থেকে মসজিদেও..রেহাই পায়নি
বাংলার জনতা। সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে
মেরেছে নির্দ্বিধায়.. এই হত্যাযজ্ঞ..নাৎসি বিভৎসতার চে’
ভয়াবহ। শিশুনারীবুড়োনির্বিশেষে হত্যা আর
ধর্ষকামের হিংস্রতায়..
বাংলার প্রকৃতিসুদ্ধো
পৃথিবী স্তম্ভিত।
এ কাহিনী লিখে ফুরোবার নয়.. বাংলা ও বাঙালি
নিধনের সে এক বর্বরযজ্ঞ..সে এক তান্ডবপিষ্ট নগ্ন
মাতৃভূমি.. তান্ডবের যে ছবিতে আজও অগ্নি হয় হৃদি..
তার কথা বলি: নেহাৎ গাঁয়ের লোক, বাংলাদেশের অজ
দূরগাঁয়ে বাস.. বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানা নেই যার..
সে কি তার অপরাধ? সে কি তার মহাপাপ?
মানবধর্ম বলে: এ মোটেও পাপ না, অপরাধও না।
অথচ ধর্মের জালে ঝুলন্ত ভ্রাতৃত্ব নামের কলঙ্ক
পাকিস্তানের সৈন্যরা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে
লোকটারে.. যেহেতু সে বাংলায় কথা বলে।
এইসব দু:খচিত্র.. রক্তাক্ত স্মৃতির অশ্র“কাব্য..
লিখলে হয়তো মহাকাব্যেরও অধিক হবে..
তখন বয়স ষোল.. এস.এস.সি.র ছাত্রী.. স্মৃতি
প্রতারক নয়.. মনে আছে.. পাড়ার ডাক্তার
নিত্যহরি বাবু চব্বিশ ঘন্টা খোলা রাখতেন চেম্বার পাড়ার
মানুষের জন্য। যে পাড়ায় তাঁর তিনপুরুষের ভিটে.. ফেলে তিনি কোথায় যাবেন.. স্ত্রীপুত্রকন্যাকে নিয়ে..
যখন হঠাৎ মিলিটারি নামল শহরে.. এগিয়ে এলনা কেউ
সামান্য আশ্রয় দিতে.. বাবা কিন্তু দাঁড়ালেন পাশে..
’’ শান্তিকমিটি ’র রক্তচক্ষু চিরে.. নির্বিরোধী বলে
বাবার সুনাম ছিল.. ছিল অসময়ে পাশে যাবার স্বভাব..
হয়তো বা সেই ভেবে অ্যকশনে যায়নি কমিটি আর..
লুকিয়ে রইল আমাদের সঙ্গে নয়মাস ডাক্তার বাবুর
পরিবার.. কিন্তু লুটেরার হাতে তাঁকে যেতে না দিলেও
লুট হয়ে গেছে ভিটে.. ’শান্তিকমিটি ’র রাজাকারগুলো
হাতিয়ে নিয়েছে সব.. মনে হলে.. আজও ঘৃণায় জ্বলি।
আজও ঘৃণায় জ্বলি..
হরিপদ-হরিদাসীদের মারবার দৃশ্য মনে এলে..
বাংলা ছাড়া কোথাও কোনও ঠাঁই ছিলনা যাদের..
তথাপি যখন মসজিদের হুজুর বল্লেন: পালাও.. মিলিটারি
আসছে.. হাজার গ্রামবাসী প্রাণভয়ে দিগি¦দিক.. দৌড়াচ্ছে.. কিছু না বুঝে তারাও তাদের কন্যা দীপালিকে নিয়ে উঠোনে পা.. সগর্জনে মিলিটারি ট্রাক
ঢুকে পড়ল যমের মতো.. কালো-কালো বুটের ধাক্কায়
চৌচির জমিন.. ধূলোরা মুহূর্তে লাল.. রক্তধারায়..
