সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর রচনাবলি
অনির্দিষ্ট নায়িকা
ফিরে যাবো, শীত শেষে অবিশ্বাসী মরালের মতো অন্ধকার শুভ্ৰ হলে, ফিরে যাবো, হে সখি নিরালা, উরসে চন্দন গন্ধ, বিন্দু বিন্দু রক্ত ইতস্তত তোমার শিশির-স্বাদ মুখ আর দৃষ্টিপাত মালা— ফেলে আমি চলে যাবো, নির্বাসনে, ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অপেক্ষা
সকালবেলা এয়ারপোর্টে গেয়েছিলাম একজন বৃদ্ধ আন্তর্জাতিক ফরাসীর সঙ্গে দেখা করার জন্য, যিনি নিজের শৈশবকে ঘৃণা করেন। তিনি তখনো আসেননি, আমি একা বসে রইলাম ভি আই পি লাউঞ্জে। ঠান্ড ঘর, দুটি টাটকা ডালিয়া, বর্তমা...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চোখ ঢেকে
যে-যেমন জীবন কাটায় তার ঠিক সেই রকম এক-একটি পোশাক রয়েছে আলো ও হাওয়ার মধ্যে লুটোপুটি খেয়ে কে যে আনন্দ-ভিখারী উড়ুনি ভিজিয়ে সেও বিধ্বংসী নদীর থেকে শান্তি চেয়েছিল সহসা বিদ্যুত-স্পর্শে চোখ ঢেকে আমিও একদ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
হাসন্ রাজার বাড়ি
গাঁয়েতে এয়েছে এক কেরামতি সাহেব কোম্পানি কত তার ঢ্যাঁড়াক্যাড়া-মানুষ না পিপীলিকা, যা রে ছুটে যা যা রে যা দ্যাখ গা খেলা হুরীর নাচন আর ভাঁড়ের কেরদানি এখেনে এখন শুধু মুখোমুখি বসে রবো আমি আর হাসন্ রাজা। ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্থির সত্য
বহুদিন আকাশ ভাসানো জ্যোৎস্নায় হেঁটে যাইনি নদীর কিনারায় একটি ঘাসফুল ছিঁড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিইনি স্রোতে বহুদিন, বহুদিন-- তবু আমি জানি এখনো কোনোদিন জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় আকাশ আমার জন্য প্রতীক্ষা করে নদীর...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্বপ্ন, একুশে ভাদ্র
কোন্ দিকে? কোন্ দিকে? আমি চিৎকার করলাম অমনি ভিড়ের ভিতরে একটা মোহর এসে ছিট্কে পড়লো। তৎক্ষণাৎ নৈঋত বাদ দিয়ে সাতদিকে সাতটা রাস্তা খুলে গেল জ্যোৎস্নায় বড় চিত্তহারী সেই পথগুলি এবং জ্যোৎস্নায় ভিড়ের প্রতি...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি
প্রিয় ইন্দিরা, তুমি বিমানের জানালায় বসে, গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না এ বড় ভয়ঙ্কর খেলা! ক্রুদ্ধ জলের প্রবল তোলপাড়ের উপড়ে গেছে রেললাইন চৌচির হয়েছে ব্রীজ, মৃত পশুর পেটের কাছে ছন্নছাড়া বালক তরঙ্গে ভেসে যা...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এখন
দারুণ সুন্দর কিছু দেখলে আমার একটু একটু কান্না আসে এমন আগে হতো না, আগে ছিল দুরন্ত উল্লাস আগে এই পৃথিবীকে জয় করে নেবার বাসনা ছিল এখন মনে হয় আমার এই পৃথিবীটা বিলিয়ে দেই সকলকে পরশুরামের মত রক্তস্নান সেরে ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কবির মৃত্যু : লোরকা স্মরণে
দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন? সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না; সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা। অস্পষ্ট গোধুলি আলোয় তাদের পায়ে ভারী বুটের...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চে গুয়েভারার প্রতি
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ শৈশব থেকে বিষন্ন দীর্ঘশ্বাস চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরধী করে দেয়- বোলিভিয়ার জঙ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অপরাহ্ণে
