রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর রচনাবলি
কর্মফল
প্রথম পরিচ্ছেদ আজ সতীশের মাসি সুকুমারী এবং মেসোমশায় শশধরবাবু আসিয়াছেন-- সতীশের মা বিধুমুখী ব্যস্তসমস্তভাবে তাঁহাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত। 'এসো দিদি, বোসো। আজ কোন্ পুণ্যে রায়মশায়ের দেখা পাওয়া গেল! দিদি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিত্রকর
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বদনাম
প্রথম পরিচ্ছেদ ক্রিং ক্রিং ক্রিং সাইকেলের আওয়াজ; সদর দরজার কাছে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন ইন্স্পেক্টার বিজয়বাবু। গায়ে ছাঁটা কোর্তা, কোমরে কোমরবন্ধ, হাফ-প্যাণ্টপরা, চলনে কেজো লোকের দাপট। দরজার কড়া নাড়া দিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চোরাই ধন
১ মহাকাব্যের যুগে স্ত্রীকে পেতে হত পৌরুষের জোরে; যে অধিকারী সেই লাভ করত রমণীরত্ন। আমি লাভ করেছি কাপুরুষতা দিয়ে, সে-কথা আমার স্ত্রীর জানতে বিলম্ব ঘটেছিল। কিন্তু, সাধনা করেছি বিবাহের পরে; যাকে ফাঁকি দিয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রগতিসংহার
এই কলেজে ছেলেমেয়েদের মেলামেশা বরঞ্চ কিছু বাড়াবাড়ি ছিল। এরা প্রায় সবাই ধনী ঘরের--এরা পয়সার ফেলাছড়া করতে ভালোবাসে। নানা রকম বাজে খরচ করে মেয়েদের কাছে দরাজ হাতের নাম কিনত। মেয়েদের মনে ঢেউ তুলত, তারা বুক ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ পুরস্কার
সেদিন আই.এ. এবং ম্যাট্রিক ক্লাসের পুরস্কারবিতরণের উৎসব। বিমলা ব'লে এক ছাত্রী ছিল, সুন্দরী ব'লে তার খ্যাতি। তারই হাতে পুরস্কারের ভার। চার দিকে তার ভিড় জমেছে আর তার মনে অহংকার জমে উঠেছে খুব প্রচুর পরিমা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভিখারিনী
প্রথম পরিচ্ছেদ কাশ্মীরের দিগন্তব্যাপী জলদস্পর্শী শৈলমালার মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটিরগুলি আঁধার আঁধার ঝোপঝাপের মধ্যে প্রচ্ছন্ন। এখানে সেখানে শ্রেণীবদ্ধ বৃক্ষচ্ছায়ার মধ্য দিয়া এ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
করুণা
ভূমিকা গ্রামের মধ্যে অনুপকুমারের ন্যায় ধনবান আর কেহই ছিল না। অতিথিশালানির্মাণ, দেবালয়প্রতিষ্ঠা, পুষ্করিণীখনন প্রভৃতি নানা সৎকর্মে তিনি ধনব্যয় করিতেন। তাঁহার সিন্ধুক-পূর্ণ টাকা ছিল, দেশবিখ্যাত যশ ছিল ও...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতিবেশিনী
আমার প্রতিবেশিনী বালবিধবা। যেন শরতের শিশিরাশ্রুপ্লুত শেফালির মতো বৃন্তচ্যুত; কোনো বাসরগৃহের ফুলশয্যার জন্য সে নহে, সে কেবল দেবপূজার জন্যই উৎসর্গ-করা। তাহাকে আমি মনে মনে পূজা করিতাম। তাহার প্রতি আমার ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নষ্টনীড়
প্রথম পরিচ্ছেদ ভূপতির কাজ করিবার কোনো দরকার ছিল না। তাঁহার টাকা যথেষ্ট ছিল, এবং দেশটাও গরম। কিন্তু গ্রহবশত তিনি কাজের লোক হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এইজন্য তাঁহাকে একটা ইংরেজি খবরের কাগজ বাহির করিতে হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মণিহারা
সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে। বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাল্যদান
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পয়লা নম্বর
আমি তামাকটা পর্যন্ত খাই নে। আমার এক অভ্রভেদী নেশা আছে, তারই আওতায় অন্য সকল নেশা একেবারে শিকড় পর্যন্ত শুকিয়ে মরে গেছে। সে আমার বই-পড়ার নেশা। আমার জীবনের মন্ত্রটা ছিল এই-- যাবজ্জীবেৎ নাই-বা জীবেৎ ঋণং কৃ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুভদৃষ্টি
কান্তিচন্দ্রের বয়স অল্প, তথাপি স্ত্রীবিয়োগের পর দ্বিতীয় স্ত্রীর অনুসন্ধানে ক্ষান্ত থাকিয়া পশুপক্ষী-শিকারেই মনোনিবেশ করিয়াছেন। দীর্ঘ কৃশ কঠিন লঘু শরীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, অব্যর্থ লক্ষ্য, সাজসজ্জায় পশ্চিমদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাত্র ও পাত্রী
১ ইতিপূর্বে প্রজাপতি কখনো আমার কপালে বসেন নি বটে, কিন্তু একবার আমার মানসপদ্মে বসেছিলেন। তখন আমার বয়স ষোলো। তার পরে কাঁচা ঘুমে চমক লাগিয়ে দিলে যেমন ঘুম আর আসতে চায় না, আমার সেই দশা হল। আমার বন্ধুবান্ধব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নামঞ্জুর গল্প
আমাদের আসর জমেছিল পোলিটিক্যাল লঙ্কাকাণ্ডের পালায়। হাল আমলের উত্তরকাণ্ডে আমরা সম্পূর্ণ ছুটি পাই নি বটে, কিন্তু গলা ভেঙেছে; তা ছাড়া সেই অগ্নিদাহের খেলা বন্ধ। বঙ্গভঙ্গের রঙ্গভূমিতে বিদ্রোহীর অভিনয় শুরু হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সংস্কার
চিত্রগুপ্ত এমন অনেক পাপের হিসাব বড়ো অক্ষরে তাঁর খাতায় জমা করেন যা থাকে পাপীর নিজের অগোচরে। তেমনি এমন পাপও ঘটে যাকে আমিই চিনি পাপ বলে, আর-কেউ না। যেটার কথা লিখতে বসেছি সেটা সেই জাতের। চিত্রগুপ্তের কাছে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বলাই
মানুষের জীবনটা পৃথিবীর নানা জীবের ইতিহাসের নানা পরিচ্ছেদের উপসংহারে, এমন একটা কথা আছে। লোকালয়ে মানুষের মধ্যে আমরা নানা জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয় পেয়ে থাকি, সে কথা জানা। বস্তুত আমরা মানুষ বলি সেই পদার্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্ত্রীর পত্র
শ্রীচরণকমলেষু আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে,আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি -- মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি;চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি। আজ আমি এসেছি তীর্থ করতে শ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অতিথি
প্রথম পরিচ্ছেদ কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলালবাবু নৌকা করিয়া সপরিবারে স্বদেশে যাইতেছিলেন। পথের মধ্যে মধ্যাহ্নে নদীতীরের এক গঞ্জের নিকট নৌকা বাঁধিয়া পাকের আয়োজন করিতেছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণবালক আসিয়া জিজ্ঞাস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরিচিতা
১ আজ আমার বয়স সাতাশ মাত্র। এ জীবনটা না দৈর্ঘ্যের হিসাবে বড়ো, না গুণের হিসাবে। তবু ইহার একটু বিশেষ মূল্য আছে। ইহা সেই ফুলের মতো যাহার বুকের উপরে ভ্রমর আসিয়া বসিয়াছিল, এবং সেই পদক্ষেপের ইতিহাস তাহার জীব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দর্পহরণ
কী করিয়া গল্প লিখিতে হয়, তাহা সম্প্রতি শিখিয়াছি। বঙ্কিমবাবু এবং সার্ ওয়াল্টার স্কট পড়িয়া আমার বিশেষ ফল হয় নাই। ফল কোথা হইতে কেমন করিয়া হইল, আমার এই প্রথম গল্পেই সেই কথাটা লিখিতে বসিলাম। আমার পিতার ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজটিকা
নবেন্দুশেখরের সহিত অরুণলেখার যখন বিবাহ হইল, তখন হোমধূমের অন্তরাল হইতে ভগবান প্রজাপতি ঈষৎ একটু হাস্য করিলেন। হায়, প্রজাপতির পক্ষে যাহা খেলা আমাদের পক্ষে তাহা সকল সময়ে কৌতুকের নহে। নবেন্দুশেখরের পিতা পূ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তির উপায়
১ ফকিরচাঁদ বাল্যকাল হইতেই গম্ভীর প্রকৃতি। বৃদ্ধসমাজে তাহাকে কখনোই বেমানান দেখাইত না। ঠাণ্ডা জল, হিম, এবং হাস্যপরিহাস তাহার একেবারে সহ্য হইত না। একে গম্ভীর, তাহাতে বৎসরের মধ্যে অধিকাংশ সময়েই মুখমণ্ডলের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
প্রথম পরিচ্ছেদরাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহামায়া
প্রথম পরিচ্ছেদ মহামায়া এবং রাজীবলোচন উভয়ে নদীর ধারে একটা ভাঙা মন্দিরে সাক্ষাৎ করিল। মহামায়া কোনো কথা না বলিয়া তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর দৃষ্টি ঈষৎ ভর্ৎসনার ভাবে রাজীবের প্রতি নিক্ষেপ করিল। তাহার মর্ম এই,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘাটের কথা
পাষাণে ঘটনা যদি অঙ্কিত হইত তবে কতদিনকার কত কথা আমার সোপানে সোপানে পাঠ করিতে পারিতে। পুরাতন কথা যদি শুনিতে চাও, তবে আমার এই ধাপে বইস; মনোযোগ দিয়া জলকল্লোলে কান পাতিয়া থাকো, বহুদিনকার কত বিস্মৃত কথা শুন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খাতা
লিখিতে শিখিয়া অবধি উমা বিষম উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছে। বাড়ির প্রত্যেক ঘরের দেয়ালে কয়লা দিয়া বাঁকা লাইন কাটিয়া বড়ো বড়ো কাঁচা অক্ষরে কেবলই লিখিতেছে--জল পড়ে, পাতা নড়ে। তাহার বউঠাকুরানীর বালিশের নিচে 'হরিদাসের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প
গল্প বলিতে হইবে। কিন্তু আর তো পারি না। এখন এই পরিশ্রান্ত অক্ষম ব্যক্তিটিকে ছুটি দিতে হইবে। এ পদ আমাকে কে দিল বলা কঠিন। ক্রমে ক্রমে একে একে তোমরা পাঁচজন আসিয়া আমার চারিদিকে কখন জড়ো হইলে, এবং কেন যে তোম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুভা
১ মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড়ো বোনকে সুকেশিনী সুহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে। এখন সকলে তাহাকে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মধ্যবর্তিনী
প্রথম পরিচ্ছেদ নিবারণের সংসার নিতান্তই সচরাচর রকমের, তাহাতে কাব্যরসের কোনো নামগন্ধ ছিল না। জীবনে উক্ত রসের যে কোনো আবশ্যক আছে, এমন কথা তাহার মনে কখনো উদয় হয় নাই। যেমন পরিচিত পুরাতন চটি-জোড়াটার মধ্যে প...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জয়পরাজয়
১ রাজকন্যার নাম অপরাজিতা। উদয়নারায়ণের সভাকবি শেখর তাঁহাকে কখনো চক্ষেও দেখেন নাই। কিন্তু যেদিন কোনো নূতন কাব্য রচনা করিয়া সভাতলে বসিয়া রাজাকে শুনাইতেন, সেদিন কণ্ঠস্বর ঠিক এতটা উচ্চ করিয়া পড়িতেন যাহাতে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইচ্ছাপূরণ
সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। কিন্তু সকল সময়ে নামের মতো মানুষটি হয় না। সেইজন্যই সুবলচন্দ্র কিছু দুর্বল ছিলেন এবং সুশীলচন্দ্র বড়ো শান্ত ছিলেন না। ছেলেটি পাড়াসুদ্ধ লোককে অস্থির করিয়া বেড়াইত, সেই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেনাপাওনা
পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপমায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিল নিরুপমা। এ গোষ্ঠীতে এমন শৌখিন নাম ইতিপূর্বে কখনো শোনা যায় নাই। প্রায় ঠাকুরদেবতার নামই প্রচলিত ছিল-- গণেশ, কার্তিক, পার্বতী,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুরাশা
দার্জিলিঙে গিয়া দেখিলাম, মেঘে বৃষ্টিতে দশ দিক আচ্ছন্ন। ঘরের বাহির হইতে ইচ্ছা হয় না, ঘরের মধ্যে থাকিতে আরো অনিচ্ছা জন্মে। হোটেলে প্রাতঃকালের আহার সমাধা করিয়া পায়ে মোটা বুট এবং আপাদমস্তক ম্যাকিন্টশ পরিয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দানপ্রতিদান
বড়োগিন্নি যে কথাগুলা বলিয়া গেলেন, তাহার ধার যেমন তাহার বিষও তেমনি। যে-হতভাগিনীর উপর প্রয়োগ করিয়া গেলেন, তাহার চিত্তপুত্তলি একেবারে জ্বলিয়া জ্বলিয়া লুটিতে লাগিল। বিশেষত, কথাগুলা তাহার স্বামীর উপর লক্ষ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসম্ভব কথা
এক যে ছিল রাজা। তখন ইহার বেশি কিছু জানিবার আবশ্যক ছিল না। কোথাকার রাজা, রাজার নাম কী, এ সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া গল্পের প্রবাহ রোধ করিতাম না। রাজার নাম শিলাদিত্য কি শালিবাহন, কাশী কাঞ্চি কনোজ কোশল অঙ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানভঞ্জন
প্রথম পরিচ্ছেদ রমানাথ শীলের ত্রিতল অট্টালিকায় সর্ব্বোচ্চ তলের ঘরে গোপীনাথ শীলের স্ত্রী গিরিবালা বাস করে। শয়নকক্ষের দক্ষিণ দ্বারের সম্মুখে ফুলের টবে গুটিকতক বেলফুল এবং গোলাপফুলের গাছ; ছাতটি উচ্চ প্রাচী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঠাকুরদা
প্রথম পরিচ্ছেদ নয়নজোড়ের জমিদারেরা এককালে বাবু বলিয়া বিশেষ বিখ্যাত ছিলেন। তখনকার কালের বাবুয়ানার আদর্শ বড়ো সহজ ছিল না। এখন যেমন রাজা-রায়বাহাদুর খেতাব অর্জন করিতে অনেক খানা নাচ ঘোড়দৌড় এবং সেলাম-সুপারিশে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পোস্টমাস্টার
প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্টমাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্টআপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্টমাস্টার কলিকা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মেঘ ও রৌদ্র
প্রথম পরিচ্ছেদ পূর্বদিনে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আজ ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতঃকালে ম্লান রৌদ্র ও খণ্ড মেঘে মিলিয়া পরিপক্কপ্রায় আউশ ধানের ক্ষেত্রের উপর পর্যায়ক্রমে আপন আপন সুদীর্ঘ তুলি বুলাইয়া যাইতেছিল; সুবিস্তৃত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারাপ্রসন্নের কীর্তি
লেখকজাতির প্রকৃতি অনুসারে তারাপ্রসন্ন কিছু লাজুক এবং মুখচোরা ছিলেন। লোকের কাছে বাহির হইতে গেলে তাঁহার সর্বনাশ উপস্থিত হইত। ঘরে বসিয়া কলম চালাইয়া তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, পিঠ একটু কুঁজা, সংসারের অভিজ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুর্বুদ্ধি
ভিটা ছাড়িতে হইল। কেমন করিয়া, তাহা খোলসা করিয়া বলিব না, আভাস দিব মাত্র। আমি পাড়াগেঁয়ে নেটিভ ডাক্তার, পুলিসের থানার সম্মুখে আমার বাড়ি। যমরাজের সহিত আমার যে পরিমাণ আনুগত্য ছিল দারোগাবাবুদের সহিত অপেক্ষা ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তপস্বিনী
১ বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্ দব্ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্ঝির্ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিশীথে
'ডাক্তার! ডাক্তার!' জ্বালাতন করিল! এই অর্ধেক রাত্রে-- চোখ মেলিয়া দেখি আমাদের জমিদার দক্ষিণাচরণবাবু। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া পিঠভাঙা চৌকিটা টানিয়া আনিয়া তাঁহাকে বসিতে দিলাম এবং উদ্বিগ্নভাবে তাঁহার মুখের দিকে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যবধান
সম্পর্ক মিলাইয়া দেখিতে গেলে বনমালী এবং হিমাংশুমালী উভয়ে মামাতো পিসতুতো ভাই; সেও অনেক হিসাব করিয়া দেখিলে তবে মেলে। কিন্তু ইহাদের দুই পরিবার বহুকাল হইতে প্রতিবেশী, মাঝে কেবল একটা বাগানের ব্যবধান, এইজন্য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ
এক সময় যজ্ঞেশ্বরের অবস্থা ভালোই ছিল। এখন প্রাচীন ভাঙা কোঠাবাড়িটাকে সাপব্যাঙ-বাদুড়ের হস্তে সমর্পণ করিয়া খোড়ো ঘরে ভগবদগীতা লইয়া কালযাপন করিতেছেন। এগারো বৎসর পূর্বে তাঁহার মেয়েটি যখন জন্মিয়াছিল তখন বংশের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিচারক
প্রথম পরিচ্ছেদ অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অধ্যাপক
প্রথম পরিচ্ছেদ কলেজে আমার সহপাঠীসম্প্রদায়ের মধ্যে আমার একটু বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল। সকলেই আমাকে সকল বিষয়েই সমজদার বলিয়া মনে করিত। ইহার প্রধান কারণ, ভুল হউক আর ঠিক হউক, সকল বিষয়েই আমার একটা মতামত ছিল। অধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সদর ও অন্দর
বিপিনকিশোর ধনীগৃহে জন্মিয়াছিলেন, সেইজন্যে ধন যে পরিমাণে ব্যয় করিতে জানিতেন তাহার অর্ধেক পরিমাণেও উপার্জন করিতে শেখেন নাই। সুতরাং যে গৃহে জন্ম সে গৃহে দীর্ঘকাল বাস করা ঘটিল না। সুন্দর সুকুমারমূর্তি তরু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উদ্ধার
গৌরী প্রাচীন ধনীবংশের পরমাদরে পালিতা সুন্দরী কন্যা। স্বামী পরেশ হীনাবস্থা হইতে সম্প্রতি নিজের উপার্জনে কিঞ্চিৎ অবস্থার উন্নতি করিয়াছে; যতদিন তাঁহার দৈন্য ছিল ততদিন কন্যার কষ্ট হইবে ভয়ে শ্বশুর শাশুড়ি স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষের রাত্রি
১ 'মাসি !' 'ঘুমোও,যতীন,রাত হল যে ।' 'হোক-না রাত,আমার দিন তো বেশি নেই । আমি বলছিলুম,মণিকে তার বাপের বাড়ি-- ভূলে যাচ্ছি,ওর বাপ এখন কোথায়--' 'সীতারামপুরে ।' 'হাঁ সীতারামপুরে । সেইখানে মণিকে পাঠিয়ে দাও,আর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উলুখড়ের বিপদ
বাবুদের নায়েব গিরিশ বসুর অন্তঃপুরে প্যারী বলিয়া একটি নূতন দাসী নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার বয়স অল্প; চরিত্র ভালো। দূর বিদেশ হইতে আসিয়া কিছুদিন কাজ করার পরেই একদিন সে বৃদ্ধ নায়েবের অনুরাগদৃষ্টি হইতে আত্মরক্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাস্টারমশায়
ভুমিকা রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফেল
ল্যাজা এবং মুড়া, রাহু এবং কেতু, পরস্পরের সঙ্গে আড়াআড়ি করিলে যেমন দেখিতে হইত এও ঠিক সেইরকম। প্রাচীন হালদার বংশ দুই খণ্ডে পৃথক হইয়া প্রকাণ্ড বসত-বাড়ির মাঝখানে এক ভিত্তি তুলিয়া পরস্পর পিঠাপিঠি করিয়া বসিয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষুধিত পাষাণ
আমি এবং আমার আত্মীয় পূজার ছুটিতে দেশভ্রমণ সারিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময় রেলগাড়িতে বাবুটির সঙ্গে দেখা হয়। তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল। তাঁহ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দৃষ্টিদান
শুনিয়াছি, আজকাল অনেক বাঙালির মেয়েকে নিজের চেষ্টায় স্বামী সংগ্রহ করিতে হয়। আমিও তাই করিয়াছি, কিন্তু দেবতার সহায়তায়। আমি ছেলেবেলা হইতে অনেক ব্রত এবং অনেক শিবপূজা করিয়াছিলাম। আমার আটবৎসর বয়স উত্তীর্ণ না ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডিটেকটিভ
আমি পুলিসের ডিটেকটিভ কর্মচারী। আমার জীবনের দুটিমাত্র লক্ষ্য ছিল-- আমার স্ত্রী এবং আমার ব্যবসায়। পূর্বে একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে ছিলাম, সেখানে আমার স্ত্রীর প্রতি সমাদরের অভাব হওয়াতেই আমি দাদার সঙ্গে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুসলমানীর গল্প
তখন অরাজকতার চরগুলো কণ্টকিত করে রেখেছিল রাষ্ট্রশাসন, অপ্রত্যাশিত অত্যাচারের অভিঘাতে দোলায়িত হত দিন রাত্রি। দুঃস্বপ্নের জাল জড়িয়েছিল জীবনযাত্রার সমস্ত ক্রিয়াকর্মে, গৃহস্থ কেবলই দেবতার মুখ তাকিয়ে থাকত, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুত্রযজ্ঞ
বৈদ্যনাথ গ্রামের মধ্যে বিজ্ঞ ছিলেন সেইজন্য তিনি ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া বর্তমানের সমস্ত কাজ করিতেন। যখন বিবাহ করিলেন তখন তিনি বর্তমান নববধূর অপেক্ষা ভাবী নবকুমারের মুখ স্পষ্টতররূপে দেখিতে পাইয়াছি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা
যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজপথের কথা
আমি রাজপথ। অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হইয়া পড়িয়া ছিল, আমিও যেন তেমনি কাহার শাপে চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সর্পের ন্যায় অরণ্যপর্বতের মধ্য দিয়া, বৃক্ষশ্রেণীর ছায়া দিয়া, সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরের বক্ষের উপর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুকুট
প্রথম পরিচ্ছেদ ত্রিপুরার রাজা অমরমাণিক্যের কনিষ্ঠ পুত্র রাজধর সেনাপতি ইশা খাঁকে বলিলেন, "দেখো সেনাপতি, আমি বারবার বলিতেছি তুমি আমাকে অসম্মান করিয়ো না।" পাঠান ইশা খাঁ কতকগুলি তীরের ফলা লইয়া তাহাদের ধার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কঙ্কাল
আমরা তিন বাল্যসঙ্গী যে ঘরে শয়ন করিতাম তাহার পাশের ঘরের দেয়ালে একটি আস্ত নরকঙ্কাল ঝুলানো থাকিত। রাত্রে বাতাসে তাহার হাড়গুলা খট্খট্ শব্দ করিয়া নড়িত। দিনের বেলায় আমাদিগকে সেই হাড় নাড়িতে হইত। আমরা তখন প...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একরাত্রি
সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি, বউ-বউ খেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড় যত্ন করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া আপনা-আপনি বলাবলি করিতেন,'আহা দুটিতে বেশ মানায়।'ছোট ছিলাম কিন্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সম্পত্তি সমর্পণ
প্রথম পরিচ্ছেদবৃন্দাবন কুণ্ড মহা ক্রুদ্ধ হইয়া আসিয়া তাহার বাপকে কহিল, "আমি এখনই চলিলাম।"বাপ যজ্ঞনাথ কুণ্ড কহিলেন, "বেটা অকৃতজ্ঞ, ছেলেবেলা হইতে তোকে খাওয়াইতে পরাইতে যে ব্যয় হইয়াছে তাহার পরিশোধ করিবার ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাসমণির ছেলে
১ কালীপদর মা ছিলেন রাসমণি-- কিন্তু তাঁহাকে দায়ে পড়িয়া বাপের পদ গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। কারণ, বাপ মা উভয়েই মা হইয়া উঠিলে ছেলের পক্ষে সুবিধা হয় না। তাঁহার স্বামী ভবানীচরণ ছেলেকে একেবারেই শাসন করিতে পারেন ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পণরক্ষা
১ বংশীবদন তাহার ভাই রসিককে যেমন ভালোবাসিত এমন করিয়া সচরাচর মাও ছেলেকে ভালোবাসিতে পারে না। পাঠশালা হইতে রসিকের আসিতে যদি কিছু বিলম্ব হইত তবে সকল কাজ ফেলিয়া সে তাহার সন্ধানে ছুটিত। তাহাকে না খাওয়াইয়া সে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভাইফোঁটা
শ্রাবণ মাসটা আজ যেন এক রাত্রে একেবারে দেউলে হইয়া গেছে। সমস্ত আকাশে কোথাও একটা ছেঁড়া মেঘের টুকরোও নাই। আশ্চর্য এই যে, আমার সকালটা আজ এমন করিয়া কাটিতেছে। আমার বাগানের মেহেদি-বেড়ার প্রান্তে শিরীষগাছের পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হালদারগোষ্ঠী
এই পরিবারটির মধ্যে কোনোরকমের গোল বাধিবার কোনো সংগত কারণ ছিল না। অবস্থাও সচ্ছল, মানুষগুলিও কেহই মন্দ নহে, কিন্তু তবুও গোল বাধিল। কেননা, সংগত কারণেই যদি মানুষের সব-কিছু ঘটিত তবে তো লোকালয়টা একটা অঙ্কের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবিত ও মৃত
প্রথম পরিচ্ছেদরানীহাটের জমিদার শারদাশংকরবাবুদের বাড়ির বিধবা বধূটির পিতৃকুলে কেহ ছিল না; সকলেই একে একে মারা গিয়াছে। পতিকুলেও ঠিক আপনার বলিতে কেহ নাই, পতিও নাই পুত্রও নাই। একটি ভাশুরপো, শারদাশংকরের ছোটো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমস্যাপূরণ
প্রথম পরিচ্ছেদ ঝিঁকড়কোটার কৃষ্ণগোপাল সরকার জ্যেষ্ঠপুত্রের প্রতি জমিদারি এবং সংসারের ভার দিয়া কাশী চলিয়া গেলেন। দেশের যত অনাথ দরিদ্র লোক তাঁহার জন্য হাহাকার করিয়া কাঁদিতে লাগিল। এমন বদান্যতা, এমন ধর্মন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছুটি
বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট করিয়া একটা নূতন ভাবোদয় হইল, নদীর ধারে একটা প্রকাণ্ড শালকাষ্ঠ মাস্তুলে রূপান্তরিত হইবার প্রতীক্ষায় পড়িয়া ছিল; স্থির হইল, সেটা সকলে মিলিয়া গড়াইয়া লইয়া যাইবে।যে-...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রীতিমত নভেল
প্রথম পরিচ্ছেদ 'আল্লা হো আকবর' শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বত্থবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শাস্তি
প্রথম পরিচ্ছেদ দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকাবকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্য কলরবের ন্যায় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সম্পাদক
আমার স্ত্রী-বর্তমানে প্রভা সম্বন্ধে আমার কোনো চিন্তা ছিল না। তখন প্রভা অপেক্ষা প্রভার মাতাকে লইয়া কিছু অধিক ব্যস্ত ছিলাম। তখন কেবল প্রভার খেলাটুকু হাসিটুকু দেখিয়া, তাহার আধো আধো কথা শুনিয়া এবং আদরটুকু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বর্ণমৃগ
আদ্যানাথ এবং বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী দুই শরিক। উভয়ের মধ্যে বৈদ্যনাথের অবস্থাই কিছু খারাপ। বৈদ্যনাথের বাপ মহেশচন্দ্রের বিষয়বুদ্ধি আদৌ ছিল না, তিনি দাদা শিবনাথের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া থাকিতেন। শিবনাথ ভাই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাবুলিওয়ালা
আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটো মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমাপ্তি
প্রথম পরিচ্ছেদ অপূর্বকৃষ্ণ বি. এ. পাস করিয়া কলিকাতা হইতে দেশে ফিরিয়া আসিতেছেন। নদীটি ক্ষুদ্র। বর্ষা অন্তে প্রায় শুকাইয়া যায়। এখন শ্রাবণের শেষে জলে ভরিয়া উঠিয়া একেবারে গ্রামের বেড়া ও বাঁশঝাড়ের তলদেশ চু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনধিকার প্রবেশ
একদা প্রাতঃকালে পথের ধারে দাঁড়াইয়া এক বালক আর-এক বালকের সহিত একটি অসমসাহসিক অনুষ্ঠান সম্বন্ধে বাজি রাখিয়াছিল। ঠাকুরবাড়ির মাধবীবিতান হইতে ফুল তুলিয়া আনিতে পারিবে কি না, ইহাই লইয়া তর্ক। একটি বালক বলিল '...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটা আষাঢ়ে গল্প
১ দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। সেখানে কেবল তাসের সাহেব, তাসের বিবি, টেক্কা এবং গোলামের বাস। দুরি তিরি হইতে নহলা-দহলা পর্যন্ত আরো অনেক-ঘর গৃহস্থ আছে কিন্তু তাহারা উচ্চজাতীয় নহে। টেক্কা সাহেব গোলাম এই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপদ
সন্ধ্যার দিকে ঝড় ক্রমশ প্রবল হইতে লাগিল। বৃষ্টির ঝাপট, বজ্রের শব্দ এবং বিদ্যুতের ঝিকমিকিতে আকাশে যেন সুরাসুরের যুদ্ধ বাধিয়া গেল। কালো কালো মেঘগুলো মহাপ্রলয়ের জয়পতাকার মতো দিগ্বিদিকে উড়িতে আরম্ভ করিল,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রায়শ্চিত্ত
প্রথম পরিচ্ছেদ স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে একটা অনির্দেশ্য অরাজক স্থান আছে যেখানে ত্রিশঙ্কু রাজা ভাসিয়া বেড়াইতেছেন, যেখানে আকাশকুসুমের অজস্র আবাদ হইয়া থাকে। সেই বায়ুদুর্গবেষ্টিত মহাদেশের নাম 'হইলে-হইতে-পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিদি
প্রথম পরিচ্ছেদ পল্লীবাসিনী কোনো-এক হতভাগিনীর অন্যায়কারী অত্যাচারী স্বামীর দুষ্কৃতিসকল সবিস্তারে বর্ণনপূর্বক প্রতিবেশিনী তারা অত্যন্ত সংক্ষেপে নিজের রায় প্রকাশ করিয়া কহিল, 'এমন স্বামীর মুখে আগুন।' শুনি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতিহিংসা
প্রথম পরিচ্ছেদ মুকুন্দবাবুদের ভূতপূর্ব দেওয়ানের পৌত্রী, বর্তমান ম্যানেজারের স্ত্রী ইন্দ্রাণী অশুভক্ষণে বাবুদের বাড়িতে তাঁহাদের দৌহিত্রের বিবাহে বউভাতের নিমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন। তৎপূর্বকার ইতিহাস সংক্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গিন্নি
ছাত্রবৃত্তি ক্লাসের দুই-তিন শ্রেণী নীচে আমাদের পণ্ডিত ছিলেন শিবনাথ। তাঁহার গোঁফদাড়ি কামানো, চুল ছাঁটা এবং টিকিটি হ্রস্ব। তাঁহাকে দেখিলেই বালকদের অন্তরাত্মা শুকাইয়া যাইত। প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়, যাহা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হৈমন্তী
কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন,মেয়েটির বিবাহের বয়স পার হইয়া গেছে, কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোনো রকমে চাপা দিবার সময়টাও পার হইয়া য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গুপ্তধন
১ অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি। মৃত্যুঞ্জয় তান্ত্রিক মতে তাহাদের বহুকালের গৃহদেবতা জয়কালীর পূজায় বসিয়াছে। পূজা সমাধা করিয়া যখন উঠিল তখন নিকটস্থ আমবাগান হইতে প্রত্যুষের প্রথম কাক ডাকিল। মৃত্যুঞ্জয় পশ্চাতে ফি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বোষ্টমী
আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধর্ম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসর্বদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালির ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্রমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোয়ারী তো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দালিয়া
ভূমিকাপরাজিত শা সুজা ঔরঞ্জীবের ভয়ে পলায়ন করিয়া আরাকান-রাজের আতিথ্য গ্রহণ করেন। সঙ্গে তিন সুন্দরী কন্যা ছিল। আরাকান-রাজের ইচ্ছা হয়, রাজপুত্রদের সহিত তাহাদের বিবাহ দেন। সেই প্রস্তাবে শা সুজা নিতান্ত অসন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ত্যাগ
প্রথম পরিচ্ছেদ ফাল্গুনের প্রথম পূর্ণিমায় আম্রমুকুলের গন্ধ লইয়া নব বসন্তের বাতাস বহিতেছে। পুষ্করিণীতীরের একটি পুরাতন লিচুগাছের ঘন পল্লবের মধ্য হইতে একটি নিদ্রাহীন অশ্রান্ত পাপিয়ার গান মুখুজ্যেদের বাড়ির...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশীর্বাদ
পঞ্চাশ বছরের কিশোর গুণী নন্দলাল বসুর প্রতি সত্তর বছরের প্রবীণ যুবা রবীন্দ্রনাথের আশীর্ভাষণ নন্দনের কুঞ্জতলে রঞ্জনার ধারা, জন্ম-আগে তাহার জলে তোমার স্নান সারা। অঞ্জন সে কী মধুরাতে লাগালো কে যে নয়নপাতে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন সে পলে পলে
নূতন সে পলে পলে অতীতে বিলীন, যুগে যুগে বর্তমান সেই তো নবীন। তৃষ্ণা বাড়াইয়া তোলে নূতনের সুরা, নবীনের চিরসুধা তৃপ্তি করে পুরা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আবার এরা ঘিরেছে মোর মন
আবার এরা ঘিরেছে মোর মন। আবার চোখে নামে যে আবরণ। আবার এ যে নানা কথাই জমে, চিত্ত আমার নানা দিকেই ভ্রমে, দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে, আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ। তব নীরব বাণী হৃদয়তলে ডোবে না যেন লোকের কোলাহলে। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আবার আবার কেন রে আমার
আবার আবার কেন রে আমার সেই ছেলেবেলা আসে নি ফিরে, হরষে কেমন আবার তা হলে, সাঁতারিয়ে ভাসি সাগরের জলে, খেলিয়ে বেড়াই শিখরী শিরে! স্বাধীন হৃদয়ে ভালো নাহি লাগে, ঘোরঘটাময় সমাজধারা, না, না, আমি রে যাব সেই স্থান...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে
উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে ওই যে তিনি, ও ই যে বাহির পথে। আয় রে ছুটে, টানতে হবে রশি, ঘরের কোণে রইলি কোথায় বসি। ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে গিয়ে ঠাঁই করে তুই নে রে কোনোমতে। কোথায় কী তোর আছে ঘরের কাজ, সে-সব কথ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমাদের ছোট নদী
আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি, দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি। চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। কিচিমিচ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা। নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা। এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে, এসো নির্মল নীল পথে, এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল বনগিরিপর্বতে। এসো মু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা
আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা, দেবদারুর কুঞ্জে ধেনু চরায় রাখালেরা। কোথা হতে চৈত্রমাসে হাঁসের শ্রেণী উড়ে আসে, অঘ্রানেতে আকাশপথে যায় যে তারা কোথা আমরা কিছুই জানি নেকো সেই সুদূরের কথা। আমরা জানি গ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাখি যবে গাহে গান
পাখি যবে গাহে গান, জানে না, প্রভাতরবিরে সে তার প্রাণের অর্ঘ্যদান। ফুল ফুটে বন-মাঝে— সেই তো তাহার পূজানিবেদন, আপনি সে জানে না যে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ। খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত।। কারা এই সমুখ দিয়ে আসে যায় খবর নিয়ে, খুশি রই আপন মনে- বাতাস বহে সুমন্দ। সারাদিন আঁখি মেলে দুয়ারে রব একা, শুভখন হঠাৎ এলে তখনি পাব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু
আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু, নয় তো হীনবল - শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে ফেলবে অশ্রুজল। মন্দমধুর সুখে শোভায় প্রেম কে কেন ঘুমে ডোবায়। তোমার সাথে জাগতে সে চায় আনন্দে পাগল। নাচ' যখন ভীষণ সাজে তীব্র তালের আঘাত ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার এই ছোটো কলসিটা পেতে রাখি
আমার এই ছোটো কলসিটা পেতে রাখি ঝরনাধারার নিচে। বসে থাকি কোমরে আঁচল বেঁধে, সারা সকালবেলা, শেওলা ঢাকা পিছল পাথরটাতে পা ঝুলিয়ে। এক নিমেষেই ঘট যায় ভরে তার পরে কেবলি তার কানা ছাপিয়ে ওঠে, জল পড়তে থাকে ফে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার সোনার বাংলা
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ॥ ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে-- ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে তখন কে তুমি তা কে জানত। তখন ছিল না ভয়, ছিল না লাজ মনে, জীবন বহে যেত অশান্ত। তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত যেন আমার আপন সখার মতো, হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলাম ছুটে সেদিন কত-না...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইছামতী নদী
অয়ি তন্বী ইছামতী, তব তীরে তীরে শান্তি চিরকাল থাক কুটিরে কুটিরে— শস্যে পূর্ণ হোক ক্ষেত্র তব তটদেশে। বর্ষে বর্ষে বরষায় আনন্দিত বেশে ঘনঘোরঘটা-সাথে বজ্রবাদ্যরবে পূর্ববায়ুকল্লোলিত তরঙ্গ-উৎসবে তুলিয়া আনন্দধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে মনে দেখলুম
মনে মনে দেখলুম সেই দূর অতীত যুগের নিঃশব্দ সাধনা যা মুখর ইতিহাসকে নিষিদ্ধ রেখেছে আপন তপস্যার আসন থেকে। দেখলেম দুর্গম গিরিব্রজে কোলাহলী কৌতূহলী দৃষ্টির অন্তরালে অসূর্যম্পশ্য নিভৃতে ছবি আঁকছে গুণী গুহাভি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার ফুলবাগানের ফুলগুলিকে
আমার ফুলবাগানের ফুলগুলিকে বাঁধব না আজ তোড়ায়, রঙ-বেরঙের সুতোগুলো থাক্, থাক্ পড়ে ঐ জরির ঝালর। শুনে ঘরের লোকে বলে, "যদি না বাঁধ জড়িয়ে জড়িয়ে ওদের ধরব কী করে, ফুলদানিতে সাজাব কোন্ উপায়ে?" আমি বল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে
আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে মরছে সে এই নামের কারাগারে। সকল ভুলে যতই দিবারাতি নামটারে ওই আকাশপানে গাঁথি, ততই আমার নামের অন্ধকারে হারাই আমার সত্য আপনারে। জড়ো করে ধূলির ‘পরে ধূলি নামটারে মোর উচ্চ করে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোপাই
পদ্মা কোথায় চলেছে দূর আকাশের তলায়, মনে মনে দেখি তাকে। এক পারে বালুর চর, নির্ভীক কেননা নিঃস্ব, নিরাসক্ত,- অন্য পারে বাঁশবন, আমবন, পুরোনো বট, পোড়ো ভিটে, অনেক দিনের গুড়ি-মোটা কাঁঠালগাছ- পুকুরের ধারে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে, তাই তো আমি এসেছি এই ভবে। এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার, ঘুচে যাবে সকল অহংকার, আনন্দময় তোমার এ সংসার আমার কিছু আর বাকি না রবে। মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে আমার মাঝে তোমার লীলা হবে। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার শেষ বেলাকার ঘরখানি
আমার শেষবেলাকার ঘরখানি বানিয়ে রেখে যাব মাটিতে, তার নাম দেব শ্যামলী। ও যখন পড়বে ভেঙে সে হবে ঘুমিয়ে পড়ার মতো, মাটির কোলে মিশবে মাটি; ভাঙা থামে নালিশ উঁচু করে বিরোধ করবে না ধরণীর সঙ্গে; ফাটা দেয়ালের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে
আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে কোন্ বিরহিণী নারী? আপন করিতে চাহিনু তাহারে, কিছুতেই নাহি পারি। রমণীরে কে বা জানে– মন তার কোন্খানে। সেবা করিলাম দিবানিশি তার, গাঁথি দিনু গলে কত ফুলহার, মনে হল সুখে প্রসন্ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমারে যদি জাগালে আজি নাথ