অজস্র গুলিতে লাশ হয়ে গেছে হরিপদ-হরিদাসী..
সঙ্গে পালাতে না পারা আরও অনেক গ্রামবাসী..
দীপালিকে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে.. যেখানে অনেক
দীপালির আর্তনাদে.. বাতাস কেঁদেছে।
কেঁদেছে বাংলার মাঠনদীবঙ্গোপসাগরধারা..
বাংলার প্রতিটি গ্রাম.. ধূলোবালি.. জানে সেই কথা।
আজও শ্মশানজাগা সাক্ষী ধিকিধিকি তারা..
হায়েনার সাথে এদেশীয় শয়তানরা একাত্ম হয়ে
সাহায্য করেছে লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটতে.. তারা
নিজেরা লুটেছে সংখ্যালঘু পড়শির ঘর.. সচক্ষে আমরা
যারা দেখেছি সেসব.. পশুদের মুখ.. আমরা নিশ্চিত জানি.. দানবরা চিনতনা পথঘাট..
শয়তানরা চিনিয়েছিল। তাহলে আমরা আজ
কেন চাইবনা প্রকাশ্য বিচার? কেন প্রকাশ্যে চিহ্নিত
করে বলবনা: তুই রাজাকার.. তুই রাজাকার?
কিন্তু কি দুর্ভাগ্য.. রাজাকার হটাতে পারিনি..
তখনও.. এখনও..
সত্য এই।
সত্য এই, নিপীড়িত লক্ষ জনতা যখন
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ’জয়বাংলা ’ বলে স্বাধীনতাযুদ্ধে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে.. অন্যদিকে ইথারে বেজেছে
সেই সে ঘোষণা.. তাঁর পক্ষে জনৈক মেজর জিয়ার..
তখন সাতাশ মার্চ। তারপর থেকে ঘরে-ঘরে বেড়ে চলে
যুদ্ধের প্রস্তুতি.. অত্যাচারিত মানুষ ভাঙে সীমান্তের কাঁটাতার.. বাঁচার আশায়.. যাদের আশ্রয় দিয়েছিল
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত.. তখন ভারতের
প্রধান ইন্দিরাগান্ধী এক কোটি উদ্বাস্তুকে ঠাঁই দিয়ে
বাঁচিয়েছিলেন.. সুদীর্ঘ ন’মাস। অধিকন্তু ইন্দিরাজি
গড়েছেন বিশ্ব জনমত.. আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে..
যে সাহায্য না হলে এদেশ হতোনা স্বাধীন.. সত্য এই
তাঁর কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ।
সত্য এই
জাতির সে ক্রন্তি দিনে অদম্য প্রেরণারূপী নেতা
বঙ্গবন্ধু ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কন্ডেম সেলে।
তারা ভেবেছিল নেতা পায়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা চাইবেন..
কিন্তু নেতা বলেছেন: আমরা বীরের জাতি..
আমার মানুষ লড়ছে মুক্তির লক্ষ্যে..
আমরা হাসতে-হাসতে মরতে
জানি। সত্য এই।
সত্য এই, প্রিয় নেতা মুজিবের নামে হয়েছিল
মুজিবনগর। হয়েছিল স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র।
ভয়ঙ্কর দানবের সঙ্গে লড়তে গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছে
লক্ষ যোদ্ধা.. অকাতরে প্রাণ দিয়ে যারা
মুক্ত করেছে বাংলা। অকাতরে দিয়ে গেছে প্রাণ..
বাংলাদেশের জন্য বহু ভারতীয় সেন্য.. এই সত্য
কলুষিত করা মানে শত্র“র উল্লাসনৃত্যে তালিয়া বাজানো
কিংবা মিথ্যার সঙ্গে সখ্য।
অথচ আমরা যারা ভালবাসি ইতিহাসমালা..
ভালবাসি বাংলা.. আমরা নিতান্ত সাধারণ..
জনতার দল.. আমরা চেয়েছি সেই স্বাধীনতা..