তোমার মুখের পাশে কাঁটা ঝোপ,একটু সরে এসো এ-পাশে দেওয়াল,এত মাকড়শার জাল! অন্যদিকে নদী,নাকি ঈর্ষা? আসলে ব্যস্ততাময় অপরাহ্ণে ছায়া ফেলে যায় বাল্য প্রেম মানুষের ভীড়ে কোন মানুষ থাকে না অসম্ভব নির্জনতা চৌরাস্ত...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মিনতি
ঝড় দিসনে, আকাশ, সেই সুন্দরীর ঘরে থিরথিরিয়ে কাঁপতে থাকুক ভীরু দীপের শিখা আঁচল পেতে মাটিতে বুক চেপে থাক সে শুয়ে, একা ঘরের প্রতীক্ষিতা, আকাশ-কনীনিকা । দিঘির মতো শরীর তার নরম জলে ভরা ব্যথার দাগ যদিও আঁকে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যর্থতার তীব্র টান
একটা সীমানাহীন ধূ ধূ গেরুয়া রঙের প্রান্তরে, একা, খুব একা শীতে কালাে রঙের চাদর মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে আছে আমার কৈশাের তার ওষ্ঠে লেগে আছে ব্যর্থ প্রেমের বিষাদ, চোখ দুটি ঈষৎ ঝাপসা দিগন্ত জোড়া আকাশে আকাশে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কুমারী মেয়েরা, কবিতা পড়ে না
কুমারী মেয়েরা, কবিতা পড়ো না, বিপদে পড়বে যে-বয়সে মেঘ বেশী ডাকে তার আকাশ অন্য কবিতার বই ভুলেও ছুঁয়োনা, আঙুল পুড়বে কবিরা নিজেরা স্বেচ্ছায় জ্বলে লেখার জন্য। সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় করে উঠে হঠাৎ দাঁড়িয়ে কী শুনল...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
গহন অরণ্যে
গহন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না- শুকনো পাতার ভাঙা নিঃশ্বাসের মতো শব্দ তরুলতা, বাঁশের ছায়া, শালের বল্লরী, সরু পথ কালভার্টে, টিলার জঙ্গলে একা বসে থাকা কী-করম নিঝুম বিষন্ন বড় হিংস্র দুঃখময়। অসংখ্...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরা তোমার কাছে
সিঁড়ির মুখে কারা অমন শান্তভাবে কথা বললো? বেরিয়ে গেল দরজা ভেজিয়ে, তবু তুমি দাঁড়িয়ে রইলে সিঁড়িতে রেলিং-এ দুই হাত ও থুত্নি, তোমায় দেখে বলবে না কেউ থির বিজুরি তোমার রঙ একটু ময়লা, পদ্মপাতার থেকে যেন একটু ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরার জন্য কবিতার ভূমিকা
এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই, শুধু তুমি, নীরা এ-কবিতা মধ্যরাত্রে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে ঘুমের ভিতরে তুমি আচমকা জেগে উঠে টিপয়ের থেকে জল খেতে গিয়ে জিভ কামড়ে একমুহূর্ত ভাববে কে তোমার কথা মনে করছে এত রাত...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চায়ের দোকানে
লণ্ডনে আছে লাস্ট বেঞ্চির ভীরু পরিমল, রথীন এখন সাহিত্যে এক পরমহংস দীপু তো শুনেছি খুলেছে বিরাট কাগজের কল এবং পাঁচটা চায়ের বাগানে দশআনি অংশ তদুপরি অবসর পেলে হয় স্বদেশসেবক; আড়াই ডজন আরশোলা ছেড়ে ক্লাস ভেঙে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সাক্ষী
হাতে লেগেছিল হাত, কেউ তো দেখেনি ? একটি শালিক দেখেছিল সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তার ওষ্ঠ ছুঁই দেখেনি তো কেউ ? কাগজের টুকরো একটা উড়ে যায় নদীর কিনারে তার চোখে চোখ রেখে বিনিময় হয়ে যায় সব দুঃখ আর কেউ জানে না হঠ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সেই সব স্বপ্ন
কারাগারের ভিতরে পড়েছিল জোছনা বাইরে হাওয়া, বিষম হাওয়া সেই হাওয়ায় নশ্বরতার গন্ধ তবু ফাঁসির আগে দীনেশ গুপ্ত চিঠি লিখেছিল তার বৌদিকে, “আমি অমর, আমাকে মারিবার সাধ্য কাহারও নাই।” মধ্যরাত্রির আর বেশি দেরি নে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
যদি কোনোদিন
যদি কোনোদিন একা তুমি যাও কাজলা দিঘিতে যখন বিকেল আসন্ন শীতে মন্থর-বেগ, দেখবে কত না রহস্য আছে এই পৃথিবীতে কত স্বল্পের অচেনা আকাশ ছায়াময় মেঘ। দেখবে সেখানে বনের বর্ণ মহা সমারোহে শব্দে মিশেছে। নদীর জোয়ার ব...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ভালোবাসা