আমারে যদি জাগালে আজি নাথ, ফিরো না তবে ফিরো না, করো করুণ আঁখিপাত। নিবিড় বন-শাখার ‘পরে আষাঢ়-মেঘে বৃষ্টি ঝরে, বাদলভরা আলসভরে ঘুমায়ে আছে রাত। ফিরো না তুমি ফিরো না, করো করুণ আঁখিপাত। বিরামহীন বিজুলিঘাতে নি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি বদল করেছি আমার বাসা
শ্রীমতী রানী দেবী কল্যাণীয়াসু ১ আমি বদল করেছি আমার বাসা। দুটিমাত্র ছোটো ঘর আমার আশ্রয়। ছোটো ঘরই আমার মনের মতো। তার কারণ বলি তোমাকে। বড়ো ঘর বড়োর ভান করে মাত্র, আসল বড়োকে বাইরে ঠেকিয়ে রাখে অবজ্ঞায...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (চতুর্থ সর্গ)
নিভৃত যমুনাতীরে বসিয়া রয়েছে কি রে কমলা নীরদ দুই জনে? যেন দোঁহে জ্ঞানহত— নীরব চিত্রের মতো দোঁহে দোঁহা হেরে একমনে। দেখিতে দেখিতে কেন অবশ পাষাণ হেন, চখের পলক নাহি পড়ে। শোণিত না চলে বুকে, কথাটি না ফুটে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি চেয়ে আছি
আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবা-পানে। স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে। নীচে সব-নীচে এ ধূলির ধরণীতে যেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে, যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নাই কিছু, যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে। স্থান দাও সেথা সক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি চঞ্চল হে
আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসি। দিন চলে যায়, আমি আনমনে তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে, ওগো প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী। আমি সুদূরের পিয়াসি। ওগো সুদূর,বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি
এই যে সবার সামান্য পথ, পায়ে হাঁটার গলি সে পথ দিয়ে আমি চলি সুখে দুঃখে লাভে ক্ষতিতে, রাতের আঁধার দিনের জ্যোতিতে। প্রতি তুচ্ছ মুহূর্তেরই আবর্জনা করি আমি জড়ো, কারো চেয়ে নইকো অমি বড়ো। চলতে পথে কখনো বা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি বেসেছিলেম ভালো
আমি বেসেছিলেম ভালো সকল দেহে মনে এই ধরণীর ছায়া আলো আমার এ জীবনে। সেই যে আমার ভালোবাসা লয়ে আকুল অকূল আশা ছড়িয়ে দিল আপন ভাষা আকাশনীলিমাতে। রইল গভীর সুখে দুখে, রইল সে-যে কুঁড়ির বুকে ফুল-ফোটানোর মুখে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহাস্বপ্ন
পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন, নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্ স্বপন্। বিশাল জগৎ এই প্রকাণ্ড স্বপন সেই, হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিম্বের মতন। উঠিতেছে চন্দ্র সূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার, উঠিতেছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আয়না দেখেই চমকে বলে
আয়না দেখেই চমকে বলে, “মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে, বেশিদিন আর বাঁচব না তো–‘ ভাবছে বসে একা সে। ডাক্তারেরা লুটল কড়ি, খাওয়ায় জোলাপ, খাওয়ায় বড়ি, অবশেষে বাঁচল না সেই বয়স যখন একাশি। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে
আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে, বাঁকা পথের ডাহিন পাশে, ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। কে জানে এই গ্রাম, কে জানে এর নাম, খেতের ধারে মাঠের পারে বনের ঘন ছায়ে– শুধু আমার হৃদয় জানে সে ছিল এই গাঁয়ে। বেণুশাখারা আড়াল দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি হেথায় থাকি
আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান, দিয়ো তোমার জগৎসভায় এইটুকু মোর স্থান। আমি তোমার ভুবন-মাঝে লাগি নি নাথ, কোনো কাজে– শুধু কেবল সুরে বাজে অকাজের এই প্রাণ। নিশায় নীরব দেবালয়ে তোমার আরাধন, তখন মোরে আদেশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আয় রে বসন্ত
আয় রে বসন্ত, হেথা কুসুমের সুষমা জাগা রে শান্তিস্নিগ্ধ মুকুলের হৃদয়ের গোপন আগারে। ফলেরে আনিবে ডেকে সেই লিপি যাস রেখে, সুবর্ণের তুলিখানি পর্ণে পর্ণে যতনে লাগা রে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরম্ভ ও শেষ
শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে, হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে। আরম্ভ কহিল ভাই, যেথা শেষ হয় সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরো আঘাত সইবে আমার
আরো আঘাত সইবে আমার সইবে আমারো, আরো কঠিন সুরে জীবনতারে ঝংকারো। যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে বাজে নি তা চরমতানে, নিঠুর মূর্ছনায় সে গানে মূর্তি সঞ্চারো। লাগে না গো কেবল যেন কোমল করুণা, মৃদু সুরের খেলায় এ প্র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আহ্বানগীত
পৃথিবী জুড়িয়া বেজেছে বিষাণ , শুনিতে পেয়েছি ওই — সবাই এসেছে লইয়া নিশান , কই রে বাঙালি কই ! সুগভীর স্বর কাঁদিয়া বেড়ায় বঙ্গসাগরের তীরে , ‘ বাঙালির ঘরে কে আছিস আয়‘ ডাকিতেছে ফিরে ফিরে । ঘরে ঘরে কেন দুয়ার ভ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরশি
তোমার যে ছায়া তুমি দিলে আরশিরে হাসিমুখ মেজে, সেইক্ষণে অবিকল সেই ছায়াটিরে ফিরে দিল সে যে। রাখিল না কিছু আর, স্ফটিক সে নির্বিকার আকাশের মতো-- সেথা আসে শশী রবি, যায় চলে, তার ছবি কোথা হয় গত। একদিন শুধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আর নাই রে বেলা নামল ছায়া
আর নাই রে বেলা, নামল ছায়া ধরণীতে, এখন চল্ রে ঘাটে কলসখানি ভরে নিতে। জলধারার কলস্বরে সন্ধ্যাগগন আকুল করে, ওরে ডাকে আমায় পথের ‘পরে সেই ধ্বনিতে। চল্ রে ঘাটে কলসখানি ভরে নিতে। এখন বিজন পথে করে না কেউ আস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আহ্বানসংগীত
ওরে তুই জগৎ-ফুলের কীট, জগৎ যে তোর শুকায়ে আসিল, মাটিতে পড়িল খসে-- সারা দিন রাত গুমরি গুমরি কেবলি আছিস বসে। মড়কের কণা,নিজ হাতে তুই রচিলি নিজের কারা, আপনার জালে জড়ায়ে পড়িয়া আপনি হইলি হারা। অবশেষে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (প্রথম সর্গ)
চাই না জ্ঞেয়ান, চাই না জানিতে সংসার, মানুষ কাহারে বলে। বনের কুসুম ফুটিতাম বনে শুকায়ে যেতাম বনের কোলে! — দীপনির্বাণ নিশার আঁধার রাশি করিয়া নিরাস রজতসুষমাময়, প্রদীপ্ত তুষারচয় হিমাদ্রি-শিখর-দেশে পাই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলো তার পদচিহ্ন
আলো তার পদচিহ্ন আকাশে না রাখে; চলে যেতে জানে, তাই চিরদিন থাকে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলো আসে দিনে দিনে
আলো আসে দিনে দিনে, রাত্রি নিয়ে আসে অন্ধকার। মরণসাগরে মিলে সাদা কালো গঙ্গাযমুনার। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরোগ্য - ১০
অলস সময়-ধারা বেয়ে মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে। সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে। কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে সুদীর্ঘ অতীতে জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে। এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল, এসেছে মোগল; বিজয়রথের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরোগ্য--৯
বিরাট সৃষ্টির ক্ষেত্রে আতশবাজির খেলা আকাশে আকাশে, সূর্য তারা ল’য়ে যুগযুগান্তের পরিমাপে। অনাদি অদৃশ্য হতে আমিও এসেছি ক্ষুদ্র অগ্নিকণা নিয়ে এক প্রান্তে ক্ষুদ্র দেশে কালে। প্রস্থানের অঙ্কে আজ এসেছি যেমনি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলো নাই, দিন শেষ হল, ওরে
আলো নাই, দিন শেষ হল, ওরে পান্থ, বিদেশী পান্থ। ঘন্টা বাজিল দূরে ও পারের রাজপুরে, এখনো যে পথে চলেছিস তুই হায় রে পথশ্রান্ত পান্থ, বিদেশী পান্থ। দেখ্ সবে ঘরে ফিরে এল, ওরে পান্থ, বিদেশী পান্থ। পূজা সারি দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (সপ্তম সর্গ)
শ্মশান গভীর আঁধার রাত্রি শ্মশান ভীষণ! ভয় যেন পাতিয়াছে আপনার আঁধার আসন! সর সর মরমরে সুধীরে তটিনী বহে যায়। প্রাণ আকুলিয়া বহে ধূমময় শ্মশানের বায়! গাছপালা নাই কোথা প্রান্তর গম্ভীর! শাখাপত্রহীন বৃক্ষ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদীর পালিত এই জীবন আমার
নদীর পালিত এই জীবন আমার। নানা গিরিশিখরের দান নাড়ীতে নাড়ীতে তার বহে, নানা পলিমাটি দিয়ে ক্ষেত্র তার হয়েছে রচিত, প্রাণের রহস্যরস নানা দিক হতে শস্যে শস্যে লভিল সঞ্চার। পূর্বপশ্চিমের নানা গীতস্রোতজালে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদায় শেষের কবিতা থেকে
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও। তারি রথ নিত্যই উধাও জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন, চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল তুলে নিল দ্রুত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলোয় আলোকময় করে হে
আলোয় আলোকময় ক’রে হে এলে আলোর আলো। আমার নয়ন হতে আঁধার মিলালো মিলালো। সকল আকাশ সকল ধরা আনন্দে হাসিতে ভরা, যে দিক-পানে নয়ন মেলি ভালো সবই ভালো। তোমার আলো গাছের পাতায় নাচিয়ে তোলে প্রাণ। তোমার আলো পাখির বাস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশার আলোকে
আশার আলোকে জ্বলুক প্রাণের তারা, আগামী কালের প্রদোষ-আঁধারে ফেলুক কিরণধারা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়
আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়, আঁধারেতে চলে যায় বাহিরে। ভাবে মনে, বৃথা এই আসা আর যাওয়া, অর্থ কিছুই এর নাহি রে। কেন আসি, কেন হাসি, কেন আঁখিজলে ভাসি, কার কথা বলে যাই, কার গান গাহি রে– অর্থ কিছুই তার নাহি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আষাঢ়
নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে। ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, আউশের ক্ষেত জলে ভরভর, কালি-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে। ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি শিশির বিন্দু
বহু দিন ধরে' বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু। (স্ফুলি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল
আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, গেল রে দিন বয়ে। বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে। একলা বসে ঘরের কোণে কী ভাবি যে আপন-মনে, সজল হাওয়া যূথীর বনে কী কথা যায় কয়ে। বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে। হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়ে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন ও সনাতন
রাজা ভাবে, নব নব আইনের ছলে ন্যায় সৃষ্টি করি আমি। ন্যায়ধর্ম বলে, আমি পুরাতন, মোরে জন্ম কেবা দেয়— যা তব নূতন সৃষ্টি সে শুধু অন্যায়। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নারী তুমি ধন্যা
নারী তুমি ধন্যা– আছে ঘর, আছে ঘরকন্না। তারি মধ্যে রেখেছ একটুখানি ফাঁক। সেথা হতে পশে কানে বাহিরের দুর্বলের ডাক। নিয়ে এসো শুশ্রূষার ডালি, স্নেহ দাও ঢালি। যে জীবলক্ষ্মীর মনে পালনের শক্তি বহমান, নারী তুমি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোন্ খ'সে-পড়া তারা
কোন্ খ'সে-পড়া তারা মোর প্রাণে এসে খুলে দিল আজি সুরের অশ্রুধারা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্যামেলিয়া
নাম তার কমলা, দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা। সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায় । আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে। মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়, আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নীচে। কোলে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষণিক ধ্বনির স্বত-উচ্ছ্বাসে
ক্ষণিক ধ্বনির স্বত-উচ্ছ্বাসে সহসা নির্ঝরিণী আপনারে লয় চিনি। চকিত ভাবের ক্বচিৎ বিকাশে বিস্মিত মোর প্রাণ পায় নিজ সন্ধান। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খবর পেলেম কল্য
খবর পেলেম কল্য, তাঞ্জামেতে চ’ড়ে রাজা গাঞ্জামেতে চলল। সময়টা তার জলদি কাটে; পৌঁছল যেই হলদিঘাটে একটা ঘোড়া রইল বাকি, তিনটে ঘোড়া মরল। গরানহাটায় পৌঁছে সেটা মুটের ঘাড়ে চড়ল। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষণিক মিলন
আকাশের দুই দিক হতে দুইখানি মেঘ এল ভেসে , দুইখানি দিশাহারা মেঘ — কে জানে এসেছে কোথা হতে ! সহসা থামিল থমকিয়া আকাশের মাঝখানে এসে। দোঁহাপানে চাহিল দুজনে চতুর্থীর চাঁদের আলোতে । ক্ষীণালোকে বুঝি মনে পড়ে দুই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীলুবাবু বলে শোনো নেয়ামৎ দর্জি
নীলুবাবু বলে, “শোনো নেয়ামৎ দর্জি, পুরোনো ফ্যাশানটাতে নয় মোর মর্জি।’ শুনে নিয়ামৎ মিঞা যতনে পঁচিশটে সম্মুখে ছিদ্র, বোতাম দিল পৃষ্ঠে। লাফ দিয়ে বলে নীলু, “এ কী আশ্চর্যি!’ ঘরের গৃহিণী কয়, “রয় না তো ধর্যি।’...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইস্কুল-এড়ায়নে সেই ছিল বরিষ্ঠ
ইস্কুল-এড়ায়নে সেই ছিল বরিষ্ঠ, ফেল-করা ছেলেদের সবচেয়ে গরিষ্ঠ। কাজ যদি জুটে যায় দুদিনে তা ছুটে যায়, চাকরির বিভাগে সে অতিশয় নড়িষ্ঠ– গলদ করিতে কাজে ভয়ানক দ্রঢ়িষ্ঠ। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইচ্ছামতী
যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি আমি তবে একখানি হই ইচ্ছামতী নদী । রইবে আমার দখিন ধারে সূর্য ওঠার পার , বাঁয়ের ধারে সন্ধেবেলায় নামবে অন্ধকার । আমি কইব মনের কথা দুই পারেরই সাথে , আধেক কথা দিনের বেলায় , ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইদিলপুরেতে বাস নরহরি শর্মা
ইদিলপুরেতে বাস নরহরি শর্মা, হঠাৎ খেয়াল গেল যাবেই সে বর্মা। দেখবে-শুনবে কে যে তাই নিয়ে ভাবনা, রাঁধবে বাড়বে, দেবে গোরুটাকে জাবনা– সহধর্মিণী নেই, খোঁজে সহধর্মা। গেল তাই খণ্ডালা, গেল তাই অণ্ডালে, মহা রেগে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উপলক্ষ
কাল বলে,আমি সৃষ্টি করি এই ভব। ঘড়ি বলে, তা হলে আমিও স্রষ্টা তব। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষুদ্রের দম্ভ
শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির, লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিরুদ্দেশ যাত্রা
আর কতদূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী? বলো, কোন পার ভিড়িবে তোমার সোনার তরী যখনই শুধাই, ওগো বিদেশিনী, তুমি হাস শুধু, মধুরহাসিনী- বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে তোমার মনে। নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি অকুল ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিষ্কাম পরহিতে কে ইহারে সামলায়
নিষ্কাম পরহিতে কে ইহারে সামলায়– স্বার্থেরে নিঃশেষে-মুছে-ফেলা মামলায়। চলেছে উদারভাবে সম্বল-খোয়ানি– গিনি যায়, টাকা যায়, সিকি যায় দোয়ানি, হল সারা বাঁটোয়ারা উকিলে ও আমলায়। গিয়েছে পরের লাগি অন্নের শেষ গুঁড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষণিকা
খোলো খোলো, হে আকাশ, স্তব্ধ তব নীল যবনিকা - খুঁজে নিতে দাও সেই আনন্দের হারানো কণিকা। কবে সে যে এসেছিল আমার হৃদয়ে যুগান্তরে গোধূলিবেলার পান্থ জনশূন্য এ মোর প্রান্তরে লয়ে তার ভীরু দীপশিখা! দিগন্তের কোন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষুদ্র অনন্ত
অনন্ত দিবসরাত্রি কালের উচ্ছ্বাস — তারি মাঝখানে শুধু একটি নিমেষ , একটি মধুর সন্ধ্যা , একটু বাতাস , মৃদু আলো – আঁধারের মিলন – আবেশ — তারি মাঝখানে শুধু একটুকু জুঁই একটুকু হাসিমাখা সৌরভের লেশ , একটু অধর ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খড়দয়ে যেতে যদি সোজা এস খুল্না
খড়দয়ে যেতে যদি সোজা এস খুল্না যত কেন রাগ কর, কে বলে তা ভুল না। মালা গাঁথা পণ ক’রে আন যদি আমড়া, রাগ করে বেত মেরে ফাটাও-না চামড়া, তবুও বলতে হবে– ও জিনিস ফুল না। বেঞ্চিতে বসে তুমি বল যদি “দোল দাও’, চটে-...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (তৃতীয় সর্গ)
‘যমুনার জল করে থল্ থল্ কলকলে গাহি প্রেমের গান। নিশার আঁচোলে পড়ে ঢোলে ঢোলে সুধাকর খুলি হৃদয় প্রাণ! বহিছে মলয় ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, নুয়ে নুয়ে পড়ে কুসুমরাশি! ধীরি ধীরি ধীরি ফুলে ফুলে ফিরি মধুকরী প্র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ন্যায়দণ্ড
তোমার ন্যায়ের দণ্ড প্রত্যেকের করে অর্পণ করেছ নিজে। প্রত্যেকের ’পরে দিয়েছ শাসনভার হে রাজাধিরাজ। সে গুরু সম্মান তব সে দুরূহ কাজ নমিয়া তোমারে যেন শিরোধার্য করি সবিনয়ে। তব কার্যে যেন নাহি ডরি কভু কারে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে, এখন তুমি যা খুশি তাই করো। এমনি যদি বিরাজ' অন্তরে বাহির হতে সকলই মোর হরো। সব পিপাসার যেথায় অবসান সেথায় যদি পূর্ণ করো প্রাণ, তাহার পরে মরুপথের মাঝে উঠে রৌদ্র উঠুক খরতর। এই যে খ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গত দিবসের ব্যর্থ প্রাণের
গত দিবসের ব্যর্থ প্রাণের যত ধুলা, যত কালি, প্রতি উষা দেয় নবীন আশার আলো দিয়ে প্রক্ষালি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাষের সময়ে
চাষের সময়ে যদিও করি নি হেলা। ভুলিয়া ছিলাম ফসল কাটার বেলা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে
ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে, তাই হেরো আজি তোমার সর্বাঙ্গ ঘেরি পুলকিছে শ্যাম শস্পরাজি প্রস্ফুটিত পুষ্পজালে; বনস্পতি শত বরষার আনন্দবর্ষণকাব্য লিখিতেছে পত্রপুঞ্জে তার বল্কলে শৈবালে জটে; সুদুর্গম তোমার শিখ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির পাঁচ বোন থাকে কাল্নায়, শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়, হাঁড়িগুলো রাখে আল্নায়। কোনো দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে নিজে থাকে তারা লোহাসিন্দুকে, টাকাকড়িগুলো হাওয়া খাবে ব’লে রেখে দেয় খোলা জা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খুদিরাম ক’সে টান
খুদিরাম ক’সে টান দিল থেলো হুঁকোতে– গেল সারবান কিছু অন্তরে ঢুকোতে। অবশেষে হাঁড়ি শেষ করি রসগোল্লার রোদে বসে খুদুবাবু গান ধরে মোল্লার; বলে, “এতখানি রস দেহ থেকে চুকোতে হবে তাকে ধোঁয়া দিয়ে সাত দিন শুকোতে।’...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি
সম্মুখে রয়েছে পড়ি যুগ - যুগান্তর । অসীম নীলিমে লুটে ধরণী ধাইবে ছুটে , প্রতিদিন আসিবে , যাইবে রবিকর । প্রতিদিন প্রভাতে জাগিবে নরনারী , প্রতিসন্ধ্যা শ্রান্তদেহে ফিরিয়া আসিবে গেহে , প্রতিরাত্রে তারকা ফুট...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পক্ষীমানব
যন্ত্রদানব, মানবে করিলে পাখি। স্থল জল যত তার পদানত আকাশ আছিল বাকি। বিধাতার দান পাখিদের ডানাদুটি। রঙের রেখায় চিত্রলেখায় আনন্দ উঠে ফুটি; তারা যে রঙিন পান্থ মেঘের সাথি। নীল গগনের মহাপবনের যেন তারা একজা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পদ্মায়
আমার নৌকো বাঁধা ছিল পদ্মানদীর পারে, হাঁসের পাঁতি উড়ে যেত মেঘের ধারে ধারে-- জানিনে মন-কেমন-করা লাগত কী সুর হাওয়ার আকাশ বেয়ে দূর দেশেতে উদাস হয়ে যাওয়ার। কী জানি সেই দিনগুলি সব কোন্ আঁকিয়ের লেখা, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গানের জাল
দেবে তুমি কখন নেশায় পেয়ে আপন-মনে যাও চলে গান গেয়ে। যে আকাশের সুরের লেখা লেখ কুঝি না তা, কেবল রহি চেয়ে। হৃদয় আমার অদৃশ্যে যায় চলে, প্রতিদিনের ঠিকঠিকানা ভোলে- মৌমাছিরা আপনা হারায় যেন গন্ধের পথ বে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খুব তার বোলচাল
খুব তার বোলচাল, সাজ ফিট্ফাট্, তক্রার হলে আর নাই মিট্মাট্। চশমায় চম্কায়, আড়ে চায় চোখ– কোনো ঠাঁই ঠেকে নাই কোনো বড়ো লোক।– (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেলা
তোমার কটি - তটের ধটি কে দিল রাঙিয়া । কোমল গায়ে দিল পরায়ে রঙিন আঙিয়া । বিহানবেলা আঙিনাতলে এসেছ তুমি কী খেলাছলে , চরণ দুটি চলিতে ছুটি পড়িছে ভাঙিয়া । তোমার কটি - তটের ধটি কে দিল রাঙিয়া । কিসের সুখে সহাস ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেলেনা
ভাবে শিশু, বড়ো হলে শুধু যাবে কেনা বাজার উজাড় করি সমস্ত খেলেনা। বড়ো হলে খেলা যত ঢেলা বলি মানে, দুই হাত তুলে চায় ধনজন-পানে। আরো বড়ো হবে না কি যবে অবহেলে ধরার খেলার হাট হেসে যাবে ফেলে? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিদ্রিতার চিত্র
মায়ায় রয়েছে বাঁধা প্রদোষ – আঁধার ; চিত্রপটে সন্ধ্যাতারা অস্ত নাহি যায় । এলাইয়া ছড়াইয়া গুচ্ছ কেশভার বাহুতে মাথাটি রেখে রমণী ঘুমায় । চারি দিকে পৃথিবীতে চিরজাগরণ , কে ওরে পাড়ালে ঘুম তারি মাঝখানে ! কোথা হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিজের ও সাধারণের
চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথিক আমি
পথিক আমি। পথ চলতে চলতে দেখেছি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ আজ কীর্তি-নিঃস্ব। দেখেছি দর্পোদ্ধত প্রতাপের অবমানিত ভগ্নশেষ, তার বিজয় নিশান বজ্রাঘাতে হঠাৎ স্তব্ধ অট্টহাসির মতো গেছে উড়ে; বিরাট অহংকার হয়েছে সাষ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পদ্মের পাতা পেতে অাছে অঞ্জলি
পদ্মের পাতা পেতে অাছে অঞ্জলি রবির করের লিখন ধরিবে বলি। সায়াহে রবি অস্তে নামিবে যবে সে ক্ষণলিখন তখন কোথায় রবে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ
আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান! না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ। জাগিয়া উঠেছে প্রাণ, ওরে উথলি উঠেছে বারি, ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অদৃশ্য কারণ
রজনী গোপনে বনে ডালপালা ভ’রে কুঁড়িগুলি ফুটাইয়া নিজে যায় স’রে। ফুল জাগি বলে, মোরা প্রভাতের ফুল— মুখর প্রভাত বলে, নাহি তাহে ভুল। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘন কাঠিন্য রচিয়া শিলাস্তূপে
ঘন কাঠিন্য রচিয়া শিলাস্তূপে দূর হতে দেখি আছে দুর্গমরূপে। বন্ধুর পথ করিনু অতিক্রম— নিকটে আসিনু, ঘুচিল মনের ভ্রম। আকাশে হেথায় উদার আমন্ত্রণ, বাতাসে হেথায় সখার আলিঙ্গন, অজানা প্রবাসে যেন চিরজানা বাণী ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ্যাতি আছে সুন্দরী বলে তার
খ্যাতি আছে সুন্দরী বলে তার, ত্রুটি ঘটে নুন দিতে ঝোলে তার; চিনি কম পড়ে বটে পায়সে স্বামী তবু চোখ বুজে খায় সে– যা পায় তাহাই মুখে তোলে তার, দোষ দিতে মুখ নাহি খোলে তার। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খোকার রাজ্য
খোকার মনের ঠিক মাঝখানটিতে আমি যদি পারি বাসা নিতে— তবে আমি একবার জগতের পানে তার চেয়ে দেখি বসি সে নিভৃতে। তার রবি শশী তারা জানি নে কেমনধারা সভা করে আকাশের তলে, আমার খোকার সাথে গোপনে দিবসে রাতে শুনেছি তা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খোকা
খোকার চোখে যে ঘুম আসে সকল - তাপ - নাশা — জান কি কেউ কোথা হতে যে করে সে যাওয়া - আসা । শুনেছি রূপকথার গাঁয়ে জোনাকি - জ্বলা বনের ছায়ে দুলিছে দুটি পারুল - কুঁড়ি , তাহারি মাঝে বাসা — সেখান থেকে খোকার চোখে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অল্প জানা ও বেশি জানা
তৃষিত গর্দভ গেল সরোবরতীরে, ‘ছিছি কালো জল!’ বলি চলি এল ফিরে। কহে জল, জল কালো জানে সব গাধা, যে জন অধিক জানে বলে জল সাদা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গদ্য ও পদ্য
শর কহে, আমি লঘু, গুরু তুমি গদা, তাই বুক ফুলাইয়া খাড়া আছ সদা। করো তুমি মোর কাজ, তর্ক যাক চুকে— মাথা ভাঙা ছেড়ে দিয়ে বেঁধো গিয়ে বুকে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গরজের আত্মীয়তা
কহিল ভিক্ষার ঝুলি টাকার থলিরে, আমরা কুটুম্ব দোঁহে ভুলে গেলি কি রে? থলি বলে, কুটুম্বিতা তুমিও ভুলিতে আমার যা আছে গেলে তোমার ঝুলিতে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘন্টা বাজে দূরে
ঘন্টা বাজে দূরে। শহরের অভ্রভেদী আত্মঘোষণার মুখরতা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল, আতপ্ত মাঘের রৌদ্রে অকারণে ছবি এল চোখে জীবনযাত্রার প্রান্তে ছিল যাহা অনতিগোচর। গ্রামগুলি গেঁথে গেঁথে মেঠো পথ গেছে দূর-পানে নদীর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গব্বুরাজার পাতে ছাগলের কোর্মাতে
গব্বুরাজার পাতে ছাগলের কোর্মাতে যবে দেখা গেল তেলা- পোকাটা রাজা গেল মহা চ’টে, চীৎকার করে ওঠে,– “খানসামা কোথাকার বোকাটা।’ মন্ত্রী জুড়িয়া পাণি কহে, “সবই এক প্রাণী।’ রাজার ঘুচিয়া গেল ধোঁকাটা। জীবের শিবের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এখনো অঙ্কুর যাহা
এখনো অঙ্কুর যাহা তারি পথ-পানে প্রত্যহ প্রভাতে রবি আশীৰ্বাদ আনে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন যুগের প্রত্যুষে কোন্
নূতন যুগের প্রত্যুষে কোন্ প্রবীণ বুদ্ধিমান নিত্যই শুধু সূক্ষ্ম বিচার করে— যাবার লগ্ন, চলার চিন্তা নিঃশেষে করে দান সংশয়ময় তলহীন গহ্বরে। নির্ঝর যথা সংগ্রামে নামে দুর্গম পর্বতে, অচেনার মাঝে ঝাঁপ দিয়ে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিষ্ফল উপহার
নিম্নে আবর্তিয়া ছুটে যমুনার জল-- দুই তীরে গিরিতট, উচ্চ শিলাতল। সংকীর্ণ গুহার পথে মূর্ছি জলধার উন্মত্ত প্রলাপে ওঠে গর্জি অনিবার। এলায়ে জটিল বক্র নির্ঝরের বেণী নীলাভ দিগন্তে ধায় নীল গিরিশ্রেণী। স্থির...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপন শোভার মূল্য
আপন শোভার মূল্য পুষ্প নাহি বোঝে, সহজে পেয়েছে যাহা দেয় তা সহজে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে
১ গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে, নিভৃত নিরালা ঠাঁই, লেশমাত্র আলো নাই, লুকানো এ প্রেমসাধ গোপনে নিবসে, শুদ্ধ যবে ভালোবাসা নয়নে তোমার, ঈষৎ প্রদীপ্ত হয়, উচ্ছ্বসয়ে এ-হৃদয়, ভয়ে ভয়ে জড়সড় তখনি আবার। ২ শূন্য এই মরমে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চালক
অদৃষ্টরে শুধালেম, চিরদিন পিছে অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে? সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে
চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে; বাজে লেখা, বাজে পড়া, দিন কাটে মিথ্যা বাজে ছলে। যে গুণী কাটাতে পারে বেলা তার বিনা আবশ্যকে তারে “এসো এসো” ব’লে যত্ন ক’রে বসাই বৈঠকে। কেজো লোকদের করি ভয়, কব্জিতে ঘড়ি বেঁধে শক্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিঠি
শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু স্টীমার ‘ রাজহংস ' । গঙ্গা চিঠি লিখব কথা ছিল , দেখছি সেটা ভারি শক্ত । তেমন যদি খবর থাকে লিখতে পারি তক্ত তক্ত । খবর বয়ে বেড়ায় ঘুরে খবরওয়ালা ঝাঁকা-মুটে । আমি বাপু ভাবের ভক্ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাহিছ বারে বারে
চাহিছ বারে বারে আপনারে ঢাকিতে— মন না মানে মানা, মেলে ডানা আঁখিতে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
ওগো কে যায় বাঁশরি বাজায়ে ! আমার ঘরে কেহ নাই যে ! তারে মনে পড়ে যারে চাই যে ! তার আকুল পরান বিরহের গান বাঁশি বুঝি গেল জানায়ে ! আমি আমার কথা তারে জানাব কী করে , প্রাণ কাঁদে মোর তাই যে ! কুসুমের মালা গাঁথ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানবপুত্র
মৃত্যুর পাত্রে খৃস্ট যেদিন মূত্যুহীন প্রাণ উৎসর্গ করলেন রবাহূত অনাহূতের জন্যে, তার পরে কেটে গেছে বহু শত বৎসর। আজ তিনি একবার নেমে এলেন নিত্যধাম থেকে মর্তধামে। চেয়ে দেখলেন, সেকালেও মানুষ ক্ষতবিক্ষত হত য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাছগুলি মুছে-ফেলা
গাছগুলি মুছে-ফেলা, গিরি ছায়া-ছায়া— মেঘে আর কুয়াশায় রচে একি মায়া। মুখঢাকা ঝরনার শুনি আকুলতা— সব যেন বিধাতার চুপিচুপি কথা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাছের পাতায় লেখন লেখে
গাছের পাতায় লেখন লেখে বসন্তে বর্ষায়— ঝ'রে পড়ে, সব কাহিনী ধুলায় মিশে যায়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গহির নীদমে
গহির নীদমে বিবশ শ্যাম মম, অধরে বিকশত হাস, মধুর বদনমে মধুর ভাব অতি কিয়ে পায় পরকাশ ! চুম্বনু শত শত চন্দ্ৰ বদন রে, তবহুঁ ন পূরল আশ, অতি ধীরে ময় হৃদয়ে রাখনু নহি নহি মিটল তিয়াষ। শ্যাম, সুখে তুঁহু নীদ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাছ দেয় ফল
গাছ দেয় ফল ঋণ ব'লে তাহা নহে। নিজের সে দান নিজেরি জীবনে বহে। পথিক আসিয়া লয় যদি ফলভার প্রাপ্যের বেশি সে সৌভাগ্য তার। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাস্টার বলে
মাস্টার বলে, “তুমি দেবে ম্যাট্রিক, এক লাফে দিতে চাও হবে না সে ঠিক। ঘরে দাদামশায়ের দেখো example, সত্তর বৎসরও হয়নিকো ample। একদা পরীক্ষায় হবে উত্তীর্ণ যখন পাকবে চুল, হাড় হবে জীর্ণ।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আগমনী
সুধীরে নিশার আঁধার ভেদিয়া ফুটিল প্রভাততারা। হেথা হোথা হতে পাখিরা গাহিল ঢালিয়া সুধার ধারা। মৃদুল প্রভাতসমীর পরশে কমল নয়ন খুলিল হরষে, হিমালয় শিরে অমল আভায় শোভিল ধবল তুষারজটা। খুলি গেল ধীরে পূরবদ্বা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসম্ভব ভালো
যথাসাধ্য-ভালো বলে, ওগো আরো-ভালো, কোন্ স্বর্গপুরী তুমি ক’রে থাকো আলো। আরো-ভালো কেঁদে কহে, আমি থাকি হায়, অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরিবর্তনীয়
এক যদি আর হয় কী ঘটিবে তবে? এখনো যা হয়ে থাকে, তখনো তা হবে। তখন সকল দুঃখ ঘোচে যদি ভাই, এখন যা সুখ আছে দুঃখ হবে তাই। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান দিয়ে যে তোমায়
গান দিয়ে যে তোমায় খুঁজি বাহির মনে চিরদিবস মোর জীবনে। নিয়ে গেছে গান আমারে ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে, গান দিয়ে হাত বুলিয়ে বেড়াই এই ভুবনে। কত শেখা সেই শেখালো, কত গোপন পথ দেখালো, চিনিয়ে দিল কত তারা হৃদ্গগনে।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গানগুলি মোর বিষে ঢালা
গানগুলি মোর বিষে ঢালা কী হবে আর তাহা বই? ফুটন্ত এ প্রাণের মাঝে বিষ ঢেলেছে বিষময়ী! গানগুলি মোর বিষেঢালা, কী হবে আর তাহা বই? বুকের মধ্যে সর্প আছে, তুমিও সেথা আছে অয়ি! Heinrich Hein (অনুবাদ কবিতা)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান গাওয়ালে আমায়
গান গাওয়ালে আমায় তুমি কতই ছলে যে, কত সুখের খেলায়, কত নয়নজলে হে। ধরা দিয়ে দাও না ধরা, এস কাছে, পালাও ত্বরা, পরান কর ব্যথায় ভরা পলে পলে হে। গান গাওয়ালে এমনি করে কতই ছলে যে। কত তীব্র তারে, তোমার বীণা সাজ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গানভঙ্গ
গাহিছে কাশীনাথ নবীন যুবা, ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি, কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর সাতটি যেন পোষা পাখি; শানিত তরবারি গলাটি যেন নাচিয়া ফিরে দশ দিকে--- কখন কোথা যায় না পাই দিশা, বিজুলি-হেন ঝিকিমিকে। আপনি গড়ি তো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান আরম্ভ
চারি দিকে খেলিতেছে মেঘ , বায়ু আসি করিছে চুম্বন -- সীমাহারা নভস্তল দুই বাহু পসারিয়া হৃদয়ে করিছে আলিঙ্গন । অনন্ত এ আকাশের কোলে টলমল মেঘের মাঝার এইখানে বাঁধিয়াছি ঘর তোর তরে কবিতা আমার ! যবে আমি আসিব ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথহারা
আজকে আমি কতদূর যে গিয়েছিলেম চলে ! যত তুমি ভাবতে পারো তার চেয়ে সে অনেক আরো , শেষ করতে পারব না তা তোমায় ব'লে ব'লে । অনেক দূর সে , আরো দূর সে , আরো অনেক দূর । মাঝখানেতে কত যে বেত , কত যে বাঁশ , কত যে খেত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাসিক হইতে খুড়ার পত্র
কলকত্তামে চলা গয়ো রে সুরেনবাবু মেরা, সুরেনবাবু, আসল বাবু, সকল বাবুকো সেরা। খুড়া সাবকো কায়কো নহি পতিয়া ভেজো বাচ্ছা-- মহিনা-ভর্ কুছ খবর মিলে না ইয়ে তো নহি আচ্ছা! টপাল্, টপাল্, কঁহা টপাল্রে, কপা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গিন্নির কানে শোনা ঘটে অতি সহজেই
গিন্নির কানে শোনা ঘটে অতি সহজেই “গিনি সোনা এনে দেব’ কানে কানে কহ যেই। না হলে তোমারি কানে দুর্গ্রহ টেনে আনে, অনেক কঠিন শোনা– চুপ করে রহ যেই।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান্ধারীর আবেদন
দুর্যোধন। প্রণমি চরণে তাত! ধৃতরাষ্ট্র। ওরে দুরাশয়, অভীষ্ট হয়েছে সিদ্ধ? দুর্যোধন। লভিয়াছি জয়। ধৃতরাষ্ট্র। এখন হয়েছ সুখী? দুর্যোধন। হয়েছি বিজয়ী। ধৃতরাষ্ট্র। অখণ্ড রাজত্ব জিনি সুখ তোর কই রে দুর্মত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গালির ভঙ্গি
লাঠি গালি দেয়, ছড়ি, তুই সরু কাঠি! ছড়ি তারে গালি দেয়, তুমি মোটা লাঠি! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গায়ে আমার পুলক লাগে
গায়ে আমার পুলক লাগে, চোখে ঘনায় ঘোর, হৃদয়ে মোর কে বেঁধেছে রাঙা রাখীর ডোর। আজিকে এই আকাশতলে জলে স্থলে ফুলে ফলে কেমন করে মনোহরণ ছড়ালে মন মোর। কেমন খেলা হল আমার আজি তোমার সনে। পেয়েছি কি খুঁজে বেড়াই ভেবে ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গিরিবক্ষ হতে আজি
গিরিবক্ষ হতে আজি ঘুচুক কুজ্ঝটি-আবরণ, নূতন প্রভাতসূর্য এনে দিক্ নবজাগরণ। মৌন তার ভেঙে যাক, জ্যোতির্ময় ঊর্ধ্ব লোক হতে বাণীর নির্ঝরধারা প্রবাহিত হোক শতস্রোতে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীহারিকা
বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে তমালছায়াতলে, সজনে গাছের ডাল পড়েছে নুয়ে দিঘির প্রান্তজলে। অস্তরবির-পথ-তাকানো মেঘে কালোর বুকে আলোর বেদন লেগে-- কেন এমন খনে কে যেন সে উঠল হঠাৎ জেগে আমার শূন্য মনে। "কে গো তু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনেক মালা গেঁথেছি মোর
অনেক মালা গেঁথেছি মোর কুঞ্জতলে, সকালবেলার অতিথিরা পরল গলে। সন্ধেবেলা কে এল আজ নিয়ে ডালা। গাঁথব কি হায় ঝরা পাতায় শুকনো মালা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাখিওয়ালা বলে এটা কালোরঙ চন্দনা
পাখিওয়ালা বলে, “এটা কালোরঙ চন্দনা।’ পানুলাল হালদার বলে, “আমি অন্ধ না– কাক ওটা নিশ্চিত, হরিনাম ঠোঁটে নাই।’ পাখিওয়ালা বলে, “বুলি ভালো করে ফোটে নাই– পারে না বলিতে বাবা, কাকা নামে বন্দনা।’ (খাপছাড়া কাব্যগ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবরুদ্ধ ছিল বায়ু
অবরুদ্ধ ছিল বায়ু; দৈত্য সম পুঞ্জ মেঘভার ছায়ার প্রহরীব্যূহে ঘিরে ছিল সূর্যের দুয়ার; অভিভূত আলোকের মূর্ছাতুর ম্লান অসম্মানে দিগন্ত আছিল বাষ্পাকুল। যেন চেয়ে ভূমিপানে অবসাদে-অবনত ক্ষীণশ্বাস চির প্রাচী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাধব না কহ আদরবাণী
মাধব , না কহ আদরবাণী , না কর প্রেমক নাম । জানয়ি মুঝকো অবলা সরলা ছলনা না কর শ্যাম । কপট , কাহ তুঁহু ঝূট বোলসি , পীরিত করসি তু মোয় ? ভালে ভালে হম অলপে চিহ্ননু , না পতিয়াব রে তোয় । ছিদল তরীসম কপট প্র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিচয় (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
একদিন দেখিলাম উলঙ্গ সে ছেলে ধুলি-’পরে বসে আছে পা-দুখানি মেলে। ঘাটে বসি মাটি ঢেলা লইয়া কুড়ায়ে দিদি মাজিতেছে ঘটি ঘুরায়ে ঘুরায়ে। অদূরে কোমললোম ছাগবৎস ধীরে চরিয়া ফিরিতেছিল নদী-তীরে-তীরে। সহসা সে কাছে আসি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পড়েছি আজ রেখার মায়ায়
শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কল্যাণীয়েষু ১ পড়েছি আজ রেখার মায়ায়। কথা ধনীঘরের মেয়ে, অর্থ আনে সঙ্গে করে, মুখরার মন রাখতে চিন্তা করতে হয় বিস্তর। রেখা অপ্রগল্ভা, অর্থহীনা, তার সঙ্গে আমার যে ব্যবহার ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না। এবার হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বোসো, কেউ জানবে না, কেউ বলবে না। বিশ্বে তোমার লুকোচুরি, দেশ বিদেশে কতই ঘুরি - এবার বলো আমার মনের কোণে দেবে ধরা, ছলবে না। আড়াল দিয়ে লুকিয...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবর্জিত
আমি চলে গেলে ফেলে রেখে যাব পিছু চিরকাল মনে রাখিবে, এমন কিছু, মূঢ়তা করা তা নিয়ে মিথ্যে ভেবে। ধুলোর খাজনা শোধ করে নেবে ধুলো, চুকে গিয়ে তবু বাকি রবে যতগুলো গরজ যাদের তারাই তা খুঁজে নেবে। আমি শুধু ভাবি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্রুবাণি তস্য নশ্যন্তি
রাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা সূর্য নাহি ফেরে, শুধু ব্যর্থ হয় তারা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশীর্বাদ
ইহাদের করো আশীর্বাদ। ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি, নন্দনের এনেছে সম্বাদ, ইহাদের করো আশীর্বাদ। ছোটো ছোটো হাসিমুখ জানে না ধরার দুখ, হেসে আসে তোমাদের দ্বারে। নবীন নয়ন তুলিকৌতুকেতে দুলি দুলি চেয়ে চেয়ে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাষাণী মা
হে ধরণী , জীবের জননী , শুনেছি যে মা তোমায় বলে , তবে কেন তোর কোলে সবে কেঁদে আসে , কেঁদে যায় চলে । তবে কেন তোর কোলে এসে সন্তানের মেটে না পিয়াসা । কেন চায় , কেন কাঁদে সবে , কেন কেঁদে পায় না ভালোবাসা । কে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিছে ডাক'–মন বলে, আজ না
মিছে ডাক'–মন বলে, আজ না— গেল উৎসবরাতি, ম্লান হয়ে এল বাতি, বাজিল বিসর্জন-বাজনা। সংসারে যা দেবার মিটিয়ে দিমু এবার, চুকিয়ে দিয়েছি তার খাজনা। শেষ আলো, শেষ গান, জগতের শেষ দান নিয়ে যাব—আজ কোনো কাজ না। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাগকুমারী
আমি যখন ছোটো ছিলুম, ছিলুম তখন ছোটো; আমার ছুটির সঙ্গী ছিল ছবি আঁকার পোটো। বাড়িটা তার ছিল বুঝি শঙ্খী নদীর মোড়ে, নাগকন্যা আসত ঘাটে শাঁখের নৌকো চ'ড়ে। চাঁপার মতো আঙুল দিয়ে বেণীর বাঁধন খুলে ঘন কালো চুলের গু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্পষ্ট
আজি ফাল্গুনে দোলপূর্ণিমারাত্রি, উপছায়া-চলা বনে বনে মন আবছা পথের যাত্রী। ঘুম-ভাঙানিয়া জোছনা-- কোথা থেকে যেন আকাশে কে বলে, "একটুকু কাছে বোসো না।' ফিস্ফিস্ করে পাতায় পাতায়, উস্খুস্ করে হাওয়া। ছা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথের বাঁধন
পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী। রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল, ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে দিগঙ্গনার নৃত্য, হঠাৎ-আলোর ঝল্কানি লেগে ঝলমল করে চিত্ত। নাই আমাদের কনকচ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৪০০ সাল
আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে-- আজি হতে শতবর্ষ পরে। আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের লেশমাত্র ভাগ-- আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান, আজিকার কোনো রক্তরাগ অনুরাগে সিক্ত ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশতলে উঠল ফুটে
আকাশতলে উঠল ফুটে আলোর শতদল। পাপড়িগুলি থরে থরে ছড়ালো দিক্-দিগন্তরে, ঢেকে গেলো অন্ধকারের নিবিড় কালো জল। মাঝখানেতে সোনার কোষে আনন্দে, ভাই, আছি বসে - আমায় ঘিরে ছড়ায় ধীরে আলোর শতদল। আকাশেতে ঢেউ দিয়ে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইঁটের গাদার নিচে
ইঁটের গাদার নিচে ফটকের ঘড়িটা। ভাঙা দেয়ালের গায়ে হেলে-পড়া কড়িটা। পাঁচিলটা নেই, আছে কিছু ইঁট সুরকি। নেই দই সন্দেশ, আছে খই মুড়কি। ফাটা হুঁকো আছে হাতে, গেছে গড়গড়িটা। গলায় দেবার মতো বাকি আছে দড়িটা। (খাপছাড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পল্লীগ্রামে
হেথায় তাহারে পাই কাছে — যত কাছে ধরাতল , যত কাছে ফুলফল — যত কাছে বায়ু জল আছে । যেমন পাখির গান , যেমন জলের তান , যেমনি এ প্রভাতের আলো , যেমনি এ কোমলতা , অরণ্যের শ্যামলতা , তেমনি তাহারে বাসি ভালো । যেমন ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাবার মতো হয় নি কোনো গান
গাবার মতো হয় নি কোনো গান, দেবার মতো হয় নি কিছু দান। মনে যে হয় সবি রইল বাকি তোমায় শুধু দিয়ে এলেম ফাঁকি, কবে হবে জীবন পূর্ণ করে এই জীবনের পূজা অবসান। আর-সকলের সেবা করি যত প্রাণপণে দিই অর্ঘ্য ভরি ভরি। সত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গুপ্তিপাড়ায় জন্ম তাহার
গুপ্তিপাড়ায় জন্ম তাহার; নিন্দাবাদের দংশনে অভিমানে মরতে গেল মোগলসরাই জংসনে। কাছা কোঁচা ঘুচিয়ে গুপি ধরল ইজের, পরল টুপি, দু হাত দিয়ে লেগে গেল কোফ্তা-কাবাব-ধ্বংসনে। গুরুপুত্র সঙ্গে ছিল– বললে তারে, “অংশ ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ্রহণে ও দানে
কৃতাঞ্জলি কর কহে, আমার বিনয়, হে নিন্দুক, কেবল নেবার বেলা নয়। নিই যবে নিই বটে অঞ্জলি জুড়িয়া, দিই যবে সেও দিই অঞ্জলি পুরিয়া। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে। এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভ'রে। না চাহিতে মোরে যা করেছ দান আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ, দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহাদানেরই যোগ্য করে অতি-ইচ্ছার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরাজিতা ফুটিল
অপরাজিতা ফুটিল, লতিকার গর্ব নাহি ধরে— যেন পেয়েছে লিপিকা আকাশের আপন অক্ষরে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এক-তরফা হিসাব
সাতাশ, হলে না কেন এক-শো সাতাশ, থলিটি ভরিত, হাড়ে লাগিত বাতাস। সাতাশ কহিল, তাহে টাকা হত মেলা, কিন্তু কী করিতে বাপু বয়সের বেলা? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অন্য মা
আমার মা না হয়ে তুমি আর - কারো মা হলে ভাবছ তোমায় চিনতেম না , যেতেম না ঐ কোলে ? মজা আরো হত ভারি , দুই জায়গায় থাকত বাড়ি , আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে , তুমি পারের গাঁয়ে । এইখানেতেই দিনের বেলা যা - কিছু সব হত খ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপমান-বর
ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে। কুটির তাহার ঘিরিয়া দাঁড়ালো লাখো নরনারী এসে। কেহ কহে 'মোর রোগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহো', সন্তান লাগি করে কাঁদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ। কেহ বলে 'তব দৈব ক্ষম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপমানিত
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। মানুষের পরশের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অত চুপি চুপি কেন কথা কও
অত চুপি চুপি কেন কথা কও ওগো মরণ, হে মোর মরণ। অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও, ওগো একি প্রণয়েরি ধরন। যবে সন্ধ্যাবেলায় ফুলদল পড়ে ক্লান্ত বৃন্তে নমিয়া, যবে ফিরে আসে গোঠে গাভীদল সারা দিনমান মাঠে ভ্রমিয়া, তুমি পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অণুকাব্য
(১) স্বপ্ন আমার জোনাকি , দীপ্ত প্রাণের মণিকা , স্তব্ধ আঁধার নিশীথে উড়িছে আলোর কণিকা ॥ (২) আমার লিখন ফুটে পথধারে ক্ষণিক কালের ফুলে , চলিতে চলিতে দেখে যারা তারে চলিতে চলিতে ভুলে ॥ (৩) প্রজাপতি সেতো বরষ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার পাচকবর গদাধর মিশ্র
আমার পাচকবর গদাধর মিশ্র, তারি ঘরে দেখি মোর কুন্তলবৃষ্য। কহিনু তাহারে ডেকে,– “এ শিশিটা এনেছে কে, শোভন করিতে চাও হেঁশেলের দৃশ্য?’ সে কহিল, “বরিষার এই ঋতু; সরিষার কহে, “কাঠমুণ্ডার নেপালের গুণ্ডার এই তেলে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নম্রতা
কহিল কঞ্চির বেড়া, ওগো পিতামহ বাঁশবন, নুয়ে কেন পড় অহরহ? আমরা তোমারি বংশে ছোটো ছোটো ডাল, তবু মাথা উঁচু করে থাকি চিরকাল। বাঁশ কহে, ভেদ তাই ছোটোতে বড়োতে, নত হই, ছোটো নাহি হই কোনোমতে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গুণজ্ঞ
আমি প্রজাপতি ফিরি রঙিন পাখায়, কবি তো আমার পানে তবু না তাকায়। বুঝিতে না পারি আমি, বলো তো ভ্রমর, কোন্ গুণে কাব্যে তুমি হয়েছ অমর। অলি কহে, আপনি সুন্দর তুমি বটে, সুন্দরের গুণ তব মুখে নাহি রটে। আমি ভাই মধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গীতোচ্ছ্বাস
নীরব বাঁশরিখানি বেজেছে আবার । প্রিয়ার বারতা বুঝি এসেছে আমার বসন্তকানন-মাঝে বসন্তসমীরে । তাই বুঝি মনে পড়ে ভোলা গান যত । তাই বুঝি ফুলবনে জাহ্নবীর তীরে পুরাতন হাসিগুলি ফুটে শত শত । তাই বুঝি হৃদয়ের বিস্মৃ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘাসি কামারের বাড়ি
ঘাসি কামারের বাড়ি সাঁড়া, গড়েছে মন্ত্রপড়া খাঁড়া। খাপ থেকে বেরিয়ে সে উঠেছে অট্টহেসে; কামার পালায় যত বলে, “দাঁড়া দাঁড়া।’ দিনরাত দেয় তার নাড়ীটাতে নাড়া। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘুমচোরা
কে নিল খোকার ঘুম হরিয়া। মা তখন জল নিতে ও পাড়ার দিঘিটিতে গিয়াছিল ঘট কাঁখে করিয়া।— তখন রোদের বেলা সবাই ছেড়েছে খেলা, ও পারে নীরব চখা-চখীরা; শালিক থেমেছে ঝোপে, শুধু পায়রার খোপে বকাবকি করে সখা-সখীরা; তখন র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘোষালের বক্তৃতা
ঘোষালের বক্তৃতা করা কর্তব্যই, বেঞ্চি চৌকি আদি আছে সব দ্রব্যই। মাতৃভূমির লাগি পাড়া ঘুরে মরেছে, একশো টিকিট বিলি নিজ হাতে করেছে। চোখ বুজে ভাবে, বুঝি এল সব সভ্যই। চোখ চেয়ে দেখে, বাকি শুধু নিরেনব্বই। (খাপছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘরের খেয়া
সন্ধ্যা হয়ে আসে; সোনা-মিশোল ধূসর আলো ঘিরল চারিপাশে। নৌকোখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে অস্তরবির কাছে নয়ন কী যেন ধন মাঙে। আপন গাঁয়ে কুটীর আমার দূরের পটে লেখা, ঝাপসা আভায় যাচ্ছে দেখা বেগনি রঙের রেখ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরনবীনতা
দিনান্তের মুখ চুম্বি রাত্রি ধীরে কয়— আমি মৃত্যু তোর মাতা, নাহি মোরে ভয়। নব নব জন্মদানে পুরাতন দিন আমি তোরে ক’রে দিই প্রত্যহ নবীন। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশার সীমা
সকল আকাশ , সকল বাতাস , সকল শ্যামল ধরা , সকল কান্তি , সকল শান্তি সন্ধ্যাগগন - ভরা , যত - কিছু সুখ যত সুধামুখ , যত মধুমাখা হাসি , যত নব নব বিলাসবিভব , প্রমোদমদিরারাশি , সকল পৃথ্বী , সকল কীর্তি , সকল অর্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চলার পথের যত বাধা
চলার পথের যত বাধা পথবিপথের যত ধাঁধা পদে পদে ফিরে ফিরে মারে, পথের বীণার তারে তারে তারি টানে সুর হয় বাঁধা। রচে যদি দুঃখের ছন্দ দুঃখের-অতীত আনন্দ তবেই রাগিণী হবে সাধা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চপলারে আমি অনেক ভাবিয়া
চপলারে আমি অনেক ভাবিয়া দূরেতে রাখিয়া এলেম তারে, রূপ-ফাঁদ হতে পালাইতে তার, প্রণয়ে ডুবাতে মদিরা-ধারে। এত দূরে এসে বুঝিনু এখন এখনো ঘুচে নি প্রণয়-ঘোর, মাথায় যদিও চড়েছে মদিরা প্রণয় রয়েছে হৃদয়ে মোর। যুবতীর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চলে যাবে সত্তারূপ
চলে যাবে সত্তারূপ সৃজিত যা প্রাণেতে কায়াতে, রেখে যাবে মায়ারূপ রচিত যা আলোতে ছায়াতে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চরণ
দুখানি চরণ পড়ে ধরণীর গায়, দুখানি অলস রাঙা কোমল চরণ । শত বসন্তের স্মৃতি জাগিছে ধরায়, শতলক্ষ কুসুমের পরশস্বপন । শত বসন্তের যেন ফুটন্ত অশোক ঝরিয়া মিলিয়া গেছে দুটি রাঙা পায় । প্রভাতের প্রদোষের দুটি সূর্যল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চতুর্থ সর্গ
"এ তবে স্বপন শুধু, বিম্বের মতন আবার মিলায়ে গেল নিদ্রার সমুদ্রে! সারারাত নিদ্রার করিনু আরাধনা-- যদি বা আইল নিদ্রা এ শ্রান্ত নয়নে, মরীচিকা দেখাইয়া গেল গো মিলায়ে! হা স্বপ্ন, কি শক্তি তোর, এ হেন মূরতি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া আমার প্রাণ
অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া আমার প্রাণ আকস্মিক চেতনার নিবিড়তায় চঞ্চল হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে, তখন কোন্ কথা জানাতে তার এত অধৈর্য। --যে কথা দেহের অতীত। খাঁচার পাখির কণ্ঠে যে বাণী সে তো কেবল খাঁচারি নয়, তার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অকর্মার বিভ্রাট
লাঙল কাঁদিয়া বলে ছাড়ি দিয়ে গলা, তুই কোথা হতে এলি ওরে ভাই ফলা? যেদিন আমার সাথে তোরে দিল জুড়ি সেই দিন হতে মোর মাথা-খোঁড়াখুঁড়ি। ফলা কহে, ভালো ভাই, আমি যাই খ'সে, দেখি তুমি কী আরামে থাক ঘরে ব'সে। ফলা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অচল স্মৃতি
আমার হৃদয়ভূমি-মাঝখানে জাগিয়া রয়েছে নিতি অচল ধবল শৈল-সমান একটি অচল স্মৃতি । প্রতিদিন ঘিরি ঘিরি সে নীরব হিমগিরি আমার দিবস আমার রজনী আসিছে যেতেছে ফিরি । যেখানে চরণ রেখেছে সে মোর মর্ম গভীরতম — উন্নত শি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অকৃতজ্ঞ
ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে, ধ্বনি কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আসা-যাওয়ার পথ চলেছে
আসা-যাওয়ার পথ চলেছে উদয় হতে অস্তাচলে, কেঁদে হেসে নানান বেশে পথিক চলে দলে দলে। নামের চিহ্ন রাখিতে চায় এই ধরণীর ধুলা জুড়ে, দিন না যেতেই রেখা তাহার ধুলার সাথে যায় যে উড়ে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলোকের অন্তরে যে আনন্দের পরশন পাই
আলোকের অন্তরে যে আনন্দের পরশন পাই, জানি আমি তার সাথে আমার আত্মার ভেদ নাই এক আদি জ্যোতি-উৎস হতে চৈতন্যের পুণ্যস্রোতে আমার হয়েছে অভিষেক, ললাটে দিয়েছে জয়লেখ, জানায়েছে অমৃতের আমি অধিকারী; পরম-আমির সাথে যু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অচেনা
তোমারে আমি কখনো চিনি নাকো, লুকানো নহ, তবু লুকানো থাকো। ছবির মতো ভাবনা পরশিয়া একটু আছ মনেরে হরষিয়া। অনেক দিন দিয়েছ তুমি দেখা, বসেছ পাশে, তবুও আমি একা। আমার কাছে রহিলে বিদেশিনী, লইলে শধু নয়ন মম জিনি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশিষ-গ্রহণ
চলিয়াছি রণক্ষেত্রে সংগ্রামের পথে। সংসারবিপ্লবধ্বনি আসে দূর হতে। বিদায় নেবার আগে, পারি যতক্ষণ পরিপূর্ণ করি লই মোর প্রাণমন নিত্য-উচ্চারিত তব কলকণ্ঠস্বরে উদার মঙ্গলমন্ত্রে—হৃদয়ের ‘পরে লই তব শুভস্পর্শ, কল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনন্ত পথে
বাতায়নে বসি ওরে হেরি প্রতিদিন ছোটো মেয়ে খেলাহীন, চপলতাহীন, গম্ভীর কর্তব্যরত, তৎপরচরণে আসে যায় নিত্যকাজে; অশ্রুভরা মনে ওর মুখপানে চেয়ে হাসি স্নেহভরে। আজি আমি তরী খুলি যাব দেশান্তরে; বালিকাও যাবে কবে কর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনন্ত জীবন
অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ, জনমেছি দু দিনের তরে-- যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে গান গাই আনন্দের ভরে। এ আমার গানগুলি দু দণ্ডের গান রবে না রবে না চিরদিন-- পুরব-আকাশ হতে উঠিবে উচ্ছ্বাস, পশ্চিমেতে হইবে বিল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনন্ত প্রেম
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার। চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার– কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার। যত শুনি সেই অতীত কাহিনী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নবীন অতিথি
ওহে নবীন অতিথি, তুমি নূতন কি তুমি চিরন্তন। যুগে যুগে কোথা তুমি ছিলে সংগোপন। যতনে কত কী আনি বেঁধেছিনু গৃহখানি, হেথা কে তোমারে বলো করেছিল নিমন্ত্রণ। কত আশা ভালোবাসা গভীর হৃদয়তলে ঢেকে রেখেছিনু বুকে, কত হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অভিলাষ
১ জনমনোমুগ্ধকর উচ্চ অভিলাষ! তোমার বন্ধুর পথ অনন্ত অপার । অতিক্রম করা যায় যত পান্থশালা , তত যেন অগ্রসর হতে ইচ্ছা হয় । ২ তোমার বাঁশরি স্বরে বিমোহিত মন — মানবেরা , ওই স্বর লক্ষ্য করি হায় , যত অগ্রসর হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনন্ত মরণ
কোটি কোটি ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে, হাসে খেলে মৃত্যু চারিপাশে। এ ধরণী মরণের পথ, এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ। যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল’ প্রাণ? সে তো শুধু পলক, নিমেষ। অতীতের মৃত ভার পৃষ্ঠেতে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আর আমায় আমি নিজের শিরে বইব না
আর আমায় আমি নিজের শিরে বইব না। আর নিজের দ্বারে কাঙাল হয়ে রইব না। এই বোঝা তোমার পায়ে ফেলে বেড়িয়ে পড়ব অবহেলে– কোনো খবর রাখব না ওর, কোনো কথাই কইব না। আমায় আমি নিজের শিরে বইব না। বাসনা মোর যারেই পরশ করে স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনাবশ্যকের আবশ্যকতা
কী জন্যে রয়েছ, সিন্ধু তৃণশস্যহীন— অর্ধেক জগৎ জুড়ি নাচো নিশিদিন। সিন্ধু কহে, অকর্মণ্য না রহিত যদি ধরণীর স্তন হতে কে টানিত নদী? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশে সোনার মেঘ
আকাশে সোনার মেঘ কত ছবি আঁকে, আপনার নাম তবু লিখে নাহি রাখে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাতুরী
আমার খোকা করে গো যদি মনে এখনি উড়ে পারে সে যেতে পারিজাতের বনে । যায় না সে কি সাধে। মায়ের বুকে মাথাটি থুয়ে সে ভালোবাসে থাকিতে শুয়ে, মায়ের মুখ না দেখে যদি পরান তার কাঁদে। আমার খোকা সকল কথা জানে। কিন্তু ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জাগি রহে চাঁদ
জাগি রহে চাঁদ আকাশে যখন সারাটি রজনী! শ্রান্ত জগত ঘুমে অচেতন সারাটি রজনী! অতি ধীরে ধীরে হৃদে কী লাগিয়া মধুময় ভাব উঠে গো জাগিয়া সারাটি রজনী! ঘুমায়ে তোমারি দেখি গো স্বপন সারাটি রজনী! জাগিয়া তোমারি দেখি গ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জাগিবার চেষ্টা
মা কেহ কি আছ মোর , কাছে এসো তবে , পাশে বসে স্নেহ ক’রে জাগাও আমায় । স্বপ্নের সমাধি – মাঝে বাঁচিয়া কী হবে , যুঝিতেছি জাগিবারে — আঁখি রুদ্ধ হায় , ডেকো না ডেকো না মোরে ক্ষুদ্রতার মাঝে , স্নেহময় আলস্যেতে র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনবচ্ছিন্ন আমি
আজি মগ্ন হয়েছিনু ব্রহ্মাণ্ড‐মাঝারে, যখন মেলিনু আঁখি হেরিনু আমারে। ধরণীর বস্ত্রাঞ্চল দেখিলাম তুলি, আমার নাড়ীর কম্পে কম্পমান ধূলি। অনন্ত আকাশতলে দেখিলাম নামি, আলোকদোলায় বসি দুলিতেছি আমি। আজি গিয়েছিনু চল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনাগতা
এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে, যারা চলে গেছে একেবারে, ফাগুন-মধ্যাহ্নবেলা শিরীষছায়ায় চুপে চুপে তারা ছায়ারূপে আসে যায় হিল্লোলিত শ্যাম দুর্বাদলে। ঘন কালো দিঘিজলে পিছনে-ফিরিয়া-চাওয়া আঁখি জ্বলো জ্বল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনেক তিয়াষে করেছি ভ্ৰমণ
অনেক তিয়াষে করেছি ভ্ৰমণ জীবন কেবলি খোঁজা। অনেক বচন করেছি রচন, জমেছে অনেক বোঝা। যা পাই নি তারি লইয়া সাধনা যাব কি সাগরপার। যা গাই নি তারি বহিয়া বেদনা ছিঁড়িবে বীণার তার? (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার না-বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে
আমার না-বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে তোমার ভাবনা তারার মতন বাজে ॥ নিভৃত মনের বনের ছায়াটি ঘিরে না-দেখা ফুলের গোপন গন্ধ ফিরে, আমার লুকায় বেদনা অঝরা অশ্রুনীরে-- অশ্রুত বাঁশি হৃদয়গহনে বাজে ॥ ক্ষণে ক্ষণে আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিত্রা
জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে তুমি বিচিত্ররূপিণী। অযুত আলোকে ঝলসিছ নীল গগনে, আকুল পুলকে উলসিছ ফুলকাননে, দ্যুলোকে ভূলোকে বিলসিছ চলচরণে, তুমি চঞ্চলগামিনী। মুখর নূপুর বাজিছে সুদূর আকাশে, অলকগন্ধ উড়িছে ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরদিন
কোথা রাত্রি , কোথা দিন , কোথা ফুটে চন্দ্র সূর্য তারা , কে বা আসে কে বা যায় , কোথা বসে জীবনের মেলা , কে বা হাসে কে বা গায় , কোথা খেলে হৃদয়ের খেলা , কোথা পথ , কোথা গৃহ , কোথা পান্থ , কোথা পথহারা ! কোথা ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইয়ারিং ছিল তার দু কানেই
ইয়ারিং ছিল তার দু কানেই। গেল যবে স্যাকরার দোকানেই মনে প’ল, গয়না তো চাওয়া যায়, আরেকটা কান কোথা পাওয়া যায়– সে কথাটা নোটবুকে টোকা নেই! মাসি বলে, “তোর মত বোকা নেই।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিচলিত কেন মাধবীশাখা
বিচলিত কেন মাধবীশাখা, মঞ্জরী কাঁপে থরথর। কোন্ কথা তার পাতায় ঢাকা চুপিচুপি করে মরমর। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উচ্চের প্রয়োজন
কহিল মনের খেদে মাঠ সমতল, হাট ভ’রে দিই আমি কত শস্য ফল। পর্বত দাঁড়ায়ে রন কী জানি কী কাজ, পাষাণের সিংহাসনে তিনি মহারাজ। বিধাতার অবিচার, কেন উঁচুনিচু সে কথা বুঝিতে আমি নাহি পারি কিছু। গিরি কহে, সব হলে সমভ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঈশ্বরের হাস্যমুখ দেখিবারে পাই
ঈশ্বরের হাস্যমুখ দেখিবারে পাই যে আলোকে ভাইকে দেখিতে পায় ভাই। ঈশ্বর প্রণামে তবে হাতজোড় হয় যখন ভাইয়ের প্রেমে মিলাই হৃদয়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অলস শয্যার পাশে জীবন মন্থরগতি চলে
অলস শয্যার পাশে জীবন মন্থরগতি চলে, রচে শিল্প শৈবালের দলে। মর্যাদা নাইকো তার, তবু তাহে রয় জীবনের স্বল্পমূল্য কিছু পরিচয়। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানসী
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী-- পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি আপন অন্তর হতে। বসি কবিগণ সোনার উপমাসূত্রে বুনিছে বসন। সঁপিয়া তোমার 'পরে নূতন মহিমা অমর করিছে শিল্পী তোমার প্রতিমা। কত বর্ণ কত গন্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চুম্বন
অধরের কানে যেন অধরের ভাষা, দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে- গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধরসংগমে। দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে। ব্যাকুল বাসনা দুটি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছবি-আঁকিয়ে
ছবি আঁকার মানুষ ওগো পথিক চিরকেলে, চলছ তুমি আশেপাশে দৃষ্টির জাল ফেলে। পথ-চলা সেই দেখাগুলো লাইন দিয়ে এঁকে পাঠিয়ে দিলে দেশ-বিদেশের থেকে। যাহা-তাহা যেমন-তেমন আছে কতই কী যে, তোমার চোখে ভেদ ঘটে নাই চণ্ডাল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনি ফুল লুকায়ে বনছায়ে
আপনি ফুল লুকায়ে বনছায়ে গন্ধ তার ঢালে দখিনবায়ে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইস্টেশন
সকাল বিকাল ইস্টেশনে আসি, চেয়ে চেয়ে দেখতে ভালবাসি। ব্যস্ত হয়ে ওরা টিকিট কেনে, ভাঁটির ট্রেনে কেউ-বা চড়ে কেউ-বা উজান ট্রেনে। সকাল থেকে কেউ-বা থাকে বসে, কেউ-বা গাড়ি ফেল্ করে তার শেষ-মিনিটের দোষে। দি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঈর্ষার সন্দেহ
লেজ নড়ে, ছায়া তারি নড়িছে মুকুরে কোনোমতে সেটা সহ্য করে না কুকুরে। দাস যবে মনিবেরে দোলায় চামর কুকুর চটিয়া ভাবে, এ কোন্ পামর? গাছ যদি নড়ে ওঠে, জলে ওঠে ঢেউ, কুকুর বিষম রাগে করে ঘেউ-ঘেউ। সে নিশ্চয় বুঝিয়াছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎসর্গ (আরোগ্য)
কল্যাণীয় শ্রীসুরেন্দ্রনাথ কর বহু লোক এসেছিল জীবনের প্রথম প্রভাতে — কেহ বা খেলার সাথী, কেহ কৌতূহলী, কেহ কাজে সঙ্গ দিতে, কেহ দিতে বাধা। আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে, পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঁধে মই বলে কই ভূঁইচাপা গাছ
কাঁধে মই, বলে “কই ভূঁইচাপা গাছ’, দইভাঁড়ে ছিপ ছাড়ে, খোঁজে কইমাছ, ঘুঁটেছাই মেখে লাউ রাঁধে ঝাউপাতা– কী খেতাব দেব তায় ঘুরে যায় মাথা। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনেককালের একটিমাত্র দিন
অনেককালের একটিমাত্র দিন কেমন করে বাঁধা পড়েছিল একটা কোনো ছন্দে, কোনো গানে, কোনো ছবিতে। কালের দূত তাকে সরিয়ে রেখেছিল চলাচলের পথের বাইরে। যুগের ভাসান খেলায় অনেক কিছু চলে গেল ঘাট পেরিয়ে, সে কখন ঠেকে গ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে। নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর কর হে। জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে। মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে। অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে। যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকুল আহ্বান
সন্ধে হল, গৃহ অন্ধকার— মা গো, হেথায় প্রদীপ জ্বলে না। একে একে সবাই ঘরে এল, আমায় যে মা, ‘মা' কেউ বলে না। সময় হল, বেঁধে দেব চুল, পরিয়ে দেব রাঙা কাপড়খানি। সাঁঝের তারা সাঁঝের গগনে— কোথায় গেল রানী আমার রানী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অন্তর্যামী
এ কী কৌতুক নিত্যনূতন ওগো কৌতুকময়ী, আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে বলিতে দিতেছ কই। অন্তরমাঝে বসি অহরহ মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ, মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ মিশায়ে আপন সুরে। কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই, তুমি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবাপানে
আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবাপানে। স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে। নীচে সব নীচে এ ধূলির ধরণীতে যেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে, যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নেই কিছু যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে, স্থান দাও সেথা সকলের ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে
গন্ধ চলে যায়, হায়, বন্ধ নাহি থাকে, ফুল তারে মাথা নাড়ি ফিরে ফিরে ডাকে। বায়ু বলে, যাহা গেল সেই গন্ধ তব, যেটুকু না দিবে তারে গন্ধ নাহি কব। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছলনা
সংসার মোহিনী নারী কহিল সে মোরে, তুমি আমি বাঁধা রব নিত্য প্রেমডোরে। যখন ফুরায়ে গেল সব লেনা দেনা, কহিল, ভেবেছ বুঝি উঠিতে হবে না! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছিন্ন করে লও হে মোরে
ছিন্ন করে লও হে মোরে আর বিলম্ব নয় ধুলায় পাছে ঝরে পড়ি এই জাগে মোর ভয়। এ ফুল তোমার মালার মাঝে ঠাঁই পাবে কি, জানি না যে, তবু তোমার আঘাতটি তার ভাগ্যে যেন রয়। ছিন্ন করো ছিন্ন করো আর বিলম্ব নয়। কখন যে দিন ফ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উদারচরিতানাম্
প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন। ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই— সূর্য উঠি বলে তারে, ভালো আছ ভাই? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎসর্গ (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল। পরিপূর্ণ বেদনার ভরে মুহূর্তেই বুঝি ফেটে পড়ে, বসন্তের দুরন্ত বাতাসে নুয়ে বুঝি নমিবে ভূতল— রসভরে অসহ উচ্ছ্বাসে থরে থরে ফলিয়াছে ফল। তুমি এসো নিকুঞ্জনিবাসে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উদবৃত্ত
তব দক্ষিণ হাতের পরশ কর নি সমর্পন। লেকে আর মেছে তব আলো ছায়া ভাবনার প্রাঙ্গণে খনে খনে আলিপন। বৈশাখে কৃশ নদী পূর্ণ স্রোতের প্রসাদ না দিল যদি শুধু কুণ্ঠিত বিশীর্ণ ধারা তীরের প্রান্তে জাগালো পিয়াসী মন। য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আহ্বান
জ্বেলে দিয়ে যাও সন্ধ্যাপ্রদীপ বিজন ঘরের কোণে। নামিল শ্রাবণ, কালো ছায়া তার ঘনাইল বনে বনে। বিস্ময় আনো ব্যগ্র হিয়ার পরশ-প্রতীক্ষায় সজল পবনে নীল বসনের চঞ্চল কিনারায়, দুয়ার-বাহির হতে আজি ক্ষণে ক্ষণে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরিহরণীয়
মৃত্যু কহে, পুত্র নিব; চোর কহে ধন। ভাগ্য কহে, সব নিব যা তোর আপন। নিন্দুক কহিল, লব তব যশোভার। কবি কহে, কে লইবে আনন্দ আমার? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবসান
জানি দিন অবসান হবে, জানি তবু কিছু বাকি রবে। রজনীতে ঘুমহারা পাখি এক সুরে গাহিবে একাকী- যে শুনিবে, সে রহিবে জাগি সে জানিবে, তারি নীড়হারা স্বপন খুঁজিছে সেই তারা যেথা প্রাণ হয়েছে বিবাগী। কিছু পরে করে যা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবসান হল রাতি
অবসান হল রাতি। নিবাইয়া ফেলো কালিমামলিন ঘরের কোণের বাতি। নিখিলের আলো পূর্ব আকাশে জ্বলিল পুণ্যদিনে; এক পথে যারা চলিবে তাহারা সকলেরে নিক্ চিনে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এ জন্মের সাথে লগ্ন স্বপ্নের জটিল সূত্র যবে
এ জন্মের সাথে লগ্ন স্বপ্নের জটিল সূত্র যবে ছিঁড়িল অদৃশ্যঘাতে, সে মুহূর্তে দেখিনু সম্মুখে অজ্ঞাত সুদীর্ঘ পথ অতি দূর নিঃসঙ্গের দেশে নিরাসক্ত নির্মমের পানে। অকস্মাৎ মহা একা ডাক দিল একাকীরে প্রলয় তোরণ চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছোটোবড়ো
এখনো তো বড়ো হই নি আমি, ছোটো আছি ছেলেমানুষ বলে। দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হব বড়ো হয়ে বাবার মতো হলে। দাদা তখন পড়তে যদি না চায়, পাখির ছানা পোষে কেবল খাঁচায়, তখন তারে এমনি বকে দেব! বলব, ‘তুমি চুপটি করে পড়ো। ' ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জটিল সংসার
জটিল সংসার, মোচন করিতে গ্রন্থি জড়াইয়া পড়ি বারংবার। গম্য নহে সোজা, দুর্গম পথের যাত্রা স্কন্ধে বহি দুশ্চিন্তার বোঝা। পথে পথে যথাতথা শত শত কৃত্রিম বক্রতা। অণুক্ষণ হতাশ্বাস হয়ে শেষে হার মানে মন। জীবনে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জড়িয়ে গেছে সরু মোটা দুটো তারে
জড়িয়ে গেছে সরু মোটা দুটো তারে জীবনবীণা ঠিক সুরে তাই বাজে না রে। এই বেসুরো জটিলতায় পরান আমার মরে ব্যথায়, হঠাৎ আমার গান থেমে যায় বারে বারে। জীবনবীণা ঠিক সুরে আর বাজে না রে। এই বেদনা বইতে আমি পারি না যে,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঊর্মি, তুমি চঞ্চলা
ঊর্মি, তুমি চঞ্চলা নৃত্যদোলায় দাও দোলা, বাতাস আসে কী উচ্ছ্বাসে— তরণী হয় পথভোলা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঋতুসংহার
হে কবীন্দ্র কালিদাস, কল্পকুঞ্জবনে নিভৃতে বসিয়া আছ প্রেয়সীর সনে যৌবনের যৌবরাজ্যসিংহাসন-’পরে। মরকতপাদপীঠ-বহনের তরে রয়েছে সমস্ত ধরা, সমস্ত গগন স্বর্ণরাজছত্র ঊর্ধ্বে করেছে ধারণ শুধু তোমাদের-’পরে; ছয় সেবাদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উপকথা
মেঘের আড়ালে বেলা কখন যে যায়। বৃষ্টি পড়ে সারাদিন থামিতে না চায় । আর্দ্র - পাখা পাখিগুলি গীতগান গেছে ভুলি , নিস্তব্ধে ভিজিছে তরুলতা । বসিয়া আঁধার ঘরে বরষার ঝরঝরে মনে পড়ে কত উপকথা । কভু মনে লয় হেন এ - সব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরাহ্নে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে
অপরাহ্নে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে পাহাড়িয়া যত। একে একে দিল মোরে পুষ্পের মঞ্জরি নমস্কারসহ। ধরণী লভিয়াছিল কোন্ ক্ষণে প্রস্তর আসনে বসি বহু যুগ বহ্নিতপ্ত তপস্যার পরে এই বর, এ পুষ্পের দান, মানুষের জ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মিলন লাগি তুমি
আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে। তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায় রাখবে কোথায় ঢেকে। কত কালের সকাল-সাঁঝে তোমার চরণধ্বনি বাজে, গোপনে দূত গৃহ-মাঝে গেছে আমায় ডেকে। ওগো পথিক, আজকে আমার সকল পরাণ ব্যেপে থেকে থেক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরো একবার যদি পারি
আরো একবার যদি পারি খুঁজে দেব সে আসনখানি যার কোলে রয়েছে বিছানো বিদেশের আদরের বাণী। অতীতের পালানো স্বপন আবার করিবে সেথা ভিড়, অস্ফুট গুঞ্জনস্বরে আরবার রচি দিবে নীড়। সুখস্মৃতি ডেকে ডেকে এনে জাগরণ করিবে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জগদীশচন্দ্র
শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু প্রিয়করকমলে বন্ধু, যেদিন ধরণী ছিল ব্যথাহীন বাণীহীন মরু, প্রাণের আনন্দ নিয়ে, শঙ্কা নিয়ে, দুঃখ নিয়ে, তরু দেখা দিল দারুণ নির্জনে। কত যুগ-যুগান্তরে কান পেতে ছিল স্তব্ধ মানুষে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এ কী অকৃতজ্ঞতার বৈরাগ্য প্রলাপ ক্ষণে ক্ষণে
এ কী অকৃতজ্ঞতার বৈরাগ্য প্রলাপ ক্ষণে ক্ষণে বিকারের রোগীসম অকস্মাৎ ছুটে যেতে চাওয়া আপনার আবেষ্টন হতে। ধন্য এ জীবন মোর— এই বাণী গাব আমি, প্রভাতে প্রথম-জাগা পাখি যে সুরে ঘোষণা করে আপনাতে আনন্দ আপন। দুঃখ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক
এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক; চৈতন্যের শুভ্র জ্যোতি ভেদ করি কুহেলিকা সত্যের অমৃত রূপ করুক প্রকাশ। সর্বমানুষের মাঝে এক চিরমানবের আনন্দকিরণ চিত্তে মোর হোক বিকীরিত। সংসারের ক্ষুব্ধতার স্তব্ধ ঊর্ধ্বলোক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই করেছ ভালো
এই করেছ ভালো, নিঠুর, এই করেছ ভালো। এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো। আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে, আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো। যখন থাকে অচেতনে এ চিত্ত আমার আঘাত সে যে পরশ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অভয়
আজি বর্ষশেষ-দিনে, গুরুমহাশয়, কারে দেখাইছ বসে অন্তিমের ভয়? অনন্ত আশ্বাস আজি জাগিছে আকাশে, অনন্ত জীবনধারা বহিছে বাতাসে, জগৎ উঠেছে হেসে জাগরণসুখে, ভয় শুধু লেগে আছে তব শুষ্ক মুখে। দেবতা রাক্ষস নহে মেলি মৃ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অযোগ্যের উপহাস
নক্ষত্র খসিল দেখি দীপ মরে হেসে। বলে, এত ধুমধাম, এই হল শেষে! রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে, যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় চুকে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অভিসার
বোধিসত্তাবদান-কল্পলতা সন্ন্যাসী উপগুপ্ত মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে একদা ছিলেন সুপ্ত– নগরীর দীপ নিবেছে পবনে, দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে, নিশীথের তারা শ্রাবণগগনে ঘন মেঘে অবলুপ্ত। কাহার নূপুরশিঞ্জিত পদ সহসা বাজি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার খোলা জানালাতে
আমার খোলা জানালাতে শব্দবিহীন চরণপাতে কে এলে গো, কে গো তুমি এলে। একলা আমি বসে আছি অস্তলোকের কাছাকাছি পশ্চিমেতে দুটি নয়ন মেলে। অতিসুদূর দীর্ঘ পথে আকুল তব আঁচল হতে আঁধারতলে গন্ধরেখা রাখি জোনাক-জ্বালা বনে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্যান
যত ভালোবাসি, যত হেরি বড়ো ক’রে তত, প্রিয়তমে, আমি সত্য হেরি তোরে। যত অল্প করি তোরে, তত অল্প জানি— কখনো হারায়ে ফেলি, কভু মনে আনি। আজি এ বসন্তদিনে বিকশিতমন হেরিতেছি আমি এক অপূর্ব স্বপন— যেন এ জগৎ নাহি, কি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে
জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা! পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিষ মাগে, গাহে তব জয়গাথা। জনগণমঙ্গলদায়ক জয় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এক পরিণাম
শেফালি কহিল, আমি ঝরিলাম, তারা! তারা কহে, আমারো তো হল কাজ সারা— ভরিলাম রজনীর বিদায়ের ডালি আকাশের তারা আর বনের শেফালি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে হবে গো এইবার– আমার এই মলিন অহংকার। দিনের কাজে ধুলা লাগি অনেক দাগে হল দাগি, এমনি তপ্ত হয়ে আছে সহ্য করা ভার। আমার এই মলিন অহংকার। এখন তো কাজ সাঙ্গ হল দিনের অবসানে, হল রে তাঁর আস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ
এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ; পাশে তোমার হবে কি আজ স্থান। দেখতে পাব অপূর্ব সেই মুখ, রইবে চেয়ে হৃদয় উৎসুক, বারে বারে চরণ ঘিরে ঘিরে ফিরবে আমার অশ্রুভরা গান? সাহস করে তোমার পদমূলে আপনারে আজ ধরি নাই য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি নমস্কারে, প্রভু
একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক তোমার এ সংসারে। ঘন শ্রাবণ-মেঘের মতো রসের ভারে নম্র নত একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে সমস্ত মন পড়িয়া থাক্ তব ভবন-দ্বারে। নানা সুরের আকুল ধা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটা খোঁড়া ঘোড়ার ‘পরে
একটা খোঁড়া ঘোড়ার ‘পরে চড়েছিল চাটুর্জে,পড়ে গিয়ে কী দশা তার হয়েছিল হাঁটুর যে! বলে কেঁদে, “ব্রাহ্মণেরে বইতে ঘোড়া পারল না যে সইত তাও, মরি আমি তার থেকে এই অধিক লাজে– লোকের মুখের ঠাট্টা যত বইতে হবে টাটুর যে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মকালেই ওর লিখে দিল কুষ্ঠি
জন্মকালেই ওর লিখে দিল কুষ্ঠি, ভালো মানুষের ‘পরে চালাবে ও মুষ্টি। যতই প্রমাণ পায় বাবা বলে, “মোদ্দা, কভু জন্মেনি ঘরে এত বড়ো যোদ্ধা।’ “বেঁচে থাকলেই বাঁচি’ বলে ঘোষগুষ্টি,– এত গাল খায় তবু এত পরিপুষ্টি। (খা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মকথা
খোকা মাকে শুধায় ডেকে — ‘ এলেম আমি কোথা থেকে , কোন্খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে । ' মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে — ‘ ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে । ছিলি আমার পুতুল - খেলায় , প্রভাতে শিবপূজা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মদিন
তোমরা রচিলে যারে নানা অলংকারে তারে তো চিনি নে আমি, চেনেন না মোর অন্তর্যামী তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই মোর নামের প্রতিমা। বিধাতার সৃষ্টিসীমা তোমাদের দৃষ্টির বাহিরে। কালসমুদ্রের তীরে বিরলে রচেন মূর্তিখানি ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কর্তব্যগ্রহণ
কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কর্ণ কুন্তি সংবাদ
(কাব্যনাট্য) কর্ণ। পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত সেই আমি-- কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ! কুন্তী। বৎস, তোর জীবনের প্রথম প্রভাতে পরিচয় করায়েছি তোর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
করুণা
অপরাহ্নে ধূলিচ্ছন্ন নগরীর পথে বিষম লোকের ভিড়; কর্মশালা হতে ফিরে চলিয়াছে ঘরে পরিশ্রান্ত জন বাঁধমুক্ত তটিনীর স্রোতের মতন। ঊর্ধ্বশ্বাসে রথ-অশ্ব চলিয়াছে ধেয়ে ক্ষুধা আর সারথির কশাঘাত খেয়ে। হেনকালে দোকানির ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কলঙ্কব্যবসায়ী
ধুলা, করো কলঙ্কিত সবার শুভ্রতা সেটা কি তোমারি নয় কলঙ্কর কথা? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কর্ম
ভৃত্যের না পাই দেখা প্রাতে । দুয়ার রয়েছে খোলা , স্নানজল নাই তোলা , মূর্খাধম আসে নাই রাতে । মোর ধৌত বস্ত্রখানি কোথা আছে নাহি জানি , কোথা আহারের আয়োজন ! বাজিয়া যেতেছে ঘড়ি বসে আছি রাগ করি — দেখা পেলে করি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জমল সতেরো টাকা
জমল সতেরো টাকা; সুদে টাকা খেলাবার শখ গেল, নবু তাই গেল চলি ম্যালাবার। ভাবনা বাড়ায় তার মুনফার মাত্রা, পাঁচ মেয়ে বিয়ে ক’রে বাঁচল এ যাত্রা। কাজ দিল কন্যারা ঠেলাগাড়ি ঠেলাবার, রোদ্দুরে ভার্যার ভিজে চুল এলা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জবাবদিহি
কবি হয়ে দোল-উৎসবে কোন্ লাজে কালো সাজে আসি, এ নিয়ে রসিকা তোরা সবে করেছিলি খুব হাসাহাসি। চৈত্রের দোল-প্রাঙ্গণে আমার জবাবদিহি চাই এ দাবি তোদের ছিল মনে, কাজ ফেলে আসিয়াছি তাই। দোলের দিনে, সে কী মনের ভু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জল
ধরাতলে চঞ্চলতা সব-আগে নেমেছিল জলে । সবার প্রথম ধ্বনি উঠেছিল জেগে তারি স্রোতোবেগে । তরঙ্গিত গতিমত্ত সেই জল কলোল্লোলে উদ্বেল উচ্ছল শৃঙ্খলিত ছিল স্তব্ধ পুকুরে আমার , নৃত্যহীন ঔদাসীন্যে অর্থহীন শূন্যদৃষ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তপোবন
মনশ্চক্ষে হেরি যবে ভারত প্রাচীন পুরব পশ্চিম হতে উত্তর দক্ষিণ মহারণ্য দেখা দেয় মহাচ্ছায়া লয়ে। রাজা রাজ্য-অভিমান রাখি লোকালয়ে অশ্বরথ দূরে বাঁধি যায় নতশিরে গুরুর মন্ত্রণা লাগি— স্রোতস্বিনীতীরে মহর্ষি বসি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জর্মন প্রোফেসার
জর্মন প্রোফেসার দিয়েছেন গোঁফে সার কত যে! উঠেছে ঝাঁকড়া হয়ে খোঁচা-খোঁচা ছাঁটা ছাঁটা– দেখে তাঁর ছাত্রের ভয়ে গায়ে দেয় কাঁটা, মাটির পানেতে চোখ নত যে। বৈদিক ব্যাখ্যায় বাণী তাঁর মুখে এসে যে নিমেষে পা বাড়ান ও...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জাগ্রত স্বপ্ন
আজ একেলা বসিয়া , আকাশে চাহিয়া , কী সাধ যেতেছে , মন! বেলা চলে যায় — আছিস কোথায় ? কোন্ স্বপনেতে নিমগন ? বসন্তবাতাসে আঁখি মুদে আসে , মৃদু মৃদু বহে শ্বাস , গায়ে এসে যেন এলায়ে পড়িছে কুসুমের মৃদু বা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জামাই মহিম এল
জামাই মহিম এল, সাথে এল কিনি– হায় রে কেবলই ভুলি ষষ্ঠীর দিনই। দেহটা কাহিল বড়ো, রাঁধবার নামে, কে জানে কেন রে, বাপু, ভেসে যায় ঘামে। বিধাতা জানেন আমি বড়ো অভাগিণী। বেয়ানকে লিখে দেব, খাওয়াবেন তিনি। (খাপছাড়া ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসময়
বৃথা চেষ্টা রাখি দাও। স্তব্ধ নীরবতা আপনি গড়িবে তুলি আপনার কথা। আজি সে রয়েছে ধ্যানে—এ হৃদয় মম তপোভঙ্গভয়ভীত তপোবনসম। এমন সময়ে হেথা বৃথা তুমি প্রিয়া বসন্তকুসুমমালা এসেছ পরিয়া, এনেছ অঞ্চল ভরি যৌবনের স্মৃত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসময়
হয়েছে কি তবে সিংহদুয়ার বন্ধ রে? এখনো সময় আছে কি, সময় আছে কি? দূরে কলরব ধ্বনিছে মন্দ মন্দ রে--- ফুরালো কি পথ? এসেছি পুরীর কাছে কি? মনে হয় সেই সুদূর মধুর গন্ধ রে রহি রহি যেন ভাসিয়া আসিছে বাতাসে। ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার নয়ন-ভুলানো এলে
আমার নয়ন-ভুলানো এলে। আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে। শিউলিতলার পাশে পাশে ঝরা ফুলের রাশে রাশে শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণ-রাঙা-চরণ ফেলে নয়ন-ভুলানো এলে। আলোছায়ার আঁচলখানি লুটিয়ে পড়ে বনে বনে, ফুলগুলি ওই মুখে চেয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্তসখী
রজনী একাদশী পোহায় ধীরে ধীরে, রঙিন মেঘমালা উষারে বাঁধে ঘিরে। আকাশে ক্ষীণ শশী আড়ালে যেতে চায়, দাঁড়ায়ে মাঝখানে কিনারা নাহি পায়। এ-হেন কালে যেন মায়ের পানে মেয়ে রয়েছে শুকতারা চাঁদের মুখে চেয়ে। কে তুমি মরি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরা এসে আমাকে বলে
ওরা এসে আমাকে বলে, কবি, মৃত্যুর কথা শুনতে চাই তোমার মুখে। আমি বলি, মৃত্যু যে আমার অন্তরঙ্গ, জড়িয়ে আছে আমার দেহের সকল তন্তু। তার ছন্দ আমার হৃৎস্পন্দনে, আমার রক্তে তার আনন্দের প্রবাহ। বলছে সে,--চলো চল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জিরাফের বাবা বলে
জিরাফের বাবা বলে,– “খোকা তোর দেহ দেখে দেখে মনে মোর ক’মে যায় স্নেহ। সামনে বিষম উঁচু, পিছনেতে খাটো, এমন দেহটা নিয়ে কী করে যে হাঁটো।’ খোকা বলে, “আপনার পানে তুমি চেহো, মা যে কেন ভালোবাসে বোঝে না তা কেহ।’ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিদ্রা-ব্যাপার কেন
নিদ্রা-ব্যাপার কেন হবেই অবাধ্য, চোখ-চাওয়া ঘুম হোক মানুষের সাধ্য– এম.এস্সি বিভাগের ব্রিলিয়ান্ট্ ছাত্র এই নিয়ে সন্ধান করে দিনরাত্র, বাজায় পাড়ার কানে নানাবিধ বাদ্য, চোখ-চাওয়া ঘটে তাহে, নিদ্রার শ্রাদ্ধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সব ঠাঁই মোর ঘর আছে
সব ঠাঁই মোর ঘর আছে,আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া। দেশে দেশে মোর দেশ আছে,আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া। পরবাসী আমি যে দুয়ারে চাই– তারি মাঝে মোর আছে যেন ঠাঁই, কোথা দিয়া সেথা প্রবেশিতে পাই সন্ধান লব বুঝিয়া। ঘরে ঘরে আছে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একলা আমি বাহির হলেম
একলা আমি বাহির হলেম তোমার অভিসারে, সাথে সাথে কে চলে মোর নীরব অন্ধকারে। ছাড়াতে চাই অনেক করে ঘুরে চলি, যাই যে সরে, মনে করি আপদ গেছে, আবার দেখি তারে। ধরণী সে কাঁপিয়ে চলে– বিষম চঞ্চলতা। সকল কথার মধ্যে সে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায়
একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায় দিগন্তের নীলিমায় চোখে পড়ে অনন্তের ভাষা। আলো আসে ছায়ায় জড়িত শিরীষের গাছ হতে শ্যামলের স্নিগ্ধ সখ্য বহি। বাজে মনে– নহে দূর,নহে বহু দূর। পথরেখা লীন হল অস্তগিরিশিখর-আড়ালে, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এপারে-ওপারে
রাস্তার ওপারে বাড়িগুলি ঘেঁষাঘেঁষি সারে সারে। ওখানে সবাই আছে ক্ষীণ যত আড়ালের আড়ে-আড়ে কাছে-কাছে। যা-খুশী প্রসঙ্গ নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কণ্ঠে বকে যায় কলস্বরে। অকারণে হাত ধরে; যে যাহারে চেনে পিঠে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়
১ যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়, লভিবে সুযশ কীর্তি গৌরব যেথায়, কিন্তু গো একটি কথা, কহিতেও লাগে ব্যথা, উঠিবে যশের যবে সমুচ্চ সীমায়, তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমায়– সুখ্যাতি অমৃত রবে, উৎফুল্ল হইবে যবে, তখন ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নলিনী
লীলাময়ী নলিনী, চপলিনী নলিনী, শুধালে আদর করে ভালো সে কি বাসে মোরে, কচি দুটি হাত দিয়ে ধরে গলা জড়াইয়ে, হেসে হেসে একেবারে ঢলে পড়ে পাগলিনী! ভালো বাসে কি না, তবু বলিতে চাহে না কভু নিরদয়া নলিনী! যবে হৃদি তার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশে যুগল তারা
আকাশে যুগল তারা চলে সাথে সাথে অনন্তের মন্দিরেতে আলোক মেলাতে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনযাত্রার পথে
জীবনযাত্রার পথে ক্লান্তি ভুলি, তরুণ পথিক, চলো নির্ভীক। আপন অন্তরে তব আপন যাত্রার দীপালোক অনির্বাণ হোক। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন মরণ
ওরা যায়, এরা করে বাস; অন্ধকার উত্তর বাতাস বহিয়া কত-না হা-হুতাশ ধূলি আর মানুষের প্রাণ উড়াইয়া করিছে প্রয়াণ। আঁধারেতে রয়েছি বসিয়া; একই বায়ু যেতেছে শ্বসিয়া মানুষের মাথার উপরে, অরণ্যের পল্লবের স্তরে। যে থা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে
জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে এ বিস্ময় মনে আজ জাগে-- লক্ষকোটি নক্ষত্রের অগ্নিনির্ঝরের যেথা নিঃশব্দ জ্যোতির বন্যাধারা ছুটেছে অচিন্ত্য বেগে নিরুদ্দেশ শূন্যতা প্লাবিয়া দিকে দিকে, তমোঘন অন্তহীন সেই আকা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জুতা-আবিষ্কার
কহিলা হবু, `শুন গো গোবুরায়, কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র--- মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায় ধরণী-মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র! তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি, রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি, রাজ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনের দীপে তব
জীবনের দীপে তব আলোকের আশীর্বচন আঁধারের অচৈতন্যে সঞ্চিত করুক জাগরণ। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিরুদ্যম অবকাশ শূন্য শুধু
নিরুদ্যম অবকাশ শূন্য শুধু, শান্তি তাহা নয়— যে কর্মে রয়েছে সত্য তাহাতে শান্তির পরিচয়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এসো হে এসো সজল ঘন বাদলবরিষনে
এসো হে এসো, সজল ঘন, বাদলবরিষনে– বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো হে এ জীবনে। এসো হে গিরিশিখর চুমি, ছায়ায় ঘিরি কাননভূমি– গগন ছেয়ে এসো হে তুমি গভীর গরজনে। ব্যথিয়ে উঠে নীপের বন পুলকভরা ফুলে। উছলি উঠে কলরোদন নদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এসে মোর কাছে
"এসে মোর কাছে" শুকতারা গাহে গান। প্রদীপের শিখা নিবে চ’লে গেল, মানিল সে আহ্বান। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওড়ার আনন্দে পাখি
ওড়ার আনন্দে পাখি শূন্যে দিকে দিকে বিনা অক্ষরের বাণী যায় লিখে লিখে। মন মোর ওড়ে যবে জাগে তার ধ্বনি, পাখার আনন্দ সেই বহিল লেখনী। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কীর্তি যত গড়ে তুলি
কীর্তি যত গড়ে তুলি ধূলি তারে করে টানাটানি। গান যদি রেখে যাই তাহারে রাখেন বীণাপাণি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওগো মৌন, না যদি কও
ওগো মৌন, না যদি কও না-ই কহিলে কথা। বক্ষ ভরি বইব আমি তোমার নীরবতা। স্তব্ধ হয়ে রইব পড়ে, রজনী রয় যেমন করে জ্বালিয়ে তারা নিমেষহারা ধৈর্যে অবনতা। হবে হবে প্রভাত হবে আঁধার যাবে কেটে। তোমার বাণী সোনার ধারা প...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের
নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের রসপাত্রগুলি আনিল এ শয্যাতলে জনহীন প্রভাতের রবির মিত্রতা, অজানা নির্ঝরিণীর বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটার হিরন্ময় লিপি, সুনিবিড় অরণ্যবীথির নিঃশব্দ মর্মরে বিজড়িত স্নিগ্ধ হৃদয়ের দৌত্য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিলনদৃশ্য
হেসো না, হেসো না তুমি বুদ্ধি-অভিমানী! একবার মনে আনো ওগো ভেদজ্ঞানী, সে মহাদিনের কথা, যবে শকুন্তলা বিদায় লইতেছিল স্বজনবৎসলা জন্মতপোবন হতে—সখা সহকার, লতাভগ্নী মাধবিকা, পশুপরিবার, মাতৃহারা মৃগশিশু, মৃগী গ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশের চাঁদ
হাতে তুলে দাও আকাশের চাঁদ — এই হল তার বুলি। দিবস রজনী যেতেছে বহিয়া, কাঁদে সে দু হাত তুলি। হাসিছে আকাশ, বহিছে বাতাস, পাখিরা গাহিছে সুখে। সকালে রাখাল চলিয়াছে মাঠে, বিকালে ঘরের মুখে। বালক বালিকা ভাই বো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কত কী যে আসে কত কী যে যায়
কত কী যে আসে কত কী যে যায় বাহিয়া চেতনাবাহিনী! আঁধারে আড়ালে গোপনে নিয়ত হেথা হোথা তারি পড়ে থাকে কত--- ছিন্নসূত্র বাছি শত শত তুমি গাঁথ বসে কাহিনী। ওগো একমনা, ওগো অগোচরা, ওগো স্মৃতি-অবগাহিনী! তব ঘরে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনে যা চিরদিন
জীবনে যা চিরদিন রয়ে গেছে আভাসে প্রভাতের আলোকে যা ফোটে নাই প্রকাশে, জীবনের শেষ দানে জীবনের শেষ গানে, হে দেবতা, তাই আজি দিব তব সকাশে, প্রভাতের আলোকে যা ফোটে নাই প্রকাশে। কথা তারে শেষ করে পারে নাই বাঁধিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনে যত পূজা হল না সারা
জীবনে যত পূজা হল না সারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা। যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে, যে নদী মরুপথে হারালো ধারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা। জীবনে আজো যাহা রয়েছে পিছে, জানি হে জানি তাও হয় নি মিছে। আম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝিনেদার জ্ঞাদনার
ঝিনেদার জ্ঞাদনার ছেলেটার জন্যে ত্রিচিনাপল্লী গিয়ে খুঁজে পেল কন্যে। শহরেতে সব-সেরা ছিল যেই বিবেচক দেখে দেখে বললে সে,– “কিবে নাক, কিবে চোখ; চুলের ডগার খুঁত বুঝবে না অন্যে।’ কন্যেকর্তা শুনে ঘটকের কানে কয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝাঁকড়াচুল
ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলি নি, কোন্ দেশে যে চলে গেছে সে-চঞ্চলিনী। সঙ্গী ছিল কুকুর কালু, বেশ ছিল তার আলুথালু, আপনা-'পরে অনাদরে ধুলায় মলিনী। হুটোপাটি ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিষ্কারণেই দিঘির জলে গাছের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝড়ের দিনে
আজি এই আকুল আশ্বিনে মেঘে-ঢাকা দুরন্ত দুর্দিনে হেমন্ত-ধানের খেতে বাতাস উঠেছে মেতে, কেমনে চলিবে পথ চিনে? আজি এই দুরন্ত দুর্দিনে! দেখিছ না ওগো সাহসিকা, ঝিকিমিকি বিদ্যুতের শিখা! মনে ভেবে দেখো তবে এ ঝড়ে ক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আঁখি পানে যবে আঁখি তুলি
আঁখি পানে যবে আঁখি তুলি দুখ জ্বালা সব যাই ভুলি। অধরে অধরে পরশিয়া প্রাণমন উঠে হরষিয়া। মাথা রাখি যবে ওই বুকে ডুবে যাই আমি মহা সুখে। যবে বল তুমি, “ভালবাসি’, শুনে শুধু আঁখিজলে ভাসি। Heinrich Hein (অনুবাদ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্তাচলের পরপারে
সন্ধ্যাসূর্যের প্রতি আমার এ গান তুমি যাও সাথে করে নূতন সাগরতীরে দিবসের পানে । সায়াহ্নের কূল হতে যদি ঘুমঘোরে এ গান উষার কূলে পশে কারো কানে! সারা রাত্রি নিশীথের সাগর বাহিয়া স্বপনের পরপারে যদি ভেসে যায় ,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাঙ্ক্ষা
আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায় ! ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে বিহগবিহগী কী যে গায় ! আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে , রহে না আবাসে মন হায় ! কোন্ কুসুমের আশে , কোন্ ফুলবাসে সুনীল আকাশে মন ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান, আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওই যে তরী দিল খুলে
ওই যে তরী দিল খুলে। তোর বোঝা কে নেবে তুলে। সামনে যখন যাবি ওরে থাক্ না পিছন পিছে পড়ে, পিঠে তারে বইতে গেলি, একলা পড়ে রইলি কূলে। ঘরের বোঝা টেনে টেনে। পারের ঘাটে রাখলি এনে, তাই যে তোরে বারে বারে ফিরতে হল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওই মহামানব আসে
ওই মহামানব আসে; দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে মর্ত ধূলির ঘাসে ঘাসে। সুরলোকে বেজে উঠে শঙ্খ, নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক— এল মহাজন্মের লগ্ন। আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন। উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া
ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া, ওরে আমার মন রে, আমার মন। জানি নে তুই কিসের লাগিকোন্ জগতে আছিস জাগি– কোন্ সেকালের বিলুপ্ত ভুবন। কোন্ পুরানো যুগের বাণী অর্থ যাহার নাহি জানি তোমার মুখে উঠছে আজ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বর্ষণগৌরব তার
বর্ষণগৌরব তার গিয়েছে চুকি, রিক্তমেঘ দিকপ্রান্তে ভয়ে দেয় উঁকি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নব বৎসরে করিলাম পণ
নব বৎসরে করিলাম পণ– লব স্বদেশের দীক্ষা, তব আশ্রমে তোমার চরণে হে ভারত, লব শিক্ষা। পরের ভূষণ পরের বসন তেয়াগিব আজ পরের অশন; যদি হই দীন, না হইব হীন, ছাড়িব পরের ভিক্ষা। নব বৎসরে করিলাম পণ– লব স্বদেশের দীক্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাটিতে মিশিল মাটি
মাটিতে মিশিল মাটি, যাহা চিরন্তন রহিল প্রেমের স্বর্গে অন্তরের ধন। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরবার ফিরে এল উৎসবের দিন
আরবার ফিরে এল উৎসবের দিন। বসন্তের অজস্র সম্মান ভরি দিল তরুশাখা কবির প্রাঙ্গণে নব জন্মদিনের ডালিতে। রুদ্ধ কক্ষে দূরে আছি আমি-- এ বৎসরে বৃথা হল পলাশবনের নিমন্ত্রণ। মনে করি,গান গাই বসন্তবাহারে। আসন্ন বির...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্যোতিষী
ওই যে রাতের তারা জানিস কি , মা , কারা ? সারাটিখন ঘুম না জানে চেয়ে থাকে মাটির পানে যেন কেমনধারা! আমার যেমন নেইকো ডানা , আকাশ - পানে উড়তে মানা , মনটা কেমন করে , তেমনি ওদের পা নেই বলে পারে না যে আসতে চলে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
টেরিটি বাজারে তার
টেরিটি বাজারে তার সন্ধান পেনু– গোরা বোষ্টমবাবা, নাম নিল বেণু। শুদ্ধ নিয়ম-মতে মুরগিরে পালিয়া, গঙ্গাজলের যোগে রাঁধে তার কালিয়া– মুখে জল আসে তার চরে যবে ধেনু। বড়ি ক’রে কৌটায় বেচে পদরেণু। (খাপছাড়া কাব্যগ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝুলন
আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা নিশীথবেলা। সঘন বরষা, গগন আঁধার হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার--- ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা; বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা রাত্রিবেলা॥ ওগো, পবনে গগনে সাগরে আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে
পাকুড়তলির মাঠে বামুনমারা দিঘির ঘাটে আদিবিশ্ব-ঠাকুরমায়ের আস্মানি এক চেলা ঠিক দুক্ষুর বেলা বেগ্নি-সোনা দিক্-আঙিনার কোণে ব 'সে ব 'সে ভুঁইজোড়া এক চাটাই বোনে হলদে রঙের শুকনো ঘাসে । সেখান থেকে ঝাপসা স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডাকাতের সাড়া পেয়ে
ডাকাতের সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি ইজেরে চোক ঢেকে মুখ ঢেকে ঢাকা দিল নিজেরে। পেটে ছুরি লাগালো কি, প্রাণ তার ভাগালো কি, দেখতে পেল না কালু হল তার কী যে রে! (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে পাখি
ওরে পাখি, থেকে থেকে ভুলিস কেন সুর, যাস নে কেন ডাকি— বাণীহারা প্রভাত হয় যে বৃথা জানিস নে তুই কি তা। অরুণ-আলোর প্রথম পরশ গাছে গাছে লাগে, কাঁপনে তার তোরই যে সুর পাতায় পাতায় জাগে— তুই যে ভোরের আলোর মিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে আজকে যে যা বলে বলুক তোরে, সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা। আয় দুরন্ত, আয় রে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে মাঝি
ওরে মাঝি, ওরে আমার মানবজন্মতরীর মাঝি, শুনতে কি পাস দূরের থেকে পারের বাঁশি উঠছে বাজি। তরী কি তোর দিনের শেষে ঠেকবে এবার ঘাটে এসে। সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি। যেন আমার লাগছে মনে, মন্দম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশ
শিশুকালের থেকে আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে। দিন কাটত কোণের ঘরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা কাছের দিকে সর্বদা মুখ-ফেরা; তাই সুদূরের পিপাসাতে অতৃপ্ত মন তপ্ত ছিল। লুকিয়ে যেতেম ছাতে, চুরি করতেম আকাশভরা সোন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই কিসের বাতাস লেগেছে– জগৎ-ঘূর্ণি জেগেছে। ঝলকি উঠেছে রবি-শশাঙ্ক, ঝলকি ছুটেছে তারা, অযুত চক্র ঘুরিয়া উঠেছে অবিরাম মাতোয়ারা। স্থির আছে শুধু একটি বিন্দু ঘূর্ণির মাঝখানে– সেইখান হতে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশে ছড়ায়ে বাণী
আকাশে ছড়ায়ে বাণী অজানার বাঁশি বাজে বুঝি। শুনিতে না পায় জন্তু, মানুষ চলেছে সুর খুঁজি।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি অতি পুরাতন
আমি অতি পুরাতন, এ খাতা হালের হিসাব রাখিতে চাহে নূতন কালের। তবুও ভরসা পাই— আছে কোনো গুণ, ভিতরে নবীন থাকে অমর ফাগুন। পুরাতন চাঁপাগাছে নূতনের আশা নবীন কুসুমে আনে অমৃতের ভাষা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ গড়ি খেলাঘর
আজ গড়ি খেলাঘর, কাল তারে ভুলি— ধূলিতে যে লীলা তারে মুছে দেয় ধূলি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
না জানি কারে দেখিয়াছি
না জানি কারে দেখিয়াছি, দেখেছি কার মুখ। প্রভাতে আজ পেয়েছি তার চিঠি। পেয়েছি তাই সুখে আছি, পেয়েছি এই সুখ– কারেও আমি দেখাব নাকো সেটি। লিখন আমি নাহিকো জানি– বুঝি না কী যে রয়েছে বাণী– যা আছে থাক্ আমার থাক্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডাকো ডাকো ডাকো আমারে
ডাকো ডাকো ডাকো আমারে, তোমার স্নিগ্ধ শীতল গভীর পবিত্র আঁধারে। তুচ্ছ দিনের ক্লান্তি গ্লানি দিতেছে জীবন ধুলাতে টানি, সারাক্ষণের বাক্যমনের সহস্র বিকারে। মুক্ত করো হে মুক্ত করো আমারে, তোমার নিবিড় নীরব উদার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
টাকা সিকি আধুলিতে
টাকা সিকি আধুলিতে ছিল তার হাত জোড়া; যে-সাহসে কিনেছিল পান্তোয়া সাত ঝোড়া। ফুঁকে দিয়ে কড়াকড়ি শেষে হেসে গড়াগড়ি; ফেলে দিতে হল সব– আলুভাতে পাত-জোড়া। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তখন আমার আয়ুর তরণী
শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ চৌধুরী কল্যাণীয়েষু তখন আমার আয়ুর তরণী যৌবনের ঘাট গেছে পেরিয়ে। যে-সব কাজ প্রবীণকে প্রাজ্ঞকে মানায় তাই নিয়ে পাকা করছিলেম পাকা চুলের মর্যাদা। এমন সময়ে আমাকে ডাক দিলে তোমার সবুজপত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তখন আমার বয়স ছিল সাত
তখন আমার বয়স ছিল সাত। ভোরের বেলায় দেখতেম জানলা দিয়ে অন্ধকারের উপরকার ঢাকা খুলে আসছে, বেরিয়ে আসছে কোমল আলো নতুন-ফোটা কাঁটালিচাঁপার মতো। বিছানা ছেড়ে চলে যেতেম বাগানে কাক ডাকবার আগে, পাছে বঞ্চিত হই ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তপথে
বাঁকাও ভুরু দ্বারে আগল দিয়া, চক্ষু করো রাঙা, ঐ আসে মোর জাত-খোয়ানো প্রিয়া ভদ্র-নিয়ম-ভাঙা। আসন পাবার কাঙাল ও নয় তো আচার-মানা ঘরে- আমি ওকে বসাব হয়তো ময়লা কাঁথার 'পরে। সাবধানে রয় বাজার-দরের খোঁজে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাম তার ডাক্তার ময়জন
নাম তার ডাক্তার ময়জন। বাতাসে মেশায় কড়া পয়জন। গণিয়া দেখিল, বড়ো বহরের একখানা রীতিমতো শহরের টিঁকে আছে নাবালক নয়জন। খুশি হয়ে ভাবে, এই গবেষণা না জানি সবার কবে হবে শোনা, শুনিতে বা বাকি রবে কয়জন। (খাপছাড়া কা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আছি আমি বিন্দুরূপে, হে অন্তরযামী
আছি আমি বিন্দুরূপে, হে অন্তরযামী আছি আমি বিশ্বকেন্দ্রস্থলে। “আছি আমি’ এ কথা স্মরিলে মনে মহান্ বিস্ময় আকুল করিয়া দেয়,স্তব্ধ এ হৃদয় প্রকাণ্ড রহস্যভারে। “আছি আর আছে’ অন্তহীন আদি প্রহেলিকা, কার কাছে শুধা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কত দিবা কত বিভাবরী
কত দিবা কত বিভাবরী কত নদী নদে লক্ষ স্রোতের মাঝখানে এক পথ ধরি, কত ঘাটে ঘাটে লাগায়ে, কত সারিগান জাগায়ে, কত অঘ্রানে নব নব ধানে কতবার কত বোঝা ভরি কর্ণধার হে কর্ণধার, বেচে কিনে কত স্বর্ণভার কোন্ গ্রামে আজ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কঠিন পাথর কাটি
কঠিন পাথর কাটি মূর্তিকর গড়িছে প্রতিমা। অসীমেরে রূপ দিক্ জীবনের বাধাময় সীমা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কণিকা
যথার্থ আপন কুষ্মাণ্ডের মনে মনে বড়ো অভিমান, বাঁশের মাচাটি তার পুষ্পক বিমান। ভুলেও মাটির পানে তাকায় না তাই, চন্দ্রসূর্যতারকারে করে 'ভাই ভাই'। নভশ্চর ব'লে তাঁর মনের বিশ্বাস, শূন্য-পানে চেয়ে তাই ছাড়ে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি-কাহিনী (তৃতীয় সর্গ)
কত দেশ দেশান্তরে ভ্রমিল সে কবি! তুষারস্তম্ভিত গিরি করিল লঙ্ঘন, সুতীক্ষ্নকণ্টকময় অরণ্যের বুক মাড়াইয়া গেল চলি রক্তময় পদে। কিন্তু বিহঙ্গের গান, নির্ঝরের ধ্বনি, পারে না জুড়াতে আর কবির হৃদয়। বিহগ, নি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মায়াবাদ
হা রে নিরানন্দ দেশ, পরি জীর্ণ জরা, বহি বিজ্ঞতার বোঝা, ভাবিতেছ মনে ঈশ্বরের প্রবঞ্চনা পড়িয়াছে ধরা সুচতুর সূক্ষ্মদৃষ্টি তোমার নয়নে! লয়ে কুশাঙ্কুর বুদ্ধি শাণিত প্রখরা কর্মহীন রাত্রিদিন বসি গৃহকোণে মিথ্যা ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - প্রাথমিক রচনা
আজি এ প্রভাতে প্রভাতবিহগ কী গান গাইল রে! অতিদূর দূর আকাশ হইতে ভাসিয়া আইল রে! না জানি কেমনে পশিল হেথায় পথহারা তার একটি তান, আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া আকুল হইয়া কাঁদি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পত্র
নৌকাযাত্রা হইতে ফিরিয়া আসিয়া লিখিত সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেন স্থলচরবরেষু জলে বাসা বেঁধেছিলেম , ডাঙায় বড়ো কিচিমিচি । সবাই গলা জাহির করে , চেঁচায় কেবল মিছিমিছি । সস্তা লেখক কোকিয়ে মরে , ঢাক নিয়ে স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আগুন জ্বলিত যবে
আগুন জ্বলিত যবে আপন আলোতে সাবধান করেছিলে মোরে দূর হতে। নিবে গিয়ে ছাইচাপা আছে মৃতপ্রায়, তাহারি বিপদ হতে বাঁচাও আমায়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবোধ হিয়া বুঝে না বোঝে
অবোধ হিয়া বুঝে না বোঝে, করে সে একি ভুল— তারার মাঝে কাঁদিয়া খোঁজে ঝরিয়া-পড়া ফুল। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তনু
ওই তনুখানি তব আমি ভালোবাসি । এ প্রাণ তোমার দেহে হয়েছে উদাসী। শিশিরেতে টলমল ঢলঢল ফুল টুটে পড়ে থরে থরে যৌবন বিকাশি । চারি দিকে গুঞ্জরিছে জগৎ আকুল , সারানিশি সারাদিন ভ্রমর পিপাসী । ভালোবেসে বায়ু এসে দুলা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তম্বুরা কাঁধে নিয়ে
তম্বুরা কাঁধে নিয়ে শর্মা বাণেশ্বর ভেবেছিল, তীর্থেই যাবে সে থানেশ্বর। হঠাৎ খেয়াল চাপে গাইয়ের কাজ নিতে– বরাবর গেল চলে একদম গাজনিতে, পাঠানের ভাব দেখে ভাঙিল গানের স্বর। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তাই তোমার আনন্দ আমার পর
তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে। আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা, আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা, মোর জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে। তাই তো ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তব চিত্তগগনের
তব চিত্তগগনের দূর দিক্সীমা বেদনার রাঙা মেঘে পেয়েছে মহিমা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তর্ক
নারীকে দিবেন বিধি পুরুষের অন্তরে মিলায়ে সেই অভিপ্রায়ে রচিলেন সূক্ষ্মশিল্পকারুময়ী কায়া — তারি সঙ্গে মিলালেন অঙ্গের অতীত কোন্ মায়া যারে নাহি যায় ধরা , যাহা শুধু জাদুমন্ত্রে ভরা , যাহারে অন্তরতম হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তবু
তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলি, সেই পুরাতন প্রেম যদি এক কালে হয়ে আসে দূরস্মৃত কাহিনী কেবলি, ঢাকা পড়ে নব নব জীবনের জালে । তবু মনে রেখো, যদি বড়ো কাছে থাকি, নূতন এ প্রেম যদি হয় পুরাতন, দেখে না দেখিতে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারকার আত্মহত্যা
জ্যোতির্ময় তীর হতে আঁধার সাগরে ঝাঁপায়ে পড়িল এক তারা , একেবারে উন্মাদের পারা । চৌদিকে অসংখ্য তারা রহিল চাহিয়া অবাক হইয়া -- এই - যে জ্যোতির বিন্দু আছিল তাদের মাঝে মুহুর্তে সে গেল মিশাইয়া । যে সমূদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারাগুলি সারারাতি
তারাগুলি সারারাতি কানে কানে কয়। সেই কথা ফুলে ফুলে ফুটে বনময়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি বসন্তের পাখি বনের ছায়ারে
তুমি বসন্তের পাখি বনের ছায়ারে করো ভাষা দান। আকাশ তোমার কণ্ঠে চাহে গাহিবারে আপনারি গান।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপিস থেকে ঘরে এসে
আপিস থেকে ঘরে এসে মিলত গরম আহার্য, আজকে থেকে রইবে না আর তাহার জো। বিধবা সেই পিসি ম’রে গিয়েছে ঘর খালি করে, বদ্দি স্বয়ং করেছে তার সাহায্য। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কন্কনে শীত তাই
কন্কনে শীত তাই চাই তার দস্তানা; বাজার ঘুরিয়ে দেখে, জিনিসটা সস্তা না। কম দামে কিনে মোজা বাড়ি ফিরে গেল সোজা– কিছুতে ঢোকে না হাতে, তাই শেষে পস্তানা। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কন্যাবিদায়
জননী, কন্যারে আজ বিদায়ের ক্ষণে আপন অতীতরূপ পড়িয়াছে মনে যখন বালিকা ছিলে। মাতৃক্রোড় হতে তোমারে ভাসালো ভাগ্য দূরতর স্রোতে সংসারের। তার পর গেল কত দিন দুঃখে সুখে, বিচ্ছেদের ক্ষত হল ক্ষীণ। এ-জন্মের আরম্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন (সঞ্চয়িতা)
কেন গো এমন স্বরে বাজে তার বাঁশি - মধুর সুন্দর রূপে কেঁদে ওঠে হিয়া, রাঙা অধরের কোণে হেরি মধুহাসি পুলকে যৌবন কেন উঠে বিকশিয়া! কেন তনু বাহুডোরে ধরা দিতে চায়, ধায় প্রাণ দুটি কালো আঁখির উদ্দেশে - হায়, যদি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবির অহংকার
গান গাহি বলে কেন অহংকার করা ! শুধু গাহি বলে কেন কাঁদি না শরমে ! খাঁচার পাখির মতো গান গেয়ে মরা , এই কি , মা , আদি অন্ত মানবজনমে ! সুখ নাই , সুখ নাই , শুধু মর্মব্যথা — মরীচিকা – পানে শুধু মরি পিপাসায় । ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কমল ফুটে অগম জলে
কমল ফুটে অগম জলে, তুলিবে তারে কেবা। সবার তরে পায়ের তলে তৃণের রহে সেবা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারা দিনের বেলা এসেছিল
তারা দিনের বেলা এসেছিল আমার ঘরে, বলেছিল, একটি পাশে রইব প’ড়ে। বলেছিল, দেবতা সেবায় আমরা হব তোমার সহায়– যা কিছু পাই প্রসাদ লব পূজার পরে। এমনি করে দরিদ্র ক্ষীণ মলিন বেশে সংকোচেতে একটি কোণে রইল এসে। রাতে দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তীর্থযাত্রী
কন্কনে ঠাণ্ডায় আমাদের যাত্রা— ভ্রমণটা বিষম দীর্ঘ, সময়টা সব চেয়ে খারাপ, রাস্তা ঘোরালো, ধারালো বাতাসের চোট, একেবারে দুর্জয় শীত। ঘাড়ে ক্ষত, পায়ে ব্যথা, মেজাজ-চড়া উটগুলো শুয়ে শুয়ে পড়ে গলা বরফে। মাঝে মাঝে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তৃতীয় সর্গ
কত দেশ দেশান্তরে ভ্রমিল সে কবি! তুষারস্তম্ভিত গিরি করিল লঙ্ঘন, সুতীক্ষ্নকণ্টকময় অরণ্যের বুক মাড়াইয়া গেল চলি রক্তময় পদে। কিন্তু বিহঙ্গের গান, নির্ঝরের ধ্বনি, পারে না জুড়াতে আর কবির হৃদয়। বিহগ, নি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তিনকড়ি তোল্পাড়িয়ে উঠল পাড়া
তিনকড়ি। তোল্পাড়িয়ে উঠল পাড়া, তবু কর্তা দেন না সাড়া! জাগুন শিগ্গির জাগুন্। কর্তা। এলারামের ঘড়িটা যে চুপ রয়েছে, কই সে বাজে– তিনকড়ি। ঘড়ি পরে বাজবে, এখন ঘরে লাগল আগুন। কর্তা। অসময়ে জাগলে পরে ভীষণ আমার ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি আছ হিমাচল ভারতের অনন্তসঞ্চিত
তুমি আছ হিমাচল ভারতের অনন্তসঞ্চিত তপস্যার মতো। স্তব্ধ ভূমানন্দ যেন রোমাঞ্চিত নিবিড় নিগূঢ়-ভাবের পথশূন্য তোমার নির্জনে, নিষ্কলঙ্ক নীহারের অভ্রভেদী আত্মবিসর্জনে। তোমার সহস্র শৃঙ্গ বাহু তুলি কহিছে নীরবে ঋ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি এবার আমায় লহো
তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ, লহো। এবার তুমি ফিরো না হে– হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো। যে দিন গেছে তোমা বিনা তারে আর ফিরে চাহি না, যাক সে ধুলাতে। এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে যেন জাগি অহরহ। কী আবেশে কিসের কথায় ফিরেছি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাল প্রাতে মোর জন্মদিন