যাতে নির্ভয়ে হাঁটতে পাই পথ.. দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন…
আর জীবনের অধিকার.. কিন্তু কি বলব দ:খের কথা..
আমাদের চাওয়াপাওয়া নিয়ে কোনওকালেই
ছিলনা সামান্য মাথাব্যথা শাসকের।
শত্র“ তো দূরের কথা।
তো.. বাংলাদেশ যখন চূড়ান্ত বিজয়ের পথে..
তখন শত্র“রা বসে এদেশীয় শয়তানদের সাথে।
বাঙালিকে মরণকামড় দিতে.. তারা ভয়ঙ্কর এক
শেষ আঘাতের নক্সা কাটে। তারা এদেশের
বুদ্ধিজীবি হত্যার তালিকা করে.. তারপর..
চৌদ্দ ডিসেম্বর, উনিশশ’ একাত্তুর
বাড়ি-বাড়ি গিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় বধ্যভূমিতে..
নৃশংসউল্লাসে হত্যা করে.. হৃদয়ে নমস্যদের।
লোমহর্ষক তান্ডব শেষ হয় তখন.. যখন
আত্মসমর্পণ ছাড়া পথ খোলা নেই তাহাদের..
তখন সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো মুক্ত.. আহ কি আনন্দ..
স্বাধীনতা.. প্রায় শহর পর্যন্ত.. অবশেষে..
উনিশশ’ একাত্তুর, ষোল ডিসেম্বর
ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে আত্মসমর্পণে রাজি
পাকবাহিনী প্রধান আমাদের
ঢাকার মাটিতে। আহ বিজয়ের সে আনন্দদিন
ভাষায় বর্ণণাতীত.. তবু বলি: হ্যাঁ, সেদিন থেকেই
বিশ্ব মানচিত্রে ’বাংলাদেশ ’ নামে এক
নতুন দেশের সূর্যখচিত পতাকা মুক্ত বিহঙ্গের মতো
ছাড়পত্র পেয়েছে ওড়ার।
তখনও অশ্র“ ও রক্তচিহ্ন.. সদ্যমুক্ত..
বাংলাদেশের শ্যামল জলেস্থলে।
তখনও ধ্বংসের ’পরে দাঁড়িয়ে মানুষ
উৎকন্ঠার প্রহর গুনছিল.. কখন ফিরবে
যুদ্ধফেরত সন্তান কিংবা স্বামী.. আর পিতার অধিক
স্বপ্নদ্রষ্টা নেতা ফিরবেন কবে.. দাঁড়াবেন
স্বাধীনবাংলার তৃষ্ণার্ত প্রান্তরে !
তখনও বিশ্বের সব দেশ দেয়নি স্বীকৃতি।
শুধু পরম মিত্র ভারত দাঁড়িয়ে পাশে।
ক্রমে রাশিয়া ও আরও কিছু দেশের স্বীকৃতি আসে।
দেশগুলো সমভাবে পাকিস্তানের কন্ডেম সেলে বন্দী
বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জোর দাবী তোলে। বিশ্বদাবীর চাপে
পাকিস্তান বাধ্য হয়ে ফাঁসির সিদ্ধান্ত পাল্টে
মুক্তি দেয় তাঁকে। সেদিন তারিখ:
দশ জানুয়ারি,
উনিশশ’ বাহাত্তুর।
সেদিন সমস্ত অশ্র“ আনন্দশ্র“ হয়ে মিলেছিল জনপদে..
সেদিন সমস্ত রক্ত নিশ্চয় মিলেছে বধ্যভূমি থেকে
ভূমধ্যসাগরে.. সেদিন প্রাণের ধারা বাতাসে-বাতাসে..
কান্নায় আপ্লুত নেতা জনতার সাথে একাকার..