ভালোবাসা নয় স্তনের ওপরে দাঁত? ভালোবাসা শুধু শ্রাবণের হা-হুতাশ? ভালোবাসা বুঝি হৃদয় সমীপে আঁচ? ভালোবাসা মানে রক্ত চেটেছে বাঘ! ভালোবাসা ছিল ঝর্ণার পাশে একা সেতু নেই আকাশে পারাপার ভালাবাসা ছিল সোনালি ফসলে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জ্বলন্ত জিরাফ
শেষ কবে নারীহত্যা করেছি আমার ব্যক্তিগত স্বর্গে? বাথরুমে- ছ’মাস আগে, সেই থেকে চোখে ভালো দেখতে পাই না। সাতদিন পর্যন্ত আয়নায় হাসির প্রমাণ লেগেছিল- এছাড়া চোখের জল জমিয়ে রেখেছিলাম বেসিনে। সেই ঠান্ডা চোখের ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
শরীর অশরীরী
কেউ শরীরবাদী বলে আমায় ভর্ৎসনা করলে, তখনই ইচ্ছে হয় অভিমানে অশরীরী হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাই। আবার কেউ ‘অশরীরী’ শব্দটি উচ্চারন করলে আমি কান্নার মতন ভয় পেয়ে তীব্র কন্ঠে বলি, শরীর, তুমি কোথায়? লুকিও না এসো, ত...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তুমি
আমার যৌবনে তুমি স্পর্ধা এনে দিলে তোমার দু’চোখে তবু ভীরুতার হিম। রাত্রিময় আকাশে মিলনান্ত নীলে ছোট এই পৃথিবীকে করেছো অসীম। বেদনা-মাধুর্যে গড়া তোমার শরীর অনুভবে মনে হয় এখনও চিনি না তুমিই প্রতীক বুঝি এই প...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বন্ধুবান্ধব
চলাে দীপক, আর একবার ধলভূমগড়ে যাই বালিশ দিয়ে চোখ চাপা, শক্তি বলল ভাস্করটাকে নেবে না? শংকর, শংকর, তুই এবার অন্তত চল, কোনােদিন যাসনি দু'হাত নেড়ে শংকর বলল, ট্রেন আমার সহ্য হয় না শক্তি ওকে লাথি কষিয়ে ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রাখাল
লাল ও সবুজ আলোর মধ্যে অন্তকাল আমি ডাইনে তাকাই পিছনে ফিরে অন্ধকার গলিতে অনন্তকাল পিছনে নয়, ডাকদিকে নয়, সবুজ ও লাল- সুখের মতো ভূবিস্তৃত, ঊরুদ্বয়ে শোকের মতো, দৃষ্টি থেকে ঘুমের মতো পেরিয়ে যাই, কুসুম এবং ফ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জয়ী নই, পরাজিত নই
পাহাড়-চুড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল আমি এই পৃথিবীকে পদতলে রেখেছি এই আক্ষরিক সত্যের কছে যুক্তি মূর্ছা যায়। শিহরিত নির্জনতার মধ্যে বুক টন্টন করে ওঠে হাল্কা মেঘের উপচ্ছায়ায় একটি ম্লান দিন সবুজকে ধূসর হতে ড...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তুমি যেখানেই যাও
তুমি যেখানেই যাও আমি সঙ্গে আছি মন্দিরের পাশে তুমি শোনোনি নিঃশ্বাস ? লঘু মরালীর মতো হাওয়া উড়ে যায় জ্যোৎস্না রাতে নক্ষত্রেরা স্থান বদলায় ভ্রমণকারিণী হয়ে তুমি গেলে কার্শিয়াং অন্য এক পদশব্দ পেছনে শোনোনি ?...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
একবারই জীবনে
দুই হাতে মৃত্যু নিয়ে ছেলেখেলা করার বিলাস প্রথম যৌবনে ছিল । ভাবতাম, নদীর আকাশে লঘু মাছরাঙা পাখির মতন মৃত্যুর দু’ধারে ঘেঁষে ছুটোছুটি জীবনকে রূপরস দেয় । বারবার আমি কি যাইনি সেই মৃত্যুমুখী দক্ষিণের ঘরে ? ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ইচ্ছে
কাচের চুড়ি ভাঙার মতন মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে দুটো চারটে নিয়মকানুন ভেঙে ফেলি পায়ের তলায় আছড়ে ফেলি মাথার মুকুট যাদের পায়ের তলায় আছি, তাদের মাথায় চড়ে বসি কাচের চুড়ি ভাঙার মতই ইচ্ছে করে অবহেলায় ধর্মতলায় দিন ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আরও নিচে
