সুকান্ত ভট্টাচার্য এর রচনাবলি
চরমপত্র
তোমাকে দিচ্ছি চরমপত্র রক্তে লেখা; অনেক দুঃখে মথিত এ শেষ বিদ্যে শেখা৷ অগণ্য চাষী-মজুর জেগেছে শহরে গ্রামে সবাই দিচ্ছি চরমপত্র একটি খামে : পবিত্র এই মাটিতে তোমার মুছে গেছে ঠাঁই, ক্ষুব্ধ আকাশে বাতাসে ধ্বন...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চারাগাছ
ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি: পাশে এক বিরাট প্রাসাদ প্রতিদিন চোখে পড়ে; সে প্রাসাদ কি দুঃসহ স্পর্ধায় প্রত্যহ আকাশকে বন্ধুত্ব জানায়, আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি। চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি- এ অট্টালিকার প...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চিল
পথ চলতে চলতে হঠাৎ দেখলামঃ ফুটপাতে এক মরা চিল! চমকে উঠলাম ওর করুণ বীভৎস মূর্তি দেখে। অনেক উঁচু থেকে যে এই পৃথিবীটাকে দেখেছে লুণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশ; যার শ্যেন দৃষ্টিতে কেবল ছিল তীব্র লোভ আর ছোঁ মারার দস্...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চৈত্রদিনের গান
চৈতীরাতের হঠাৎ হাওয়া আমায় ডেকে বলে, “বনানী আজ সজীব হ’ল নতুন ফুলে ফলে৷ এখনও কি ঘুম-বিভোর? পাতায় পাতায় জানায় দোল বসন্তেরই হাওয়া৷ তোমার নবীন প্রাণে প্রাণে, কে সে আলোর জোয়ার আনে? নিরুদ্দেশের পানে আজি তোমা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ডাক
খে-মৃদু-হাসি অহিংস বুদ্ধের ভূমিকা চাই না। ডাক ওঠে যুদ্ধের। গুলি বেঁধে বুকে উদ্ধত তবু মাথা- হাতে হাতে ফেরে দেনা-পাওনার খাতা, শোনো হুঙ্কার কোটি অবরুদ্ধের। দুর্ভিক্ষকে তাড়াও, ওদেরও তাড়াও- সন্ধিপত্র মাড...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ছাড়পত্র
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে তার মুখে খবর পেলুম: সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার জন্মমাত্র সুতীব্র চীৎকারে। খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলিত, উদ্ভাসি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ছুরি
বিগত শেষ-সংশয়; স্বপ্ন ক্রমে ছিন্ন, আচ্ছাদন উন্মোচন করেছে যত ঘৃণ্য, শঙ্কাকুল শিল্পীপ্রাণ, শঙ্কাকুল কৃষ্টি, দুর্দিনের অন্ধকারে ক্রমশ খোলে দৃষ্টি। হত্যা চলে শিল্পীদের, শিল্প আক্রান্ত, দেশকে যারা অস্ত্র ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জনযুদ্ধের গান - ৯
জনগণ হও আজ উদ্বুদ্ধ শুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ, জাপানী ফ্যাসিস্টদের ঘোর দুর্দিন মিলছে ভারত আর বীর মহাচীন। সাম্যবাদীরা আজ মহা ক্রুদ্ধ শুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ। জনগণ শক্তির ক্ষয় নেই, ভয় নেই আমাদের ভ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জবাব
আশংকা নয় আসন্ন রাত্রিকে মুক্তি-মগ্ন প্রতিজ্ঞায় চারিদিকে হানবে এবার অজস্র মৃত্যুকে; জঙ্গী-জনতা ক্রমাগত সম্মুখে৷ শত্রুদল গোপনে আজ, হানো আঘাত এসেছে দিন; পতেঙ্গার রক্তপাত আনে নি ক্রোধ, স্বার্থবোধ দুর্দিনে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিচয়
ও পাড়ার শ্যাম রায় কাছে পেলে কামড়ায় এমনি সে পালোয়ান, একদিন দুপুরে ডেকে বলে গুপুরে ‘এক্ষুনি আলো আন্’৷ কী বিপদ তা হ’লে মার খাব আমরা? দিলে পরে উত্তর রেগে বলে ‘দুত্তর, যত সব দামড়া’৷ কেঁদে বলি, শ্রীপদে ব...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ঠিকানা
ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু ঠিকানার সন্ধান, আজও পাও নি? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান? ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু, পথে পথে বাস করি, কখনো গাছের তলাতে কখনো পর্ণকুটির গড়ি। আমি যাযাবর, কুড়াই পথের নুড়ি, হাজা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
তরঙ্গ ভঙ্গ
হে নাবিক, আজ কোন্ সমুদ্রে এল মহাঝড়, তারি অদৃশ্য আঘাতে অবশ মরু-প্রান্তর। এই ভুবনের পথে চলবার শেষ-সম্বল ফুরিয়েছে, তাই আজ নিরুক্ত প্রাণ চঞ্চল। আজ জীবনেতে নেই অবসাদ! কেবল ধ্বংস, কেবল বিবাদ- এই জীবনের একী ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
তারুণ্য
হে তারুণ্য, জীবনের প্রত্যেক প্রবাহ অমৃতের স্পর্শ চায়; অন্ধকারময় ত্রিকালের কারাগৃহ ছিন্ন করি’ উদ্দাম গতিতে বেদনা-বিদ্যুৎ-শিখা জ্বালাময় আত্মার আকাশে, ঊর্ধ্বমুখী আপনারে দগ্ধ করে প্রচণ্ড বিস্ময়ে। জীবনের প...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিবেশন
সান্ধ্য ভিড় জমে ওঠে রেস্তোরাঁর দুর্লভ আসরে, অর্থনীতি, ইতিহাস, সিনেমার পরিচ্ছন্ন পথে – খুঁজে ফেরে অনন্তের বিলুপ্ত পর্যায়। গন্ধহীন আনন্দের অন্তিম নির্যাস এক কাপ চা-এ আর রঙিন সজ্জায়। সম্প্রতি নীরব হল; বি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দুরাশার মৃত্যু
দ্বারে মৃত্যু, বনে বনে লেগেছে জোয়ার, পিছনে কি পথ নেই আর? আমাদের এই পলায়ন জেনেছে মরণ, অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে, প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে। দাবানল! ব্যর্থ হল শুষ্ক অশ্রুজল, বেনামী কৌশল জেনেছে যে আরণ্যক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দুর্মর
হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলা দেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে, সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ। জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে। হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান, গত আকালের ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দেওয়ালী
তোর সেই ইংরেজীতে দেওয়ালীর শুভেচ্ছা কামনা পেয়েছি, তবুও আমি নিরুৎসাহে আজ অন্যমনা, আমার নেইকো সুখ, দীপান্বিতা লাগে নিরুৎসব, রক্তের কুয়াশা চোখে, স্বপ্নে দেখি শব আর শব। এখানে শুয়েই আমি কানে শুনি আর্তনা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দেশলাই কাঠি