বল্লেন: রবীন্দ্রনাথ, আপনার ‘রেখেছ বাঙালি করে
- মানুষ করনি ’ ভুল প্রমাণিত, দেখে যান
- আমার বাঙালি
- মানুষ হয়েছে আজ।
কিন্তু দুর্ভাগা আমরা দেখি
নেতার আবেগ যেন বা অজান্তেই ভুল হয়ে গেছে..
মাত্র বছর চারেক পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলায়..
বাঙালিকে স্বপ্ন দেখাতে-দেখাতে..
নেতা চেয়েছিলেন হৃদয় দিয়ে.. টেরও পাননি..
হৃদয় রাষ্টনীতি না.. শত্র“র জন্য নয় ক্ষমা।
যে ক্ষমায় ঘাতকের দল
নখর বিস্তার করে চলেছিল ভিতরে-ভিতরে।
মীরজাফর সমান খন্দকার মোশতাক ছিল দলে..
ছিল পাকিস্তানমনস্ক বিপথগামী কতিপয় সেনা..
যারা আঁতাত করেছে গোপনে-গোপনে..
তাঁকে হত্যা করে দ্রুত ক্ষমতায় যেতে হবে।
তাঁকে আগেই সতর্ক করেছে গোয়েন্দা, তিনি
হেসেই উড়িয়েছেন, দেশ ও মানুষ বড়ো ভালোবাসতেন
তিনি। বলতেন: আমার মানুষ কখনও আমাকে
মারবেনা.. মারতে পারেনা।
এত যে বিশ্বাস.. এত ভালোবাসা তাঁর
হয়তো হয়নি ঠিক.. কে বোঝায় হায়!
মীরজাফর কি মরে! যুগে-যুগে তারা ঢুকে পড়ে
দলের ভিতরে..
তারপরে..
ঝোপ বুঝে কোপ মারে!
নেপথ্যে ঘাতক ছিল.. স্বাধীনতার শত্র“র মতো..
আমাদের বীর সেনাদের অভ্যন্তরে..
পাকিস্তানী ভূত হয়ে!
উনিশশো পঁচাত্তুর, পনের আগস্ট
ফজরের প্রথম প্রহরে
ঘৃণিত ঘাতকদল ঢুকে পড়ে বত্রিশ রোডের
নেতার বাড়িতে.. তারা বাংলার নেতাকে সপরিবারে
হত্যা করে। এমন কি সন্তানসম্ভবা পুত্রবধূ, শিশুপুত্র
রাসেলও পায়নি প্রাণভিক্ষা!
কেবল প্রবাস বাঁচিয়েছে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসুরি
দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানাকে।
কেবল প্রবল ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুকে দেয়নি
প্রাণের সুরক্ষা!
সেদিন থেকেই আবারও আমাদের অন্ধকার
নেতৃত্ববিহীন দুর্ভাগ্যের শুরু। মেজর ডালিম আর
খন্দকার মোশতাক চক্র
খেলল নিষ্ঠুর খেলা।
সেদিনও ফজর প্রায়..
তিন নভেম্বর, উনিশশো পঁচাত্তুর
ঘৃণ্য উপায়ে জেলখানায়
হত্যা করল জাতীয় চার নেতা
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ
সহচরদের।
অত:পর অচিরেই
খন্দকার মোশতাকের পতন হলো।
প্রেসিডেন্ট সায়েম এলেন..
স্বল্পকালীন এসব সরকার এল আর গেল..
ভাগ্য খুলল না জনতার। তারপর এল হায় পুনরায়
সামরিক জেনারেলদের বেলা।
বলা যায় আবারও আমাদের
শুরু হলো কালবেলা।
উনিশশো সাতাত্তুরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান
ক্ষমতা নিলেন..