সিংহাসন থেকে একটু নিচে নেমে, পাথরের সিঁড়ির উপর বসে থাকি একা, চিবুক নির্ভরশীল চোখ লোকচক্ষু থেকে দূরে। ‘সম্রাটের চেয়ে কিছু কম সম্রাটত্ব’ থেকে ছুটি নিয়ে আজ হলুদ দিনাবসানে পরিকীর্ণ শব্দটির মোহে মাটির মানু...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমি ও কলকাতা
কলকাতা আমার বুকে বিষম পাথর হয়ে আছে আমি এর সর্বনাশ করে যাবো- আমি একে ফুসলিয়ে নিয়ে যাবো হলদিয়া বন্দরে নারকোল নাডুর সঙ্গে সেঁকো বিষ মিশিয়ে খাওয়াবো- কলকাতা আমার বুকে বিষম পাথর হয়ে আছে। কলকাতা চাঁদের আলো জ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অসুখের ছড়া
একলা ঘরে শুয়ে রইলে কারুর মুখ মনে পড়ে না মনে পড়ে না মনে পড়ে না মনে পড়ে না মনে পড়ে না চিঠি লিখবো কোথায়, কোন মুন্ডহীন নারীর কাছে? প্রতিশ্রুতি মনে পড়ে না চোখের আলো মনে পড়ে না ব্লেকের মতো জানলা খুলে মুখ দে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এই দৃশ্য
হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো নীল ডুরে শাড়ী, স্বপ্নে পিঠের ওপরে চুল খোলা বাতাসে অসংখ্য প্রজাপতি কিংবা সবই অভ্রফুল? হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো চোখ দুটি বিখ্যাত সুদূর, পায়ের আঙুলে লাল আভা। ডান হা...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অন্য লোক
যে লেখে, সে আমি নয় কেন যে আমায় দোষী করো! আমি কি নেকড়ের মতো ক্রুব্ধ হয়ে ছিঁড়েছি শৃঙ্খল? নদীর কিনারে তার ছেলেবেলা কেটেছিল সে দেখেছে সংসারের গোপন ফাটল মাংসল জলের মধ্যে তার আয়না খুঁজেছে, ভেঙেছে। আমি তো ইস...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার কৈশোরে
শিউলি ফুলের রাশি শিশিরের আঘাতও সয় না অন্তত আমার কৈশোরে তারা এরকমই ছিল এখন শিউলি ফুলের খবরও রাখি না অবশ্য জানি না তারা স্বভাব বদলেছে কি না আমার কৈশোরে শিউলির বোঁটার রঙ ছিল শুধু শিউলি বোঁটারই মতন কোনো ক...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমিও ছিলাম
পাঁচজনে বলে পাঁচ কথা, আমি নিজেকে এখনো চিনি না চেয়েছিলাম তো সকালবেলার শুদ্ধ মানুষ হতে দশ দিকে চেয়ে আলোর আকাশে আয়নায় মুখ দেখা আমিও ছিলাম, আমিও ছিলম, এই সুখে নিশ্বাস জনি না কোথায় ভূল হয়ে যায়, ছায়া পড়ে ঘো...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বয়েস
আমার নাকি বয়েস বাড়ছে ? হাসতে হাসতে এই কথাটা স্নানের আগে বাথরুমে যে ক’বার বললুম ! এমন ঘোর একলা জায়গায় দু-পাক নাচলেও ক্ষতি নেই তো- হাসতে হাসতে দম ফেটে যায়, বিকেলবেলায় নীরার কাছে বলি, আমার বয়েস বাড়ছে, শু...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না
আমার ভালোবাসার কোনো জন্ম হয় না মৃত্যু হয় না – কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম। আমার কেউ নাম রাখেনি, তিনটে-চারটে ছদ্মনামে আমার ভ্রমণ মর্ত্যধামে, আগুন দেখে আলো ভেবেছি, আলোয় ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাড়ি ফেরা
রাত্তির সাড়ে বারোটায় বৃষ্টি, দুপুরে অত্যন্ত শুক্নো এবং ঝক্ঝকে ছিল পথ, মেঘ থেকে কাদা ঝরেছে, খুবই দুঃখিত মূর্তি একা হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে, কালো ভিজে চুপচাপ দ্বিধায় ট্রাম বাস বন্ধ, রিক্সা ট্যাক্সি-প...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি
আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের পায়ে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অনর্থক নয়
বেয়ারা পাঠিয়ে কারা টাকা তোলে ব্যাঙ্ক থেকে? আমি তো নিজের সইটা এখনো চিনি না বিষম টাকার অভাব! নেই। শুধু হৃৎপিন্ড হাওয়া টেনে নিয়ে হাসি কুলকুচো করি। মাথায় মুকুট নেই বলে কেউ ধার দিতেও চায় না। কিছু টাকা জমা ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অপমান এবং নীরাকে উত্তর