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি নাঃ তবু জেনো মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ- বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস; আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি। মনে আছে সেদিন হুলস্থূল বেধেছিল? ঘরের...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
নব জ্যামিতির ছড়া
Food-Problem (একটি প্রাথমিক সম্পাদ্যের ছায়া অবলম্বনে) সিদ্ধান্ত : আজকে দেশে রব উঠেছে, দেশেতে নেই খাদ্য; ‘আছে’, সেটা প্রমাণ করাই অধুনা ‘সম্পাদ্য’৷ * কল্পনা : মনে করো, আসছে জাপান অতি অবিলম্বে, সাধারণকে ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
নিভৃত
বিষণ্ণ রাত, প্রসন্ন দিন আনো আজ মরণের অন্ধ অনিদ্রায়, সে অন্ধতায় সূর্যের আলো হানো, শ্বেত স্বপ্নের ঘোরে যে মৃতপ্রায়। নিভৃত-জীবন-পরিচর্যায় কাটে যে দিনের, আজ সেখানে প্রবল দ্বন্দ্ব। নিরন্ন প্রেম ফেরে নি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পটভূমি
অজাতশত্রু, কতদিন কাল কাটলো : চিরজীবন কি আবাদ-ই ফসল ফলবে? ওগো ত্রিশঙ্কু, নামাবলী আজ সম্বল টংকারে মূঢ় স্তব্ধ বুকের রক্ত৷ কখনো সন্ধ্যা জীবনকে চায় বাঁধতে, সাদা রাতগুলো স্বপ্নের ছায়া মনে হয়, মাটির বুকেতে ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পত্র
কাশী গিয়ে হু হু ক’রে কাটলো কয়েক মাস তো, কেমন আছে মেজাজ ও মন, কেমন আছে স্বাস্থ্য? বেজায় রকম ঠাণ্ডা সবাই করছে তো বরদাস্ত? খাচ্ছে সবাই সস্তা জিনিস, খাচ্ছে পাঁঠা আস্ত? সেলাই কলের কথাটুকু মেজদার দু’কান স্প...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিখা
স্বচ্ছ রাত্রি এনেছে প্লাবন, উষ্ণ নিবিড় ধুলিদাপটের মরুচ্ছায়ায় ঘনায় নীল। ক্লান্ত বুকের হৃৎস্পন্দন ক্রমেই ধীর হয়ে আসে তাই শেষ সম্বল তোলো পাঁচিল। ক্ষণভঙ্গুর জীবনের এই নির্বিরোধ হতাশা নিয়েই নিত্য তোম...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সুতরাং
এত দিন ছিল বাঁধা সড়ক, আজ চোখে দেখি শুধু নরক! এত আঘাত কি সইবে, যদি না বাঁচি দৈবে? চারি পাশে লেগে গেছে মড়ক! বহুদিনকার উপার্জন, আজ দিতে হবে বিসর্জন। নিষ্ফল যদি পন্থা; সুতরাং ছেঁড়া কন্থা মনে হয় শ্রেয় বর্জ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সূচনা
ভারতবর্ষে পাথরের গুরুভারঃ এহেন অবস্থাকেই পাষাণ বলো, প্রস্তরীভুত দেশের নীরবতার একফোঁটা নেই অশ্রুও সম্বলও। অহল্যা হল এই দেশ কোন্ পাপে ক্ষুদার কান্না কঠিন পাথরে ঢাকা, কোনো সাড়া নেই আগুনের উত্তাপে এ নৈঃশ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পৃথিবীর দিকে তাকাও
দেখ, এই মোটা লোকটাকে দেখ অভাব জানে না লোকটা, যা কিছু পায় সে আঁকড়িয়ে ধরে লোভে জ্বলে তার চোখটা। মাথা উঁচু করা প্রাসাদের সারি পাথরে তৈরি সব তার, কত সুন্দর, পুরোনো এগুলো! অট্রালিকা এ লোকটার। উঁচু মাথা তার...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রথম বার্ষিকী
আবার ফিরে এল বাইশে শ্রাবণ। আজ বর্ষশেষে হে অতীত, কোন সম্ভাষণ জানাব অলক্ষ্য পানে? ব্যথাক্ষুব্ধ গানে ঝরাব শ্রাবণ বরিষণ! দিনে দিনে, তিলে তিলে যে বেদনা উদাস মধুর হয়েছে নিঃশব্দ প্রাণে ভরেছে বিপুল টানে, তারে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রস্তুত
কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়, নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায়। ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ; তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক, কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায়। অবশেষে ভুল ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিক্ষোভ
দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম, হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম। জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে, কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে? যারা আজ এত মি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ফসলের ডাকঃ ১৩৫১
কাস্তে দাও আমার এ হাতে সোনালী সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে। শক্তির উন্মুক্ত হাওয়া আমার পেশীতে স্নায়ুতে স্নায়ুতে দেখি চেতনার বিদ্যুৎ বিকাশঃ দু'পায়ে অস্থির আজ বলিষ্ঠ কদম; কাস্তে দাও আমার এ হাতে। দু'চ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভাল খাবার
ধনপতি পাল, তিনি জমিদার মস্ত; সূর্য রাজ্যে তাঁর যায় নাকো অস্ত তার ওপর ফুলে উঠে কারখানা-ব্যাঙ্কে আয়তনে হারালেন মোটা কোলা ব্যাঙকে। সবার “হুজুর” তিনি, সকলের কর্তা, হাজার সেলাম পান দিনে গড়পড়তা। সদাই পাহারা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিভীষণের প্রতি
বিভীষণের প্রতি আমরা সবাই প্রস্তুত আজ, ভীরু পলাতক ! লুপ্ত অধুনা এদেশে তোমার গুপ্তঘাতক, হাজার জীবন বিকশিত এক রক্ত-ফুলে, পথে-প্রান্তরে নতুন স্বপ্ন উঠেছে দুলে । অভিজ্ঞতার আগুনে শুদ্ধ অতীত পাতক, এখানে সবাই...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বুদ্বুদ মাত্র
মৃত্যুকে ভুলেছ তুমি তাই, তোমার অশান্ত মনে বিপ্লব বিরাজে সর্বদাই। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মৃত্যুকে স্মরণ ক’রো মনে, মুহূর্তে মুহূর্তে মিথ্যা জীবন ক্ষরণে, – তারি তরে পাতা সিংহাসন, রাত্রি দিন অসাধ্য সাধন। তব...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মীমাংসা
আজকে হঠাৎ সাত-সমুদ্র তের-নদী পার হতে সাধ জাগে মনে, হায় তবু যদি পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ প্রস্রবণের মতো এসে যেত হঠাৎ আজ- তাহলে না হয় আকাশ বিহার হত সফল, টুকরো মেঘেরা যেতে যেতে ছুঁয়ে যেত কপোল...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বোধন