আর প্রেসিডেন্ট থাকলেন
চার বৎসরকাল.. সানগ্লাস ও সাফারি পরে
খাল কাটলেন অগণিত.. কঠোর শাসনে
বেঁধে রাখলেন দেশ.. তবু কাটা খাল দিয়ে
কুমিরের মতো ঢুকে পড়ল দালাল.. তারা তাঁর
অধীনস্ত সেনাদের তুলল বিষিয়ে.. বিভাজিত
সেনাদের এক ট্রুপ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁকে
গুলিতে ঝাঁঝরা করে মারল হঠাৎ উনিশশো একাশিতে।
যিনি রাজনীতিকে কঠোর করে তুলছিলেন ক্রমশ..
যিনি প্রায়শ: বলতেন: মানি ইজ নো প্রবলেম এবঙ
এই থিওরিতে গড়েছেন বিএনপি
করুণ মৃত্যু হলো তাঁর।
অত:পর ঘাতক সন্দেহে মৃত্যুদন্ড হলো
সেনাবাহিনীর মঞ্জুর এবঙ অনেকের।
অত:পর জিয়াউর রহমানের বিএনপি
ক্ষমতা ছাড়ল।
ক্ষমতায় বসলেন জেনারেল এরশাদ।
যথারীতি প্রেসিডেন্ট হয়ে গড়লেন দল..
নাম দিলেন: জাতীয় পার্টি।
উনিশশো একাশিতে শুরু করে প্রায় নয় বৎসর
চালালেন দেশ.. কবিতা ও দুর্নীতির
মহড়ায়.. মহোৎসবে।
ক্রমে.. জনতা বিদ্রোহী হলো..
তদ্দিনে উত্তরাধিকারসূত্রে বিএনপির নেত্রী
বেগম খালেদা আর আওয়ামীলীগ নেত্রী
শেখ হাসিনা। তদ্দিনে খাল কেটে ডেকে আনা
স্বাধীনতার দালালচক্র জামায়াত-শিবিরও দিব্যি
সিন্দাবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে রেখেছে পা।
অন্যদিকে
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে
দুই নেত্রীসুদ্ধো
সব দল প্রস্তুুত হয়েছে।
প্রস্তুত হয়েছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত জনমত..
ঢাকার রাস্তায় পিঠে ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক গণতন্ত্র
মুক্তি পাক’ লিখে নূর হোসেন দিয়েছে প্রাণ, প্রাণ দিয়েছেন ডাক্তার মিলন সহ আরও অনেক ছাত্রজনতা..
অবশেষে
এরশাদের পতন।
অবশেষে
গণতন্ত্রের বিজয়।
শেখ হাসিনা নতুন কনসেপ্ট রাখলেন..
সেই কনসেপ্টে তত্ত¡াবধায়ক সরকার হলো দেশে..
তাদের অধীন প্রহসন নয় সত্য নির্বাচন হলো..
জনতার রায় বিএনপি পেলো এবঙ আওয়ামীলীগ
মেনে নিল।
কিন্তু পাঁচ বৎসরের ম্যন্ডেটে বিএনপির রাজনীতি
লক্ষ্যমাত্রায় যায়নি.. উপ-নির্বাচন নিয়ে
প্রহসনে মেতেছিল বলে.. শেষ বর্ষে গিয়ে
ক্ষমতা ছাড়ার আগেই পতন ঘটে।
তাদের শাসনকালে এরশাদ খেটেছেন জেল..
দুই বৎসর দুর্নীতির দায়ে।
তাদের শাসনকালে রাজপথে মার খেয়েছেন
শহীদ জননী সহ বহু নেতাকর্মী।
তারপরের কাহিনী
উনিশশো ছিয়ানব্বুইর.. দ্বিতীয়বার দেশে
তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন হলো..
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর আওয়ামীলীগ
জনতার রায়
পেল।
বছর তিনেক শেখ হাসিনার সরকার
বহু ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলেও
পঁচিশ বর্ষকাল বহুবিধ চক্রজালে বেড়ে ওঠা
দালাল-রাজাকারের জাল ছিন্ন করে বেরুতে পারেনি..