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেন হেসে উঠলে, সাক্ষী রইলো বন্ধু তিনজন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেন হেসে উঠলে, সাক্ষী রইলো বন্ধু তিনজন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেন হেসে উঠলে, নীরা, কেন হেসে উঠলে, কেন সহসা ঘুমের মধ্যে যেন বজ্রপাত, যেন ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার কয়েকটি নিজস্ব শব্দ
পরিত্রাণ, তুমি শ্বেত, একটুও ধূসর নও, জোনাকির পিছনে বিদ্যুৎ, যেমন তোমার চিরকাল জোনাকির চিরকাল; স্বর্গ থেকে পতনের পর তোমার অসুখ হলে ভয় পাই, বহু রাত্রি জাগরণ- প্রাচীন মাটিতে তুমি শেষ উত্তরাধিকার। একাদশী ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়
যে পান্থনিবাসে যাই দ্বার বন্ধ, বলে, ‘ঐ যে রুগ্ন ফুলগুলি বাগানে রয়েছে শুধু, এখন বসবেন?’ কেউ মুমূর্ষু অঙ্গুলি আপন উরসে রেখে হেসে ওঠে, পাতা ঝরানোর হাসি, ‘এই অবেলায় কেন এসেছেন আপনি, কী আছে এখন? গত বসন্তমে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এক একদিন উদাসীন
এমনও তো হয় কোনোদিন পৃথিবী বান্ধবহীন তুমি যাও রেলব্রীজে একা_ ধূসর সন্ধ্যায় নামে ছায়া নদীটিও স্থিরকায়া বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা। ইস্টিশানে অতি ক্ষীণ আলো তাও কে বেসেছে ভালো এত প্রিয় এখন দ্যুলোক হে মানুষ, ব...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
একটি কথা
একটি কথা বাকি রইলো থেকেই যাবে মন ভোলালো ছদ্মবেশী মায়া আর একটু দূর গেলেই ছিল স্বর্গ নদী দূরের মধ্যে দূরত্ব বোধ কে সরাবে। ফিরে আসার আগেই পেল খুব পিপাসা বালির নিচে বালিই ছিল, আর কিছুই না রৌদ্র যেন হিংসা,...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
উত্তরাধিকার
নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুস-ভরা হাসি দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ’য়ে শুয়ে থাকা এসব এখন তোমারই, তোমার হাত ভ’রে নাও আমা...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এবার কবিতা লিখে
এবার কবিতা লিখে আমি একটা রাজপ্রাসাদ বানাবো এবার কবিতা লিখে আমি চাই পনটিয়াক গাড়ি এবার কবিতা লিখে আমি ঠিক রাষ্ট্রপতি না হলেও ত্রিপাদ ভূমির জন্য রাখবো পা উঁচিয়ে--- মেষপালকের গানে এ পৃথিবী বহুদিন ঋণী! ক...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মন ভালো নেই
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায় আশায় আশায় আশায় আশায় এখন আমার ওষ্ঠে লাগে ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কেউ কথা রাখেনি
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ঘুম ভাঙার পর
ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়। হলুদ-তেল মাখা একটি সকাল, ঝর্নার জলে বৃষ্টিপাতের মতন শব্দ ঝুল বারান্দার সামনের বাগানে কেউ হাসছে শীতের রোদ্দুরের মতন। কিছু ভাঙছে, কিছু খসে যাচ্ছে বইয়ের পাতায় কার আ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চতুরের ভূমিকা
কিছু উপমার ফুল নিতে হবে নিরুপমা দেবী যদিও নামের মধ্যে রেখেছেন আসল উপমা ক্ষণিক প্রশ্রয়-তুষ্টি চায় আজ সামান্য এ কবি, রবীন্দ্রনাথেরও আপনি চপলতা করেছেন ক্ষমা । যদিও প্রত্যহ আসে অগণিত সুঠাম যুবক নানা উপহ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
গদ্যছন্দে মনোবেদনা