হে মহামানব, একবার এসো ফিরে শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে, এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার; লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার। এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি নীরবে মৃত্যু গেড়েছে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ব্যর্থতা
আজকে হঠাৎ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হ’তে সাধ জাগে, মনে হয় তবু যদি পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ, চাষার ছেলের হাতে এসে যেত হঠাৎ আজ৷ তা হলে না হয় আকাশবিহার হ’ত সফল, টুকরো মেঘেরা যেতে-যেতে ছুঁয়ে যেত কপো...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ব্ল্যাক-মার্কেট
হাত করে মহাজন, হাত করে জোতদার, ব্ল্যাক-মার্কেট করে ধনী রাম পোদ্দার, গরীব চাষীকে মেরে হাতখানা পাকালো বালিগঞ্জেতে বাড়ি খান ছয় হাঁকালো। কেউ নেই ত্রিভুবনে, নেই কিছু অভাবও তবু ছাড়ল না তার লোক-মারা স্বভাবও।...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস
ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস (শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে) অকস্মাৎ মধ্যদিনে গান বন্ধ ক’রে দিল পাখি, ছিন্নভিন্ন সন্ধ্যাবেলা প্রাত্যহিক মিলনের রাখী; ঘরে ঘরে অনেকেই নিঃসঙ্গ একাকী৷ ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মজুরদের ঝড়
এখন এই তো সময়- কই? কোথায়? বেরিয়ে এসো ধর্মঘটভাঙা দালালরা; সেই সব দালালরা- ছেলেদের চোখের মতো যাদের ভোল বদলায়, বেরিয়ে এসো! জাহান্নামে যাওয়া মূর্খের দল, বিচ্ছিন্ন, তিক্ত, দুর্বোধ্য পরাজয় আর মৃত্যুর...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মণিপুর
এ আকাশ, এ দিগন্ত, এই মাঠ, স্বপ্নের সবুজ ছোঁয়া মাটি, সহস্র বছর ধ'রে এসে আমি জানি পরিপাটি, জানি এ আমার দেশ অজস্র ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা, এখানে আমার রক্তে বেঁচে আছে পূর্বপুরুষেরা। যদিও দলিত দেশ, তবু মুক্তি ক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মধ্যবিত্ত -৪২
পৃথিবীময় যে সংক্রামক রোগে, আজকে সকলে ভুগছে একযোগে, এখানে খানিক তারই পূর্বাভাস পাচ্ছি, এখন বইছে পুব-বাতাস। উপায় নেই যে সামলে ধরব হাল, হিংস্র বাতাসে ছিঁড়ল আজকে পাল, গোপনে আগুন বাড়ছে ধানক্ষেতে, বিদেশ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মহাত্মাজীর প্রতি
চল্লিশ কোটি জনতার জানি আমিও যে একজন, হাঠাৎ ঘোষণা শুনেছি; আমার জীবনে শুভক্ষণ এসেছে, তখনি মুছে গেছে ভীরু চিন্তার হিজিবিজি। রক্তে বেজেছে উৎসব, আজ হাত ধরো গান্ধীজী। এখানে আমরা লড়েছি, মরেছি, করেছি অঙ্গীকা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মুহূর্ত (ক)
এমন মুহূর্ত এসেছিল একদিন আমার জীবনে যে মহূর্তে মনে হয়েছিল সার্থক ভুবনে বেঁচে থাকাঃ কালের আরণ্য পদপাত ঘটেছিল আমার গুহায়। জরাগ্রস্ত শীতের পাতারা উড়ে এসেছিল কোথা থেকে, সব কিছু মিশে একাকার কাল-বোশেখীর পদা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মৃত পৃথিবী
পৃথিবী কি আজ শেষে নিঃস্ব ক্ষুধাতুর কাঁদে সারা বিশ্ব, চারিদিকে ঝরে পড়া রক্ত, জীবন আজকে উত্যক্ত। আজকের দিন নয় কাব্যের পরিণাম আর সম্ভাব্যের ভয় নিয়ে দিন কাটে নিত্য, জীবনে গোপন-দুর্বৃত্ত। তাইতো জীবন আজ রিক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মৃত্যুজয়ী গান
নিয়ত দক্ষিণ হাওয়া স্তব্ধ হল একদা সন্ধ্যায় অজ্ঞাতবাসের শেষে নিদ্রাভঙ্গে নির্বীর্য জনতা সহসা আরণ্য রাজ্যে স্তম্ভিত সভয়ে; নির্বায়ুমণ্ডল ক্রমে দুর্ভাবনা দৃঢ়তর করে। দুরাগত স্বপ্নের কী দুর্দিন! মহামার...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি, প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি, এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি, নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রূকুটি; এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, তোমার দানের ম...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি, প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি, এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি, নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রূকুটি; এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, তোমার দান...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রানার
রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে, রানার চলেছে রানার! রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার। দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার- কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রোম
ভেঙ্গেছে সাম্রাজ্যস্বপ্ন, ছত্রপতি হয়েছে উধাও; শৃঙ্খল গড়ার দুর্গ ভূমিসাৎ বহু শতাব্দীর। 'সাথী আজ দৃঢ় হাতে হাতিয়ার নাও' - রোমের প্রত্যেক পথে ওঠে ডাক ক্রমশ অস্থির। উদ্ধত ক্ষমতালোভী দস্যুতার ব্যর্থ পরা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রৌদ্রের গান
এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ, যে সোনার মদ পান ক'রে ধন ক্ষেত দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ। ভারতী! তোমার লাবণ্য দেহ ঢাকে রৌদ্র তোমায় পরায় সোনার হার, সূর্য তোমার শুকায় সবুজ চুল প...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
লেনিন
লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ, অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ। আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে হাজার লেনিন যুদ্ধ করে, মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
শত্রু এক
এদেশ বিপন্ন আজ; জানি আজ নিরন্ন জীবন- মৃত্যুরা প্রত্যহ সঙ্গী, নিয়ত শত্রুর আক্রমণ রক্তের আল্পনা আঁকে, কানে বাজে আর্তনাদ সুর; তবুও সুদৃঢ় আমি, আমি এক ক্ষুধিত মজুর আমার সম্মুখে আজ এক শত্রুঃ এক লাল পথ, শত...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সিপাহী বিদ্রোহ