কাল প্রাতে মোর জন্মদিনে এ শৈল-আতিথ্যবাসে বুদ্ধের নেপালী ভক্ত এসেছিল মোর বার্তা শুনে। ভূতলে আসন পাতি বুদ্ধের বন্দনামন্ত্র শুনাইল আমার কল্যাণে-- গ্রহণ করিনু সেই বাণী। এ ধারায় জন্ম নিয়ে যে মহামানব সব ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
করিয়াছি বাণীর সাধনা
করিয়াছি বাণীর সাধনা দীর্ঘকাল ধরি, আজ তারে ক্ষণে ক্ষণে উপহাস পরিহাস করি। বহু ব্যবহার আর দীর্ঘ পরিচয় তেজ তার করিতেছে ক্ষয়। নিজেরে করিয়া অবহেলা নিজেরে নিয়ে সে করে খেলা। তবু জানি, অজানার পরিচয় আছিল ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন মধুর
রঙিন খেলেনা দিলে ও রাঙা হাতে তখন বুঝি রে বাছা, কেন যে প্রাতে এত রঙ খেলে মেঘে জলে রঙ ওঠে জেগে, কেন এত রঙ লেগে ফুলের পাতে— রাঙা খেলা দেখি যবে ও রাঙা হাতে। গান গেয়ে তোরে আমি নাচাই যবে আপন হৃদয়-মাঝে বুঝি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঁচা আম
তিনটে কাঁচা আম পড়ে ছিল গাছতলায় চৈত্রমাসের সকালে মৃদু রোদ্দুরে । যখন-দেখলুম অস্থির ব্যগ্রতায় হাত গেল না কুড়িয়ে নিতে । তখন চা খেতে খেতে মনে ভাবলুম , বদল হয়েছে পালের হাওয়া পুব দিকের খেয়ার ঘাট ঝা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কল্পনার সাথি
যখন কুসুমবনে ফির একাকিনী , ধরায় লুটায়ে পড়ে পূর্ণিমাযামিনী , দক্ষিণবাতাসে আর তটিনীর গানে শোন যবে আপনার প্রাণের কাহিনী — যখন শিউলি ফুলে কোলখানি ভরি দুটি পা ছড়ায়ে দিয়ে আনতবয়ানে ফুলের মতন দুটি অঙ্গুলিতে ধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কল্লোলমুখর দিন
কল্লোলমুখর দিন ধায় রাত্রি-পানে। উচ্ছল নির্ঝর চলে সিন্ধুর সন্ধানে। বসন্তে অশান্ত ফুল পেতে চায় ফল। স্তব্ধ পূর্ণতার পানে চলিছে চঞ্চল। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে। এসো গন্ধে বরনে, এসো গানে। এসো অঙ্গে পুলকময় পরশে, এসো চিত্তে অমৃতময় হরষে, এসো মুগ্ধ মুদিত দু নয়ানে। তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে। এসো নির্মল উজ্জ্বল কান্ত, এসো সুন্দর স্নিগ্ধ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি একটি ফুলের মতো মণি
তুমি একটি ফুলের মতো মণি এম্নি মিষ্টি, এম্নি সুন্দর! মুখের পানে তাকাই যখনি ব্যথায় কেন কাঁদায় অন্তর! শিরে তোমার হস্ত দুটি রাখি পড়ি এই আশীষ মন্তর, বিধি তোরে রাখুন চিরকাল এমনি মিষ্টি, এম্নি সুন্দর! Hei...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃখ এড়াবার আশা
দুঃখ এড়াবার আশা নাই এ জীবনে। দুঃখ সহিবার শক্তি যেন পাই মনে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি যখন গান গাহিতে বল
তুমি যখন গান গাহিতে বল গর্ব আমার ভ’রে উঠে বুকে; দুই আঁখি মোর করে ছলছল, নিমেষহারা চেয়ে তোমার মুখে। কঠিন কটু যা আছে মোর প্রাণে গলিতে চায় অমৃতময় গানে, সব সাধনা আরাধনা মম উড়িতে চায় পাখির মত সুখে। তৃপ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি বাঁধছ নূতন বাসা
তুমি বাঁধছ নূতন বাসা, আমার ভাঙছে ভিত। তুমি খুঁজছ লড়াই, আমার মিটেছে হার-জিত। তুমি বাঁধছ সেতারে তার, থামছি সমে এসে। চক্ররেখা পূর্ণ হল আরম্ভে আর শেষে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কলরবমুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণে যে আসন
কলরবমুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণে যে আসন পাতা হয়েছিল কবে, সেথা হতে উঠে এসো, কবি, পূজা সাঙ্গ করি দাও চাটুলুব্ধ জনতা-দেবীরে বচনের অর্ঘ্য বিরচিয়া। দিনের সহস্র কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে এল; যে প্রহরগুলি ধ্বনি-পণ্যবাহী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঁচড়াপাড়াতে এক ছিল রাজপুত্তুর
কাঁচড়াপাড়াতে এক ছিল রাজপুত্তুর, রাজকন্যারে লিখে পায় না সে উত্তর। টিকিটের দাম দিয়ে রাজ্য বিকাবে কি এ, রেগেমেগে শেষকালে বলে ওঠে–দুত্তোর! ডাকবাবুটিকে দিল মুখে ডালকুত্তোর। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাগজের নৌকা
ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে কাগজ-নৌকাখানি। লিখে রাখি তাতে আপনার নাম, লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে যতনে লাইন টানি। যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে আমার লিখন প...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি যে কাজ করছ আমায়
তুমি যে কাজ করছ, আমায় সেই কাজে কি লাগাবে না। কাজের দিনে আমায় তুমি আপন হাতে জাগাবে না? ভালোমন্দ ওঠাপড়ায় বিশ্বশালার ভাঙাগড়ায় তোমার পাশে দাঁড়িয়ে যেন তোমার সাথে হয় গো চেনা। ভেবেছিলেম বিজন ছায়ায় নাই যেখানে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমায় চিনি বলে আমি করেছি গরব
তোমায় চিনি বলে আমি করেছি গরব লোকের মাঝে; মোর আঁকা পটে দেখেছে তোমায় অনেকে অনেক সাজে। কত জনে এসে মোরে ডেকে কয় “কে গো সে’, শুধায় তব পরিচয়– “কে গো সে।’ তখন কী কই, নাহি আসে বাণী, আমি শুধু বলি,”কী জানি! কী ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিরাট মানবচিত্তে
বিরাট মানবচিত্তে অকথিত বাণীপুঞ্জ অব্যক্ত আবেগে ফিরে কাল হতে কালে মহাশূন্যে নীহারিকাসম। সে আমার মনঃসীমানার সহসা আঘাতে ছিন্ন হয়ে আকারে হয়েছে ঘনীভূত, আবর্তন করিতেছে আমার রচনাকক্ষপথে। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঠের সিঙ্গি
ছোটো কাঠের সিঙ্গি আমার ছিল ছেলেবেলায়, সেটা নিয়ে গর্ব ছিল বীরপুরুষি খেলায়। গলায় বাঁধা রাঙা ফিতের দড়ি, চিনেমাটির ব্যাঙ বেড়াত পিঠের উপর চড়ি। ব্যাঙটা যখন পড়ে যেত ধম্কে দিতেম কষে, কাঠের সিঙ্গি ভয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা
কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা, তারি মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা— এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা সুরের-গন্ধ-ঢালা?। তাই কি আমার ঘুম ছুটেছে, বাঁধ টুটেছে মনে, খ্যাপা হাওয়ার ঢেউ উঠেছে চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাছের রাতি দেখিতে পাই
কাছের রাতি দেখিতে পাই মানা। দূরের চাঁদ চিরদিনের জানা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালিদাসের প্রতি
আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ— কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ, কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ। কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয় ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময় অলকার অধিবাসী। সন্ধ্য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সব চেয়ে ভক্তি যার
সব চেয়ে ভক্তি যার অস্ত্রদেবতারে অস্ত্র যত জয়ী হয় আপনি সে হারে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর, যবে আমার জনম হবে ভোর। চলে যাব নবজীবন-লোকে, নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে, নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে পরব তব নবমিলন-ডোর। তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর। তোমার অন্ত নাই গো অন্ত নাই, বারে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনা-জালে, হে ছলনাময়ী। মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে সরল জীবনে। এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত; তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি। তোমার জ্যোতি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ আর সহে না
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ আর সহে না– দিনে দিনে উঠছে জমে কতই দেনা। সবাই তোমায় সভার বেশে প্রণাম করে গেল এসে, মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই মান রহে না। কী জানাব চিত্তবেদন, বোবা হয়ে গেছে যে মন, তোমার কাছে কোনো কথাই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালো মেঘ আকাশের তারাদের ঢেকে
কালো মেঘ আকাশের তারাদের ঢেকে মনে ভাবে, জিত হল তার। মেঘ কোথা মিলে যায় চিহ্ন নাহি রেখে, তারাগুলি রহে নির্বিকার। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কীটের বিচার
মহাভারতের মধ্যে ঢুকেছেন কীট, কেটেকুটে ফুঁড়েছেন এপিঠ-ওপিঠ। পণ্ডিত খুলিয়া দেখি হস্ত হানে শিরে; বলে, ওরে কীট, তুই এ কী করিলি রে! তোর দন্তে শান দেয়, তোর পেট ভরে, হেন খাদ্য কত আছে ধূলির উপরে। কীট বলে, হয়েছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাশী
কাশীর গল্প শুনেছিলুম যোগীনদাদার কাছে, পষ্ট মনে আছে। আমরা তখন ছিলাম না কেউ, বয়েস তাঁহার সবে বছর-আষ্টেক হবে। সঙ্গে ছিলেন খুড়ি, মোরব্বা বানাবার কাজে ছিল না তাঁর জুড়ি। দাদা বলেন, আমলকি বেল পেঁপে সে তো ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কী কথা বলিব বলে
কী কথা বলিব বলে বাহিরে এলেম চলে, দাঁড়ালেম দুয়ারে তোমার– ঊর্ধ্বমুখে উচ্চরবে বলিতে গেলেম যবে কথা নাহি আর। যে কথা বলিতে চাহে প্রাণ সে শুধু হইয়া উঠে গান। নিজে না বুঝিতে পারি, তোমারে বুঝাতে নারি, চেয়ে থাকি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কী যে কোথা হেথা হোথা যায় ছড়াছড়ি
কী যে কোথা হেথা হোথা যায় ছড়াছড়ি, কুড়িয়ে যতনে বাঁধি দিয়ে দড়াদড়ি। তবুও কখন শেষে বাঁধন যায় রে ফেঁসে, ধুলায় ভোলার দেশে যায় গড়াগড়ি— হায় রে, রয় না তার দাম কড়াকড়ি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কী পাই, কী জমা করি
কী পাই, কী জমা করি, কী দেবে, কে দেবে, দিন মিছে কেটে যায় এই ভেবে ভেবে। চ'লে তো যেতেই হবে— কী যে দিয়ে যাব বিদায় নেবার অাগে এই কথা ভাবো! (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে করে ধর্মের নামে
যে করে ধর্মের নামে বিদ্বেষ সঞ্চিত ঈশ্বরকে অর্ঘ্য হতে সে করে বঞ্চিত। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুসুমের শোভা
কুসুমের শোভা কুসুমের অবসানে মধুরস হয়ে লুকায় ফলের প্রাণে (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুটুম্বিতা-বিচার
কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই ব’লে ডাক যদি দেব গলা টিপে। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা— কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুয়াশার আক্ষেপ
‘কুয়াশা, নিকটে থাকি, তাই হেলা মোরে— মেঘ ভায়া দূরে রন, থাকেন গুমরে!’ কবি কুয়াশারে কয়, শুধু তাই না কি? মেঘ দেয় বৃষ্টিধারা, তুমি দাও ফাঁকি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুমার
কুমার, তোমার প্রতীক্ষা করে নারী, অভিষেক-তরে এনেছে তীর্থবারি। সাজাবে অঙ্গ উজ্জ্বল বরবেশে, জয়মাল্য-যে পরাবে তোমার কেশে, বরণ করিবে তোমারে সে-উদ্দেশে দাঁড়ায়েছে সারি সারি। দৈত্যের হাতে স্বর্গের পরাভবে ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুঁজো তিনকড়ি ঘোরে
কুঁজো তিনকড়ি ঘোরে পাড়া চারিদিককার, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে নিয়ে ঝুলি ভিক্ষার। বলে সিধু গড়গড়ি রাগে দাঁত কড়মড়ি, “ভিখ্ মেগে ফের’, মনে হয় না কি ধিক্কার?’ ঝুলি নিজে কেড়ে বলে, “মাহিনা এ শিক্ষার।’ (খাপছাড়া কাব্যগ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কৃষ্ণকলি
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেউ চেনা নয়
কেউ চেনা নয় সব মানুষই অজানা। চলেছে আপনার রহস্যে আপনি একাকী। সেখানে তার দোসর নেই। সংসারের ছাপমারা কাঠামোয় মানুষের সীমা দিই বানিয়ে। সংজ্ঞার বেড়া-দেওয়া বসতির মধ্যে বাঁধা মাইনের কাজ করে সে। থাকে সাধা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘট ভরা
আমার এই ছোটো কলসখানি সারা সকাল পেতে রাখি ঝরনাধারার নিচে। বসে থাকি একটি ধারে শেওলাঢাকা পিছল কালো পাথরটাতে। ঘট ভরে যায় বারে বারে-- ফেনিয়ে ওঠে, ছাপিয়ে পড়ে কেবলি। সবুজ দিয়ে মিনে-করা শৈলশ্রেণীর নীল আক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন
জ্যোতিষীরা বলে, সবিতার আত্মদান-যজ্ঞের হোমাগ্নিবেদিতলে যে জ্যোতি উৎসর্গ হয় মহারুদ্রতপে এ বিশ্বের মন্দিরমণ্ডপে, অতিতুচ্ছ অংশ তার ঝরে পৃথিবীর অতিক্ষুদ্র মৃৎপাত্রের 'পরে। অবশিষ্ট অমেয় আলোকধারা পথহারা, আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কে বলে সব ফেলে যাবি
কে বলে সব ফেলে যাবি মরণ হাতে ধরবে যবে। জীবনে তুই যা নিয়েছিস মরণে সব নিতে হবে। এই ভরা ভাণ্ডারে এসে শূন্য কি তুই যাবি শেষে। নেবার মতো যা আছে তোর ভালো করে নেই তুই তবে। আবর্জনার অনেক বোঝা জমিয়েছিস যে নিরব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো
কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো। বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো। রয়েছে দীপ না আছে শিখা, এই কি ভালে ছিল রে লিখা– ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো। বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো। বেদনাদূতী গাহিছে, “ওরে প্রাণ, তোমার লাগি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন মার’ সিঁধ-কাটা ধূর্তে
কেন মার’ সিঁধ-কাটা ধূর্তে। কাজ ওর দেয়ালটা খুঁড়তে। তোমার পকেটটাকে করেছ কি ডোবা হে– চিরদিন বহমান অর্থের প্রবাহে বাধা দেবে অপরের পকেটটি পূরতে? আর, যত নীতিকথা সে তো ওর চেনা না– ওর কাছে অর্থনীতিটা নয় জেনান...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কো তুঁহু বোলবি মোয়
কো তুঁহু বোলবি মোয় ! হৃদয়মাহ মঝু জাগসি অনুখন , আঁখউপর তুঁহু রচলহি আসন , অরুণ নয়ন তব মরমসঙে মম নিমিখ ন অন্তর হোয় । কো তুঁহু বোলবি মোয় ! হৃদয়কমল তব চরণে টলমল , নয়নযুগল মম উছলে ছলছল , প্রেমপূর্ণ ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেমন সুন্দর আহা ঘুমায়ে রয়েছে
কেমন সুন্দর আহা ঘুমায়ে রয়েছে চাঁদের জোছনা এই সমুদ্রবেলায়! এসো প্রিয়ে এইখানে বসি কিছুকাল; গীতস্বর মৃদু মৃদু পশুক শ্রবণে! সুকুমার নিস্তব্ধতা আর নিশীথিনী– সাজে ভালো মর্ম-ছোঁয়া সুধা-সংগীতেরে। বইস জেসিকা, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ
কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস। সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো, ধরায় আস। এই অকুল সংসারে দুঃখ-আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝংকারে। ঘোরবিপদ-মাঝে কোন্ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস। তুমি কাহা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্যান্ডীয় নাচ
সিংহলে সেই দেখেছিলেম ক্যান্ডিদলের নাচ; শিকড়গুলোর শিকড় ছিঁড়ে যেন শালের গাছ পেরিয়ে এল মুক্তিমাতাল খ্যাপা, হুংকার তার ছুটল আকাশ-ব্যাপা। ডালপালা সব দুড়্দাড়িয়ে ঘূর্ণি হাওয়ায় কহে-- নহে, নহে, নহে--...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা। নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা। আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে, উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে, আজ কিসের তরে নদীর চরে চখাচখির মেলা। ওরে যাবো না আজ ঘরে রে ভাই, যাবো ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ বারি ঝরে ঝর ঝর
আজ বারি ঝরে ঝর ঝর ভরা বাদরে। আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা কোথাও না ধরে। শালের বনে থেকে থেকে ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে, জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে মাঠের ‘পরে। আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে নৃত্য কে করে। ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুট...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে
আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে; চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে। হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠিছে ভীমা, ধাইতে ধাইতে লোপ ক’রে চলে সীমা, কোন্ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে, বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বজ্র বাজে। বরষার রূপ হেরি মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইতিহাসবিশারদ গণেশ ধুরন্ধর
ইতিহাসবিশারদ গণেশ ধুরন্ধর ইজারা নিয়েছে একা বম্বাই বন্দর। নিয়ে সাতজন জেলে দেখে মাপকাঠি ফেলে– সাগরমথনে কোথা উঠেছিল চন্দর, কোথা ডুব দিয়ে আছে ডানাকাটা মন্দর। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উজ্জ্বলে ভয় তার
উজ্জ্বলে ভয় তার, ভয় মিট্মিটেতে, ঝালে তার যত ভয় তত ভয় মিঠেতে। ভয় তার পশ্চিমে, ভয় তার পূর্বে, যে দিকে তাকায় ভয় সাথে সাথে ঘুরবে। ভয় তার আপনার বাড়িটার ইঁটেতে, ভয় তার অকারণে অপরের ভিটেতে। ভয় তার বাহিরেতে,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে কোরো না বিড়ম্বিত তারে। আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো, আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো, এই সংগীত-মুখরিত গগনে তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো। এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে
আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে তোমারেই ভালোবেসেছি। জনতা বাহিয়া চিরদিন ধরে শুধু তুমি আমি এসেছি। দেখি চারি দিক-পানে কী যে জেগে ওঠে প্রাণে– তোমার আমার অসীম মিলন যেন গো সকল খানে। কত যুগ এই আকাশে যাপিনু সে কথা অনেক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে গোপন তব চরণ ফেলে নিশার মতো নীরব ওহে সবার দিঠি এড়ায়ে এলে। প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি, বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি, নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে। কূজনহীন কাননভূমি, দুয়ার দেওয়া...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি হেরিতেছি আমি
আজি হেরিতেছি আমি, হে হিমাদ্রি, গভীর নির্জনে পাঠকের মতো তুমি বসে আছ অচল আসনে, সনাতন পুঁথিখানি তুলিয়া লয়েছ অঙ্ক’পরে। পাষাণের পত্রগুলি খুলিয়া গিয়াছে থরে থরে, পড়িতেছ একমনে। ভাঙিল গড়িল কত দেশ, গেল এল কত যু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কথা চাই, কথা চাই, হাঁকে
কথা চাই, কথা চাই, হাঁকে কথার বাজারে; কথাওয়ালা অাসে ঝাঁকে ঝাঁকে হাজারে হাজারে। প্রাণে তোর বাণী যদি থাকে মৌনে ঢাকিয়া রাখ্ তাকে মুখর এ হাটের মাঝারে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎসর্গ
বিজ্ঞানাচার্য শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু করকমলেষু বন্ধু, এ যে আমার লজ্জাবতী লতা কী পেয়েছে আকাশ হতে কী এসেছে বায়ুর স্রোতে পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে সে যে প্রাণের কথা। যত্নভরে খুঁজে খুঁজে তোমায় নিতে হবে বুঝ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আত্মাভিমান
আপনি কণ্টক আমি , আপনি জর্জর । আপনার মাঝে আমি শুধু ব্যথা পাই । সকলের কাছে কেন যাচি গো নির্ভর — গৃহ নাই , গৃহ নাই , মোর গৃহ নাই ! অতি তীক্ষ্ম অতি ক্ষুদ্র আত্ম – অভিমান সহিতে পারে না হায় তিল অসম্মান । আগ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি-কাহিনী (প্রথম সর্গ)
শুন কলপনা বালা, ছিল কোন কবি বিজন কুটীর-তলে। ছেলেবেলা হোতে তোমার অমৃত-পানে আছিল মজিয়া। তোমার বীণার ধ্বনি ঘুমায়ে ঘুমায়ে শুনিত, দেখিত কত সুখের স্বপন। একাকী আপন মনে সরল শিশুটি তোমারি কমল-বনে করিত গো খে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আত্মশত্রুতা
খোঁপা আর এলোচুলে বিবাদ হামাশা, পাড়ার লোকেরা জোটে দেখিতে তামাশা। খোঁপা কয় এলোচুল, কী তোমার ছিরি! এলো কয়, খোঁপা তুমি রাখো বাবুগিরি। খোঁপা কহে, টাক ধরে হই তবে খুশি। তুমি যেন কাটা পড়ো, এলো কয় রুষি। কবি মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি-কাহিনী (দ্বিতীয় সর্গ)
"এত কাল হে প্রকৃতি করিনু তোমার সেবা, তবু কেন এ হৃদয় পূরিল না দেবি? এখনো বুকের মাঝে রয়েছে দারুণ শূন্য, সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর? মনের মন্দির মাঝে প্রতিমা নাহিক যেন, শুধু এ আঁধার গৃহ রয়েছে পড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আধখানা বেল
আধখানা বেল খেয়ে কানু বলে,– “কোথা গেল বেল একখানা।’ আধা গেলে শুধু আধা বাকি থাকে, যত করি আমি ব্যাখ্যানা, সে বলে, “তাহলে মহা ঠকিলাম, আমি তো দিয়েছি ষোল আনা দাম।’– হাতে হাতে সেটা করিল প্রমাণ ঝাড়া দিয়ে তার ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আধা রাতে গলা ছেড়ে
আধা রাতে গলা ছেড়ে মেতেছিনু কাব্যে, ভাবিনি পাড়ার লোকে মনেতে কী ভাববে। ঠেলা দেয় জানলায়, শেষে দ্বার-ভাঙাভাঙি, ঘরে ঢুকে দলে দলে মহা চোখ-রাঙারাঙি– শ্রাব্য আমার ডোবে ওদেরই অশ্রাব্যে। আমি শুধু করেছিনু সামান্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনারে নিবেদন
আপনারে নিবেদন সত্য হয়ে পূর্ণ হয় যবে সুন্দর তখনি মূর্তি লভে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনারে তুমি করিবে গোপন
আপনারে তুমি করিবে গোপন কী করি। হৃদয় তোমার আঁখির পাতায় থেকে থেকে পড়ে ঠিকরি। আজ আসিয়াছ কৌতুকবেশে, মানিকের হার পরি এলোকেশে, নয়নের কোণে আধো হাসি হেসে এসেছ হৃদয়পুলিনে। ভুলি নে তোমার বাঁকা কটাক্ষে, ভুলি নে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মবাসরের ঘটে
জন্মবাসরের ঘটে নানা তীর্থে পুণ্যতীর্থবারি করিয়াছি আহরণ, এ কথা রহিল মোর মনে। একদা গিয়েছি চিন দেশে, অচেনা যাহারা ললাটে দিয়েছে চিহ্ন "তুমি আমাদের চেনা' ব'লে। খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ; দেখা দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সখী,ভাবনা কাহারে বলে
সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে । তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’— সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময় । সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুখের শ্বাস ? লোকে তবে করে ক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চেয়ে থাকা
মনেতে সাধ যে দিকে চাই কেবলি চেয়ে রব। দেখিব শুধু, দেখিব শুধু, কথাটি নাহি কব। পরানে শুধু জাগিবে প্রেম, নয়নে লাগে ঘোর, জগতে যেন ডুবিয়া রব হইয়া রব ভোর। তটিনী যায়, বহিয়া যায়, কে জানে কোথা যায়; তীরে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চৈত্রের সেতারে বাজে
চৈত্রের সেতারে বাজে বসন্তবাহার, বাতাসে বাতাসে উঠে তরঙ্গ তাহার। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছুটির দিনে
ওই দেখো মা, আকাশ ছেয়ে মিলিয়ে এল আলো, আজকে আমার ছুটোছুটি লাগল না আর ভালো। ঘণ্টা বেজে গেল কখন, অনেক হল বেলা। তোমায় মনে পড়ে গেল, ফেলে এলেম খেলা। আজকে আমার ছুটি, আমার শনিবারের ছুটি। কাজ যা আছে সব রেখে আয় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সন্দেহের কারণ
কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি।— তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সত্য
১ ভয়ে ভয়ে ভ্রমিতেছি মানবের মাঝে হৃদয়ের আলোটুকু নিবে গেছে ব’লে ! কে কী বলে তাই শুনে মরিতেছি লাজে , কী হয় কী হয় ভেবে ভয়ে প্রাণ দোলে ! ‘ আলো’ ‘আলো’ খুঁজে মরি পরের নয়নে , ‘ আলো’ ‘আলো’ খুঁজে খুঁজে কাঁদি পথ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সতিমির রজনি, সচকিত সজনী
সতিমির রজনী , সচকিত সজনী, শূন্য নিকুঞ্জঅরণ্য । কলয়িত মলয়ে , সুবিজন নিলয়ে বালা বিরহবিষণ্ন ! নীল আকাশে তারক ভাসে , যমুনা গাওত গান , পাদপ মরমর , নির্ঝর ঝরঝর, কুসুমিত বল্লিবিতান । তৃষিত নয়ানে বনপথপানে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছল
তোমারে পাছে সহজে বুঝি তাই কি এত লীলার ছল - বাহিরে যবে হাসির ছটা ভিতরে থাকে আঁখির জল। বুঝি গো আমি, বুঝি গো তব ছলনা - যে কথা তুমি বলিতে চাও সে কথা তুমি বল না।। তোমারে পাছে সহজে ধরি কিছুরই তব কিনারা নাই ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চুরি-নিবারণ
সুয়োরাণী কহে, রাজা দুয়োরাণীটার কত মতলব আছে বুঝে ওঠা ভার। গোয়াল্-ঘরের কোণে দিলে ওরে বাসা, তবু দেখো অভাগীর মেটে নাই আশা। তোমারে ভুলায়ে শুধু মুখের কথায় কালো গরুটিরে তব দুয়ে নিতে চায়। রাজা বলে, ঠিক ঠিক, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সন্ধ্যারবি মেঘে দেয়
সন্ধ্যারবি মেঘে দেয় নাম সই করে। লেখা তার মুছে যায়, মেঘ যায় সরে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সন্ধ্যা
ক্ষান্ত হও, ধীরে কও কথা। ওরে মন, নত করো শির। দিবা হল সমাপন, সন্ধ্যা আসে শান্তিময়ী। তিমিরের তীরে অসংখ্য-প্রদীপ-জ্বালা এ বিশ্বমন্দিরে এল আরতির বেলা। ওই শুন বাজে নিঃশব্দ গম্ভীর মন্দ্রে অনন্তের মাঝে শঙ্খ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে
সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে জুটল চুপিচুপি গোপেন্দ্র মুস্তুফি। রাত্রে যখন ফিরল ঘরে সবাই দেখে তারিফ করে– পাগড়িতে তার জুতোজোড়া, পায়ে রঙিন টুপি। এই উপদেশ দিতে এল– সব করা চাই এলোমেলো, “মাথায় পায়ে রাখব না ভেদ’ চেঁচ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছায়াসঙ্গিনী
কোন্ ছায়াখানি সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী তুমি কি আপনি তাহা জানো। চোখের দৃষ্টিতে তব রয়েছে বিছানো। আপনাবিস্মৃত তারি। স্তম্ভিত স্তিমিত অশ্রুবারি। একদিন জীবনের প্রথম ফাল্গুনী এসেছিল, তুমি তারি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনে তব প্রভাত এল
জীবনে তব প্রভাত এল নব-অরুণকান্তি। তোমারে ঘেরি মেলিয়া থাক শিশিরে-ধোওয়া শান্তি। মাধুরী তব মধ্যদিনে শক্তিরূপ ধরি কর্মপটু কল্যাণের করুক দূর ক্লান্তি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জগৎ জুড়ে উদার সুরে
জগৎ জুড়ে উদার সুরে আনন্দগান বাজে, সে গান কবে গভীর রবে বাজিবে হিয়া-মাঝে। বাতাস জল আকাশ আলো সবারে কবে বাসিব ভালো, হৃদয়সভা জুড়িয়া তারা বসিবে নানা সাজে। নয়নদুটি মেলিলে কবে পরান হবে খুশি, যে পথ দিয়া চলিয়া ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সময় আসন্ন হলে
সময় আসন্ন হলে আমি যাব চলে, হৃদয় রহিল এই শিশু চারাগাছে— এর ফুলে, এর কচি পল্লবের নাচে অনাগত বসন্তের আনন্দের আশা রাখিলাম আমি হেথা নাই থাকিলাম। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সময়হারা
যত ঘণ্টা , যত মিনিট , সময় আছে যত শেষ যদি হয় চিরকালের মতো , তখন স্কুলে নেই বা গেলেম ; কেউ যদি কয় মন্দ , আমি বলব , ' দশটা বাজাই বন্ধ । ' তাধিন তাধিন তাধিন । শুই নে বলে রাগিস যদি , আমি বলব তোরে , ' রাত ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সময়হারা
খবর এল , সময় আমার গেছে , আমার-গড়া পুতুল যারা বেচে বর্তমানে এমনতরো পসারী নেই ; সাবেক কালের দালানঘরের পিছন কোণেই ক্রমে ক্রমে উঠছে জমে জমে আমার হাতের খেলনাগুলো , টানছে ধুলো । হাল আমলের ছাড়পত্রহীন অকিঞ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি
আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি মনে হয় এ যেন আমার প্রথম দেখা। আমি দেখলেম নবীনকে, প্রতিদিনের ক্লান্ত চোখ যার দর্শন হারিয়েছে। কল্পনা করছি,-- অনাগত যুগ থেকে তীর্থযাত্রী আমি ভেসে এসেছি মন্ত্রবলে। উজান স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমালোচক
বাবা নাকি বই লেখে সব নিজে। কিছুই বোঝা যায় না লেখেন কী যে! সেদিন পড়ে শোনাচ্ছিলেন তোরে, বুঝেছিলি? - বল্ মা, সত্যি করে। এমন লেখায় তবে বল্ দেখি কী হবে।। তোর মুখে মা, যেমন কথা শুনি তেমন কেন লেখেন নাকো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমুদ্র
কিসের অশান্তি এই মহাপারাবারে , সতত ছিঁড়িতে চাহে কিসের বন্ধন ! অব্যক্ত অস্ফুট বাণী ব্যক্ত করিবারে শিশুর মতন সিন্ধু করিছে ক্রন্দন । যুগযুগান্তর ধরি যোজন যোজন ফুলিয়া ফুলিয়া উঠে উত্তাল উচ্ছ্বাস — অশান্ত ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছয়
অতিথিবৎসল, ডেকে নাও পথের পথিককে তোমার আপন ঘরে, দাও ওর ভয় ভাঙিয়ে। ও থাকে প্রদোষের বস্তিতে, নিজের কালো ছায়া ওর সঙ্গে চলে কখনো সমুখে কখনো পিছনে, তাকেই সত্য ভেবে ওর যত দুঃখ যত ভয়। দ্বারে দাঁড়িয়ে তো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জড়ায়ে আছে বাধা ছাড়ায়ে যেতে চাই
জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই, ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে। মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই চাহিতে গেলে মরি লাজে। জানি হে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম, এমন ধন আর নাহি যে তোমা-সম, তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পোরা ফ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাত সমুদ্র পারে
দেখছ না কি , নীল মেঘে আজ আকাশ অন্ধকার । সাত সমুদ্র তেরো নদী আজকে হব পার । নাই গোবিন্দ , নাই মুকুন্দ , নাইকো হরিশ খোঁড়া । তাই ভাবি যে কাকে আমি করব আমার ঘোড়া । কাগজ ছিঁড়ে এনেছি এই বাবার খাতা থেকে , নৌকো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেদিন আমার জন্মদিন
সেদিন আমার জন্মদিন। প্রভাতের প্রণাম লইয়া উদয়দিগন্ত-পানে মেলিলাম আঁখি, দেখিলাম সদ্যস্নাত উষা আঁকি দিল আলোকচন্দনলেখা হিমাদ্রির হিমশুভ্র পেলব ললাটে। যে মহাদূরত্ব আছে নিখিল বিশ্বের মর্মস্থানে তারি আজ দে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সামান্য ক্ষতি
বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস, স্বচ্ছসলিলা বরুণা। পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জনে শিলাময় ঘাট চম্পকবনে, স্নানে চলেছেন শতসখীসনে কাশীর মহিষী করুণা। সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতে জনহীন রাজশাসনে। নিকটে যে ক'টি আছিল ক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাত ভাই চম্পা
সাতটি চাঁপা সাতটি গাছে, সাতটি চাঁপা ভাই— রাঙা - বসন পারুলদিদি, তুলনা তার নাই। সাতটি সোনা চাঁপার মধ্যে সাতটি সোনা মুখ, পারুলদিদির কচি মুখটি করতেছে টুক্টুক্। ঘুমটি ভাঙে পাখির ডাকে, রাতটি যে পোহালো— ভো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাধারণ মেয়ে
আমি অন্তঃপুরের মেয়ে, চিনবে না আমাকে। তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাবু, "বাসি ফুলের মালা'। তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরণ-দশা ধরেছিল পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। পঁচিশ বছর বয়সের সঙ্গে ছিল তার রেষারেষি, দেখলেম তুম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছোটো ফুল
আমি শুধু মালা গাঁথি ছোটো ছোটো ফুলে , সে ফুল শুকায়ে যায় কথায় কথায় ! তাই যদি , তাই হোক , দুঃখ নাহি তায় — তুলিব কুসুম আমি অনন্তের কূলে । যারা থাকে অন্ধকারে , পাষাণকারায় , আমার এ মালা যদি লহে গলে তুলে , ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন
জন্ম মৃত্যু দোঁহে মিলে জীবনের খেলা, যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা পা-ফেলা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি জন্মবাসরের বক্ষ ভেদ করি
আজি জন্মবাসরের বক্ষ ভেদ করি প্রিয়মৃত্যুবিচ্ছেদের এসেছে সংবাদ; আপন আগুনে শোক দগ্ধ করি দিল আপনারে উঠিল প্রদীপ্ত হয়ে। সায়াহ্নবেলার ভালে অস্তসূর্য দেয় পরাইয়া রক্তোজ্জল মহিমার টিকা, স্বর্ণময়ী করে দেয...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সার্থক জনম আমার
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালবেসে।। জানিনে তোর ধনরতন আছে কিনা রানীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।। কোন্ বনেতে জানিনে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল, কোন্ গগনে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সিংহাসনতলচ্ছায়ে দূরে দূরান্তরে
সিংহাসনতলচ্ছায়ে দূরে দূরান্তরে য়ে রাজ্য জানায় স্পর্ধাভরে রাজায় প্রজায় ভেদ মাপা, পায়ের তলায় রাখে সর্বনাশ চাপা। হতভাগ্য যে রাজ্যের সুবিস্তীর্ণ দৈন্যজীর্ণ প্রাণ রাজমুকুটের নিত্য করিছে কুৎসিত অপমান...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সার্থকতা
ফাল্গুনের সূর্য যবে দিল কর প্রসারিয়া সঙ্গীহীন দক্ষিণ অর্ণবে, অতল বিরহ তার যুগযুগান্তের উচ্ছ্বসিয়া ছুটে গেল নিত্য-অশান্তের সীমানার ধারে; ব্যথার ব্যথিত কারে ফিরিল খুঁজিয়া, বেড়ালো যুঝিয়া আপন তরঙ্গদল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুখী প্রাণ
জান না তো নির্ঝরিণী, আসিয়াছ কোথা হতে, কোথায় যে করিছ প্রয়াণ, মাতিয়া চলেছ তবু আপন আনন্দে পূর্ণ, আনন্দ করিছ সবে দান। বিজন-অরণ্য-ভূমি দেখিছে তোমার খেলা জুড়াইছে তাহার নয়ান। মেষ-শাবকের মতো তরুদের ছায়ে ছায়ে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুখস্বপ্ন
ওই জানালার কাছে বসে আছে করতলে রাখি মাথা । তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে , সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা । শুধু ঝুরু ঝুরু বায়ু বহে যায় , তার কানে কানে কী যে কহে যায় , তাই আধো শুয়ে আধো বসিয়ে কত ভাবিতেছে আন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুখদুঃখ
শ্রাবণের মোটা ফোঁটা বাজিল যূথীরে— কহিল, মরিনু হায় কার মৃত্যুতীরে! বৃষ্টি কহে, শুভ আমি নামি মর্তমাঝে, কারে সুখরূপে লাগে কারে দুঃখ বাজে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সিন্ধুপারে
পউষ প্রখর শীতে জর্জর, ঝিল্লিমুখর রাতি; নিদ্রিত পুরী, নির্জন ঘর, নির্বাণদীপ বাতি। অকাতর দেহে আছিনু মগন সুখনিদ্রার ঘোরে-- তপ্ত শয্যা প্রিয়ার মতন সোহাগে ঘিরেছে মোরে। হেনকালে হায় বাহির হইতে কে ডাকিল মোর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্পষ্ট সত্য
সংসার কহিল, মোর নাহি কপটতা, জন্মমৃত্যু, সুখদুঃখ, সবই স্পষ্ট কথা। আমি নিত্য কহিতেছি যথাসত্য বাণী, তুমি নিত্য লইতেছ মিথ্যা অর্থখানি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তত্ত্ব ও সৌন্দর্য
শুনিয়াছি নিম্নে তব, হে বিশ্বপাথার, নাহি অন্ত মহামূল্য মণিমুকুতার। নিশিদিন দেশে দেশে পন্ডিত ডুবারি রত রহিয়াছে কত অন্বেষণে তারি। তাহে মোর নাহি লোভ মহাপারাবার! যে আলোক জ্বলিতেছে উপরে তোমার, যে রহস্য দুলি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জয়ধ্বনি
যাবার সময় হলে জীবনের সব কথা সেরে শেষবাক্যে জয়ধ্বনি দিয়ে যাব মোর অদৃষ্টেরে। বলে যাব, পরমক্ষণের আশীর্বাদ বারবার আনিয়াছে বিস্ময়ের অপূর্ব আস্বাদ। যাহা রুগ্ন, যাহা ভগ্ন, যাহা মগ্ন পঙ্কস্তরতলে আত্মপ্রব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুসময়
শোকের বরষা দিন এসেছে আঁধারি— ও ভাই গৃহস্থ চাষি, ছেড়ে আয় বাড়ি। ভিজিয়া নরম হল শুষ্ক মরু মন, এই বেলা শস্য তোর করে নে বপন। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুপ্তোত্থিতা
ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম, উঠিল কলস্বর । গাছের শাখে জাগিল পাখি, কুসুমে মধুকর । অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া, হস্তীশালে হাতি । মল্লশালে মল্ল জাগি ফুলায় পুন ছাতি । জাগিল পথে প্রহরীদল, দুয়ারে জাগে দ্বারী, আকাশে চেয...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সূর্য ও ফুল
মহীয়সী মহিমার আগ্নেয় কুসুম সূর্য , ধায় লভিবারে বিশ্রামের ঘুম । ভাঙা এক ভিত্তি- ' পরে ফুল শুভ্রবাস , চারি দিকে শুভ্রদল করিয়া বিকাশ মাথা তুলে চেয়ে দেখে সুনীল বিমানে অমর আলোকময় তপনের পানে , ছোটো মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বপ্ন