ভেবেছিলাম নিচু করবো না মাথা, তবুও ভেতরের এক কুত্তার বাচ্চা মাঝে মাঝে মসৃণ পায়ের কাছে ঘষতে চায় মুখ, জানি তো অসীমে ভাসিয়েছি আমার আত্মার শাদা পায়রা দূত, বলেছি মৃত্যুর চেয়েও সাচ্চা মানুষের মতো বেঁচে থঅকা-...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্মৃতির শহর ১
আমাকে টান মারে রাত্রি-জাগা নদী আমাকে টানে গূঢ় অন্ধকার আমার ঘুম ভেঙে হঠাৎ খুলে যায় মধ্যরাত্রির বন্ধ দ্বার। বাতাসে ছেঁড়া মেঘ, চাঁদের চারপাশে সহসা দানা বাঁধে নীল সময় বাইরে এসে দেখি পৃথিবী শুন্-শান্ রাস্ত...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জাগরণ হেমবর্ণ
জাগরণ হেমবর্ণ, তুমি ওকে সন্ধ্যায় জাগাও আরও কাছে যাও ও কেন হিংসার মতো শুয়ে আছে যাখন পৃথিবী খুব শৈশবের মতো প্রিয় হলো জল কনা- মেশা হওয়া এখন এ আশ্বিনের প্রথম সোপানে বারবার হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় আরও কাছে য...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তুমি যেই এসে দাঁড়ালে
তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে হাত ছুঁয়ে বলে বন্ধু তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় হাসি বিনিময় করে চলে যায় উত্তরে দক্ষিণে তুমি যেই এসে দাঁড়ালে--- কেউ চিনলো না কেউ দেখলো না সবাই সবার অচ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়
শব্দ মোহ বন্ধনে কবে প্রথম ধরা পড়েছিলুম আজ মনে নেই কোনো এক নদীর তীরে দাঁড়িয়ে জলস্রোতের পাশে অকস্মাৎ দেখা যেন ঠিক আর এক স্রোত সমস্ত ধ্বনির পাশাপাশি অন্য এক ধ্বনি জীবন যাপনের পাশাপাশি এক অদেখা জীবন যাপন…...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নির্বাসন
আমি ও নিখিলেশ, অর্থাৎ নিখিলেশ ও আমি, অর্থাৎ আমরা চারজন একসঙ্গে সন্ধেবেলা কার্জন পার্কের মধ্য দিয়ে,- চতুর্দিকে রাজকুমারীর মত আলো- হেঁটে যাই, ইনসিওরেন্স কোম্পানীর ঘড়ি ভয় দেখালো উল্টো দিকে কাঁটা ঘুরে, আম...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নশ্বর
কখনো কখনো মনে হয়, নীরা, তুমি আমার জন্মদিনের চেয়েও দূরে-- তুমি পাতা-ঝরা অরণ্যে একা একা হেঁটে চলো তোমার মসৃণ পায়ের নিচে পাতা ভাঙার শব্দ দিগন্তের কাছে মিশে আছে মোষের পিঠের মতন পাহাড় জয়ডঙ্কা বাজিয়ে তার আড়...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরা ও জীরো আওয়ার
এখন অসুখ নেই, এখন অসুখ থেকে সেরে উঠে- পরবর্তী অসুখের জন্য বসে থাকা। এখন মাথার কাছে জানলা নেই, বুক ভরা দুই জানলা, শুধু শুকনো চোখ দেয়ালে বিশ্রাম করে, কপালে জলপট্টির মতো ঠাণ্ডা হাত দূরে সরে গেছে, আজ এই ব...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
না-পাঠানো চিঠি
মা, তুমি কেমন আছ? আমার পোষা বেড়াল খুনচু, সে কেমন আছে সে রাত্তিরে কার পাশে শোয় দুপুরে যেন আলি সাহেবদের বাগানে না যায় মা, ঝিঙে মাচায় ফুল এসেছে? তুলিকে আমার ড়ুরে শাড়িটা পরতে বলো আঁচলের ফেঁসোটা যেন সেলাই ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
দুপুর
রৌদ্রে এসে দাঁড়িয়েছে রৌদ্রের প্রতিমা এ যেন আলোরই শস্য, দুপুরের অস্থির কুহক অলিন্দে দাঁড়ানো মূর্তি ঢেকে দিল দু’চক্ষুর সীমা পথ চলতে থম্কে গেলো অপ্রতিভ অসংখ্য যুবক। ভিজে চুল খুলেছে সে সুকুমার, উদাস আ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রবাসের শেষে
যমুনা, আমার হাত ধরো, স্বর্গে যাবো। এসো, মুখে রাখো মুখ, চোখে চোখ, শরীরে শরীর নবীনা পাতার মতো শুদ্ধরূপ, এসো স্বর্গ খুব দুরে নয়, উত্তর সমুদ্র থেকে যে রকম বসন্ত প্রবাসে উড়ে আসে কলস্বর, বাহু থেকে শীতের উত্...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রার্থনা