হঠাৎ দেশে উঠল আওয়াজ- “হো-হো, হো-হো, হো-হো” চমকে সবাই তাকিয়ে দেখে- সিপাহী বিদ্রোহ! আগুন হয়ে সারাটা দেশ ফেটে পড়ল রাগে, ছেলে বুড়ো জেগে উঠল নব্বই সন আগেঃ একশো বছর গোলামিতে সবাই তখন ক্ষিপ্ত, বিদেশীদের রক্ত...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সিগারেট
আমরা সিগারেট। তোমরা আমাদের বাঁচতে দাও না কেন? আমাদের কেন নিঃশেষ করো পুড়িয়ে? কেন এত স্বল্প-স্থায়ী আমাদের আয়ু? মানবতার কোন্ দোহাই তোমরা পাড়বে? আমাদের দাম বড় কম এই পৃথিবীতে। তাই কি তোমরা আমাদের শোষ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হে মহাজীবন
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয় এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো, পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো! প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা- কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্য...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
স্মারক
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায় তবুও পড়িবে মনে, চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে হৃদয়ের আঙ্গিনায় রজনীগন্ধা বনে, তবুও পড়িবে মনে। বলাকার পাখা আজও যদি উড়ে সুদূর দিগঞ্চলে বন্যার মহাবেগে, তবুও আমার স্তব্ধ বুক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
স্বতঃসিদ্ধ
মৃত্যুর মৃত্তিকা ‘পরে ভিত্তি প্রতিকূল – সেখানে নিয়ত রাত্রি ঘনায় বিপুল; সহসা চৈত্রের হাওয়া ছড়ায় বিদায়ঃ স্তিমিত সূর্যের চোখে অন্ধকার ছায়। বিরহ-বন্যার বেগে প্রভাতের মেঘ রাত্রির সীমায় এসে জানায় আবেগ, ধূসর...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হদিশ
আমি সৈনিক, হাঁটি যুগ থেকে যুগান্তরে প্রভাতী আলোয়, অনেক ক্লান্ত দিনের পরে, অজ্ঞাত এক প্রাণের ঝড়ে। বহু শতাব্দী দরে লাঞ্ছিত, পাই নি ছাড়া বহু বিদ্রোহ দিয়েছে মনের প্রান্ত নাড়া তবু হতবাক দিই নি সাড়া। আমি সৈ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কলম
কলম, তুমি কত না যুগ কত না কাল ধ'রে অক্ষরে অক্ষরে গিয়েছ শুধু ক্লান্তিহীন কাহিনী শুরু ক'রে। কলম, তুমি কাহিনী লেখো, তোমার কাহিনী কি দুঃখে জ্বলে তলোয়ারের মতন ঝিকিমিকি? কলম, তুমি শুধু বারংবার, আনত ক'রে ক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কাশ্মীর
সেই বিশ্রী দম-আটকানো কুয়াশা আর নেই নেই সেই একটানা তুষার-বৃষ্টি, হঠাৎ জেগে উঠেছে- সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠেছে ভূস্বর্গ। দুহাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে, ডেকেছে র...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
১লা মে-র কবিতা
লাল আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে, কী হবে আর কুকুরের মতো বেঁচে থাকায়? কতদিন তুষ্ট থাকবে আর অপরের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট হাড়ে? মনের কথা ব্যক্ত করবে ক্ষীণ অস্পষ্ট কেঁউ-কেঁউ শব্দে? ক্ষুদিত পেটে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অতি কিশোরের ছড়া
তোমরা আমায় নিন্দে ক’রে দাও না যতই গালি, আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি, কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া, পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া। তোতো ওষুধ গিলি নাকো, মিষ্টি এবং টক খাওয়ার দিকেই জ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অদ্বৈধ
নরম ঘুমের ঘোর ভাঙল? দেখ চেয়ে অরাজক রাজ্য; ধ্বংস সমুখে কাঁপে নিত্য এখনো বিপদ অগ্রাহ্য? পৃথিবী, এ পুরাতন পৃথিবী দেখ আজ অবশেষে নিঃস্ব স্বপ্ন-অলস যত ছায়ারা একে একে সকলি অদৃশ্য। রুক্ষ মরুর দুঃস্বপ্ন হৃদয...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অনন্যোপায়
অনেক গড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হল, ব্যর্থ বহু উদ্যম আমার, নদীতে জেলেরা ব্যর্থ, তাঁতী ঘরে, নিঃশব্দ কামার, অর্ধেক প্রাসাদ তৈরী, বন্ধ ছাদ-পেটানোর গান, চাষীর লাঙল ব্যর্থ, মাঠে নেই পরিপূর্ণ ধান। যতবার গড়ে তুলি,...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আমরা এসেছি
কারা যেন আজ দুহাতে খুলেছে, ভেঙেছে খিল, মিছিলে আমারা নিমগ্ন তাই দোলে মিছিল। দুঃখ-যুগের দারায় দারায় যারা আনে প্রাণ, যারা তা হারায় তারাই ভরিয়ে তুলেছে সাড়ায় হৃদয়-বিল। তারাই এসেছে মিছিলে, আজকে চলে ম...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অবৈধ
আজ মনে হয় বসন্ত আমার জীবনে এসেছিল উত্তর মহাসাগরের কূলে আমার স্বপ্নের ফুলে তারা কথা কয়েছিল অস্পষ্ট পুরনো ভাষায় অস্ফুট স্বপ্নের ফুল অসহ্য সূর্যের তাপে অনিবার্য ঝরেছিল মরেছিল নিষ্ঠুর প্রগল্ভ হতাশায়।...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অলক্ষ্যে
আমার মৃত্যুর পর কেটে গেল বৎসর বৎসর; ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতির ব্যর্থ প্রচেষ্টাও আজ অগভীর, এখন পৃথিবী নয় অতিক্রান্ত প্রায়ান্ধ স্থবির; নিভেছে প্রদূম্রজ্বালা, নিরঙ্কুশ সূর্য অনশ্বর ; স্তব্ধতা নেমেছে রাত্রে থে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অসহ্য দিন
অসহ্য দিন! স্নায়ু উদ্বেল। শ্লথ পায়ে ঘুরি ইতস্তত অনেক দুঃখে রক্ত আমার অসংযত। মাঝে মাঝে যেন জ্বালা করে এক বিরাট ক্ষত হৃদয়গত। ব্যর্থতা বুকে, অক্ষম দেহ, বহু অভিযোগ আমার ঘাড়ে দিন রাত শুধু চেতনা আমাকে নির্দ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আজিকার দিন কেটে যায়
আজিকার দিন কেটে যায়,— অনলস মধ্যাহ্ন বেলায় যাহার অক্ষয় মূর্তি পেয়েছিনু খুঁজে তারি পানে চেয়ে আছি চক্ষু বুজে৷ আমি সেই ধনুর্ধর যার শরাসনে অস্ত্র নাই, দীপ্তি মনে মনে, দিগন্তের স্তিমিত আলোকে পূজা চলে অনিত্য...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আঠারো বছর বয়স