উপরন্তু আইনি জঞ্জাল থেকে আদালতকে পৃথক
স্বাধীনতা দিতে পারেনি বলেই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয়
চার নেতা হত্যা-মামলার রায় আজও হয়নি কার্যকর..
আর শেষ দু’বছর সন্ত্রাসী দৌরাত্ম্যে নিজ দলে
বেড়েছে সন্ত্রাস.. তবু পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে
ক্ষমতা দিয়েছে তত্ত¡াবধায়কের হাতে।
কিন্তু বাস্তবতা এই
স্বাধীনতার ধারক দল হেরে গেছে
রাজনীতির নেপথ্য কুটকৌশলের কাছে.. বাস্তবতা এই
দেশে দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে
ঘাতক-দালাল দল..
বিএনপির মাথায় চড়ে।
অত:পর অসা¤প্রদায়িক দেশে আবারও চলল সেই
সংখ্যালঘুদের ’পরে উৎপীড়নের পালা।
আবারও আমরা দেখি সেই একই পাকি-কায়দায়
নিপীড়নের ভয়াল ছবি..
হাত-পা-মস্তক ছিন্ন কুঠারে-কুঠারে..
শত মানবের আহাজারি..
সকালে পত্রিকা খুলে
বিভীষিকায় শিউরে উঠি..
হায় এ কোন জঙ্গীরা কেড়ে নিচ্ছে সহধর্ম..
লক্ষ রক্তে কেনা দীপ্ত বাংলাদেশ..
কারা তারে দলিত করছে জঙ্গীবাদে?
অজর ’জয়বাংলা’ ধ্বনি..
কারা করে রূপান্তর
বিজাতীয় ’জিন্দাবাদে’?
সত্য বলবার অপরাধে
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে নির্মম কুঠারবিদ্ধ করা হলো
রমনার বটমূলে জঙ্গী বোমায় ছিন্নভিন্ন লাশ হলো
নিরীহ মানুষ। জনসভায় উড়িয়ে দেয়া হোল
নির্ভীক আইভি রহমান সহ বহু তাজা প্রাণ..
অর্থনীতিবিদ কিবরিয়া সহ খুন করা হোল শত..
যেন
বিচার-আচার নেই দেশে!
যেন এই দেশ আর সেই দেশ নেই!
যে দেশে সহজে পাশে বসতো বন্ধু ও পড়শি শর্তহীন।
যে দেশে পুতুলমার্কা ঠুঁটো জগন্নাথের রাজত্ব ফেঁসে যায়
মুক্ত দুর্নীতির জন্য.. সেই দেশে দ্যাখা যাক তবে
জনতার রায় কোনদিকে যায়.. দ্যাখা যাক তবে
সহজিয়া-সবুজিয়া শর্তহীন সম্পর্কের দিন ফের
আসে কি না পাশে.. বসে কি না হেসে..
জনতা ও শিশু ভালবেসে….
আমাদের দিন যায়.. হায় দিন চলে যায়..
জনতার ভাগ্য ঝোলে রাজনীতিবিদদের
অপরিনামদর্শী কৌশলে.. আমরা বুঝিনা ভালো, কবে
তাহাদের বোধদয়ে হবে জনতার ভালো! আমাদের
কাটা ঘায়ে নুন দিয়ে যদি তারা রাজভোগ পায়..
যদি জনতার চোখে ধূলো দিয়ে পার পেতে চায়..
সে বড়ো বোকামি! সে বড়ো মূর্খের চাল!
আমরা বুঝেছি আজ
জনতার রক্তে কেনা স্বাধীনতা নয় কোনও ধূর্তের পাঠ!