ঋজু শাল অশ্বত্থের শিকড়ে শিকড়ে যত ক্ষুধা সব তুমি সয়েছ, বসুধা। স্তব্ধ নীল আকাশের দৃশ্য অন্তহীন পটভূমি চক্ষুর সীমানা-প্রান্তে বেঁধে দিয়ে তুমি এঁকে দিলে মাঠ বন বৃষ্টি-মগ্ন নদী-তার দুরাভাস তীর আমাকে নি...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
যদি নির্বাসন দাও
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো আমি বিষপান করে মরে যাবো! বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ প্রান্তরে দিগন্ত নিনির্মেষ- এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বঞ্চনা
সিংহদ্বার খুলে গেছে, ভেতরে দেখি শুধুই শূন্যতা হা হা করছে অন্ধকার কেউ নেই, কোনো রহস্যও না যেন বালক বয়েসের হাওয়া ঘুরে যায় দু' একটা শুকনো পাতার শব্দ--- কেউ নেই ? আমি চেঁচিয়ে উঠি প্রতিধ্বনি আসে কেউ নেই...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
পাহাড় চূড়ায়
অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না। আমার নিজস্ব একটা নদী আছে, সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে। কে না জানে, পাহাড়...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যর্থ প্রেম
প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয় আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে হ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মনে মনে
যে আমায় চোখ রাঙিয়ে এইমাত্র চলে গেল গট্গটিয়ে সে আমায় দিয়ে গেল একটুকরো সুখ শরীরে নতুন করে রক্ত চলাচল টের পাই ইন্দ্রীয় সুতীক্ষ্ম হয়ে ওঠে মৃদু হেসে মনে মনে আমি তার নাম কেটে দিই। সে আর কোথাও নেই, হিম অন্ধ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাতাসে তুলোর বীজ
বাতাসে তুলোর বীজ, তুমি কার? এই দিক শূন্য ওড়াউড়ি, এ যেন শিল্পের রূপ- আচমকা আলোর রশ্মি পপি ফুল ছুঁয়ে গেলে যে রকম মিহি মায়াজাল বাতাসে তুলোর বীজ তুমি কার? পাহাড়ী জঙ্গল থেকে উড়ে এলে খোলা জানলা পাঁচকোণা ঘরে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বিবৃতি
উনিশে বিধবা মেয়ে কায়ক্লেশে উন্তিরিশে এসে গর্ভবতী হলো, তার মোমের আলোর মতো দেহ কাঁপালো প্রাণান্ত লজ্জা, বাতাসের কুটিল সন্দেহ সমস্ত শরীরে মিশে, বিন্দু বিন্দু রক্তে অবশেষে যন্ত্রণার বন্যা এলো, অন্ধ হলো চ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সখী আমার
সখী, আমার তৃষ্ণা বড় বেশি, আমায় ভুল বুঝবে? শরীর ছেনে আশ মেটে না, চক্ষু ছুঁয়ে আশ মেটে না তোমার বুকে ওষ্ঠ রেখেও বুক জ্বলে যায়, বুক জ্বলে যায় যেন আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, যেন আমার দিঘির পাড়ে বকের সাথে দে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
শব্দ ২
আমায় অনুসরণ করে আঠাশ বছর পেরিয়ে আসা শব্দ যেন তাকায় অতিকুসীদ, যেন হরণ দাবি করে যেন আমার বুকের মধ্যে তুঁত পোকার মতো নড়ে অনুসরণ অনুসরণ শব্দ শব্দ ওঁ শব্দ অতিক্ষিদেয় খেয়েছিলাম সাতশো বিবেক, শব্দ বললো, ‘আমি ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সকল ছন্দের মধ্যে আমিই গায়ত্রী
ছিলাম বাসনা-লঘু, ছন্দ এসে আমাকে সুসি’র হতে বলে প্রিয় বয়স্যের মতো তার দন্তপঙ্ক্তি আমি তাকে দূর হয়ে যেতে বলি নতুন বন্ধুর খোঁজে আমি ছন্দহীন হতে হতে ক্রমশ ধর্মদ্রোহী আগোপন পাষন্ড হয়ে যাই। তবু সে দরজার কা...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রাগী লোক
রাগী লোকেরা কবিতা লিখতে পারে না তারা বড্ড চ্যাঁচায় গহন সংসারের ম্লান ছায়ায় রাগী লোকরা অত্যন্ত নিঃসঙ্গ তারা নিজের কন্ঠস্বর শুনতে ভালোবাসে। পাহাড়ের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়া জলপ্রপাতের পাশে আমি একজন রাগ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