কাল রাতে দেখিনু স্বপন — দেবতা - আশিস - সম শিয়রে সে বসি মম মুখে রাখি করুণনয়ন কোমল অঙ্গুলি শিরে বুলাইছে ধীরে ধীরে সুধামাখা প্রিয় - পরশন — কাল রাতে হেরিনু স্বপন । হেরি সেই মুখপানে বেদনা ভরিল প্রাণে দুই চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুপ্রভাত
রুদ্র , তোমার দারুণ দীপ্তি এসেছে দুয়ার ভেদিয়া ; বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎবাণ স্বপ্নের জাল ছেদিয়া । ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি , অন্ধ তামস গেছে কিনা ছুটি , রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি তন্দ্রা-জড়িমা মাজিয়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়
দেশশূন্য কালশূন্য জ্যোতিঃশূন্য, মহাশূন্য-'পরি চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান, মহা অন্ধ অন্ধকার সভয়ে রয়েছে দাঁড়াইয়া-- কবে দেব খুলিবে নয়ান। অনন্ত হৃদয়-মাঝে আসন্ন জগৎ-চরাচর দাঁড়াইয়া স্তম্ভিত নিশ্চল, অনন্ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনবহনভাগ্য নিত্য আশীর্বাদে
জীবনবহনভাগ্য নিত্য আশীর্বাদে ললাট করুক স্পর্শ অনাদি জ্যোতির দান-রূপে-- নব নব জাগরণে প্রভাতে প্রভাতে মর্ত এ আয়ুর সীমানায়। ম্লানিমার ঘন আবরণ দিনে দিনে পড়ুক খসিয়া অমর্তলোকের দ্বারে নিদ্রায় জড়িত রাত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তত্ত্বজ্ঞানহীন
যার খুশি রুদ্ধচক্ষে করো বসি ধ্যান, বিশ্ব সত্য কিম্বা ফাঁকি লভ সেই জ্ঞান। আমি ততক্ষণ বসি তৃপ্তিহীন চোখে বিশ্বেরে দেখিয়া লই দিনের আলোকে। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেতারের তারে
সেতারের তারে ধানশি মিড়ে মিড়ে উঠে বাজিয়া। গোধূলির রাগে মানসী স্বরে যেন এল সাজিয়া। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বর্গ হইতে বিদায়
ম্লান হয়ে এলো কণ্ঠে মন্দারমালিকা, হে মহেন্দ্র, নির্বাপিত জ্যোতির্ময় টিকা মলিন ললাটে। পুণ্যবল হল ক্ষীণ, আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন, হে দেব, হে দেবীগণ। বর্ষ লক্ষশত যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মতো দেবলোক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেদিন আমাদের ছিল খোলা সভা
সেদিন আমাদের ছিল খোলা সভা আকাশের নিচে রাঙামাটির পথের ধারে। ঘাসের 'পরে বসেছে সবাই। দক্ষিণের দিকে শালের গাছ সারি সারি, দীর্ঘ, ঋজু, পুরাতন,-- স্তব্ধ দাঁড়িয়ে, শুক্লনবমীর মায়াকে উপেক্ষা ক'রে;-- দূরে কোক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সে লড়াই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই
সে লড়াই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই যে যুদ্ধে ভাইকে মারে ভাই। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৃষ্টিলীলাপ্রাঙ্গনের প্রান্তে দাঁড়াইয়া
সৃষ্টিলীলাপ্রাঙ্গণের প্রান্তে দাঁড়াইয়া দেখি ক্ষণে ক্ষণে তমসের পরপার, যেথা মহা-অব্যক্তের অসীম চৈতন্যে ছিনু লীন। আজি এ প্রভাতকালে ঋষিবাক্য জাগে মোর মনে। করো করো অপাবৃত হে সূর্য,আলোক-আবরণ, তোমার অন্তরত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জানার বাঁশি হাতে নিয়ে
জানার বাঁশি হাতে নিয়ে না-জানা বাজান তাঁহার নানা সুরের বাজানা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্ঞানের দৃষ্টি ও প্রেমের সম্ভোগ
‘কালো তুমি’— শুনি জাম কহে কানে কানে, যে আমারে দেখে সেই কালো বলি জানে, কিন্তু সেটুকু জেনে ফের কেন জাদু? যে আমারে খায় সেই জানে আমি স্বাদু। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বাধীনতা
শর ভাবে, ছুটে চলি, আমি তো স্বাধীন, ধনুকটা একঠাঁই বদ্ধ চিরদিন। ধনু হেসে বলে, শর, জান না সে কথা— আমারি অধীন জেনো তব স্বাধীনতা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সোনায় রাঙায় মাখামাখি
সোনায় রাঙায় মাখামাখি, রঙের বাঁধন কে দেয় রাখি পথিক রবির স্বপন ঘিরে। পেরোয় যখন তিমিরনদী তখন সে রঙ মিলায় যদি প্রভাতে পায় আবার ফিরে। অস্ত-উদয়-রথে রথে যাওয়া-আসার পথে পথে দেয় সে অাপন আলো ঢালি। পায়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্তুতি নিন্দা
স্তুতি নিন্দা বলে আসি, গুণ মহাশয়, আমরা কে মিত্র তব? গুণ শুনি কয়, দুজনেই মিত্র তোরা শত্রু দুজনেই— তাই ভাবি শত্রু মিত্র কারে কাজ নেই। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৌন্দর্যের সংযম
নর কহে, বীর মোরা যাহা ইচ্ছা করি। নারী কহে জিহ্বা কাটি, শুনে লাজে মরি! পদে পদে বাধা তব, কহে তারে নর। কবি কহে, তাই নারী হয়েছে সুন্দর। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সোনার তরী
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা-- কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা--- চারি দিকে বাঁকা জল করিছে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেদিন কি তুমি এসেছিলে ওগো
সেদিন কি তুমি এসেছিলে ওগো, সে কি তুমি, মোর সভাতে। হাতে ছিল তব বাঁশি, অধরে অবাক হাসি, সেদিন ফাগুন মেতে উঠেছিল মদবিহ্বল শোভাতে। সে কি তুমি ওগো, তুমি এসেছিলে সেদিন নবীন প্রভাতে– নবযৌবনসভাতে। সেদিন আমার য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্কুল-পালানে
মাস্টারি-শাসনদুর্গে সিঁধকাটা ছেলে ক্লাসের কর্তব্য ফেলে জানি না কী টানে ছুটিতাম অন্দরের উপেক্ষিত নির্জন বাগানে । পুরোনো আমড়াগাছ হেলে আছে পাঁচিলের কাছে , দীর্ঘ আয়ু বহন করিছে তার পুঞ্জিত নিঃশব্দ স্মৃতি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বর্গ হইতে বিদায়
ম্লান হয়ে এল কণ্ঠে মন্দারমালিকা, হে মহেন্দ্র, নির্বাপিত জ্যোতির্ময় টিকা মলিন ললাটে। পুণ্যবল হল ক্ষীণ, আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন, হে দেব, হে দেবীগণ। বর্ষ লক্ষশত যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মতো দেবল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জান তুমি রাত্তিরে
জান তুমি, রাত্তিরে নাই মোর সাথি আর– ছোটোবউ, জেগে থেকো, হাতে রেখো হাতিয়ার। যদি করে ডাকাতি, পারিনে যে তাকাতেই, আছে এক ভাঙা বেত আছে ছেঁড়া ছাতি আর। ভাঙতে চায় না ঘুম, তা না হলে দুমাদুম্ লাগাতেম কিল ঘুষি চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্বালো নবজীবনেব
জ্বালো নবজীবনেব নির্মল দীপিকা, মর্তের চোখে ধরো স্বর্গের লিপিকা। আঁধারগহনে রচো আলোকের বীথিকা, কলকোলাহলে আনো অমৃতের গীতিকা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্পর্ধা
হাউই কহিল, মোর কী সাহস, ভাই, তারকার মুখে আমি দিয়ে আসি ছাই! কবি কহে, তার গায়ে লাগে নাকো কিছু, সে ছাই ফিরিয়া আসে তোরি পিছু পিছু। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্পর্শমণি
নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে জপিছেন নাম, হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে করিল প্রণাম। শুধালেন সনাতন, 'কোথা হতে আগমন, কী নাম ঠাকুর?' বিপ্র কহে, 'কিবা কব, পেয়েছি দর্শন তব ভ্রমি বহুদূর। জীবন আমার নাম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডুবারি যে সে কেবল
ডুবারি যে সে কেবল ডুব দেয় তলে। যেজন পারের যাত্রী সেই ভেসে চলে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বপ্নরুদ্ধ
নিষ্ফল হয়েছি আমি সংসারের কাজে, লোকমাঝে আঁখি তুলে পারি না চাহিতে। ভাসায়ে জীবনতরী সাগরের মাঝে তরঙ্গ লঙ্ঘন করি পারি না বাহিতে। পুরুষের মতো যত মানবের সাথে যোগ দিতে পারি নাকো লয়ে নিজ বল, সহস্র সংকল্প শু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বপ্ন হঠাৎ উঠল রাতে
স্বপ্ন হঠাৎ উঠল রাতে প্রাণ পেয়ে, মৌন হতে ত্রাণ পেয়ে। ইন্দ্রলোকের পাগ্লাগারদ খুলল তারই দ্বার, পাগল ভুবন দুর্দাড়িয়া ছুটল চারিধার– দারুণ ভয়ে মানুষগুলোর চক্ষে বারিধার, বাঁচল আপন স্বপন হতে খাটের তলায় স্থা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বার্থ
কে রে তুই, ওরে স্বার্থ, তুই কতটুকু, তোর স্পর্শে ঢেকে যায় ব্রহ্মান্ডের মুখ, লুকায় অনন্ত সত্য—স্নেহ সখ্য প্রীতি মুহূর্তে ধারণ করে নির্লজ্জ বিকৃতি, থেমে যায় সৌন্দর্যের গীতি চিরন্তন তোর তুচ্ছ পরিহাসে। ওগো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনদেবতা তব
জীবনদেবতা তব দেহে মনে অন্তরে বাহিরে আপন পূজার ফুল আপনি ফুটান ধীরে ধীরে মাধুর্যে সৌরভে তারি অহোরাত্র রহে যেন ভরি তোমার সংসারখানি, এই আমি আশীর্বাদ করি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্যোতিষ-শাস্ত্র
আমি শুধু বলেছিলেম— ‘কদম গাছের ডালে পূর্ণিমা-চাঁদ আটকা পড়ে যখন সন্ধেকালে তখন কি কেউ তারে ধরে আনতে পারে। ' শুনে দাদা হেসে কেন বললে আমায়, ‘ খোকা, তোর মতো আর দেখি নাইকো বোকা। চাঁদ যে থাকে অনেক দূরে কেমন ক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতিকাপালিনী পূজারতা, একমনা
স্মৃতিকাপালিনী পূজারতা, একমনা, বর্তমানেরে বলি দিয়া করে অতীতের অর্চনা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতি-পাথেয়
একদিন কোন্ তুচ্ছ আলাপের ছিন্ন অবকাশে সে কোন্ অভাবনীয় স্মিতহাসে অন্যমনা আত্মভোলা যৌবনেরে দিয়ে ঘন দোলা মুখে তব অকস্মাৎ প্রকাশিল কী অমৃত-রেখা কভু যার পাই নাই দেখা, দুর্লভ সে প্রিয় অনির্বচনীয়। হে মহ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতি
ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি । সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে, জন্মজন্মান্তের যেন বসন্তের গীতি । যেন গো আমারি তুমি আত্মবিস্মরণ, অনন্ত কালের মোর সুখ দুঃখ শোক, কত নব জগতের কুসু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাসিমুখে শুকতারা
হাসিমুখে শুকতারা লিখে গেল ভোররাতে আলোকের আগমনী অাঁধারের শেষপাতে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতির ভূমিকা
আজি এই মেঘমুক্ত সকালের স্নিগ্র্ধ নিরালায় অচেনা গাছের যত ছিন্ন ছিন্ন ছায়ার ডালায় রৌদ্রপুঞ্জ আছে ভরি। সারাবেলা ধরি কোন্ পাখি আপনারি সুরে কুতূহলী আলস্যের পেয়ালায় ঢেলে দেয় অস্ফুট কাকলি। হঠাৎ কী হল ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝড়
দেখ্ রে চেয়ে নামল বুঝি ঝড়, ঘাটের পথে বাঁশের শাখা ঐ করে ধড়ফড়। আকাশতলে বজ্রপাণির ডঙ্কা উঠল বাজি, শীঘ্র তরী বেয়ে চল্ রে মাঝি। ঢেউয়ের গায়ে ঢেউগুলো সব গড়ায় ফুলে ফুলে, পুবের চরে কাশের মাথা উঠছে দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হম সখি দারিদ নারী
হম সখি দারিদ নারী ! জনম অবধি হম পীরিতি করনু মোচনু লোচন - বারি । রূপ নাহি মম , কছুই নাহি গুণ দুখিনী আহির জাতি , নাহি জানি কছু বিলাস - ভঙ্গিম যৌবন গরবে মাতি । অবলা রমণী , ক্ষুদ্র হৃদয় ভরি পীরিত করনে জা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হরপণ্ডিত বলে ব্যঞ্জন সন্ধি এ
হরপণ্ডিত বলে, “ব্যঞ্জন সন্ধি এ, পড়ো দেখি, মনুবাবা, একটুকু মন নিয়ে।’ মনোযোগহন্ত্রীর বেড়ি আর খন্তির ঝংকার মনে পড়ে; হেঁসেলের পন্থার ব্যঞ্জন-চিন্তায় অস্থির মন তার। থেকে থেকে জল পড়ে চক্ষুর কোণ দিয়ে। (খাপছা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হম যব না রব সজনী
হম যব না রব, সজনী, নিভৃত বসন্তনিকুঞ্জবিতানে আসবে নির্মল রজনী— মিলনপিপাসিত আসবে যব, সখি, শ্যাম হমারি আশে, ফুকারবে যব ‘রাধা রাধা’ মুরলি ঊরধ শ্বাসে, যব সব গোপিনী আসবে ছুটই যব হম আওব না, যব সব গোপিনী জাগব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হঠাৎ দেখা
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন। আগে ওকে বারবার দেখেছি লালরঙের শাড়িতে- দালিম-ফুলের মতো রাঙা; আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, আঁচল তুলেছে মাথায় দোলন-চাঁপার মতো চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে। মন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন যখন শুকায়ে যায়
জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো। সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসো। কর্ম যখন প্রবল-আকার গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার, হৃদয়প্রান্তে হে নীরব নাথ, শান্তচরণে এসো। আপনারে যবে করিয়া কৃপণ কোণে পড়ে থাকে দী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাতে-কলমে
বোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক, এরই তরে মধুকর এত করে জাঁক! মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই, আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাসিরাশি
নাম রেখেছি বাব্লারানী, একরত্তি মেয়ে। হাসিখুশি চাঁদের আলো মুখটি আছে ছেয়ে। ফুট্ফুটে তার দাঁত কখানি, পুট্পুটে তার ঠোঁট। মুখের মধ্যে কথাগুলি সব উলোটপালোট। কচি কচি হাত দুখানি, কচি কচি মুঠি, মুখ নেড়ে কেউ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হার-জিত
ভিমরুলে মৌমাছিতে হল রেষারেষি, দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি। ভিমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ তোমার দংশন নহে আমার সমান। মধুকর নিরুত্তর ছলছল-আঁখি— বনদেবী কহে তারে কানে কানে ডাকি, কেন বাছা, নতশির! এ কথা নিশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাত দিয়ে পেতে হবে
হাত দিয়ে পেতে হবে কী তাহে আনন্দ– হাত পেতে পাওয়া যাবে সেটাই পছন্দ। আপিসেতে খেটে মরা তার চেয়ে ঝুলি ধরা ঢের ভালো– এ কথায় নাই কোনো সন্দ। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাজারিবাগের ঝোপে হাজারটা হাই
হাজারিবাগের ঝোপে হাজারটা হাই তুলেছিল হাজারটা বাঘে, ময়মন্সিংহের মাসতুত ভাই গর্জি উঠিল তাই রাগে। খেঁকশেয়ালের দল শেয়ালদহর হাঁচি শুনে হেসে মরে অষ্টপ্রহর, হাতিবাগানের হাতি ছাড়িয়া শহর ভাগলপুরের দিকে ভাগে– ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তব সিংহাসনের আসন হতে
তব সিংহাসনের আসন হতে এলে তুমি নেমে, মোরবিজন ঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়ালে নাথ থেমে। একলা বসে আপন-মনে গাইতেছিলেম গান, তোমার কানে গেল সে সুর এলে তুমি নেমে, মোর বিজন ঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়ালে নাথ থেমে। তোমার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন উৎসর্গ
এসো এসো এই বুকে নিবাসে তোমার, যূথভ্রষ্ট বাণবিদ্ধ হরিণী আমার, এইখানে বিরাজিছে সেই চির হাসি, আঁধারিতে পারিবে না তাহা মেঘরাশি। এই হস্ত এ হৃদয় চিরকাল মতো তোমার, তোমারি কাজে রহিবে গো রত! কিসের সে চিরস্থায়ী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জানা-অজানা
এই ঘরে আগে পাছে বোবা কালা বস্তু যত আছে দলবাঁধা এখানে সেখানে , কিছু চোখে পড়ে , কিছু পড়ে না মনের অবধানে । পিতলের ফুলদানিটাকে বহে নিয়ে টিপাইটা এক কোণে মুখ ঢেকে থাকে । ক্যাবিনেটে কী যে আছে কত , না জানা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হালকা আমার স্বভাব
হালকা আমার স্বভাব, মেঘের মতো না হোক গিরিনদীর মতো। আমার মধ্যে হাসির কলরব আজও থামল না। বেদীর থেকে নেমে আসি, রঙ্গমঞ্চে বসে বাঁধি নাচের গান, তার বায়না নিয়েছি প্রভুর কাছে। কবিতা লিখি, তার পদে পদে ছন্দের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ
জ্বল্ জ্বল্ চিতা! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ, পরাণ সঁপিবে বিধবা-বালা। জ্বলুক্ জ্বলুক্ চিতার আগুন, জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা॥ শোন্ রে যবন!-- শোন্ রে তোরা, যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে, সাক্ষী র'লেন দেবত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ট্রাম্-কন্ডাক্টার
ট্রাম্-কন্ডাক্টার, হুইসেলে ফুঁক দিয়ে শহরের বুক দিয়ে বারো-আনা বাকি তার মাথাটার তেলো যে, চিরুনির চালাচালি শেষ হয়ে এল যে। বিধাতার নিজ হাতে ঝাঁট-দেওয়া ফাঁকটার কিছু চুল দুপাশেতে ফুটপাত আছে পেতে, মাঝে বড়ো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তখন বয়স ছিল কাঁচা
তখন বয়স ছিল কাঁচা; কতদিন মনে মনে এঁকেছি নিজের ছবি, বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার, জিন নেই, লাগাম নেই, ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে ভরসন্ধ্যেবেলায়; ঘোড়ার খুরে উড়ছে ধুলো ধরণী যেন পিছু ডাকছে আঁচল দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হিন্দুমেলার উপহার
১ হিমাদ্রি শিখরে শিলাসন - ' পরি , গান ব্যাসঋষি বীণা হাতে করি — কাঁপায়ে পর্বত শিখর কানন , কাঁপায়ে নীহারশীতল বায় । ২ স্তব্ধ শিখর স্তব্ধ তরুলতা , স্তব্ধ মহীরূহ নড়েনাকো পাতা । বিহগ নিচয় নিস্তব্ধ অচল ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হিং টিং ছট্
স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ — অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ। শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাদঁরে উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে — একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড় , চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড় । সহসা ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হিমালয়
যেখানে জ্বলিছে সূর্য, উঠিছে সহস্র তারা, প্রজ্বলিত ধূমকেতু বেড়াইছে ছুটিয়া। অসংখ্য জগৎযন্ত্র, ঘুরিছে নিয়মচক্রে অসংখ্য উজ্জ্বল গ্রহ রহিয়াছে ফুটিয়া। গম্ভীর অচল তুমি, দাঁড়ায়ে দিগন্ত ব্যাপি, সেই আকাশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হিমাদ্রির ধ্যানে যাহা
হিমাদ্রির ধ্যানে যাহা স্তব্ধ হয়ে ছিল রাত্রিদিন, সপ্তর্ষির দৃষ্টিতলে বাক্যহীন শুভ্রতায় লীন, সে তুষারনির্ঝরিণী রবিকরস্পর্শে উচ্ছ্বসিতা দিগ্ দিগন্তে প্রচারিছে অন্তহীন আনন্দের গীতা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন পবিত্র জানি
জীবন পবিত্র জানি, অভাব্য স্বরূপ তার অজ্ঞেয় রহস্য-উৎস হতে পেয়েছে প্রকাশ কোন্ অলক্ষিত পথ দিয়ে, সন্ধান মেলে না তার। প্রত্যহ নূতন নির্মলতা দিল তারে সূর্যোদয় লক্ষ ক্রোশ হতে স্বর্ণঘটে পূর্ণ করি আলোকের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে
জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে, সহসা হে প্রিয়, কত গৃহে পথে রেখে গেছ প্রাণে কত হরষন। কতবার তুমি মেঘের আড়ালে এমনি মধুর হাসিয়া দাঁড়ালে, অরুণ-কিরণে চরণ বাড়ালে, ললাটে রাখিলে শুভ পরশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার বীণায় কত তার আছে
তোমার বীণায় কত তার আছে কত-না সুরে, আমি তার সাথে আমার তারটি দিব গো জুড়ে। তার পর হতে প্রভাতে সাঁঝে তব বিচিত্র রাগিণীমাঝে আমারো হৃদয় রণিয়া রণিয়া বাজিবে তবে। তোমার সুরেতে আমার পরান জড়ায়ে রবে। তোমার তারায় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে উষা, নিঃশব্দে এসো
হে উষা, নিঃশব্দে এসো, আকাশের তিমিরগুণ্ঠন করে উন্মোচন। হে প্রাণ, অন্তরে থেকে মুকুলের বাহ্য আবরণ করো উন্মোচন। হে চিত্ত, জাগ্রত হও, জড়ত্বের বাধা নিশ্চেতন করে উন্মোচন। ভেদবুদ্ধি-তামসের মোহযবনিকা, হে আত্ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হৃদয়ের ভাষা
হৃদয় , কেন গো মোরে ছলিছ সতত , আপনার ভাষা তুমি শিখাও আমায় । প্রত্যহ আকুল কন্ঠে গাহিতেছি কত , ভগ্ন বাঁশরিতে শ্বাস করে হায় হায় ! সন্ধ্যাকালে নেমে যায় নীরব তপন সুনীল আকাশ হতে সুনীল সাগরে । আমার মনের কথা ,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হৃদয়ধর্ম
হৃদয় পাষাণভেদী নির্ঝরের প্রায়, জড়জন্তু সবাপানে নামিবারে চায়। মাঝে মাঝে ভেদচিহ্ন আছে যত যার সে চাহে করিতে মগ্ন লুপ্ত একাকার। মধ্যদিনে দগ্ধদেহে ঝাঁপ দিয়ে নীরে মা ব’লে সে ডেকে ওঠে স্নিগ্ধ তটিনীরে। যে চাঁ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি গল্প জমাতে পার
শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র দত্ত প্রিয়বরেষু তুমি গল্প জমাতে পার। বসো তোমার কেদারায়, ধীরে ধীরে টান দাও গুড়গুড়িতে, উছলে ওঠে আলাপ তোমার ভিতর থেকে হালকা ভাষায়, যেন নিরাসক্ত ঔৎসুক্যে, তোমার কৌতুকে-ফেনিল মনের...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি কেমন করে গান কর যে গুণী
তুমি কেমন করে গান কর যে গুণী, অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি। সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে, সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে, পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে, বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী। মনে করি অমনি সুরে গাই, কণ্ঠে আমার সুর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে বিরাট নদী
হে বিরাট নদী, অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল অবিচ্ছিন্ন অবিরল চলে নিরবধি। স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে; বস্তুহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুফেনা উঠে জেগে; ক্রন্দসী কাঁদিয়া ওঠে বহ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে প্রিয়, দুঃখের বেশে
হে প্রিয়, দুঃখের বেশে অাস যবে মনে তোমারে আনন্দ ব'লে চিনি সেই ক্ষণে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে বিশ্বদেব, মোর কাছে তুমি
হে বিশ্বদেব, মোর কাছে তুমি দেখা দিলে আজ কী বেশে। দেখিনু তোমারে পূর্বগগনে, দেখিনু তোমারে স্বদেশে। ললাট তোমার নীল নভতল বিমল আলোকে চির-উজ্জ্বল নীরব আশিস-সম হিমাচল তব বরাভয় কর। সাগর তোমার পরশি চরণ পদধূলি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে ভারত, আজি নবীন বর্ষে
হে ভারত, আজি নবীন বর্ষে শুন এ কবির গান। তোমার চরণে নবীন হর্ষে এনেছি পূজার দান। এনেছি মোদের দেহের শকতি এনেছি মোদের মনের ভকতি, এনেছি মোদের ধর্মের মতি, এনেছি মোদের প্রাণ। এনেছি মোদের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য তোমার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার প্রেম যে বইতে পারি এমন সাধ্য নাই
তোমার প্রেম যে বইতে পারি এমন সাধ্য নাই। এ সংসারে তোমার আমার মাঝখানেতে তাই কৃপা করে রেখেছ নাথ অনেক ব্যবধান– দুঃখসুখের অনেক বেড়া ধনজনমান। আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে আভাসে দাও দেখা– কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে রবি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারা তোমার নামে বাটের মাঝে
তারা তোমার নামে বাটের মাঝে মাসুল লয় যে ধরি। দেখি শেষে ঘাটে এসে নাইকো পারের কড়ি। তারা তোমার কাজের তানে নাশ করে গো ধনে প্রাণে, সামান্য যা আছে আমার লয় তা অপহরি। আজকে আমি চিনেছি সেই ছদ্মবেশী-দলে। তারাও আম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হেলাভরে ধুলার 'পরে
হেলাভরে ধুলার 'পরে ছড়াই কথাগুলো। পায়ের তলে পলে পলে গুঁড়িয়ে সে হয় ধুলো। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হোক ভারতের জয়
এসো এসো ভ্রাতৃগণ! সরল অন্তরে সরল প্রীতির ভরে সবে মিলি পরস্পরে আলিঙ্গন করি আজ বহুদিন পরে । এসেছে জাতীয় মেলা ভারতভূষণ , ভারত সমাজে তবে হৃদয় খুলিয়া সবে এসো এসো এসো করি প্রিয়সম্ভাষণ । দূর করো আত্মভেদ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে মোর সুন্দর
হে মোর সুন্দর, যেতে যেতে পথের প্রমোদে মেতে যখন তোমার গায় কারা সবে ধুলা দিয়ে যায়, আমার অন্তর করে হায় হয়। কেঁদে বলি, হে মোর সুন্দর, আজ তুমি হও দণ্ডধর, করহ বিচার। তার পরে দেখি, এ কী, খোলা তব বিচারঘরের দ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার সঙ্গে আমার মিলন
তোমার সঙ্গে আমার মিলন বাধল কাছেই এসে। তাকিয়ে ছিলেম আসন মেলে— অনেক দূরের থেকে এলে, আঙিনাতে বাড়িয়ে চরণ ফিরলে কঠিন হেসে— তীরের হাওয়ায় তরী উধাও পারের নিরুদ্দেশে।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার মঙ্গলকার্য
তোমার মঙ্গলকার্য তব ভূত্য-পানে অযাচিত যে প্রেমেরে ডাক দিয়ে আনে, যে অচিন্ত্য শক্তি দেয়, যে অক্লান্ত প্রাণ, সে তাহার প্রাপ্য নহে— সে তোমারি দান।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমারে পাছে সহজে বুঝি
তোমারে পাছে সহজে বুঝি তাই কি এত লীলার ছল, বাহিরে যবে হাসির ছটা ভিতরে থাকে আঁখির জল। বুঝি গো আমি বুঝি গো তব ছলনা, যে কথা তুমি বলিতে চাও সে কথা তুমি বল না। তোমারে পাছে সহজে ধরি কিছুরই তব কিনারা নাই– দশে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি
তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি, ওই যে আসে, আসে, আসে। যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী সে যে আসে, আসে, আসে। গেয়েছি গান যখন যত আপন-মনে খ্যাপার মতো সকল সুরে বেজেছে তার আগমনী- সে যে আসে, আসে, আসে। কত ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমারে হেরিয়া চোখে
তোমারে হেরিয়া চোখে, মনে পড়ে শুধু, এই মুখখানি দেখেছি স্বপ্নলোকে।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছোটো হয়ে
দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছোটো হয়ে এসো তুমি এ ক্ষুদ্র আলয়ে। তাই তোমার মাধুর্যসুধা ঘুচায় আমার আঁখির ক্ষুধা, জলে স্থলে দাও যে ধরা কত আকার লয়ে। বন্ধু হয়ে পিতা হয়ে জননী হয়ে আপনি তুমি ছোটো হয়ে এসো হৃদয়ে। আমিও...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দূর সাগরের পারের পবন
দূর সাগরের পারের পবন আসবে যখন কাছের কূলে রঙিন আগুন জ্বালবে ফাগুন, মাতবে অশোক সোনার ফুলে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে– নইলে কি আর পারব তোমার চরণ ছুঁতে। তোমায় দিতে পূজার ডালি বেড়িয়ে পড়ে সকল কালি, পরান আমার পারি নে তাই পায়ে থুতে। এতদিন তো ছিল না মোর কোনো ব্যথা, সর্ব অঙ্গে মাখা ছিল মলিনতা। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিনের প্রহরগুলি হয়ে গেল পার
দিনের প্রহরগুলি হয়ে গেল পার বহি কর্মভার। দিনান্ত ভরিছে তরী রঙিন মায়ায় আলোয় ছায়ায়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দায়মোচন
চিরকাল রবে মোর প্রেমের কাঙাল, এ কথা বলিতে চাও বোলো। এই ক্ষণটুকু হোক সেই চিরকাল - তার পরে যদি তুমি ভোল মনে করাব না আমি শপথ তোমার, আসা যাওয়া দু দিকেই খোলা রবে দ্বার - যাবার সময় হলে যেয়ো সহজেই, আবার আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিক্বালা
দূর আকাশের পথ উঠিছে জলদরথ, নিমেন চাহি দেখে কবি ধরণী নিদ্রিত। অস্ফুট চিত্রের মত নদ নদী পরবত, পৃথিবীর পটে যেন রয়েছে চিত্রিত! সমস্ত পৃথিবী ধরি একটি মুঠায় অনন্ত সুনীল সিন্ধু সুধীরে লুটায়। হাত ধরাধরি কর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিনের অালো নামে যখন
দিনের অালো নামে যখন ছায়ার তাতলে আমি আসি ঘট ভরিবার ছলে একলা দিঘির জলে। তাকিয়ে থাকি, দেখি, সঙ্গীহারা একটি সন্ধ্যাতারা ফেলেছে তার ছায়াটি এই কমলসাগরে। ডোবে না সে, নেবে না সে, ঢেউ দিলে সে যায় না তবু স’...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিন চলে না যে
দিন চলে না যে, নিলেমে চড়েছে খাট-টিপাই; ব্যাবসা ধরেছি গল্পেরে করা নাট্যি-fy। ক্রিটিক মহল করেছি ঠাণ্ডা, মুর্গি এবং মুর্গি-আণ্ডা খেয়ে করে শেষ, আমি হাড় দুটি- চারটি পাই– ভোজন-ওজনে লেখা ক’রে দেয় certify। (খ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিন রাত্রি নাহি মানি
দিন রাত্রি নাহি মানি, আয় তোরা আয় রে, চির সুখ-রসে রত আমরা হেথায় রে। বসন্তে মলয় বায় একটি মিলায়ে যায়, আরেকটি আসে পুনঃ মধুময় তেমনি, প্রেমের স্বপন হায় একটি যেমনি যায় আরেকটি সুস্বপন জাগি উঠে অমনি। নন্দন কান...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিল্লি দরবার
দেখিছ না অয়ি ভারত-সাগর,অয়ি গো হিমাদ্রি দেখিছ চেয়ে, প্রলয়-কালের নিবিড় আঁধার, ভারতের ভাল ফেলেছে ছেয়ে। অনন্ত সমুদ্র তোমারই বুকে, সমুচ্চ হিমাদ্রি তোমারি সম্মুখে, নিবিড় আঁধারে, এ ঘোর দুর্দিনে, ভারত ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিয়েছ প্রশ্রয় মোরে, করুণানিলয়
দিয়েছ প্রশ্রয় মোরে, করুণানিলয়, হে প্রভু, প্রত্যহ মোরে দিয়েছ প্রশ্রয়। ফিরেছি আপন-মনে আলসে লালসে বিলাসে আবেশে ভেসে প্রবৃত্তির বশে নানা পথে, নানা ব্যর্থ কাজে– তুমি তবু তখনো যে সাথে সাথে ছিলে মোর প্রভু, আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃসময়
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া, যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে, যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে, দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা— তবু বিহঙ্গ, ওরে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃখহারী
মনে করো, তুমি থাকবে ঘরে, আমি যেন যাব দেশান্তরে। ঘাটে আমার বাঁধা আছে তরী, জিনিসপত্র নিয়েছি সব ভরি— ভালো করে দেখ্ তো মনে করি কী এনে মা, দেব তোমার তরে। চাস কি মা, তুই এত এত সোনা— সোনার দেশে করব আনাগোনা।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুখের দশা শ্রাবণরাতি
দুখের দশা শ্রাবণরাতি— বাদল না পায় মানা, চলেছে একটানা। সুখের দশা যেন সে বিদ্যুৎ ক্ষণহাসির দূত। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুয়ারে তোমার ভিড় ক’রে যারা আছে
দুয়ারে তোমার ভিড় ক’রে যারা আছে, ভিক্ষা তাদের চুকাইয়া দাও আগে। মোর নিবেদন নিভৃতে তোমার কাছে– সেবক তোমার অধিক কিছু না মাগে। ভাঙিয়া এসেছি ভিক্ষাপাত্র, শুধু বীণাখানি রেখেছি মাত্র, বসি এক ধারে পথের কিনারে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দু-কানে ফুটিয়ে দিয়ে
দু-কানে ফুটিয়ে দিয়ে কাঁকড়ার দাঁড়া বর বলে, “কান দুটো ধীরে ধীরে নাড়া।’ বউ দেখে আয়নায়, জাপানে কি চায়নায় হাজার হাজার আছে মেছনীর পাড়া– কোথাও ঘটেনি কানে এত বড়ো ফাঁড়া। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই বিঘা জমি
শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। বাবু বলিলেন, 'বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।' কহিলাম আমি, 'তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই - চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই। শুনি রাজা কহে, 'বাপু, জা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুরন্ত আশা
মর্মে যবে মত্ত আশা সর্পসম ফোঁসে, অদৃষ্টের বন্ধনেতে দাপিয়া বৃথা রোষে, তখনো ভালো-মানুষ সেজে বাঁধানো হুঁকা যতনে মেজে মলিন তাস সজোরে ভেঁজে থেলিতে হবে কষে! অন্নপায়ী বঙ্গবাসী স্তন্যপায়ী জীব জন-দশেকে জটলা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই পাখি
খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে বনের পাখি ছিল বনে। একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে। বনের পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই, বনেতে যাই দোঁহে মিলে। খাঁচার পাখি বলে-- বনের পাখি, আয় খাঁচায় থাকি নি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুর্বোধ
তুমি মোরে পার না বুঝিতে? প্রশান্তবিষাদভরে দুটি আঁখি প্রশ্ন করে অর্থ মোর চাহিছে খুঁজিতে, চন্দ্রমা যেমন-ভাবে স্থিরনতমুখে চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে।। কিছু আমি করি নি গোপন। যাহা আছে সব আছে তোমার আঁখির কাছে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুষ্টু
তোমার কাছে আমিই দুষ্টু ভালো যে আর সবাই । মিত্তিরদের কালু নিলু ভারি ঠাণ্ডা ক - ভাই ! যতীশ ভালো , সতীশ ভালো , ন্যাড়া নবীন ভালো , তুমি বল ওরাই কেমন ঘর করে রয় আলো । মাখন বাবুর দুটি ছেলে দুষ্টু তো নয় কেউ —...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নামজাদা দানুবাবু রীতিমতো খর্চে
নামজাদা দানুবাবু রীতিমতো খর্চে, অথচ ভিটেয় তার ঘুঘু সদা চরছে। দানধর্মের ‘পরে মন তার নিবিষ্ট, রোজগার করিবার বেলা জপে “শ্রীবিষ্ণু’, চাঁদার খাতাটা তাই দ্বারে দ্বারে ধরছে। এই ভাবে পুণ্যের খাতা তার ভরছে। (...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নামকরণ
একদিন মুখে এল নূতন এ নাম — চৈতালিপূর্ণিমা ব ' লে কেন যে তোমারে ডাকিলাম সে কথা শুধাও যবে মোরে স্পষ্ট ক ' রে তোমারে বুঝাই হেন সাধ্য নাই । রসনায় রসিয়েছে , আর কোনো মানে কী আছে কে জানে । জীবনের যে সীমায়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেখো চেয়ে গিরির শিরে
দেখো চেয়ে গিরির শিরে মেঘ করেছে গগন ঘিরে, আর কোরো না দেরি। ওগো আমার মনোহরণ, ওগো স্নিগ্ধ ঘনবরন, দাঁড়াও, তোমায় হেরি। দাঁড়াও গো ওই আকাশ-কোলে, দাঁড়াও আমার হৃদয়-দোলে, দাঁড়াও গো ওই শ্যামল-তৃণ-‘পরে, আকুল চোখে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দৃষ্টি
বুঝি গো সন্ধার কাছে শিখেছে সন্ধার মায়া ওই আঁখিদুটি, চাহিলে হৃদয়-পানে মরমেতে পড়ে ছায়া, তারা উঠে ফুটি। আগে কে জানিত বল কত কি লুকানো ছিল হৃদয়নিভৃতে-- তোমার নয়ন দিয়া আমার নিজের হিয়া পাইনু দেখিতে। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নির্লিপ্ত
বাছা রে মোর বাছা, ধূলির ‘পরে হরষভরে লইয়া তৃণগাছা আপন মনে খেলিছ কোণে, কাটিছে সারা বেলা। হাসি গো দেখে এ ধূলি মেখে এ তৃণ লয়ে খেলা। আমি যে কাজে রত, লইয়া খাতা ঘুরাই মাথা হিসাব কষি কত, আঁকের সারি হতেছে ভারী...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেখিলাম অবসন্ন চেতনার গোধূলিবেলায়
দেখিলাম অবসন্ন চেতনার গোধূলিবেলায় দেহ মোর ভেসে যায় কালো কালিন্দীর স্রোত বাহি নিয়ে অনুভূতিপুঞ্জ, নিয়ে তার বিচিত্রবেদনা, চিত্রকরা আচ্ছাদনে আজন্মের স্মৃতির সঞ্চয়, নিয়ে তার বাঁশিখানি। দূর হতে দূরে য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেবতার গ্রাস
গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে মৈত্র মহাশয় যাবেন সাগরসংগমে তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি প্রস্তুত হইল ঘাটে। পুণ্য লোভাতুর মোক্ষদা কহিল আসি, "হে দাদাঠাকুর, আম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বিতীয় সর্গ
"এত কাল হে প্রকৃতি করিনু তোমার সেবা, তবু কেন এ হৃদয় পূরিল না দেবি? এখনো বুকের মাঝে রয়েছে দারুণ শূন্য, সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর? মনের মন্দির মাঝে প্রতিমা নাহিক যেন, শুধু এ আঁধার গৃহ রয়েছে পড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধরণীর খেলা খুঁজে
ধরণীর খেলা খুঁজে শিশু শুকতারা তিমিররজনীতীরে এল পথহারা। উষা তারে ডাক দিয়ে ফিরে নিয়ে যায়, আলোকের ধন বুঝি আলোকে মিলায়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেশান্তরী
প্রাণ-ধারণের বোঝাখানা বাঁধা পিঠের 'পরে, আকাল পড়ল, দিন চলে না, চলল দেশান্তরে। দূর শহরে একটা কিছু যাবেই যাবে জুটে, এই আশাতেই লগ্ন দেখে ভোরবেলাতে উঠে দুর্গা ব'লে বুক বেঁধে সে চলল ভাগ্যজয়ে, মা ডাকে না প...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বার খোলা ছিল মনে
দ্বার খোলা ছিল মনে, অসর্তকে সেথা অকস্মাৎ লেগেছিল কী লাগিয়া কোথা হতে দুঃখের আঘাত; সে লজ্জায় খুলে গেল মর্মতলে প্রচ্ছন্ন যে বল জীবনের নিহিত সম্বল। ঊর্ধ্ব হতে জয়ধ্বনি অন্তরে দিগন্তপথে নামিল তখনি, আনন্দের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দোতলায় ধুপ্ধাপ্
দোতলায় ধুপ্ধাপ্ হেমবাবু দেয় লাফ, মা বলেন, একি খেলা ভূতের নাচন নেচে? নাকি সুরে বেলা হেমা, “চলতে যে পারিনে, মা, সকালে সর্দি লেগে যেমনি উঠেছি হেঁচে অমনি যে খচ্ করে পা আমার মচ্কেছে।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্বনি