লক্ষ মা-বোন-শিশু ও শহীদের রক্ত ও ত্যাগের দামে
সে এসেছে। সে থাকবে চিরকাল.. চিরকাল।
আর কোনও অপালনের ফাঁকিঝুঁকি চলবেনা দেশে।
আগামীর প্রয়োজনে লিখছি তো বটে যা কিছু ঘটেছে।
সামনে কি ভাগ্য ভালো না মন্দ.. তা কেবল
ভাগ্যবিধাতাই জানে.. তা কেবল ভাগ্যবিধাতাই জানে।
আমার তো মন বলে: আহ কতকাল এই দেশে
জনতার দ্যাখা নেই হানাহানিহীন শান্ত সড়কের সাথে..
কতকাল দেখিনি তো ভালোবাসাময় শ্রেষ্ঠবেলার দিগন্ত
কে জানে সে আদৌ ফিরবে কি ফিরবেনা মাঠে!
কে জানে আগামী আদৌ পাশাপাশি বসবে কি
বসবেনা..হাতে হাত রাখবে কি রাখবেনা..
কে জানে তা..
কে জানে তা!
তবুও যখন দেখি
এই দেশে কত মুক্তিযোদ্ধা আজ
ফেরিওয়ালা কি রিক্সাওয়ালা.. এবঙ পঙ্গু হয়ে
বেঁচে যারা.. অধিকারবঞ্চিত তাহাদের রাষ্ট্র দেয়না
বীরের মর্যাদা.. তখন তো অর্ন্তদ্রোহে কেঁদে ওঠে আত্মা!
তখন তো বলতেই হয়:
নীতি পাল্টাও.. পাল্টাও সব..
নতুনের তরে ছেড়ে দাও ঘর।
যে ঘরে থাকবে আলো..
হৃদয় সমান খোলা..
যেন নদী .. যেন অপার প্রকৃতি ..
যার যেথানে থাকার ..
সে থাকবে ..
যথার্থেই ভালো।
যার যা বলার .. সে বলবে ..
অন্যকেও ভালোবেসে .. অন্যকেও মূল্য দিতে ..
এবার জানতে হবে ভাই। নতুন আসছে .. তারে
হৃদয়ের খোলা ঘর দাও ..
সে হোক সবার
প্রিয় হরবোলা।
সে হোক সবার প্রিয় ..
হাতে হাত রাখবার মাঠ ..
মাঠের নতুন ঘাস পদচিহ্নে হেসে বলুক শিশুকে:
এসো .. এসো ছায়াঘনমূলে ..
আজ শিশুতোষ দিন। আজ
দিন বদলের কালে কালো মুখগুলো যাতে
সত্যের থাপ্পড়ে আলোয় আসে .. আসে
প্রকাশ্য ধারায় ..
ভবিষ্য শিশুর জন্য এই দেশে এই মাঠে
এ আমার এষনাতুর অমল প্রার্থনা।
আরতো আমার বলবার নেই তত .. যত হলে
পালাবে এদেশ ছেড়ে অশুভ-অমঙ্গলের লম্ফ-ঝম্প।
পালাবে ক্লেদাক্তকাল চাঁড়ালের নষ্ট চাল ছিঁড়ে।
যথেষ্ট বয়স পেয়ে ছিনাল-জঞ্জাল যদি
না পারি পোড়াতে .. তবে তা নিজেরই দোষে ..
এ কথাই বলি জনতারে ..
এবঙ আমি তো
জনতার দলে।
কিন্তু মেধা কি আর তেমন অগ্নি ! যাতে জ্বলেপুড়ে
সোনা হবে মিথ্যে আর নীল স্বার্থের গহŸর! যাতে
দগ্ধ পদধ্বনিগুলো যাবে
শুশ্রƒষার গাঁয়! এই ভেবে এ রুগ্ন অঙ্গুলিতলে
বাতিঘর রূপে জ্বলছে বাংলাদেশ ..
জ্বলছে জ্যোøাগন্ধি বিদগ্ধ জন্মভূমি ..
যেন মৃত্যু অব্দি ঘুরে
তার কথা বলি।
যেন সেই পিতৃদত্ত অভয়ের মতো বলি:
ভয় নেই। ভয় নেই। আমরা বীরে জাতি ..