শুধু কবিতার জন্য
শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য অপলক মুখশ্রীর শান্তি একঝলক; শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী, শুধু কবিতার জন্য এতো ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্বপ্ন নয়
সুগন্ধ নারীর পাশে শুয়ে থাকা স্বপ্ন নয় বাইরে বর্ষার কলরোল কানের লতির পাশে ঠোঁট এনে পুরোনো কাব্যের পঙক্তি বলাবলি হলো স্বপ্ন নয় বাইরে ক্ষুধা ও মৃত্যু চোখাচোখি করে হাতের আঙুল নিয়ে খেলা, দুরন্ত আঙুল...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্মৃতির শহর ২২
কৈশোর ভেঙেছে তার একমাত্র গোপন কার্নিশ কৈশোরই ভেঙেছে ভেঙে গেছে যত ঢেউ ছিল দূর আকাশগঙ্গায় শত টুকরো হয়ে গেছে সোনালি পিরিচ সে ভেঙেছে, সে নিজে ভেঙেছে পাথরকুচির আঠা দুই চোখে লেগেছিল তার রক্ত ঝরে পড়েছিল হাতে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সাবধান
আমি সেই মানুষ, আমাকে চেয়ে দ্যাখো আমি ফিরে এসেছি আমার কপালে রক্ত; বাষ্প-জমা গলায় বাস-ওল্টানো ভাঙা রাস্তা দিয়ে ফিরে এলাম- আমি মাছহীন ভাতের থালার সামনে বসেছি আমি দাঁড়িয়েছি চালের দোকানের লাইনে আমার চুলে ভ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সত্যবদ্ধ অভিমান
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ আমি কি এ হাতে কোনাে পাপ করতে পারি? শেষ বিকেলের সেই ঝুল বারান্দায় তার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে নীরার সুষমা চোখে ও ভুরুতে মে...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সহজ
কেমন সহজ আমি ফোটালাম একলক্ষ ফুল হঠাৎ দিলাম জ্বেলে কয়েকটা সুর্য চাঁদ তারা আবার খেয়াল হলে এক ফুঁয়ে নেভালাম সেই জ্যোৎস্না (মনে পড়ে কোন্ জ্যোৎস্না?) নেভালাম সেই রোদ (তাও মনে পড়ে?) নিন্দুকে নানান কথ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্মৃতির শহর ১৩
সীমান্ত এলাকার মানুষ গদ্যে কথা বলে বস্তি ও কলকারখানার মানুষ গদ্যে কথা বলে দিনের বেলায় শহর গদ্যে কথা বলে সমস্ত সমসাময়িক দুঃখ গদ্যে কথা বলে শুকনো মাঠ ও রুখু দাড়িওয়ালা মানুষটি গদ্যে কথা বলে গোটা ছুরি-কাচ...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্বপ্নের অন্তর্গত
কারুর আসার কথা ছিল না কেউ আসেনি তবু কেন মন খারাপ হয় ? যে-কোনো শব্দ শুনেই বাইরে উঠে যাই কেউ নেই-- অদ্ভুত নির্জন হয়ে পৃথিবী শুয়ে আছে ঘুম ভাঙ্গার ঠিক আগের মুহূর্তের স্বপ্নে আমিও যেন সেই স্বপ্নের অন্তর্...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
হিমযুগ
শরীরের যুদ্ধ থেকে বহুদূর চলে গিয়ে ফিরে আসি শরীরের কাছে কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে- শিশিরে ধুয়েছো বুক, কোমল জ্যোঃস্নার মতো যোনি মধুকূপী ঘাসের মতন রোম, কিছুটা খয়েরি কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন স...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
হঠাৎ নীরার জন্য
বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–দিকচিহ্নহীন– বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
স্মৃতির শহর ১৪
যদি কবিতা লিখে মাঠ-ভর্তি ধান ফলানো যেত আমি রক্ত দিয়ে লিখতুম সেই কবিতা যদি কবিতার ছন্দে তৃষ্ণার্ত ভূমিতে ধারা-বর্ষণ হতো আমি আমার হাড় মজ্জার নির্যাস মিশিয়ে রচনা করতুম বৃষ্টির বন্দনা স্তোত্র যদি কবিতা লি...
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়