জন্মেছিনু সূক্ষ্ম তারে বাঁধা মন নিয়া , চারি দিক হতে শব্দ উঠিত ধ্বনিয়া নানা কম্পে নানা সুরে নাড়ীর জটিল জালে ঘুরে ঘুরে । বালকের মনের অতলে দিত আনি পাণ্ডুনীল আকাশের বাণী চিলের সুতীক্ষ্ণ সুরে নির্জন দুপ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বিধা
এসেছিলু তবু আস নাই, তাই জানায়ে গেলে সমুখের পথে পলাতকা পদ-পতন ফেলে। তোমার সে উদাসীনতা উপহাসভরে জানালো কি মোর দীনতা। সে কি চল-করা অবহেলা, জানি না সে- চপল চরণ সত্য কি ঘাসে ঘাসে গেল উপেক্ষা মেলে। পাতায় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধীরু কহে শূন্যেতে মজো রে
ধীরু কহে শূন্যেতে মজো রে, নিরাধার সত্যেরে ভজো রে। এত বলি যত চায় শূন্যেতে ওড়াটা কিছুতে কিছু-না-পানে পৌঁছে না ঘোড়াটা, চাবুক লাগায় তারে সজোরে। ছুটে মরে সারারাত, ছুটে মরে সারাদিন– হয়রান হয়ে তবু আমিহীন ঘোড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধীরে সন্ধ্যা আসে
ধীরে সন্ধ্যা আসে, একে একে গ্রন্থি যত যায় স্খলি প্রহরের কর্মজাল হতে। দিন দিল জলাঞ্জলি খুলি পশ্চিমের সিংহদ্বার সোনার ঐশ্বর্য তার অন্ধকার আলোকের সাগরসংগমে। দূর প্রভাতের পানে নত হয়ে নিঃশব্দে প্রণমে। চক্ষু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নতিস্বীকার
তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয় তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়, অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্রুবসত্য
আমি বিন্দুমাত্র আলো, মনে হয় তবু আমি শুধু আছি আর কিছু নাই কভু। পলক পড়িল দেখি আড়ালে আমার তুমি আছ হে অনাদি আদি অন্ধকার! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদীযাত্রা
চলেছে তরণী মোর শান্ত বায়ুভরে। প্রভাতের শুভ্র মেঘ দিগন্তশিয়রে। বরষার ভরা নদী তৃপ্ত শিশুপ্রায় নিস্তরঙ্গ পুষ্ট-অঙ্গ নিঃশব্দে ঘুমায়। দুই কূলে স্তব্ধ ক্ষেত্র শ্যামশস্যে ভরা, আলস্যমন্থর যেন পূর্ণগর্ভা ধরা। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদী
ওরে তোরা কি জানিস কেউ জলে কেন ওঠে এত ঢেউ । ওরা দিবস - রজনী নাচে , তাহা শিখেছে কাহার কাছে । শোন্ চলচল্ ছলছল্ সদাই গাহিয়া চলেছে জল । ওরা কারে ডাকে বাহু তুলে , ওরা কার কোলে ব'সে দুলে । সদা হেসে করে ল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নতুন রঙ
এ ধূসর জীবনের গোধূলী, ক্ষীণ তার উদাসীন স্মৃতি, মুছে-আসা সেই ম্লান ছবিতে রঙ দেয় গুঞ্জনগীতি। ফাগুনের চম্পকপরাগে সেই রঙ জাগে, ঘুমভাঙা কোকিলের কূজনে সেই রঙ লাগে, সেই রঙ পিয়ালের ছায়াতে ঢেলে দেয় পুর্ণিম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীল বায়লেট নয়ন দুটি করিতেছে ঢলঢল
নীল বায়লেট নয়ন দুটি করিতেছে ঢলঢল রাঙা গোলাপ গাল দুখানি, সুধায় মাখা সুকোমল। শুভ্র বিমল করকমল ফুটে আছে চিরদিন! হৃদয়টুকু শুষ্ক শুধু পাষাণসম সুকঠিন! Heinrich Hein (অনুবাদ কবিতা)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নববর্ষ এল আজি
নববর্ষ এল আজি দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে; আনে নি আশার বাণী, দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়; প্রতিকূল ভাগ্য আসে হিংস্র বিভীষিকার আকারে— তখনি সে অকল্যাণ যখনি তাহারে করি ভয়। যে জীবন বহিয়াছি পূর্ণ মূল্যে আজ হোক কে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদীর প্রতি খাল
খাল বলে, মোর লাগি মাথা-কোটাকুটি, নদীগুলা আপনি গড়ায়ে আসে ছুটি। তুমি খাল মহারাজ, কহে পারিষদ, তোমারে জোগাতে জল আছে নদীনদ। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নবজাতক
নবীন আগন্তুক, নব যুগ তব যাত্রার পথে চেয়ে আছে উৎসুক। কী বার্তা নিয়ে মর্তে এসেছ তুমি; জীবনরঙ্গভূমি তোমার লাগিয়া পাতিয়াছে কী আসন। নরদেবতার পূজায় এনেছ কী নব সম্ভাষণ। অমরলোকের কী গান এসেছ শুনে। তরুণ ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ননীলাল বাবু যাবে লঙ্কা
ননীলাল বাবু যাবে লঙ্কা; শ্যালা শুনে এল, তার ডাক-নাম টঙ্কা। বলে, “হেন উপদেশ তোমারে দিয়েছে সে কে, আজও আছে রাক্ষস, হঠাৎ চেহারা দেখে রামের সেবক ব’লে করে যদি শঙ্কা। আকৃতি প্রকৃতি তব হতে পারে জম্কালো, দিদি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজু সখি মুহু মুহু
আজু সখি , মুহু মুহু গাহে পিক কুহু কুহু , কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায় । যুবনমদবিলসিত পুলকে হিয়া উলসিত , অবশ তনু অলসিত মূরছি জনু যায় । আজু মধু চাঁদনী প্রাণউনমাদনী , শিথিল সব বাঁধনী , শিথিল ভ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
না চেয়ে যা পেলে তার যত দায়
না চেয়ে যা পেলে তার যত দায় পুরাতে পার না তাও, কেমনে বহিবে চাও যত কিছু সব যদি তার পাও! (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে ॥ বাসনার বশে মন অবিরত ধায় দশ দিশে পাগলের মতো, স্থির-আঁখি তুমি মরমে সতত জাগিছ শয়নে স্বপনে ॥ সবাই ছেড়েছে, নাই যার কে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাটক
নাটক লিখেছি একটি। বিষয়টা কী বলি। অর্জুন গিয়েছেন স্বর্গে, ইন্দ্রের অতিথি তিনি নন্দনবনে। উর্বশী গেলেন মন্দারের মালা হাতে তাঁকে বরণ করবেন ব'লে। অর্জুন বললেন, ``দেবী, তুমি দেবলোকবাসিনী, অতিসম্পূর্ণ তোমা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস
নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস— বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে। (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাম তার ভেলুরাম ধুনিচাঁদ শিরত্থ
নাম তার ভেলুরাম ধুনিচাঁদ শিরত্থ, ফাটা এক তম্বুরা কিনেছে সে নিরর্থ। সুরবোধ-সাধনায় ধুরপদে বাধা নাই, পাড়ার লোকেরা তাই হারিয়েছে ধীরত্ব– অতি-ভালোমানুষেরও বুকে জাগে বীরত্ব॥ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাম তার চিনুলাল
নাম তার চিনুলাল হরিরাম মোতিভয়, কিছুতে ঠকায় কেউ এই তার অতি ভয়। সাতানব্বই থেকে তেরোদিন ব’কে ব’কে বারোতে নামিয়ে এনে তবু ভাবে, গেল ঠকে। মনে মনে আঁক কষে, পদে পদে ক্ষতি-ভয়। কষ্টে কেরানি তার টিঁকে আছে কতিপয়।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিধু বলে আড়চোখে কুছ নেই পরোয়া
নিধু বলে আড়চোখে, “কুছ নেই পরোয়া।’– স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে, “এটা ঘরোয়া।’ দারোগাকে হেসে কয়, “খবরটা দিতে হয়’– পুলিস যখন করে ঘরে এসে চড়োয়া। বলে, “চরণের রেণু নাহি চাহিতেই পেনু।’– এই ব’লে নিধিরাম করে পায়ে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নানা দুঃখে চিত্তের বিক্ষেপে
নানা দুঃখে চিত্তের বিক্ষেপে যাহাদের জীবনের ভিত্তি যায় বারংবার কেঁপে, যারা অন্যমনা,তারা শোনো আপনারে ভুলো না কখনো। মৃত্যুঞ্জয় যাহাদের প্রাণ, সব তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে দীপ যারা জ্বালে অনির্বাণ, তাহাদের মাঝে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নানা গান গেয়ে ফিরি নানা লোকালয়
নানা গান গেয়ে ফিরি নানা লোকালয়; হেরি সে মত্ততা মোর বৃদ্ধ আসি কয়, “তাঁর ভৃত্য হয়ে তোর এ কী চপলতা। কেন হাস্য-পরিহাস, প্রণয়ের কথা, কেন ঘরে ঘরে ফিরি তুচ্ছ গীতরসে ভুলাস এ সংসারের সহস্র অলসে।’ দিয়েছি উত্তর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিজের হাতে উপার্জনে
নিজের হাতে উপার্জনে সাধনা নেই সহিষ্ণুতার। পরের কাছে হাত পেতে খাই, বাহাদুরি তারি গুঁতার। কৃপণ দাতার অন্নপাকে ডাল যদি বা কমতি থাকে গাল-মিশানো গিলি তো ভাত– নাহয় তাতে নেইকো সুতার। নিজের জুতার পাত্তা না পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যোগীনদা
যোগীনদাদার জন্ম ছিল ডেরাস্মাইলখাঁয়ে। পশ্চিমেতে অনেক শহর অনেক গাঁয়ে গাঁয়ে বেড়িয়েছিলেন মিলিটারি জরিপ করার কাজে, শেষ বয়সে স্থিতি হল শিশুদলের মাঝে। "জুলুম তোদের সইব না আর" হাঁক চালাতেন রোজই, পরের দি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নামটা যেদিন ঘুচাবে, নাথ
নামটা যেদিন ঘুচাবে, নাথ, বাঁচব সেদিন মুক্ত হয়ে- আপনগড়া স্বপন হতে তোমার মধ্যে জনম লয়ে। ঢেকে তোমার হাতের লেখা কাটি নিজের নামের রেখা, কতদিন আর কাটবে জীবন এমন ভীষণ আপদ বয়ে। সবার সজ্জা হরণ করে আপনাকে সে সা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নারী
তুমি এ মনের সৃষ্টি, তাই মনোমাঝে এমন সহজে তব প্রতিমা বিরাজে। যখন তোমারে হেরি জগতের তীরে মনে হয় মন হতে এসেছ বাহিরে। যখন তোমারে দেখি মনোমাঝখানে মনে হয় জন্ম-জন্ম আছ এ পরানে। মানসীরূপিণী তুমি, তাই দিশে দিশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিরাপদ নীচতা
তুমি নীচে পাঁকে পড়ি ছড়াইছ পাঁক, যে জন উপরে আছে তারি তো বিপাক। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিন্দুকের দুরাশা
মালা গাঁথিবার কালে ফুলের বোঁটায় ছুঁচ নিয়ে মালাকর দুবেলা ফোটায়। ছুঁচ বলে মনদুঃখে, ওরে জুঁই দিদি, হাজার হাজার ফুল প্রতিদিন বিঁধি, কত গন্ধ কোমলতা যাই ফুঁড়ে ফুঁড়ে কিছু তার নাহি পাই এত মাথা খুঁড়ে। বিধি-পায়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিদ্রিতা
একদা রাতে নবীন যৌবনে স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া, বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার--- ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া । শীর্ণ হয়ে এসেছে শুকতারা, পূর্বতটে হতেছে নিশিভোর । আকাশকোণে বিকাশে জাগরণ, ধরণীতলে ভাঙে নি ঘুমঘোর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নির্জন রোগীর ঘর
নির্জন রোগীর ঘর। খোলা দ্বার দিয়ে বাঁকা ছায়া পড়েছে শয্যায়। শীতের মধ্যাহ্নতাপে তন্দ্রাতুর বেলা চলেছে মন্থরগতি শৈবালে দুর্বলস্রোত নদীর মতন। মাঝে মাঝে জাগে যেন দূর অতীতের দীর্ঘশ্বাস শস্যহীন মাঠে। মনে পড়ে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন চাল
এক দিন গরজিয়া কহিল মহিষ, ঘোড়ার মতন মোর থাকিবে সহিস। একেবারে ছাড়িয়াছি মহিষি-চলন, দুই বেলা চাই মোর দলন-মলন। এই ভাবে প্রতিদিন, রজনী পোহালে, বিপরীত দাপাদাপি করে সে গোহালে। প্রভু কহে,চাই বটে! ভালো, তাই হোক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন
হেথাও তো পশে সূর্যকর!ঘোর ঝটিকার রাতে দারুণ অশনিপাতেবিদীরিল যে গিরিশিখর,বিশাল পর্বত কেটে পাষাণহৃদয় ফেটেপ্রকাশিল যে ঘোর গহ্বর,প্রভাতে পুলকে ভাসি বহিয়া নবীন হাসিহেথাও তো পশে সূর্যকর!দুয়ারেতে উঁকি মেরে ফি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন কল্পে
নূতন কল্পে সৃষ্টির আরম্ভে আঁকা হল অসীম আকাশে কালের সীমানা আলোর বেড়া দিয়ে। সব চেয়ে বড়ো ক্ষেত্রটি অযুত নিযুত কোটি কোটি বৎসরের মাপে। সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জ্যোতিষ্কপতঙ্গ দিয়েছে দেখা, গণনায় শেষ করা যায...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নৈবেদ্য
তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি রজনীর শুভ্র অবসানে ; কিছু আর নাহি বাকি, নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি, নাই অভিমান, নাই দীনকান্না, নাই গর্বহাসি, নাই পিছে ফিরে দেখা। শুধু স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবতী কল্যাণীয়েষু পঁচিশে বৈশাখ চলেছে জন্মদিনের ধারাকে বহন করে মৃত্যুদিনের দিকে। সেই চলতি আসনের উপর বসে কোন্ কারিগর গাঁথছে ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায় নানা রবীন্দ্রনাথের একখা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নৌকাযাত্রা
মধু মাঝির ওই যে নৌকোখানা বাঁধা আছে রাজগঞ্জের ঘাটে , কারো কোনো কাজে লাগছে না তো , বোঝাই করা আছে কেবল পাটে । আমায় যদি দেয় তারা নৌকাটি আমি তবে একশোটা দাঁড় আঁটি , পাল তুলে দিই চারটে পাঁচটা ছটা — মিথ্যে ঘু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথিক দেখেছি আমি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ
পথিক দেখেছি আমি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ কীর্তি-নিঃস্ব আজি; দেখেছি অবমানিত ভগ্নশেষ দর্পোদ্ধত প্রতাপের; অন্তর্হিত বিজয়-নিশান বজ্রাঘাতে স্তব্ধ যেন অট্টহাসি; বিরাট সম্মান সাষ্টাঙ্গে সে ধুলায় প্রণত, যে ধুল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পঞ্চমী
ভাবি বসে বসে গত জীবনের কথা , কাঁচা মনে ছিল কী বিষম মূঢ়তা । শেষে ধিক্কারে বলি হাত নেড়ে , যাক গে সে কথা যাক গে । তরুণ বেলাতে যে খেলা খেলাতে ভয় ছিল হারবার , তারি লাগি , প্রিয়ে , সংশয়ে মোরে ফিরিয়েছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পত্র
শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু স্টীমার । খুলনা মাগো আমার লক্ষ্মী , মনিষ্যি না পক্ষী! এই ছিলেম তরীতে , কোথায় এনু ত্বরিতে! কাল ছিলেম খুলনায় , তাতে তো আর ভুল নাই , কলকাতায় এসেছি সদ্য , বসে বসে লিখছি পদ্য ।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পত্র (সম্পাদক সমীপেষু)
শ্রীমান্ দামু বসু এবং চামু বসু সম্পাদক সমীপেষু । দামু বোস আর চামু বোসে কাগজ বেনিয়েছে বিদ্যেখানা বড্ড ফেনিয়েছে! (আমার দামু আমার চামু!) কোথায় গেল বাবা তোমার মা জননী কই! সাত-রাজার-ধন মানিক ছেলের মুখে ফুট...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পণ্ডিত কুমিরকে ডেকে বলে
পণ্ডিত কুমিরকে ডেকে বলে, “নক্র, প্রখর তোমার দাঁত, মেজাজটা বক্র। আমি বলি নখ তব করো তুমি কর্তন, হিংস্র স্বভাব তবে হবে পরিবর্তন আমিষ ছাড়িয়া যদি শুধু খাও তক্র।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথের পথিক করেছ আমায়
পথের পথিক করেছ আমায় সেই ভালো ওগো, সেই ভালো। আলেয়া জ্বালালে প্রান্তরভালে সেই আলো মোর সেই আলো। ঘাটে বাঁধা ছিল খেয়াতরী, তাও কি ডুবালে ছল করি। সাঁতারিয়া পার হব বহি ভার সেই ভালো মোর সেই ভালো। ঝড়ের মুখে যে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পূজার সাজ
আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি, পূজার সময় এল কাছে। মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই, আনন্দে দু-হাত তুলি নাচে। পিতা বসি ছিল দ্বারে, দুজনে শুধালো তারে, ‘কী পোশাক আনিয়াছ কিনে। ' পিতা কহে, ‘আছে আছে তো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরবেশ
কে তুমি ফিরিছ পরি প্রভুদের সাজ। ছদ্মবেশে বাড়ে না কি চতুর্গুণ লাজ! পরবস্ত্র অঙ্গে তব হয়ে অধিষ্ঠান তোমারেই করিছে না নিত্য অপমান? বলিছে না, “ওরে দীন, যত্নে মোরে ধরো, তোমার চর্মের চেয়ে আমি শ্রেষ্ঠতর?” চিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুষ্পচয়িনী
হে পুষ্পচয়িনী, ছেড়ে আসিয়াছ তুমি কবে উজ্জয়িনী মালিনীছন্দের বন্ধ টুটে। বকুল উৎফুল্ল হয়ে উঠে আজো বুঝি তব মুখমদে। নূপুররণিত পদে। আজো বুঝি অশোকের ভাঙাইবে ঘুম। কী সেই কুসুম যা দিয়ে অতীত জন্মে গণেছিলে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরস্পর
বাণী কহে, তোমারে যখন দেখি, কাজ, আপনার শূণ্যতায় বড়ো পাই লাজ। কাজ শুনি কহে, অয়ি পরিপূর্ণা বাণী, নিজেরে তোমার কাছে দীন ব’লে জানি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর-বিচারে গৃহভেদ
আম্র কহে, এক দিন, হে মাকাল ভাই, আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই— মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি, মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরম সুন্দর আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে
পরম সুন্দর আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে। অসীম অরূপ রূপে রূপে স্পর্শমণি রসমূর্তি করিছে রচনা, প্রতিদিন চিরনূতনের অভিষেক চিরপুরাতন বেদীতলে। মিলিয়া শ্যামলে নীলিমায় ধরণীর উত্তরীয় বুনে চলে ছায়াতে আলোতে। আকাশের ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর ও আত্মীয়
ছাই বলে, শিখা মোর ভাই আপনার, ধোঁওয়া বলে, আমি তো যমজ ভাই তার। জোনাকি কহিল, মোর কুটুম্বিতা নাই, তোমাদের চেয়ে আমি বেশি তার ভাই। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরের কর্ম-বিচার
নাক বলে, কান কভু ঘ্রাণ নাহি করে, রয়েছে কুণ্ডল দুটো পরিবার তরে। কান বলে, কারো কথা নাহি শুনে নাক, ঘুমোবার বেলা শুধু ছাড়ে হাঁকডাক। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিচিত সীমানার
পরিচিত সীমানার বেড়াঘেরা থাকি ছোটো বিশ্বে; বিপুল অপরিচিত নিকটেই রয়েছে অদৃশ্যে। সেথাকার বাঁশিরবে অনামা ফুলের মৃতুগন্ধে জানা না-জানার মাঝে বাণী ফিরে ছায়াময় ছন্দে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিত্যক্ত
চলে গেল , আর কিছু নাই কহিবার । চলে গেল , আর কিছু নাই গাহিবার । শুধু গাহিতেছে আর শুধু কাঁদিতেছে দীনহীন হৃদয় আমার , শুধু বলিতেছে , “ চলে গেল সকলেই চলে গেল গো , বুক শুধু ভেঙে গেল দলে গেল গো । ” বসন্ত চল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিচয় (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
দয়া বলে, কে গো তুমি মুখে নাই কথা? অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পশ্চিমে রবির দিন
পশ্চিমে রবির দিন হলে অবসান তখনো বাজুক কানে পুরবীর গান। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পলাশ আনন্দমূর্তি জীবনের ফাগুনদিনের
পলাশ আনন্দমূর্তি জীবনের ফাগুনদিনের, আজ এই সম্মানহীনের দরিদ্র বেলায় দিলে দেখা যেথা আমি সাথিহীন একা উৎসবের প্রাঙ্গণ-বাহিরে শস্যহীন মরুময় তীরে। যেখানে এ ধরণীর প্রফুল্ল প্রাণের কুঞ্জ হতে অনাদৃত দিন মোর নি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পশ্চাতের নিত্যসহচর, অকৃতার্থ হে অতীত
পশ্চাতের নিত্যসহচর, অকৃতার্থ হে অতীত, অতৃপ্ত তৃষ্ণার যত ছায়ামূর্তি প্রেতভূমি হতে নিয়েছ আমার সঙ্গ, পিছু-ডাকা অক্লান্ত আগ্রহে আবেশ-আবিল সুরে বাজাইছ অস্ফুট সেতার, বাসাছাড়া মৌমাছির গুন গুন গুঞ্জরণ যেন ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাড়াতে এসেছে এক
পাড়াতে এসেছে এক নাড়িটেপা ডাক্তার, দূর থেকে দেখা যায় অতি উঁচু নাক তার। নাম লেখে ওষুধের, এ দেশের পশুদের সাধ্য কী পড়ে তাহা এই বড়ো জাঁক তার। যেথা যায় বাড়ি বাড়ি দেখে যে ছেড়েছে নাড়ী, পাওনাটা আদায়ের মেলে না ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাড়ায় আছে ক্লাব
পাড়ায় আছে ক্লাব, আমার একতলার ঘরখানা দিয়েছি ওদের ছেড়ে। কাগজে পেয়েছি প্রশংসাবাদ, ওরা মীটিং করে আমাকে পরিয়েছে মালা। আজ আট বছর থেকে শূন্য আমার ঘর। আপিস থেকে ফিরে এসে দেখি সে ঘরের একটা ভাগে টেবিলে পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাখির ভোজ
ভোরে উঠেই পড়ে মনে , মুড়ি খাবার নিমন্ত্রণে আসবে শালিখ পাখি । চাতালকোণে বসে থাকি , ওদের খুশি দেখতে লাগে ভালো । স্নিগ্ধ আলো এ অঘ্রানের শিশির-ছোঁওয়া প্রাতে , সরল লোভে চপল পাখির চটুল নৃত্য-সাথে শিশুদিনে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাঠশালে হাই তোলে
পাঠশালে হাই তোলে মতিলাল নন্দী; বলে, “পাঠ এগোয় না যত কেন মন দি।’ শেষকালে একদিন গেল চড়ি টঙ্গায়, পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভাসালো মা-গঙ্গায়, সমাস এগিয়ে গেল, ভেসে গেল সন্ধি– পাঠ এগোবার তরে এই তার ফন্দি। (খাপছা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাতায় পাতায় দুলিছে শিশির
পূরবী পাতায় পাতায় দুলিছে শিশির গাহিছে বিহগগণ, ফুলবন হতে সুরভি হরিয়া বহিতেছে সমীরণ সাঁঝের আকাশ মাঝারে এখনো মৃদুল কিরণ জ্বলে। নলিনীর সাথে বসিয়া তখন কত-না হরষে কাটাইনু ক্ষণ, কে জানিত তবে বালিকা নিদয় রেখে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রবীণ ও নবীন
পাকা চুল মোর চেয়ে এত মান্য পায়, কাঁচা চুল সেই দুঃখে করে হায়-হায়। পাকা চুল বলে, মান সব লও বাছা, আমারে কেবল তুমি করে দাও কাঁচা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাষাণে পাষাণে তব
পাষাণে পাষাণে তব শিখরে শিখরে লিখেছ, হে গিরিরাজ, অজানা অক্ষরে কত যুগযুগাস্তের প্রভাতে সন্ধ্যায় ধরিত্রীর ইতিবৃত্ত অনন্ত-অধ্যায়। মহান সে গ্রন্থপত্র, তারি এক দিকে কেবল একটি ছত্রে রাখিবে কি লিখে— তব শৃঙ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাথরপিণ্ড
সাগরতীরে পাথরপিণ্ড ঢুঁ মারতে চায় কাকে, বুঝি আকাশটাকে। শান্ত আকাশ দেয় না কোনো জবাব, পাথরটা রয় উঁচিয়ে মাথা, এমনি সে তার স্বভাব। হাতের কাছেই আছে সমুদ্রটা, অহংকারে তারই সঙ্গে লাগত যদি ওটা, এমনি চাপড় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পিছু-ডাকা
যখন দিনের শেষে চেয়ে দেখি সমুখপানে সূর্য ডোবার দেশে মনের মধ্যে ভাবি অস্তসাগর-তলায় গেছে নাবি অনেক সূর্য-ডোবার সঙ্গে অনেক আনাগোনা, অনেক দেখাশোনা, অনেক কীর্তি, অনেক মূর্তি, অনেক দেবালয়, শক্তিমানের অনেক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুরস্কার
সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে কহিল কবির স্ত্রী 'রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো, রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো, মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো, তার খোঁজ রাখ কি! গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব--- মাথা ও মুণ্ড, ছাই ও ভস্ম, মিলিবে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুতুল ভাঙা
' সাত - আটটে সাতাশ ', আমি বলেছিলাম বলে গুরুমশায় আমার ‘পরে উঠল রাগে জ্বলে । মা গো , তুমি পাঁচ পয়সায় এবার রথের দিনে সেই যে রঙিন পুতুলখানি আপনি দিলে কিনে খাতার নিচে ছিল ঢাকা ; দেখালে এক ছেলে , গুরুমশায় র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুণ্যের হিসাব
সাধু যবে স্বর্গে গেল, চিত্রগুপ্তে ডাকি কহিলেন, “আনো মোর পুণ্যের হিসাব।” চিত্রগুপ্ত খাতাখানি সম্মুখেতে রাখি দেখিতে লাগিল তার মুখের কী ভাব। সাধু কহে চমকিয়া, “মহা ভুল এ কী! প্রথমের পাতাগুলো ভরিয়াছ আঁকে, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুনর্মিলন
কিসের হরষ কোলাহল শুধাই তোদের, তোরা বল্। আনন্দ-মাঝারে সব উঠিতেছে ভেসে ভেসে আনন্দে হতেছে কভু লীন-- চাহিয়া ধরণী-পানে নব আনন্দের গানে মনে পড়ে আর-এক দিন। সে তখন ছেলেবেলা--রজনী প্রভাত হলে, তাড়াতাড়ি শয্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রাণের সাধন কবে নিবেদন
প্রাণের সাধন কবে নিবেদন করেছি চরণতলে, অভিষেক তার হল না তোমার করুণ নয়নজলে। রসের বাদল নামিল না কেন তাপের দিনে। ঝরে গেল ফুল মালা পরাই নি তোমার গলে। মনে হয়েছিল, দেখেছি করুণা আঁখির পাতে- উড়ে গেল কোথা শু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুরানো সেই দিনের কথা
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়। ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়। আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়। মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়। মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুরাতন ভৃত্য
ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর— যা‐কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, “কেষ্টা বেটাই চোর।” উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে। যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে। বড়ো প্রয়োজন, ডাকি প্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যেদিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই
যেদিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই আমি ছিলেম অন্যমনে | আমার সাজিয়ে সাজি তারে আনি নাই সে যে রইল সঙ্গোপনে | মাঝে মাঝে হিয়া আকুলপ্রায় স্বপন দেখে চম্ কে উঠে চায়, মন্দ মধুর গন্ধ আসে হায় কোথায় দখিন সমীরণে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকারভেদ
বাবলাশাখারে বলে আম্রশাখা, ভাই, উনানে পুড়িয়া তুমি কেন হও ছাই? হায় হায়, সখী, তব ভাগ্য কী কঠোর! বাবলার শাখা বলে, দুঃখ নাহি মোর। বাঁচিয়া সফল তুমি, ওগো চূতলতা, নিজেরে করিয়া ভস্ম মোর সফলতা। (কণিকা কাব্যগ্রন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পৃথিবী
আজ আমার প্রণতি গ্রহন করো, পৃথিবী, শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।। মহাবীর্যবতী তুমি বীরভোগ্যা, বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে, মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে, মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দু:সহ দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশিতা
আজ তুমি ছোটো বটে, যার সঙ্গে গাঁঠছড়া বাঁধা যেন তার আধা। অধিকারগর্বভরে সে তোমারে নিয়ে চলে নিজঘরে। মনে জানে তুমি তার ছায়েবানুগতা-- তমাল সে, তার শাখালগ্ন তুমি মাধবীর লতা। আজ তুমি রাঙাচেলি দিয়ে মোড়া আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকৃতির খেদ (প্রথম পাঠ)
১ বিস্তারিয়া ঊর্মিমালা , বিধির মানস-বালা , মানস-সরসী ওই নাচিছে হরষে । প্রদীপ্ত তুষাররাশি , শুভ্র বিভা পরকাশি , ঘুমাইছে স্তব্ধভাবে হিমাদ্রি উরসে । ২ অদূরেতে দেখা যায় , উজল রজত কায় , গোমুখী হইতে গঙ্গ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান
পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান-- বোবা স্মৃতির চাপা কাঁদন হুহু করে, মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার গুমরে ওঠে প্রেতের কন্ঠে সারা দুপুরবেলা। মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে হাওয়ার হাঁপানি। হঠাৎ হানে বৈশাখ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতিধ্বনি
অয়ি প্রতিধ্বনি, বুঝি আমি তোরে ভালোবাসি, বুঝি আর কারেও বাসি না। আমারে করিলি তুই আকুল ব্যাকুল, তোর লাগি কাঁদে মোর বীণা। তোর মুখে পাখিদের শুনিয়া সংগীত, নির্ঝরের শুনিয়া ঝর্ঝর, গভীর রহস্যময় অরণ্যের গান...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতিনিধি
অ্যাক্ওয়ার্থ্ সাহেব কয়েকটি মারাঠি গাথার যে ইংরাজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন তাহারই ভূমিকা হইতে বর্ণিত ঘটনা গৃহীত। শিবাজির গেরুয়া পতাকা "ভগোয়া ঝেণ্ডা' নামে খ্যাত। বসিয়া প্রভাতকালে সেতারার দু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভালোবাসে যারে তার চিতাভস্ম-পানে
ভালোবাসে যারে তার চিতাভস্ম-পানে প্রেমিক যেমন চায় কাতর নয়ানে তেমনি যে তোমা-পানে নাহি চায় গ্রীস্ তাহার হৃদয় মন পাষাণ কুলিশ ইংরাজেরা ভাঙিয়াছে প্রাচীর তোমার দেবতাপ্রতিমা লয়ে গেছে [সিন্ধুপার] এ দেখে কার ন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি
ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আচার্য জগদীশ। কী অদৃশ্য তপোভূমি বিরচিলে এ পাষাণনগরীর শুষ্ক ধূলিতলে। কোথা পেলে সেই শান্তি এ উন্মত্ত জনকোলাহলে যার তলে মগ্ন হয়ে মুহূর্তে বিশ্বের কেন্দ্র-মাঝে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভাষা ও ছন্দ
যেদিন হিমাদ্রিশৃঙ্গে নামি আসে আসন্ন আষাঢ়, মহানদ ব্রহ্মপুত্র অকস্মাৎ দুর্দাম দুর্বার দুঃসহ অন্তরবেগে তীরতরু করিয়া উন্মূল মাতিয়া খুঁজিয়া ফিরে আপনার কূল-উপকূল তট-অরণ্যের তলে তরঙ্গের ডম্বরু বাজায়ে ক্ষিপ্ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মেঘদূত
নিমেষে টুটিয়া গেল সে মহাপ্রতাপ। ঊর্ধ্ব হতে একদিন দেবতার শাপ পশিল সে সুখরাজ্যে, বিচ্ছেদের শিখা করিয়া বহন; মিলনের মরীচিকা, যৌবনের বিশ্বগ্রাসী মত্ত অহমিকা মুহূর্তে মিলায়ে গেল মায়াকুহেলিকা খররৌদ্রকরে। ছয় ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রলাপ ৩
আয় লো প্রমদা! নিঠুর ললনে বার বার বল্ কী আর বলি! মরমের তলে লেগেছে আঘাত হৃদয় পরাণ উঠেছে জ্বলি! আর বলিব না এই শেষবার এই শেষবার বলিয়া লই মরমের তলে জ্বলেছে আগুন হৃদয় ভাঙিয়া গিয়াছে সই! পাষাণে গঠিত সু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রভেদ
তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ জানি তা বন্ধু, জানি, বিচ্ছেদ তবু অন্তরে নাহি মানি। এক জ্যোৎস্নায় জেগেছি দুজনে সারারাত-জাগা পাখির কূজনে, একই বসন্তে দোঁহাকার মনে দিয়েছে আপন বাণী। তুমি চেয়ে আছ আলোকের পানে,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার কাছে শুনতে চেয়েছ
শ্রীমান ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কল্যাণীয়েষু আমার কাছে শুনতে চেয়েছ গানের কথা; বলতে ভয় লাগে, তবু কিছু বলব। মানুষের জ্ঞান বানিয়ে নিয়েছে আপন সার্থক ভাষা। মানুষের বোধ অবুঝ, সে বোবা, যেমন বোবা বিশ্ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমরা চাষ করি আনন্দে
আমরা চাষ করি আনন্দে। মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে॥ রৌদ্র ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, বাঁশের বনে পাতা নড়ে, বাতাস ওঠে ভরে ভরে চষা মাটির গন্ধে॥ সবুজ প্রাণের গানের লেখা রেখায় রেখায় দেয় রে দেখা, মাতে রে কোন্ ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভোরের আলো-আঁধারে
ভোরের আলো-আঁধারে থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি। ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়েছে আকাশে একটু একটু সোনার লিখন নিয়ে। হাটের দিন, মাঠের মাঝখানকার পথে চলেছে গোরুর গাড়ি। কলসীতে নতুন আখের গু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূমিকা
স্মৃতিরে আকার দিয়ে আঁকা , বোধে যার চিহ্ন পড়ে ভাষায় কুড়ায়ে তারে রাখা , কী অর্থ ইহার মনে ভাবি । এই দাবি জীবনের এ ছেলেমানুষি , মরণেরে বঞ্চিবার ভান ক ' রে খুশি , বাঁচা-মরা খেলাটাতে জিতিবার শখ , তাই ম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রত্যহ প্রভাতকালে ভক্ত এ কুকুর
প্রত্যহ প্রভাতকালে ভক্ত এ কুকুর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে আসনের কাছে যতক্ষণে সঙ্গ তার না করি স্বীকার করস্পর্শ দিয়ে। এটুকু স্বীকৃতি লাভ করি সর্বাঙ্গে তরঙ্গি উঠে আনন্দপ্রবাহ। বাক্যহীন প্রাণীলোক-মাঝে এই জীব শু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রত্যক্ষ প্রমাণ
বজ্র কহে, দূরে আমি থাকি যতক্ষণ আমার গর্জনে বলে মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের জ্যোতি বলি মোর জ্যোতি রটে, মাথায় পড়িলে তবে বলে—বজ্র বটে! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আতার বিচি
আতার বিচি নিজে পুঁতে পাব তাহার ফল, দেখব ব'লে ছিল মনে বিষম কৌতূহল। তখন আমার বয়স ছিল নয়, অবাক লাগত কিছুর থেকে কেন কিছুই হয়। দোতলাতে পড়ার ঘরের বারান্দাটা বড়ো, ধুলো বালি একটা কোণে করেছিলুম জড়ো। সেথা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মংপু পাহাড়ে
কুজ্ঝটিজাল যেই সরে গেল মংপু-র নীল শৈলের গায়ে দেখা দিল রঙপুর। বহুকেলে জাদুকর, খেলা বহুদিন তার, আর কোনো দায় নেই, লেশ নেই চিন্তার। দূর বৎসর-পানে ধ্যানে চাই যদ্দূর দেখি লুকোচুরি খেলে মেঘ আর রোদ্দুর। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মঙ্গলগীত
শ্রীমতী ইন্দিরা । প্রাণাধিকাসু । নাসিক এতবড়ো এ ধরণী মহাসিন্ধু-ঘেরা দুলিতেছে আকাশসাগরে — দিন - দুই হেথা রহি মোরা মানবেরা শুধু কি, মা, যাব খেলা করে । তাই কি ধাইছে গঙ্গা ছাড়ি হিমগিরি , অরণ্য বহিছে ফুল-ফল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ
মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ চক্র ক'রে বসেছে দুর্মন্ত্রণায়। অদৃষ্ট জাল ফেলে অন্তরের শেষ তলা থেকে টেনে টেনে তুলছে নাড়ি-ছেঁড়া যন্ত্রণাকে। মনে হয়েছিল, অন্তহীন এই দুঃখ; মনে হয়েছিল, পন্থহীন নৈরাশ্যে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভোরের পাখি ডাকে কোথায়
ভোরের পাখি ডাকে কোথায় ভোরের পাখি ডাকে। ভোর না হতে ভোরের খবর কেমন করে রাখে। এখনো যে আঁধার নিশি জড়িয়ে আছে সকল দিশি কালীবরন পুচ্ছ ডোরের হাজার লক্ষ পাকে। ঘুমিয়ে-পড়া বনের কোণে পাখি কোথায় ডাকে। ওগো তুমি ভোর...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রভাত উৎসব
হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি, জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি। প্রভাত হল যেই কী জানি হল একি, আকাশ-পানে চাই কী জানি কারে দেখি।। পুরবমেঘমুখে পড়েছে রবিরেখা, অরুণরথচূড়া আধেক যায় দেখা। তরুণ আলো দেখে পাখির কলরব,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পেন্সিল টেনেছিনু হপ্তায় সাতদিন
পেন্সিল টেনেছিনু হপ্তায় সাতদিন, রবার ঘষেছি তাহে তিনমাস রাতদিন। কাগজ হয়েছে সাদা; সংশোধনের বাধা ঘুচে গেছে, এইবার শিক্ষক হাত দিন কিন্তু ছবির কোণে স্বাক্ষর বাদ দিন। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আসনতলের মাটির ‘পরে লুটিয়ে রব
আসনতলের মাটির ‘পরে লুটিয়ে রব। তোমার চরণ-ধুলায় ধুলায় ধূসর হব। কেন আমায় মান দিয়ে আর দূরে রাখ, চিরজনম এমন করে ভুলিয়ো নাকো, অসম্মানে আনো টেনে পায়ে তব। তোমার চরণ-ধুলায় ধুলায় ধূসর হব। আমি তোমার যাত্রীদলের র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে ভাবিতেছি যেন অসংখ্য ভাষার শব্দরাজি
মনে ভাবিতেছি, যেন অসংখ্য ভাষার শব্দরাজি ছাড়া পেল আজি, দীর্ঘকাল ব্যাকরণদুর্গে বন্দী রহি অকস্মাৎ সারি সারি কুচকাওয়াজের পদক্ষেপে উঠেছে অধীর হয়ে খেপে। লঙ্ঘিয়াছে বাক্যের শাসন, নিয়েছে অবুদ্ধিলোকে অবদ্ধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুরাতন
হেথা হতে যাও পুরাতন,হেথায় নতুন খেলা আরম্ভ হয়েছে ।আবার বাজিছে বাঁশি, আবার উঠিছে হাসি,বসন্তের বাতাস বয়েছে ।সুনীল আকাশ-'পরে শুভ্র মেঘ থরে থরেশ্রান্ত যেন রবির আলোকে,পাখিরা ঝাড়িছে পাখা, কাঁপিছে তরুর শাখা,খ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পেঁচোটাকে মাসি তার
পেঁচোটাকে মাসি তার যত দেয় আস্করা, মুশকিল ঘটে তত এক সাথে বাস করা। হঠাৎ চিমটি কাটে কপালের চামড়ায়– বলে সে, “এমনি ক’রে ভিমরুল কামড়ায়।’ আমার বিছানা নিয়ে খেলা ওর চাষ-করা– মাথার বালিশ থেকে তুলোগুলো হ্রাস-করা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আদিরহস্য
বাঁশি বলে, মোর কিছু নাহিকো গৌরব, কেবল ফুঁয়ের জোরে মোর কলরব। ফুঁ কহিল, আমি ফাঁকি, শুধু হাওয়াখানি— যে জন বাজায় তারে কেহ নাহি জানি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মর্তবাসী
কাকা বলেন , সময় হলে সবাই চ ' লে যায় কোথা সেই স্বর্গ - পারে । বল্ তো কাকী সত্যি তা কি একেবারে ? তিনি বলেন , যাবার আগে তন্দ্রা লাগে ঘণ্টা কখন ওঠে বাজি , দ্বারের পাশে তখন আসে ঘাটের মাঝি । বাবা গেছেন এমন...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মরীচিকা (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
এসো , ছেড়ে এসো , সখী , কুসুমশয়ন । বাজুক কঠিন মাটি চরণের তলে । কত আর করিবে গো বসিয়া বিরলে আকাশকুসুমবনে স্বপন চয়ন । দেখো ওই দূর হতে আসিছে ঝটিকা , স্বপ্নরাজ্য ভেসে যাবে খর অশ্রুজলে । দেবতার বিদ্যুতের অভি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ময়ূরের দৃষ্টি
দক্ষিণায়নের সূর্যোদয় আড়াল ক'রে সকালে বসি চাতালে । অনুকূল অবকাশ ; তখনো নিরেট হয়ে ওঠে নি কাজের দাবি, ঝুঁকে পড়ে নি লোকের ভিড় পায়ে পায়ে সময় দলিত করে দিয়ে । লিখতে বসি , কাটা খেজুরের গুঁড়ির মতো ছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুষ্প
পুষ্প ছিল বৃক্ষশাখে, হে নারী, তোমার অপেক্ষায় পল্লবচ্ছায়ায়। তোমার নিশ্বাস তারে লেগে অন্তরে সে উঠিয়াছে জেগে, মুখে তব কী দেখিতে পায়। সে কহিছে-- "বহু পূর্বে তুমি আমি কবে একসাথে আদিম প্রভাতে প্রথম আলো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রাচীন ভারত