জাতি কিন্তু দেখে যাচ্ছে ..
আখের গোছাচ্ছে হর্তাকর্তাবিধাতারা! পালাবার জন্য
পথ করতেই তাহাদের পঞ্চশালা .. তা কি আর
জানেনা জনতা! পঞ্চবর্ষ যায়-যায় কালে
বসে তারা ..
সুচতুর হিসেব-নিকেষে!
শুধু কি না ভাগ্যদোষে জনতার ভাগে ধূলোমুঠি জোটে!
শুধু কি না জনপদের অবস্থা নিত্য খারাপের দিকে!
বলি হৃদয় তো হাঁদা নয় .. এ যে চতর্মুখ চক্রজাল ..
এ যে ঝুট-জালিয়াতি .. পাবলিক জানে।
’পাবলিক রাইটস’ নামে সংবিধানের নামে যত
কাটাকুটি .. যত বেআইনি রুল .. তাতে কি হৃদয় যায়
বনে! হৃদয় তো কথা বলে বাতাসের সনে! বলে:
তোমাদের বেঅইনি ধাক্কায় ভাঙবে তোমাদেরই
ভুলের ফানুস। দেখছোনা দূরাশার পানে
উড়িয়ে ঘৃণার ছাই রাস্তার মানুষ আজ
গাল দিচ্ছে খুব লোভ ও লালসাতুর
ক্ষমতার রাজপুত্তুরকে!
মিছে কথায় যে চিঁড়ে ভেজেনা মোটেও ..
মিছে নীলনক্সায় যে গদি সামলানো দায় ..
জনগণ আজ এসবই বোঝাতে চায়। চায়:
খারাপের দিকে যেতে-যেতেও .. হাওয়া ঘুরে যাক।
হৃদয়ের দু:খের ঠাঁই
হৃদয়ের থাক।
এই যে আমরা আজ
সংবাদের শীর্ষ ছুঁয়ে যাই
এই যে আমরা আজ
দু:খের সম্পর্কে জাগি
কারও পৌষ .. কারও সর্বনাশে ..
আমাদের এ ক্যামন বাঁচাবাঁচি!
এ ক্যামন অদ্ভূত ফাল্গুন মাস
আলাল-দুলাল কাটে শিল্পের আকাশ!
এ ক্যামন পায়ে পা বাঁধিয়ে
মাঠে ফাঁসিয়ে দেয়ার খেলা ..
আমাদেরই মাথার ’পরে কাঁঠাল খাওয়া বাপু
এবার বুঝতে হবে এসব কি আর চলতে দেওয়া ভালো!
বলি :
ভালো না, ভালো না বাপু
অযথা মাথার ’পরে
খাঁড়া ঝোলানোর খেলা।
বলি :
ভালো না, ভালো না এত
অযথা কবিতা ভুলে হিংসুক সংহারে যাওয়া।
এ বিশ্ব সংসার বড়ো তেতে ওঠা তৃষ্ণাপাত্র
তার শুভ-অশুভের কালে
জল দিতে ভুল হলে চলে!
আজ ’যত দোষ নন্দঘোষ’ দিনগুলো মারা গেছে বলে
লোভী হাতগুলো ছলেবলে ঢুকে পড়তে চাইছে ঘরে !
কিন্তু সমস্ত বিষাক্ত পাঁয়তারা গেছে ঝুলে!
আজ নিন্দুকের বাঁকা চোখ যত বাঁকা হোক
তবু ভালোবাসা হবে! তবু জয়ী হবে বলে
বাংলার মানুষ আবারও উঠছে জ্বলে .. আবারও বাংলায়
হৃদয়ের তৃষ্ণাপাত্র ভরা হবে বলে
জেগেছে শিকড়গুলো।
সমস্ত অপেক্ষাকাল
এবার তাহলে যাক স্বাধীনতাকালে ..
সমস্ত অপেক্ষাকাল
এবার তাহলে যাক স্বাধীনতাকালে।
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।