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। আঠারো বছর বয়সের নেই ভয় পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা, এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়- আঠা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
উদ্যোগ
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন, একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন। ঘরে তোল ধান, বি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আসন্ন আঁধারে
নিশুতি রাতের বুকে গলানো আকাশ ঝরে – দুনিয়ায় ক্লান্তি আজ কোথা? নিঃশব্দে তিমির স্রোত বিরক্ত-বিস্বাদে প্রগল্ভ আলোর বুকে ফিরে যেতে চায়। -তবে কেন কাঁপে ভীরু বুক? স্বেদ-সিক্ত ললাটের শেষ বিন্দুটুকু প্রখর আলো...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ইউরোপের উদ্দেশে
ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন, এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন; হয়তো ওখানে শুরু মন্থর দক্ষিণ হাওয়া; এখানে বোশেখী ঝড়ের ঝাপ্টা পশ্চাৎ দাওয়া; এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে কত রঙ, কত বিচিত্...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
উদ্বীক্ষণ
নগরে ও গ্রামে জমেছে ভিড় ভগ্ননীড়,- ক্ষুদিত জনতা আজ নিবিড়। সমুদ্রে জাগে না বাড়বানল, কী উচ্ছল, তীরসন্ধানী ব্যাকুল জল। কখনো হিংস্র নিবিড় শোকে; দাঁতে ও নখে- জাগে প্রতিজ্ঞা অন্ধ চোখে। তবু সমুদ্র সীমানা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
এক যে ছিল
এক যে ছিল আপনভোলা কিশোর, ইস্কুল তার ভাল লাগত না, সহ্য হত না পড়াশুনার ঝামেলা আমাদের চলতি লেখাপড়া সে শিখল না কোনোকালেই, অথচ সে ছাড়িয়ে গেল সারা দেশের সবটুকু পাণ্ডিত্যকে। কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো ন...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
একুশে নভেম্বরঃ ১৯৪৬
আবার এবার দুর্বার সেই একুশে নভেম্বর- আকাশের কোণে বিদ্যুৎ হেনে তুলে দিয়ে গেল মুত্যুকাঁপানো ঝড়। আবার এদেশে মাঠে, ময়দানে সুদূর গ্রামেও জনতার প্রাণে হাসানাবাদের ইঙ্গিত হানে প্রত্যাঘাতের স্বপ্ন ভয়ঙ্কর।...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
খাদ্য সমস্যার সমাধান
বন্ধুঃ ঘরে আমার চাল বাড়ন্ত তোমার কাছে তাই, এলাম ছুটে, আমায় কিছু চাল ধার দাও ভাই। মজুতদারঃ দাঁড়াও তবে, বাড়ির ভেতর একটু ঘুরে আসি, চালের সঙ্গে ফাউও পাবে ফুটবে মুখে হাসি। মজুদতারঃ এই নাও ভাই, চালকুমড়ো আমা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চট্টগ্রামঃ ১৯৪৩
ক্ষুদার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম- চট্টগ্রামঃ বীর চট্টগ্রাম! বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে, আনে আজ চেতনার দিন। চট্টগ্রামঃ বীর চট্টগ্...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
গান
যেমন ক'রে তপন টানে জল তেমনি ক'রে তোমায় অবিরল টানছি দিনে দিনে তুমি লও গো আমায় চিনে শুধু ঘোচাও তোমার ছল।। আমি জানি তোমায় বলা বৃথা তুমি আমার আমি তোমার মিতা, রুদ্ধ দুয়ার খুলে তুমি আসবে নাকো ভুলে থামবে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
গীতিগুচ্ছ-২
এই নিবিড় বাদল দিনে কে নেবে আমায় চিনে, জানিনে তা। এই নব ঘন ঘোরে কে ডেকে নেবে মোরে কে নেবে হৃদয় কিনে, উদাসচেতা। পবন যে গহন ঘুম আনে, তার বাণী দেবে কি কানে, যে আমার চিরদিন অভিপ্রেতা! শ্যামল রঙ বনে বনে,...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ঘুমভাঙার গান
মাথা তোল তুমি বিন্ধ্যাচল মোছ উদ্গত অশ্রুজল যে গেল সে গেল, ভেবে কি ফল? ভোল ক্ষত! তুমি প্রতারিত বিন্ধ্যাচল, বোঝ নি ধূর্ত চতুর ছল, হাসে যে আকাশচারীর দল, অনাহত। শোন অবনত বিন্ধ্যাচল, তুমি নও ভীরু বিগত বল ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রেশন কার্ড
রঘুবীর একদিন দিতে গিয়ে আড্ডা, হারিয়ে ফেলল ভুলে রেশনের কার্ডটা; তারপর খোঁজাখুজি এখানে ও ওখানে, রঘু ছুটে এল তার রেশনের দোকানে, সেখানে বলল কেঁদে, হুজুর, চাই যে আটা- দোকানী বলল হেঁকে, চলবে না কাঁদা-কাঁটা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কবে
অনেক স্তব্ধ দিনের এপারে চকিত চুতুর্দিক, আজো বেঁচে আছি মৃত্যুতাড়িত আজো বেঁচে আছি ঠিক। দুলে ওঠে দিন; শপথমুখর কিষাণ শ্রমিকপাড়া, হাজারে হাজারে মাঠে বন্দরে আজকে দিয়েছে সাড়া। জ্বলে আলো আজ, আমাদের হাড়ে ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রার্থী
হে সূর্য! শীতের সূর্য! হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায় আমরা থাকি, যেমন প্রতীক্ষা ক'রে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ, ধানকাটার রেমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে। হে সূর্য, তুমি তো জানো, আমাদের গরম কাপড়ের কত অভা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কবিতার খসড়া
আকাশে আকাশে ধ্রুবতারায় কারা বিদ্রোহে পথ মাড়ায় ভরে দিগন্ত দ্রুত সাড়ায়, জানে না কেউ। উদ্যমহীন মূঢ় কারায় পুরনো বুলির মাছি তাড়ায় যারা, তারা নিয়ে ঘোরে পাড়ায় স্মৃতির ফেউ।। (কাব্যগ্রন্থঃ ঘুমনেই)...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রিয়তমাসু
সীমান্তে আজ আমি প্রহরী। অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম ক'রে আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি- স্বদেশের সীমানায়। ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালী, স্নিগ্ধ ইতালী থেকে ছুটে গেছি বিপ্লবী ফ্রান্সে নক্ষত্রনিয়ন্ত...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
১৯৪১ সাল
