বিষের মধ্যে সমস্ত শোক
এই কবিতাটি লিখেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় · ৩ মিনিট পড়ার সময় ·
ভেবেছি এই আলোর মধ্যে ঢোকাবো সেই অন্ধকারের
কীট পতঙ্গ। সারাজীবন, ভেবেছিলাম আলোর মধ্যে
ঢোকাবো সেই প্রতিচ্ছবি, ভেবেছিলাম আলোর মধ্যে
ঢোকাবো সেই প্রতিচ্ছবি।
কে যে মনে তোমায় রাখলো ? ভিতর-বাহির সমস্ত দিন
কে যে তোমায় মনে রাখলো ? অন্তরে সেই প্রতিচ্ছবি !
দ্যাখো, একটু ঘুরে দাঁড়াও, আয়নাতে তার দরজা আছে
রাজাই তো ময়ূরবাহন, অন্তত এক পাগলা গাছের
রাজা সে তো ময়ূরবাহন !
মদ খেয়েছি, এমন তাতে ছিলো তেমন ময়ূরবাহন
মদটি খেয়েছি ছেলেবেলায়
দুর্গানামও দেখেছি ঠিক
মদ খেয়েছি ময়ূরবাহন
কিন্তুু সে তো একলা আমার
আমার ভিতর সেই ছেলেটির মধ্যে ছিল ময়ূরবাহন
এক বাটি মদ, সঙ্গে সঙ্গে, এক বাটি মদ সঙ্গে সঙ্গে
খেয়ে, একটু ভিরমি খেয়ে দেখেছিলাম ময়ূর্বাহন
তারপর তার সঙ্গে এবং আসঙ্গে এই সমস্ত স্থির
খেতাম, আমি অল্প খেতাম, তারই সঙ্গে সমস্ত দিক
ভুয়োদর্শী বেজায় আগুন, তারপরে সেই আগুনে ঠিক
আর কিছু সব ঘুরে আনার।
এখন আমার বৃদ্ধ বয়েস, খাইনা আমি সঠিক আগুন
এই মুহূর্তে ঝগড়া করো, ঝগড়া মানে সমস্ত বিষ
আমার মধ্যে ঝগড়া করো বিষের মধ্যে সমস্ত শোক
কী শোক আছে তোমার কাছে ? তোমার আছে সমস্ত বিষ
এখন আমার বৃদ্ধ বয়েস, খাইনা আমি সঠিক আগুন
আগুনে আজ রোদ পোহাচ্ছি, আগুন মানে শীতের আগুন
দেরে দেরে দ্রিম দেরে দেরে দ্রিম
ততঃ কিম্ ততঃ কিম্ ততঃ কিম্
দেরে দেরে দ্রিম
তাহ'লে এই রাত পোহালে আমি পাবোই চাঁদের আলো
দেরে দেরে দ্রিম
আর কিছু নয় আত্মরক্ষা
দেরে দেরে দ্রিম
আর কিছু তাে আমার, কিন্তু আমার মানেই স্বাস্থ্যরক্ষা।
কিছু তো জানিনা, শুধু হাত ধরে হেমন্তের বুকে যতােদূর চলা যায়,
সে আমাকে দেবে না প্রত্যক্ষ অভিমান, সে আমাকে সম্পূর্ণ নেভাবে
যতােই আগুন আমি তুলে দিই তার বক্ষোচুড়ে,
সে আমাকে একান্তে নেভাবে।
শােনো আমার সামান্য চুল, তুমি আমার মধ্যে থাকো বলেছিলাম,
অসুখ হয়নি, অসুখ তােমার কেবল একার তােমাকে তাই বলেছিলাম,
তুমি আমার মধ্যে থাকো, থাকলে না তা, পুড়িয়ে ফেললে,
ও সুন্দরী সমস্ত দিক পুড়িয়ে ফেললে,
রাখলে কিছু আমার বড়াে শােভন হ'তাে
পুড়িয়ে ফেললে, সমস্ত দিক।
এইই মৃত্যু ! আমি তাে প্রত্যক্ষ দেখেছি---
ভরে না ইন্দ্রিয়ে, এই বাজুবন্ধ কোথায় মেলায় ?