নীল সমুদ্রের ইশারা- অন্ধকারে ক্ষীণ আলোর ছোট ছোট দ্বীপ, আর সূর্যময় দিনের স্তব্ধতা; নিঃশব্দ দিনের সেই ভীরু অন্তঃশীল মত্ততাময় পদক্ষেপঃ এ সবের ম্লান আধিপত্য বুঝি আর জীবনের ওপর কালের ব্যবচ্ছেদ-ভ্রষ্ট নয়...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অনুভব
১ ৯৪ ০ অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন। অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন; অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরো- দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো। অবাক পৃথিবী!...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আগামী
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ, আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ; মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে। যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আজব লড়াই
ফেব্রুয়ারী মাসে ভাই, কলকাতা শহরে ঘটল ঘটনা এক, লম্বা সে বহরে! লড়াই লড়াই খেলা শুরু হল আমাদের, কেউ রইল না ঘরে রামাদের শ্যামাদের; রাস্তার কোণে কোণে জড়ো হল সকলে, তফাৎ রইল নাকো আসলে ও নকলে, শুধু শুনি ‘ধর’ ‘...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আমার মৃত্যুর পর
আমার মৃত্যুর পর থেমে যাবে কথার গুঞ্জন, বুকের স্পন্দনটুকু মূর্ত হবে ঝিল্লীর ঝংকারে জীবনের পথপ্রান্তে ভুলে যাব মৃত্যুর শঙ্কারে, উজ্জ্বল আলোর চোখে আঁকা হবে আঁধার-অঞ্জন। পরিচয়ভারে ন্যুব্জ অনেকের শোকগ্রস্ত...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অভিবাদন
হে সাথী, আজকে স্বপ্নের দিন গোনা ব্যর্থ নয় তো, বিপুল সম্ভাবনা দিকে দিকে উদ্যাপন করছে লগ্ন, পৃথিবী সূর্য-তপস্যাতেই মগ্ন। আজকে সামনে নিরুচ্চারিত প্রশ্ন, মনের কোমল মহল ঘিরে কবোষ্ণ ক্রমশ পুষ্ট মিলিত উন্ম...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আগ্নেয়গিরি
কখনো হঠাৎ মনে হয়ঃ আমি এক আগ্নেয় পাহাড়। শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা। এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে আমাকে তোমরা বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছ বারংবার আমি পা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আলো-অন্ধকার
দৃষ্টিহীন সন্ধ্যাবেলা শীতল কোমল অন্ধকার স্পর্শ ক’রে গেল মোরে। স্বপনের গভীর চুম্বন, ছন্দ-ভাঙা স্তব্ধতায় ভ্রান্তি এনে দিল চিরন্তন। অহর্নিশি চিন্তা মোর বিক্ষুব্ধ হয়েছে; প্রতিবার স্নায়ুতে স্নায়ুতে দেখি অন...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
এই নবান্নে
এই হেমন্তে কাটা হবে ধান, আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান- পৌষপার্বণে প্রাণ-কোলাহলে ভরবে গ্রামের নীরব শ্মশান। তবুও এ হাতে কাস্তে তুলতে কান্না ঘনায়ঃ হালকা হাওয়ায় বিগত স্মৃতিকে ভুলে থাকা দায়; গত হে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
একটি মোরগের কাহিনী
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে, ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায় আরো দু'তিনটি মুরগীর সঙ্গে। আশ্রয় যদিও মিলল, উপযুক্ত আহার মিলল না। সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে গলা ফাট...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিদ্রোহের গান
বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি? এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি, আমরা সবাই যে যার প্রহরী উঠুক ডাক। উঠুক তুফান মাটিতে পাহাড়ে জ্বলুক আগুন গরিবের হাড়ে কোটি করাঘাত পৌঁছোক দ্বারে ভীরুরা থাক। মানবো না বাধা, মানবো না ক্ষত...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কনভয়
হঠাৎ ধূলো উড়িয়ে ছুটে গেল যুদ্ধফেরত এক কনভয়ঃ ক্ষেপে-ওঠা পঙ্গপালের মতো রাজপথ সচকিত ক'রে আগে আগে কামান উঁচিয়ে, পেছনে নিয়ে খাদ্য আর রসদের সম্ভার। ইতিহাসের ছাত্র আমি. জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম ইতি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কৃষকের গান
এ বন্ধ্যা মাটির বুক চিরে এইবার ফলাব ফসল- আমার এ বলিষ্ঠ বাহুতে আজ তার নির্জন বোধন। এ মাটির গর্ভে আজ আমি দেখেছি আসন্ন জন্মেরা ক্রমশ সুপুষ্ট ইঙ্গিতেঃ দুর্ভিরে অন্তিম কবর। আমার প্রতিজ্ঞা শুনেছ কি? (গোপন এ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সব্যসাচী
অভুক্ত শ্বাপদচক্ষু নিঃস্পন্দ আঁধারে জ্বলে রাত্রিদিন। হে বন্ধু, পশ্চাতে ফেলি অন্ধ হিমগিরি অনন্ত বাধ্যক্য তব ফেলুক নিঃশ্বাস; রক্তলিপ্ত যৌবনের অন্তিম পিপাসা নিষ্ঠুর গর্জনে আজ অরণ্য ধোঁয়ায় উঠুক প্রজ্বলি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
খবর
খবর আসে! দিগ্দিগন্ত থেকে বিদ্যুদ্বাহিনী খবর; যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ঝড় ---এখানে সাংবাদিকতার নৈশ নৈঃশব্দ্য। রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝঙ্কৃত ছন্দে- প্রকাশের ব্যগ্রতায়; তোমাদের জীবনে যখন নিদ্র...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
গোপন খবর
শোন একটা গোপন খবর দিচ্ছি আমি তোমায়, কলকাতাটা যখন খাবি খাচ্ছিল রোজ বোমায়, সেই সময়ে একটা বোমা গড়ের মাঠের ধারে, মাটির ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে ছিল এক্কেবারে, অনেক দিনের ঘটনা তাই ভুলে গেছ্ল লোকে, মাটির ভেতর ছিল...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জনতার মুখে ফোটে বিদ্যুৎবাণী
কত যুগ, কত বর্ষান্তের শেষে জনতার মুখে ফোটে বিদ্যুৎবাণী; আকাশে মেঘের তাড়াহুড়ো দিকে দিকে বজ্রের কানাকানি। সহসা ঘুমের তল্লাট ছেড়ে শান্তি পালাল আজ। দিন ও রাত্রি হল অস্থির কাজ, আর শুধু কাজ! জনসিংহের ক্ষ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ঐতিহাসিক
আজ এসেছি তোমাদের ঘরে ঘরে পৃথিবীর আদালতের পরোয়ানা নিয়ে তোমরা কি দেবে আমার প্রশ্নের কৈফিয়ৎঃ কেন মৃত্যুকীর্ণ শবে ভরলো পঞ্চাশ সাল? আজ বাহান্ন সালের সূচনায় কি তার উত্তর দেবে? জানি! স্তব্ধ হয়ে গেছে তোম...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
গীতিগুচ্ছ-১
ওগো কবি তুমি আপন ভোলা, আনিলে তুমি নিথর জলে ঢেউয়ের দোলা! মালাখানি নিয়ে মোর একী বাঁধলে অলখ ডোর! নিবেদিত প্রাণে গোপনে তোমার কী সুর তোলা! জেনেছ তো তুমি অজানা প্রাণের নীরব কথা। তোমার বাণীতে আমার মনের এ ব্...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
গীতিগুচ্ছ-৩
গানের সাগর পাড়ি দিলাম সুরের তরঙ্গে, প্রাণ ছুটেছে নিরুদ্দেশে ভাবের তুরঙ্গে। আমার আকাশ মীড়ের মূর্ছনাতে উধাও দিনে রাতে; তান তুলেছে অন্তবিহীন রসের মৃদঙ্গে! আমি কবি সপ্তসুরের ডোরে, মগ্ন হলাম অতল ঘুম-ঘোরে;...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চিরদিনের
এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা, সবুজ মাঠেরা পথ দেয় পায়ে পায়ে পথ নেই, তবু এখানে যে পথ হাঁটা। জোড়া দীঘি, তার পাড়েতে তালের সারি দূরে বাঁশঝাড়ে আত্মদানের সাড়া, পচা জল...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জাগবার দিন আজ
জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপি চুপি আসছে; যাদের চোখেতে আজো স্বপ্নের ছায়া ছবি ভাসছে – তাদেরই যে দুর্দিন পরিণামে আরো বেশী জানবে, মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল হানবে। আজকের দিন নয় কাব্যের – আজকের সব কথা ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জনরব
পাখি সব করে রব, রাত্রি শেষ ঘোষণা চৌদিকে, ভোরের কাকলি শুনি; অন্ধকার হয়ে আসে ফিকে, আমার ঘরেও রুদ্ধ অন্ধকার, ষ্পস্ট নয় আলো, পাখিরা ভোরের বার্তা অকস্মাৎ আমাকে শোনালো। স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠি, অন্ধকারে খাড়...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জ্ঞানী
বরেনবাবু মস্ত জ্ঞানী, মস্ত বড় পাঠক, পড়েন তিনি দিনরাত্তির গল্প এবং নাটক, কবিতা আর উপন্যাসের বেজায় তিনি ভক্ত, ডিটেক্টিভের কাহিনীতে গরম করেন রক্ত; জানেন তিনি দর্শন আর নানা রকম বিজ্ঞান জ্যোতিষশাস্ত্র জান...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দিকপ্রান্তে
ভাঙন নেপথ্য পৃথিবীতে; অদৃশ্য কালের শত্রু প্রচ্ছন্ন জোয়ারে, অনেক বিপন্ন জীব ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়ে উন্মুখ নিঃশেষে কেড়ে নিতে, দুর্গম বিষণ্ণ শেষ শীতে। বীভৎস প্রাণের কোষে কোষে নিঃশব্দে ধ্বংসের বীজ নির্দিষ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দিনবদলের পালা
আর এক যুদ্ধ শেষ, পৃথিবীতে তবু কিছু জিজ্ঞাসা উন্মুখ। উদ্দাম ঢাকের শব্দে সে প্রশ্নের উত্তর কোথায়? বিজয়ী বিশ্বের চোখ মুদে আসে, নামে এক ক্লান্তির জড়তা। রক্তাক্ত প্রান্তর তার অদৃশ্য দুহাতে নাড়া দেয় পৃ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দেবদারু গাছে রোদের ঝলক
দেবদারু গাছে রোদের ঝলক, হেমন্তে ঝরে পাতা, সারাদিন ধ’রে মুরগীরা ডাকে, এই নিয়ে দিন গাঁথা৷ রক্তের ঝড় বাইরে বইছে, ছোটে হিংসার ঢেউ, খবরে কাগজ জানায় সেকথা, চোখে দেখি নাকো কেউ॥ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রচ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দেয়ালিকা
এক দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা। আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা। দুই সকালে বিকালে মনের খেয়ালে ইঁদারায় দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থটা তার কি দাঁড়ায়? তিন কখন বাজল ছ’টা প্রাসাদে প্রাসাদে ঝলসায় দেখি শেষ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
নিবৃত্তির পূর্বে
দুর্বল পৃথিবী কাঁদে জটিল বিকারে, মৃত্যুহীন ধমনীর জ্বলন্ত প্রলাপ; অবরুদ্ধ বে তার উন্মাদ তড়িৎ; নিত্য দেখে বিভীষিকা পূর্ব অভিশাপ। ভয়ার্ত শোণিত-চক্ষে নামে কালোছায়া, রক্তাক্ত ঝটিকা আনে মূর্ত শিহরণ দিক্প...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে
আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ, আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের। হাতাশায় স্তব্ধ বাক্য; ভাষা চাই আমরা নির্বাক, পাঠাব মৈত্রীর বাণী সারা পৃথিবীকে জানি ফের। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে আমাদের ভাষা যাবে শো...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিশিষ্ট
অনেক উল্কার স্রোত বয়েছিল হঠাৎ প্রত্যুষে. বিনিদ্র তারার বে পল্লবিত মেঘ ছুঁয়েছিল রশ্মিটুকু প্রথম আবেগে। অকস্মাৎ কম্পমান অশরীরী দিন, রক্তের বাসরঘরে বিবর্ণ মৃত্যুর বীজ ছড়াল আসন্ন রাজপথে। তবু স্বপ্ন নয়...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পূর্বাভাস
সন্ধ্যার আকাশতলে পীড়িত নিঃশ্বাসে বিশীর্ণ পাণ্ডুর চাঁদ ম্লান হয়ে আসে। বুভুক্ষু প্রেতেরা হাসে শাণিত বিদ্রূপে, প্রাণ চায় শতাব্দীর বিলুপ্ত রক্তের– সুষুপ্ত যরো নিত্য কাঁদিছে ক্ষুদায় দূর্ত দাবাগ্নি আজ জ্বলে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বৈশম্পায়ন
আকাশের খাপছাড়া ক্রন্দন নাই আর আষাঢ়ের খেলনা। নিত্য যে পাণ্ডুর জড়তা সথীহারা পথিকের সঞ্চয়। রক্তের বুকভরা নিঃশ্বাস, আঁধারের বুকফাটা চীৎকার- এই নিয়ে মেতে আছি আমরা কাজ নেই হিসাবের খাতাতে। মিলাল দিনের ক...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পুরনো ধাঁধা
বলতে পার বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে? গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে? বড়মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি, গরীবরা পায় খোলামকুচি, একি অনাসৃষ্টি? বলতে পার ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে, কুঁড়েঘরেই তারা কেন মাছি...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরাভব
হঠাৎ ফাল্গুনী হাওয়া ব্যাধিগ্রস্ত কলির সন্ধ্যায়ঃ নগরে নগররক্ষী পদাতিক পদধ্বনি শুনি; – দুরাগত স্বপ্নের কী দুর্দিন, – মহামারী,অন্তরে বিক্ষোভ – অবসন্ন বিলাসের সংকুচিত প্রাণ। ব্যক্তিত্বের গাত্রদাহ; রন্ধ্রহ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সুহৃদবরেষু