মৃত, তা কি মৃত্যুতেই শেষ হয় ? জানি না কোথায় ?
কার রূঢ় অগ্নি থাকে, অগ্নিতে কি সমস্ত মেলায় ?
মেলায় বাঘের সঙ্গে ঘা মেরে বিস্তর,
শুধু কি বাঘের ডাক শুনেছিলে তুমি ?
বাঘের সঙ্গেও আছে সন্ধ্যার প্লাবন,
প্লাবনের বাঘ সে তাে খুব সুস্থ নয় !
সারাদিন ধরে এক বিসর্জন আমায় ধরেছে ?
তার থেকে মুক্ত নই, কিন্তু আমি যেখানে তা পাই
মুক্তি পাই, বিসর্জন আমাকে ধরেছে।
অথচ উন্মুক্ত শান্তি চাই আমি বিষন্ন দরােজার
চাবি পড়লাে, বলা হলাে, এ তােমার দরােজা নয়,
শােনো অন্য কোন দরােজার সামনে এসে দুহাত পেতেছো।
এ তােমার দরােজা নয় !
জানি আমি দু হাত পেতেছি । নিজের বাড়ির সামনে দুহাত পেতেছি।
খােলা হয়নি। এতো মদ্য। এতাে পদ্য চার হাত ঘুরিয়ে।
এতাে পদ্য । চার হাত পাতিনি।
মদ্য ছিলাে এতাে, সে তো ভূবন মােহন
মদ্য ছিলাে এতাে সে তাে ঋতুরঙ্গস্বামী।
আনন্দবাজারে আছি, এসেছিনু যেভাবেই আসে
অবশ্য সুখাদ্য ছিলাে , তাতে আমি কলুষ হাতের
স্পর্শ না দিয়েই শুধু বলেছিনু, এখানে হাতের
স্পর্শ নয়, বলেছিনু, এখানের সমস্ত সময়।
আমার এ-ওড়াউড়ি সেই দিকে যাবার সময়
হয়নি। ওদিকে যাওয়া, বিশেষত আমি অঘ্রানের
সন্তান, সেহেতু হয়নি এখনাে সে যাবার সময়
অঘ্রানের মাঠে একটু ঝিনুক সাজাই প্রাণমন।
সেও তাে অঘ্রানে নেবে, সেও তাে অঘ্রানে ফেলে দেবে।
কী পাংশু এ-মাতৃমুখ, শুধু আমি দুহাতে ছোঁয়াবাে,
এক বাটি আগ্নেয়কে, তাতে ক্ষতি হয়েছে কখনাে ?
খেয়ে তুই সুস্থ থাক---মা বলেছিলেন আমাকে
এমনও কি, তাের যদি মনে হয় ভালাে !
ভালাে তাে কিছুতে নেই, এতাে মদ, বিছানার কালাে,
ঘােচাতে পারবে না যদি, তুমি কেন সুমুখে দাঁড়ালে
মদ এতাে, বিষণ্ণতা, এ মুহূর্তে আমি তার পিছে
সে-মূহুর্তে আমি নিচে, সে মুহুর্তে সর্বক্ষণ নিচে।
দিন দুরন্ত, রাত তো মােহর,
আমার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখাে
অবিকলের উদাস সিড়ি, ভিতরে তার একলা থাকো
সব তাে আমার চেনাশােনা, অন্তরে তার যথেষ্ট দিন থাকলে থাকো,
এবার বাঁকো, ভিতরে থাক একটা সিড়ি।
সেই সিঁড়িতে বসবে বলে এসেছো ওই দয়ার অধিক
এক চুমুকে পান করো এই বিষের বাঁধন, নিরম্বু বিষ,
এই তাে তােমার বয়ঃসন্ধি, পাঞ্জাবিতে ঠিকরে আলাে পড়ছে
বুড়াের গায়ের মধ্যে, সেই তােমারি নতুন জহর ॥
কাব্যগ্রন্থ --
'বিষের মধ্যে সমস্ত শোক'
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।