কাব্যকে জানিতে হয়, দৃষ্টিদোষে নতুবা পতিত শব্দের ঝঙ্কার শুধু যাহা ক্ষীণ জ্ঞানের অতীত। রাতকানা দেখে শুধু দিবসের আলোক প্রকাশ, তার কাছে অর্থহীন রাত্রিকার গভীর আকাশ। মানুষ কাব্যের স্রষ্টা, কাব্য কবি করে না...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সেপ্টেম্বর ৪৬
কলকাতায় শান্তি নেই। রক্তের কলঙ্ক ডাকে মধ্যরাত্রে প্রতিটি সন্ধ্যায়। হৃৎস্পন্দনধ্বনি দ্রুত হয়ঃ মূর্ছিত শহর। এখন গ্রামের মতো সন্ধ্যা হলে জনহীন নগরের পথ; স্তম্ভিত আলোকস্তম্ভ আলো দেয় নিতান্ত সভয়ে। কোথ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিবৃতি
আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে, জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে, দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল, প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল। আহার্যের অন্বেষণে প্রতি মনে আদিম আগ্রহ রাস্তায় রাস্তায...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রতিদ্বন্দ্বী
গন্ধ এনেছে তীব্র নেশায়, ফেনিল মদির, জোয়ার কি এল রক্ত নদীর? নইলে কখনো নিস্তার নেই বন্দীশালায়। সচারাচর কি সামনা সামনি ধূর্ত পালায়? কাজ নেই আর বল্লাল সেন-ই আমলে, মুক্তি পেয়েছি ধোঁয়াতে নিবিড় শ্যামলে, তোমা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভেজাল
ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়, ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়! ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা, ‘কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হায় ফয়দা।’ ভেজাল পোষাক, ভেজাল খাবা...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মুহূর্ত (খ)
মুহূর্তকে ভুলে থাকা বৃথা যে মুহূর্ত তোমার আমার আর অন্য সকলের মৃত্যুর সূচনা, যে মুহূর্ত এনে দিল আমার কবিতা আর তোমার আগ্রহ। এ মুহূর্তে সূর্যোদয়, এ মুহূর্তে নক্ষত্রের সভা, আর এক মুহূর্তে দেখি কালো ঝড়ে স...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিয়ে বাড়ির মজা
বিয়ে বাড়িঃ বাজছে সানাই, বাজছে নানান বাদ্য একটি ধারে তৈরি হচ্ছে নানা রকম খাদ্য; হৈ-চৈ আর চেঁচামেচি, আসছে লুচির গন্ধ, আলোয় আলোয় খুশি সবাই, কান্নাকাটি বন্ধ, বাসরঘরে সাজছে কনে, সকলে উৎফুল্ল, লোকজনকে আসতে ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মার্শাল তিতোর প্রতি
মার্শাল তিতোর প্রতি কমরেড, তুমি পাঠালে ঘোষণা দেশান্তরে, কুটিরে কুটিরে প্রতিধ্বনি,— তুলেছে মুক্তি দারুণ তুফান প্রাণের ঝড়ে তুমি শক্তির অটুট খনি৷ কমরেড, আজ কিষাণ শ্রমিক তোমার পাশে তুমি যে মুক্তি রটনা কর...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মেজদাকে : মুক্তির অভিনন্দন
তোমাকে দেখেছি আমি অবিচল, দৃপ্ত দুঃসময়ে ললাটে পড়ে নি রেখা ক্রূরতম সংকটেরও ভয়ে; তোমাকে দেখেছি আমি বিপদেও পরিহাস রত দেখেছি তোমার মধ্যে কোনো এক শক্তি সুসংহত৷ দুঃখ শোকে, বারবার অদৃষ্টের নিষ্ঠুর আঘাতে অনাহ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভবিষ্যতে
স্বাধীন হবে ভারতবর্ষ থাকবে না বন্ধন, আমারা সবাই স্বরাজ-যজ্ঞে হব রে ইন্ধন! বুকের রক্ত দিব ঢালি স্বাধীনতারে, রক্ত পণে মুক্তি দের ভারত-মাতারে৷ মূর্খ যারা অজ্ঞ যারা যে জন বঞ্চিত তাদের তরে মুক্তি-সুধা করব ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মুক্ত বীরদের প্রতি
তোমরা এসেছ, বিপ্লবী বীর! অবাক অভ্যুদয়। যদিও রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা কলকাতাময়। তবু দেখ আজ রক্তে রক্তে সাড়া- আমরা এসেছি উদ্দাম ভয়হারা। আমরা এসেছি চারিদিক থেকে, ভুলতে কখনো পারি! একসূত্রে যে বাঁধা হয...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মেয়েদের পদবী
মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী, অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি; 'আ'কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার চেষ্টা হাসির ৷ তাই ভূমিকা ছড়ার ৷ 'গুপ্ত' 'গুপ্তা' হয় মেয়েদের নামে, দেখেছি অনেক চিঠি, পোস্টকার্ড, খামে ৷ সে নিয়মে ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সিঁড়ি
আমরা সিঁড়ি, তোমরা আমাদের মাড়িয়ে প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও, তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে; তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন। তোমরাও তা জানো, তাই কার্পেটে মুড...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হে পৃথিবী
হে পৃথিবী, আজিকে বিদায় এ দুর্ভাগা চায়, যদি কভু শুধু ভুল ক’রে মনে রাখো মোরে, বিলুপ্ত সার্থক মনে হবে দুর্ভাগার! বিস্মৃত শৈশবে যে আঁদার ছিল চারিভিতে তারে কি নিভৃতে আবার আপন ক’রে পাব, ব্যর্থতার চিহ্ন এঁকে...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সুচিকিৎসা
বদ্যিনাথের সর্দি হল কলকাতাতে গিয়ে, আচ্ছা ক’রে জোলাপ নিল নস্যি নাকে দিয়ে। ডাক্তার এসে, বল্ল কেশে, “বড়ই কঠিন ব্যামো, এ সব কি সুচিকিৎসা ? —আরে আরে রামঃ। আমার হাতে পড়লে পড়ে ‘এক্সরে’ করে দেখি, রোগটা কেমন,...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সহসা
আমার গোপন সূর্য হল অস্তগামী এপারে মর্মরধ্বনি শুনি, নিস্পন্দ শবের রাজ্য হতে ক্লান্ত চোখে তাকাল শকুনি। গোদূলি আকাশ ব’লে দিল তোমার মরণ অতি কাছে, তোমার বিশাল পৃথিবীতে এখনো বসন্ত বেঁচে আছে। অদূরে নিবিড় ঝাউ...
সুকান্ত ভট্টাচার্য
স্বপ্নপথ
আজ রাত্রে ভেঙে গেল ঘুম, চারিদিক নিস্তব্ধ নিঃঝুম, তন্দ্রাঘোরে দেখিলাম চেয়ে অবিরাম স্বপ্নপথ বেয়ে চলিয়াছে দুরাশার স্রোত, বুকে তার বহু ভগ্ন পোত। বিফল জীবন যাহাদের, তারাই টানিছে তার জের; অবিশ্রান্ত পৃথিবীর...
সুকান্ত ভট্টাচার্য