দিকে দিকে দেখা যায় বিদর্ভ, বিরাট, অযোধ্যা, পাঞ্চাল, কাঞ্চী উদ্ধতললাট স্পর্ধিছে অম্বরতল অপাঙ্গ-ইঙ্গিতে, অশ্বের হ্রেষায় আর হস্তীর বৃংহিতে, অসির ঝঞ্ঝনা আর ধনুর টংকারে, বীণার সংগীত আর নূপুরঝংকারে, বন্দীর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আফ্রিকা
উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত, তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহতের দুঃখ
সূর্য দুঃখ করি বলে নিন্দা শুনি স্বীয়, কী করিলে হব আমি সকলের প্রিয়। বিধি কহে, ছাড়ো তবে এ সৌর সমাজ, দু-চারি জনেরে লয়ে করো ক্ষুদ্র কাজ। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাকাল
গৌরবর্ণ নধর দেহ, নাম শ্রীযুক্ত রাখাল, জন্ম তাহার হয়েছিল, সেই যে-বছর আকাল। গুরুমশায় বলেন তারে, "বুদ্ধি যে নেই একেবারে; দ্বিতীয়ভাগ করতে সারা ছ'মাস ধরে নাকাল।" রেগেমেগে বলেন, "বাঁদর, নাম দিনু তোর মাকা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাঝারির সতর্কতা
উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানসলোক
মানসকৈলাসশৃঙ্গে নির্জন ভুবনে ছিলে তুমি মহেশের মন্দিরপ্রাঙ্গণে তাঁহার আপন কবি, কবি কালিদাস। নীলকণ্ঠদ্যুতিসম স্নিগ্ধনীলভাস চিরস্থির আষাঢ়ের ঘনমেঘদলে, জ্যোতির্ময় সপ্তর্ষির তপোলোকতলে। আজিও মানসধামে করিছ বস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মান অপমান উপেক্ষা করি দাঁড়াও
মান অপমান উপেক্ষা করি দাঁড়াও, কণ্টকপথ অকুণ্ঠপদে মাড়াও, ছিন্ন পতাকা ধূলি হতে লও তুলি। রুদ্রের হাতে লাভ করো শেষ বর, আনন্দ হোক দুঃখের সহচর, নিঃশেষ ত্যাগে আপনারে যাও ভুলি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাধো
রায়বাহাদুর কিষনলালের স্যাকরা জগন্নাথ, সোনারুপোর সকল কাজে নিপুণ তাহার হাত। আপন বিদ্যা শিখিয়ে মানুষ করবে ছেলেটাকে এই আশাতে সময় পেলেই ধরে আনত তাকে; বসিয়ে রাখত চোখের সামনে, জোগান দেবার কাজে লাগিয়ে দি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যুগে যুগে জলে রৌদ্রে বায়ুতে
যুগে যুগে জলে রৌদ্রে বায়ুতে গিরি হয়ে যায় ঢিবি। মরণে মরণে নুতন আয়ুতে তৃণ রহে চিরজীবী। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানবহৃদয়ের বাসনা
নিশীথে রয়েছি জেগে ; দেখি অনিমেখে , লক্ষ হৃদয়ে সাধ শূন্যে উড়ে যায় । কত দিক হতে তারা ধায় কত দিকে ! কত – না অদৃশ্যকায়া ছায়া – আলিঙ্গন বিশ্বময় কারে চাহে , করে হায় – হায় । কত স্মৃতি খুঁজিতেছে শ্মশানশয়ন — অ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যা পায় সকলই জমা করে
যা পায় সকলই জমা করে, প্রাণের এ লীলা রাত্রিদিন। কালের তাণ্ডবলীলাভরে সকলই শূন্যেতে হয় লীন। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যা রাখি আমার তরে
যা রাখি আমার তরে মিছে তারে রাখি, আমিও রব না যবে সেও হবে ফাঁকি। যা রাখি সবার তরে সেই শুধু রবে— মোর সাথে ডোবে না সে, রাখে তারে সবে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাত্রা
ইস্টিমারের ক্যাবিনটাতে কবে নিলেম ঠাঁই , স্পষ্ট মনে নাই । উপরতলার সারে কামরা আমার একটা ধারে । পাশাপাশি তারি আরো ক্যাবিন সারি সারি নম্বরে চিহ্নিত , একই রকম খোপ সেগুলোর দেয়ালে ভিন্নিত । সরকারী যা আইনকা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাত্রাপথ
মনে পড়ে , ছেলেবেলায় যে বই পেতুম হাতে ঝুঁকে পড়ে যেতুম পড়ে তাহার পাতে পাতে । কিছু বুঝি , নাই বা কিছু বুঝি , কিছু না হোক পুঁজি , হিসাব কিছু না থাক্ নিয়ে লাভ অথবা ক্ষতি , অল্প তাহার অর্থ ছিল , বাকি ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাওয়া-আসার একই যে পথ
যাওয়া-আসার একই যে পথ জান না তা কি অন্ধ। যাবার পথ রোধিতে গেলে আসার পথ বন্ধ । (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে আঁধারে ভাইকে দেখিতে নাহি পায়
যে আঁধারে ভাইকে দেখিতে নাহি পায় সে আঁধারে অন্ধ নাহি দেখে আপনায়। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মা-লক্ষ্মী
কার পানে মা, চেয়ে আছ মেলি দুটি করুণ আঁখি। কে ছিঁড়েছে ফুলের পাতা, কে ধরেছে বনের পাখি। কে কারে কী বলেছে গো, কার প্রাণে বেজেছে ব্যথা— করুণায় যে ভরে এল দুখানি তোর আঁখির পাতা। খেলতে খেলতে মায়ের আমার আর বুঝ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাস্টারবাবু
আমি আজ কানাই মাস্টার, পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি। আমি ওকে মারি নে মা, বেত, মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি। রোজ রোজ দেরি করে আসে, পড়াতে দেয় না ও তো মন, ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই যত আমি বলি ‘শোন্ শোন্'। দিনরাত খেলা খে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানিক কহিল পিঠ পেতে দিই দাঁড়াও
মানিক কহিল, “পিঠ পেতে দিই দাঁড়াও। আম দুটো ঝোলে, ওর দিকে হাত বাড়াও। উপরের ডালে সবুজে ও লালে ভরে আছে, কষে নাড়াও। নিচে নেমে এসে ছুরি দিয়ে শেষে ব’সে ব’সে খোসা ছাড়াও। যদি আসে মালি চোখে দিয়ে বালি পারো যদি ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্ত যে ভাবনা মোর
মুক্ত যে ভাবনা মোর ওড়ে ঊর্ধ্ব-পানে সেই এসে বসে মোর গানে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুকুলের বক্ষোমাঝে
মুকুলের বক্ষোমাঝে কুসুম আঁধারে আছে বাঁধা, সুন্দর হাসিয়া বহে প্রকাশের সুন্দর এ বাধা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তবাতায়নপ্রান্তে জনশূন্য ঘরে
মুক্তবাতায়নপ্রান্তে জনশূন্য ঘরে বসে থাকি নিস্তব্ধ প্রহরে, বাহিরে শ্যামল ছন্দে উঠে গান ধরণীর প্রাণের আহ্বান; অমৃতের উৎসস্রোতে চিত্ত ভেসে চলে যায় দিগন্তের নীলিম আলোতে। কার পানে পাঠাইবে স্তুতি ব্যগ্র এই ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিলের চুমকি গাঁথি ছন্দের পাড়ের মাঝে মাঝে
মিলের চুমকি গাঁথি ছন্দের পাড়ের মাঝে মাঝে অকেজো অলস বেলা ভরে ওঠে শেলাইয়ের কাজে। অর্থভরা কিছুই-না চোখে ক’রে ওঠে ঝিল্মিল্ ছড়াটার ফাঁকে ফাঁকে মিল। গাছে গাছে জোনাকির দল করে ঝলমল; সে নহে দীপের শিখা, রাত্র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথমে আশাহত হয়েছিনু
প্রথমে আশাহত হয়েছিনু ভেবেছিনু সবে না এ বেদনা; তবু তো কোনোমতে সয়েছিনু, কী করে যে সে কথা শুধায়ো না। Heinrich Hein (অনুবাদ কবিতা)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমরা কি সত্যিই চাই শোকের অবসান
শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য সুহৃদ্বরেষু আমরা কি সত্যই চাই শোকের অবসান? আমাদের গর্ব আছে নিজের শোককে নিয়েও। আমাদের অতি তীব্র বেদনাও বহন করে না স্থায়ী সত্যকে-- সান্ত্বনা নেই এমন কথায়; এতে আঘাত লা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পূর্ণা
তুমি গো পঞ্চদশী শুক্লা নিশার অভিসারপথে চরম তিথির শশী। স্মিত স্বপ্নের আভাস লেগেছে বিহ্বল তব রাতে। ক্বচিৎ চকিত বিহগকাকলি তব যৌবনে উঠিছে আকুলি নব আষাঢ়ের কেতকীগন্ধ- শিথিলিত নিদ্রাতে। যেন অশ্রুত বনমর্মর ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমগাছ
এ তো সহজ কথা , অঘ্রানে এই স্তব্ধ নীরবতা জড়িয়ে আছে সামনে আমার আমের গাছে ; কিন্তু ওটাই সবার চেয়ে দুর্গম মোর কাছে । বিকেল বেলার রোদ্দুরে এই চেয়ে থাকি , যে রহস্য ওই তরুটি রাখল ঢাকি গুঁড়িতে তার ডালে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুর পরে
আজিকে হয়েছে শান্তি , জীবনের ভুলভ্রান্তি সব গেছে চুকে । রাত্রিদিন ধুক্ধুক্ তরঙ্গিত দুঃখসুখ থামিয়াছে বুকে । যত কিছু ভালোমন্দ যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিছু আর নাই । বলো শান্তি , বলো শান্তি , দেহ-সাথে স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যু
ওগো মৃত্যু, তুমি যদি হতে শূন্যময় মুহূর্তে নিখিল তবে হয়ে যেত লয়। তুমি পরিপূর্ণ রূপ, তব বক্ষে কোলে জগৎ শিশুর মতো নিত্যকাল দোলে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুমাধুরী
পরান কহিছে ধীরে—হে মৃত্যু মধুর, এই নীলাম্বর, এ কি তব অন্তঃপুর! আজি মোর মনে হয়, এ শ্যামলা ভূমি বিস্তীর্ণ কোমল শয্যা পাতিয়াছ তুমি। জলে স্থলে লীলা আজি এই বরষার, এই শান্তি, এ লাবণ্য, সকলই তোমার। মনে হয়, য...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুদূত এসেছিল হে প্রলয়ংকর, অকস্মাৎ
মৃত্যুদূত এসেছিল হে প্রলয়ংকর, অকস্মাৎ তব সভা হতে। নিয়ে গেল বিরাট প্রাঙ্গণে তব; চক্ষে দেখিলাম অন্ধকার; দেখিনি অদৃশ্য আলো আঁধারের স্তরে স্তরে অন্তরে অন্তরে, যে আলোক নিখিল জ্যোতির জ্যোতি; দৃষ্টি মোর ছি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রলাপ ২
ঢাল্! ঢাল্ চাঁদ! আরো আরো ঢাল্! সুনীল আকাশে রজতধারা! হৃদয় আজিকে উঠেছে মাতিয়া পরাণ হয়েছে পাগলপারা! গাইব রে আজ হৃদয় খুলিয়া জাগিয়া উঠিবে নীরব রাতি! দেখাব জগতে হৃদয় খুলিয়া পরাণ আজিকে উঠেছে মাতি! ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি গন্ধবিধুর সমীরণে
আজি গন্ধবিধুর সমীরণে কার সন্ধানে ফিরি বনে বনে। আজি ক্ষুব্ধ নীলাম্বর-মাঝে এ কী চঞ্চল ক্রন্দন বাজে। সুদূর দিগন্তের সকরুণ সংগীত লাগে মোর চিন্তায় কাজে– আমি খুঁজি কারে অন্তরে মনে গন্ধবিধুর সমীরণে। ওগো জানি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোর চেতনায়
মোর চেতনায় আদিসমুদ্রের ভাষা ওঙ্কারিয়া যায়; অর্থ তার নাহি জানি, আমি সেই বাণী। শুধু ছলছল কলকল; শুধু সুর, শুধু নৃত্য, বেদনার কলকোলাহল; শুধু এ সাঁতার-- কখনো এ পারে চলা, কখনো ও পার, কখনো বা অদৃশ্য গভীরে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোর কিছু ধন আছে সংসারে
মোর কিছু ধন আছে সংসারে, বাকি সব ধন স্বপনে নিভৃতস্বপনে। ওগো কোথা মোর আশার অতীত, ওগো কোথা তুমি পরশচকিত, কোথা গো স্বপনবিহারী। তুমি এসো এসো গভীর গোপনে, এসো গো নিবিড় নীরব চরণে বসনে প্রদীপ নিবারি, এসো গো গো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে যায় তাহারে অার
যে যায় তাহারে অার ফিরে ডাকা বৃথা। অশ্রুজলে স্মৃতি তার হোক পল্লবিতা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বউ কথা কও
'বউ কথা কও' 'বউ কথা কও' যতই গায় সে পাখি নিজের কথাই কুঞ্জবনের সব কথা দেয় ঢাকি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বঙ্গবাসীর প্রতি
আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না । এ কি শুধু হাসিখেলা , প্রমোদের মেলা শুধু মিছে কথা ছলনা ! আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না । এ যে নয়নের জল , হতাশের শ্বাস , কলঙ্কের কথা দরিদ্রের আশ , এ যে বুক - ফাটা দুখে গুমরিছ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার এ গান ছেড়েছে তার
আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার, তোমার কাছে রাখে নি আর সাজের অহংকার। অলংকার যে মাঝে পড়ে মিলনেতে আড়াল করে, তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার। তোমার কাছে খাটে না মোর কবির গরব করা, মহাকবি, তোমার পায়ে দিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোহের আশঙ্কা
শিশু পুষ্প আঁখি মেলি হেরিল এ ধরা শ্যামল, সুন্দর, স্নিগ্ধ, গীতগন্ধভরা— বিশ্বজগতেরে ডাকি কহিল, হে প্রিয়, আমি যত কাল থাকি তুমিও থাকিয়ো। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে রত্ন সবার সেরা
যে রত্ন সবার সেরা তাহারে খুঁজিয়া ফেরা ব্যর্থ অন্বেষণ। কেহ নাহি জানে, কিসে ধরা দেয় আপনি সে এলে শুভক্ষণ। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৌলানা জিয়াউদ্দিন
কখনো কখনো কোনো অবসরে নিকটে দাঁড়াতে এসে; "এই যে' বলেই তাকাতেম মুখে, "বোসো' বলিতাম হেসে। দু-চারটে হত সামান্য কথা, ঘরের প্রশ্ন কিছু, গভীর হৃদয় নীরবে রহিত হাসিতামাশার পিছু। কত সে গভীর প্রেম সুনিবিড়, অক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ম্যাক্বেথ্
(ডাকিনী । ম্যাক্বেথ্) দৃশ্য : বিজন প্রান্তর । বজ্র বিদ্যুৎ । তিনজন ডাকিনী। ১ম ডা — ঝড় বাদলে আবার কখন মিল্ব মোরা তিনটি জনে। ২য় ডা — ঝগড়া ঝাঁটি থামবে যখন, হার জিত সব মিট্বে রণে। ৩য় ডা — সাঁঝের আগেই ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোহ
এ মোহ ক'দিন থাকে, এ মায়া মিলায়, কিছুতে পারে না আর বাঁধিয়া রাখিতে - কোমল বাহুর ডোর ছিন্ন হয়ে যায়, মদিরা উথলে নাকো মদির আঁখিতে । কেহ কারে নাহি চিনে আঁধার নিশায় । ফুল ফোটা সাঙ্গ হলে গাহে না পাখিতে । কোথা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রেমের আনন্দ থাকে
প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ। প্রেমের বেদন থাকে সমস্ত জীবন। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (পঞ্চম সর্গ)
বিজয় নিভৃতে কী কহে নিশীথে? কি কথা শুধায় নীরজা বালায়— দেখেছ, দেখেছ হোথা? ফুলপাত্র হতে ফুল তুলি হাতে নীরজা শুনিছে, কুসুম গুণিছে, মুখে নাই কিছু কথা। বিজয় শুধায়— কমলা তাহারে গোপনে, গোপনে ভালবাসে কি র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন দেখা হল
যখন দেখা হল তার সঙ্গে চোখে চোখে তখন আমার প্রথম বয়েস; সে আমাকে শুধাল, "তুমি খুঁজে বেড়াও কাকে?" আমি বললেম, "বিশ্বকবি তাঁর অসীম ছড়াটা থেকে একটা পদ ছিঁড়ে নিলেন কোন্ কৌতুকে, ভাসিয়ে দিলেন পৃথিবীর হাওয...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন ছিলেম পথেরই মাঝখানে
যখন ছিলেম পথেরই মাঝখানে মনটা ছিল কেবল চলার পানে বোধ হত তাই, কিছুই তো নাই কাছে— পাবার জিনিস সামনে দূরে আছে। লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছব এই ঝোঁকে সমস্ত দিন চলেছি একরোখে। দিনের শেষে পথের অবসানে মুখ ফিরে আজ তাকাই...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন এ দেহ হতে রোগে ও জরায়
যখন এ দেহ হতে রোগে ও জরায় দিনে দিনে সামর্থ্য ঝরায়, যৌবন এ জীর্ণ নীড় পিছে ফেলে দিয়ে যায় ফাঁকি, কেবল শৈশব থাকে বাকি। বদ্ধ ঘরে কর্মক্ষুব্ধ সংসার–বাহিরে অশক্ত সে শিশুচিত্ত মা খুঁজিয়া ফিরে। বিত্তহারা প্রাণ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাষ্ট্রনীতি
কুড়াল কহিল, ভিক্ষা মাগি ওগো শাল, হাতল নাহিকো, দাও একখানি ডাল। ডাল নিয়ে হাতল প্রস্তুত হল যেই, তার পরে ভিক্ষুকের চাওয়া-চিন্তা নেই— একেবারে গোড়া ঘেঁষে লাগাইল কোপ, শাল বেচারার হল আদি অন্ত লোপ। (কণিকা কাব্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যতকাল তুই শিশুর মতো
যতকাল তুই শিশুর মতো রইবি বলহীন, অন্তরেরি অন্তঃপুরে থাক্ রে ততদিন। অল্প ঘায়ে পড়বি ঘুরে, অল্প দাহে মরবি পুড়ে, অল্প গায়ে লাগলে ধুলা করবে যে মলিন-- অন্তরেরি অন্তঃপুরে থাক্ রে ততদিন। যখন তোমার শক্তি হবে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যত বড়ো হোক ইন্দ্ৰধনু সে
যত বড়ো হোক ইন্দ্ৰধনু সে সুদূর-আকাশে-আঁকা, অামি ভালোবাসি, মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যথাকর্তব্য
ছাতা বলে, ধিক্ ধিক্ মাথা মহাশয়, এ অন্যায় অবিচার আমারে না সয়। তুমি যাবে হাটে বাটে দিব্য অকাতরে, রৌদ্র বৃষ্টি যতকিছু সব আমা-’পরে। তুমি যদি ছাতা হতে কী করিতে দাদা? মাথা কয়, বুঝিতাম মাথার মর্যাদা, বুঝিত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যথার্থ আপন
কুষ্মাণ্ডের মনে মনে বড়ো অভিমান বাঁশের মাচাটি তার পুষ্পক বিমান। ভুলেও মাটির পানে তাকায় না তাই, চন্দ্রসূর্যতারকারে করে ভাই ভাই। নভশ্চর ব’লে তার মনের বিশ্বাস, শূণ্যপানে চেয়ে তাই ছাড়ে সে নিশ্বাস। ভাবে শুধ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রঙ্গমঞ্চে একে একে নিবে গেল যবে দীপশিখা
রঙ্গমঞ্চে একে একে নিবে গেল যবে দীপশিখা রিক্ত হোলো সভাতল, আঁধারের মসী-অবলেপে স্বপ্নচ্ছবি-মুছেযাওয়া সুষুপ্তির মতো শান্ত হোলো চিত্ত মোর নিঃশব্দের তর্জনী সংকেতে। এতকাল যে সাজে রচিয়াছিনু আপনার নাট্য পরিচ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রার্থনা
চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি, যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে উচ্ছ্বাসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রেমের আদিম জ্যোতি আকাশে সঞ্চরে
প্রেমের আদিম জ্যোতি আকাশে সঞ্চরে শুভ্রতম তেজে, পৃথিবীতে নামে সেই নানা রূপে রূপে নানা বর্ণে সেজে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাবার দিনে এই কথাটি
যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই--- যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই। এই জ্যোতিঃসমুদ্র-মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে তারই মধু পান করেছি ধন্য আমি তাই--- যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই। বিশ্বরূপের খেলাঘরে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যুগল
আমি থাকি একা, এই বাতায়নে বসে এক বৃন্তে যুগলকে দেখা-- সেই মোর সার্থকতা। বুঝিতে পারি সে কথা লোকে লোকে কী আগ্রহ অহরহ করিছে সন্ধান আপনার বাহিরেতে কোথা হবে আপনার দান। তা নিয়ে বিপুল দুঃখে বিশ্বচিত্ত জেগে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাত্রী আমি ওরে
যাত্রী আমি ওরে। পারবে না কেউ রাখতে আমায় ধরে। দুঃখসুখের বাঁধন সবই মিছে, বাঁধা এ-ঘর রইবে কোথায় পিছে, বিষয়বোঝা টানে আমায় নীচে, ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যাবে পড়ে। যাত্রী আমি ওরে। চলতে পথে গান গাহি প্রাণ ভরে। দেহ-দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজপুতানা
এই ছবি রাজপুতানার; এ দেখি মৃত্যুর পৃষ্ঠে বেঁচে থাকিবার দুর্বিষহ বোঝা। হতবুদ্ধি অতীতের এই যেন খোঁজা পথভ্রষ্ট বর্তমানে অর্থ আপনার, শূন্যেতে হারানো অধিকার। ঐ তার গিরিদুর্গে অবরুদ্ধ নিরর্থ ভ্রূকুটি ঐ তার ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাত্রী
ওরে যাত্রী, যেতে হবে বহুদূরদেশে। কিসের করিস চিন্তা বসি পথশেষে? কোন্ দুঃখে কাঁদে প্রাণ? কার পানে চাহি বসে বসে দিন কাটে শুধু গান গাহি শুধু মুগ্ধনেত্র মেলি? কার কথা শুনে মরিস জ্বলিয়া মিছে মনের আগুনে? কো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফুল ও ফল
ফুল কহে ফুকারিয়া, ফল, ওরে ফল, কত দূরে রয়েছিস বল্ মোরে বল্। ফল কহে, মহাশয়, কেন হাঁকাহাঁকি, তোমারি অন্তরে আমি নিরন্তর থাকি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বজাও রে মোহন বাঁশি
বজাও রে মোহন বাঁশি । সারা দিবসক বিরহদহনদুখ , মরমক তিয়াষ নাশি । রিঝমনভেদন বাঁশরিবাদন কঁহা শিখলি রে কান ? হানে থিরথির মরমঅবশকর লহু লহু মধুময় বাণ । ধসধস করতহ উরহ বিয়াকুলু , ঢুলু ঢুলু অবশনয়ান ; কত কত ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে-মাসেতে আপিসেতে
যে-মাসেতে আপিসেতে হল তার নাম ছাঁটা স্ত্রীর শাড়ি নিজে পরে, স্ত্রী পরিল গামছাটা। বলে, “আমি বৈরাগী, ছেড়ে দেব শিগ্গির, ঘরে মোর যত আছে বিলাস-সামিগ্গির।’ ছিল তার টিনে-গড়া চা-খাওয়ার চাম্চাটা, কেউ তা কেনে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যোগিয়া
বহুদিন পরে আজি মেঘ গেছে চলে , রবির কিরণসুধা আকাশে উথলে । স্নিগ্ধ শ্যাম পত্রপুটে আলোক ঝলকি উঠে পুলক নাচিছে গাছে গাছে । নবীন যৌবন যেন প্রেমের মিলনে কাঁপে , আনন্দ বিদ্যুৎ - আলো নাচে । জুঁই সরোবরতীরে নিশ্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বউ নিয়ে লেগে গেল
বউ নিয়ে লেগে গেল বকাবকি রোগা ফণী আর মোটা পঞ্চিতে, মণিকর্ণিকা-ঘাটে ঠকাঠকি যেন বাঁশে আর সরু কঞ্চিতে। দুজনে না জানে এই বউ কার, মিছেমিছি ভাড়া বাড়ে নৌকার, পঞ্চি চেঁচায় শুধু হাউহাউ,– “পারবিনে তুই মোরে বঞ্চি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফুলদানি হতে একে একে
ফুলদানি হতে একে একে আয়ুক্ষীণ গোলাপের পাপড়ি পড়িল ঝরে ঝরে। ফুলের জগতে মৃত্যুর বিকৃতি নাহি দেখি। শেষ ব্যঙ্গ নাহি হানে জীবনের পানে অসুন্দর। যে মাটির কাছে ঋণী আপনার ঘৃণা দিয়ে অশুচি করে না তারে ফুল, রূপ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবিবার
সোম মঙ্গল বুধ এরা সব আসে তাড়াতাড়ি , এদের ঘরে আছে বুঝি মস্ত হাওয়া - গাড়ি ? রবিবার সে কেন , মা গো , এমন দেরি করে ? ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে সকল বারের পরে । আকাশ - পারে তার বাড়িটি দূর কি সবার চেয়ে ? সে বুঝি মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যৌবনের প্রান্তসীমায়
যৌবনের প্রান্তসীমায় জড়িত হয়ে আছে অরুণিমার ম্লান অবশেষ;-- যাক কেটে এর আবেশটুকু; সুস্পষ্টের মধ্যে জেগে উঠুক আমার ঘোর-ভাঙা চোখ স্মৃতিবিস্মৃতির নানা বর্ণে রঞ্জিত দুঃখসুখের বাষ্পঘনিমা স'রে যাক সন্ধ্যামে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রজনী প্রভাত হল
রজনী প্রভাত হল— পাখি, ওঠো জাগি, আলোকের পথে চলো অমৃতের লাগি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফুলের অক্ষরে প্রেম
ফুলের অক্ষরে প্রেম লিখে রাখে নাম আপনার— ঝ’রে যায়, ফেরে সে আবার। পাথরে পাথরে লেখা কঠিন স্বাক্ষর দুরাশার ভেঙে যায়, নাহি ফেরে আর। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজা ও রানী
এক যে ছিল রাজা সেদিন আমায় দিল সাজা । ভোরের রাতে উঠে আমি গিয়েছিলুম ছুটে , দেখতে ডালিম গাছে বনের পিরভু কেমন নাচে । ডালে ছিলেম চড়ে , সেটা ভেঙেই গেল পড়ে । সেদিন হল মানা আমার পেয়ারা পেড়ে আনা , রথ দেখতে যাও...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রসগোল্লার লোভে
রসগোল্লার লোভে পাঁচকড়ি মিত্তির দিল ঠোঙা শেষ করে বড়ো ভাই পৃথ্বির। সইল না কিছুতেই যকৃতের নিচুতেই যন্ত্র বিগড়ে গিয়ে ব্যামো হল পিত্তির। ঠোঙাটাকে বলে, “পাজি ময়রার কারসাজি।’ দাদার উপরে রাগে– দাদা বলে, “চিত্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবিচার
বিপ্র কহে, রমণী মোর আছিল যেই ঘরে নিশীথে সেথা পশিল চোর ধর্মনাশ-তরে। বেঁধেছি তারে, এখন কহো চোরে কী দেব সাজা।' 'মৃত্যু' শুধু কহিলা তারে রতনরাও রাজা। ছুটিয়া আসি কহিল দূত, 'চোর সে যুবরাজ-- বিপ্র তাঁরে ধরে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজা বসেছেন ধ্যানে
রাজা বসেছেন ধ্যানে, বিশজন সর্দার চীৎকাররবে তারা হাঁকিছে– “খবরদার’। সেনাপতি ডাক ছাড়ে, মন্ত্রী সে দাড়ি নাড়ে, যোগ দিল তার সাথে ঢাকঢোল-বর্দার। ধরাতল কম্পিত, পশুপ্রাণী লম্ফিত, রানীরা মূর্ছা যায় আড়ালেতে পর্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজার মতো বেশে তুমি
রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে পরাও যারে মণিরতন-হার-- খেলাধুলা আনন্দ তার সকলি যায় ঘুরে, বসন-ভুষণ হয় যে বিষম ভার। ছেঁড়ে পাছে আঘাত লাগি, পাছে ধুলায় হয় সে দাগি, আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বঙ্গমাতা
পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে। দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান। পদে পদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রানী, তোর ঠোঁট দুটি মিঠি
রানী, তোর ঠোঁট দুটি মিঠি রানী, তোর মধুখানা দিঠি রানী, তুই মণি তুই ধন, তোর কথা ভাবি সারাক্ষণ। দীর্ঘ সন্ধ্যা কাটে কী করিয়া? সাধ যায় তোর কাছে গিয়া চুপিচাপি বসি এক ভিতে ছোটোছোটো সেই ঘরটিতে। ছোটো হাতখানি হ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাতের বাদল মাতে
রাতের বাদল মাতে তমালের শাখে; পাখির বাসায় এসে "জাগো জাগো" ডাকে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাতের গাড়ি
এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি-- কামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম। অসীম আঁধারে কালি-লেপা কিছুনয় মনে হয় যারে নিদ্রার পারে রয়েছে সে পরিচয়হারা দেশে। ক্ষণ-আলো ইঙ্গিতে উঠে ঝলি, পার হয়ে যায় চলি অজ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রায়ঠাকুরানী অম্বিকা
রায়ঠাকুরানী অম্বিকা। দিনে দিনে তাঁর বাড়ে বাণীটার লম্বিকা। অবকাশ নেই তবুও তো কোনো গতিকে নিজে ব’কে যান, কহিতে না দেন পতিকে। নারীসমাজের তিনি তোরণের স্তম্ভিকা। সয় নাকো তাঁর দ্বিতীয় কাহারো দম্ভিকা। (খাপছাড়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাত্রি (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
জগতেরে জড়াইয়া শত পাকে যামিনীনাগিনী আকাশ – পাতাল জুড়ি ছিল পড়ে নিদ্রায় মগনা , আপনার হিম দেহে আপনি বিলীনা একাকিনী । মিটিমিটি তারকায় জ্বলে তার অন্ধকার ফণা । উষা আসি মন্ত্র পড়ি বাজাইল ললিত রাগিণী । রাঙা আঁ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রেমতত্ত্ব
নিঝর মিশেছে তটিনীর সাথে তটিনী মিশেছে সাগর-‘পরে, পবনের সাথে মিশিছে পবন চির-সুমধুর প্রণয়-ভরে! জগতে কেহই নাইকো একেলা, সকলি বিধির নিয়ম-গুণে, একের সহিত মিশিছে অপরে আমি বা কেন না তোমার সনে? দেখো, গিরি ওই চু...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বধূ
ঠাকুরমা দ্রুততালে ছড়া যেত প ' ড়ে — ভাবখানা মনে আছে — “ বউ আসে চতুর্দোলা চ ' ড়ে আম কাঁঠালের ছায়ে , গলায় মোতির মালা , সোনার চরণচক্র পায়ে । ” বালকের প্রাণে প্রথম সে নারীমন্ত্র আগমনীগানে ছন্দের লাগা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আনন্দেরই সাগর থেকে
আনন্দেরই সাগর থেকে এসেছে আজ বান। দাঁড় ধরে আজ বোস্ রে সবাই, টান রে সবাই টান্। বোঝা যত বোঝাই করি করব রে পার দুখের তরী, ঢেউয়ের ‘পরে ধরব পাড়ি যায় যদি যাক প্রাণ । আনন্দেরই সাগর থেকে এসেছে আজ বান। কে ডাকে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সংসারেতে দারুণ ব্যথা
সংসারেতে দারুণ ব্যথা লাগায় যখন প্রাণে "আমি যে নাই" এই কথাটাই মনটা যেন জানে। যে আছে সে সকল কালের, এ কাল হতে ভিন্ন— তাহার গায়ে লাগে না তো কোনো ক্ষতের চিহ্ন। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাহুর প্রেম
শুনেছি আমারে ভালোই লাগে না, নাই বা লাগিল তোর । কঠিন বাঁধনে চরণ বেড়িয়া চিরকাল তোরে রব আঁকড়িয়া লোহার শিকল-ডোর । তুই তো আমার বন্দী অভাগী, বাঁধিয়াছি কারাগারে, প্রাণের বাঁধন দিয়েছি প্রাণেতে, দেখি কে খুলিতে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাহুর মতন মৃত্যু
রাহুর মতন মৃত্যু শুধু ফেলে ছায়া, পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত জড়ের কবলে এ কথা নিশ্চিত মনে জানি। প্রেমের অসীম মূল্য সম্পূর্ণ বঞ্চনা করি লবে হেন দস্যু নাই গুপ্ত নিখিলের গুহা-গহ্বরেতে এ কথ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফসল গিয়েছে পেকে
ফসল গিয়েছে পেকে, দিনান্ত আপন চিহ্ন দিল তারে পাণ্ডূর আভায়। আলোকের ঊর্ধ্বসভা হতে আসন পড়িছে নুয়ে ভূতলের পানে। যে মাটির উদ্বোধন বাণী জাগায়েছে তারে একদিন, শোনো আজি তাহারই আহ্বান আসন্ন রাত্রির অন্ধকার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে
আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে, ওগো, দিক্-দিগন্ত ঢাকি। আজিকে আমরা কাঁদিয়া শুধাই সঘনে, ওগো, আমরা খাঁচার পাখি– হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর, আজি কি আসিল প্রলয়রাত্রি ঘোর। চিরদিবসের আলোক গেল কি মুছিয়া। চিরদ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রোম্যাণ্টিক
আমারে বলে যে ওরা রোম্যাণ্টিক। সে কথা মানিয়া লই রসতীর্থ-পথের পথিক। মোর উত্তরীয়ে দুয়ার-বাহিরে তব আসি যবে সুর করে ডাকি আমি ভোরের ভৈরবে। বসন্তবনের গন্ধ আনি তুলে রজনীগন্ধার ফুলে নিভৃত হাওয়ায় তব ঘরে। ক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রূপে ও অরূপে গাঁথা
রূপে ও অরূপে গাঁথা এ ভুবনখানি— ভাব তারে সুর দেয়, সত্য দেয় বাণী। এসো মাঝখানে তার, অানো ধ্যান আপনার ছবিতে গানেতে যেথা নিত্য কানাকানি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রূপ-বিরূপ
এই মোর জীবনের মহাদেশে কত প্রান্তরের শেষে, কত প্লাবনের স্রোতে এলেম ভ্রমণ করি শিশুকাল হতে-- কোথাও রহস্যঘন অরণ্যের ছায়াময় ভাষা, কোথাও পাণ্ডুর শুষ্ক মরুর নৈরাশা, কোথাও-বা যৌবনের কুসুমপ্রগল্ভ বনপথ, কোথা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার
রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার যাইবি কি তুই যাইবি কি তুই, রূপসী আমার যাইবি কি তুই, ভ্রমিবারে গিরি-কাননে? পাদপের ছায়া মাথার ‘পরে, পাখিরা গাইছে মধুর স্বরে অথবা উড়িছে পাখা বিছায়ে হরষে সে গিরি-কাননে! রূপসী আমার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে
ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে, গন্ধ সে চাহে ধূপেরে রহিতে জুড়ে। সুর আপনারে ধরা দিতে চাহে ছন্দে, ছন্দ ফিরিয়া ছুটে যেতে চায় সুরে। ভাব পেতে চায় রূপের মাঝারে অঙ্গ, রূপ পেতে চায় ভাবের মাঝারে ছাড়া। অসীম সে চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে– আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে। এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে। রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের ‘পরে নব তৃণ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তপনের পানে চেয়ে
তপনের পানে চেয়ে সাগরের ঢেউ বলে, "ওই পুতলিরে এনে দে-না কেউ।" (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শক্তির শক্তি
দিবসে চক্ষুর দম্ভ দৃষ্টিশক্তি লয়ে, রাত্রি যেই হল সেই অশ্রু যায় বয়ে! আলোরে কহিল—আজ বুঝিয়াছি ঠেকি তোমারি প্রসাদবলে তোমারেই দেখি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লটারিতে পেল পীতু
লটারিতে পেল পীতু হাজার পঁচাত্তর, জীবনী লেখার লোক জুটিল সে-মাত্তর। যখনি পড়িল চোখে চেহারাটা চেক্টার “আমি পিসে’ কহে এসে ড্রেন্ইন্স্পেক্টার। গুরু-ট্রেনিঙের এক পিলেওয়ালা ছাত্তর অযাচিত এল তার কন্যার পা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লুকায়ে আছেন যিনি
লুকায়ে আছেন যিনি জগতের মাঝে আমি তাঁরে প্রকাশিব সংসারের কাজে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লুকোচুরি
আমি যদি দুষ্টুমি করে চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি, ভোরের বেলা মা গো, ডালের ‘পরে কচি পাতায় করি লুটোপুটি, তবে তুমি আমার কাছে হারো, তখন কি মা চিনতে আমায় পারো। তুমি ডাক, ‘খোকা কোথায় ওরে। ' আমি শুধু হাসি চুপ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জননী তোমার করুণ চরণখানি
জননী, তোমার করুণ চরণখানি হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে। জননী, তোমার মরণহরণ বাণী নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে। তোমারে নমি হে সকল ভুবন-মাঝে, তোমারে নমি হে সকল জীবন-কাজে; তনু মন ধন করি নিবেদন আজি ভক্তিপাবন ত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছাড়িস নে ধরে থাক এঁটে
ছাড়িস নে ধরে থাক এঁটে, ওরে হবে তোর জয়। অন্ধকার যায় বুঝি কেটে, ওরে আর নেই ভয়। ওই দেখ্ পূর্বাশার ভালে নিবিড় বনের অন্তরালে শুকতারা হয়েছে উদয়। ওরে আর নেই ভয়। এরা যে কেবল নিশাচর– অবিশ্বাস আপনার ‘পর, নিরাশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শরতের শুকতারা
একাদশী রজনী পোহায় ধীরে ধীরে — রাঙা মেঘ দাঁড়ায় উষারে ঘিরে ঘিরে । ক্ষীণ চাঁদ নভের আড়ালে যেতে চায় , মাঝখানে দাঁড়ায়ে কিনারা নাহি পায় । বড়ো ম্লান হয়েছে চাঁদের মুখখানি , আপনাতে আপনি মিশাবে অনুমানি । হেরো দে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্নিগ্ধ মেঘ তীব্র তপ্ত
স্নিগ্ধ মেঘ তীব্র তপ্ত আকাশেরে ঢাকে, আকাশ তাহার কোনো চিহ্ন নাহি রাখে। তপ্ত মাটি তৃপ্ত যবে হয় তার জলে নম্ৰ নমস্কার তারে দেয় ফুলে ফলে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শক্তের ক্ষমা
নারদ কহিল আসি, হে ধরণী দেবী, তব নিন্দা করে নর তব অন্ন সেবি। বলে মাটি, বলে ধূলি, বলে জড় স্থুল, তোমারে মলিন বলে অকৃতজ্ঞকুল। বন্ধ করো অন্নজল, মুখ হোক চুন, ধুলামাটি কী জিনিস বাছারা বুঝুন। ধরণী কহিলা হাসি,...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শা-জাহান
এ কথা জানিতে তুমি ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান, কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান। শুধু তব অন্তরবেদনা চিরন্তন হয়ে থাক্, সম্রাটের ছিল এ সাধনা রাজশক্তি বজ্রসুকঠিন সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন কেবল ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মতিথির উপহার
একটি কাঠের বাক্স শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু স্নেহ-উপহার এনেছি রে দিতে লিখেও এনেছি দু-তিন ছত্তর । দিতে কত কী যে সাধ যায় তোরে দেবার মতো নেই জিনিস-পত্তর! টাকাকড়িগুলো ট্যাঁকশালে আছে ব্যাঙ্কে আছে সব জমা ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শিশু ভোলানাথ
ওরে মোর শিশু ভোলানাথ , তুলি দুই হাত যেখানে করিস পদপাত বিষম তাণ্ডবে তোর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সব ; আপন বিভব আপনি করিস নষ্ট হেলাভরে ; প্রলয়ের ঘূর্ণচক্র -' পরে চূর্ণ খেলেনার ধূলি উড়ে দিকে দিকে ; আপন সৃষ্টিকে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শীতের বিদায়
বসন্ত বালক মুখ-ভরা হাসিটি, বাতাস ব'য়ে ওড়ে চুল— শীত চলে যায়, মারে তার গায় মোটা মোটা গোটা ফুল। আঁচল ভরে গেছে শত ফুলের মেলা, গোলাপ ছুঁড়ে মারে টগর চাঁপা বেলা— শীত বলে, ‘ভাই, এ কেমন খেলা, যাবার বেলা হল, আস...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শান্তি
থাক্ থাক্ চুপ কর্ তোরা , ও আমার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে । আবার যদি জেগে ওঠে বাছা কান্না দেখে কান্না পাবে যে । কত হাসি হেসে গেছে ও , মুছে গেছে কত অশ্রুধার , হেসে কেঁদে আজ ঘুমাল , ওরে তোরা কাঁদাস নে আর । কত রা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শিশুর জীবন
ছোটো ছেলে হওয়ার সাহস আছে কি এক ফোঁটা, তাই তো এমন বুড়ো হয়েই মরি। তিলে তিলে জমাই কেবল জমাই এটা ওটা, পলে পলে বাক্স বোঝাই করি। কালকে-দিনের ভাবনা এসে আজ-দিনেরে মারলে ঠেসে কাল তুলি ফের পরদিনের বোঝা। সাধের জ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শিমূল রাঙা রঙে
শিমূল রাঙা রঙে চোখেরে দিল ভ’রে। নাকটা হেসে বলে, “হায় রে যাই ম’রে।’ নাকের মতে, গুণ কেবলি আছে ঘ্রাণে, রূপ যে রঙ খোঁজে নাকটা তা কি জানে। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিন্তাহরণ দালালের বাড়ি
চিন্তাহরণ দালালের বাড়ি গিয়ে একশো টাকার একখানি নোট দিয়ে তিনখানা নোট আনে সে দশ টাকার। কাগজ্-গন্তি মুনফা যতই বাড়ে টাকার গন্তি লক্ষ্মী ততই ছাড়ে, কিছুতে বুঝিতে পারে না দোষটা কার। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছায়াছবি
আমার প্রিয়ার সচল ছায়াছরি সজল নীলাকাশে। আমার প্রিয়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যাতারায় লুকিয়ে দেখে কাকে, সন্ধ্যাদীপের লুপ্ত আলো স্মরণে তার ভাসে। বারিঝরা বনের গন্ধ নিয়া পরশহারা বরণমালা গাঁথে আমার প্রি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরকাল একি লীলা গো
চিরকাল একি লীলা গো– অনন্ত কলরোল। অশ্রুত কোন্ গানের ছন্দে অদ্ভুত এই দোল। দুলিছ গো, দোলা দিতেছ। পলকে আলোকে তুলিছ, পলকে আঁধারে টানিয়া নিতেছ। সমুখে যখন আসি তখন পুলকে হাসি, পশ্চাতে যবে ফিরে যায় দোলা ভয়ে আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুন সখি বাজত বাঁশি
শুন সখি , বাজত বাঁশি গভীর রজনী , উজল কুঞ্জপথ , চন্দ্রম ডারত হাসি । দক্ষিণপবনে কম্পিত তরুগণ , তম্ভিত যমুনাবারি , কুসুমসুবাস উদাস ভইল , সখি , উদাস হৃদয় হমারি । বিগলিত মরম , চরণ খলিতগতি , শরম ভরম গয়ি দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুনব হাতির হাঁচি
“শুনব হাতির হাঁচি’ এই ব’লে কেষ্টা নেপালের বনে বনে ফেরে সারা দেশটা। শুঁড়ে সুড়্সুড়ি দিতে নিয়ে গেল কঞ্চি, সাত জালা নস্যি ও রেখেছিল সঞ্চি, জল কাদা ভেঙে ভেঙে করেছিল চেষ্টা– হেঁচে দু-হাজার হাঁচি মরে গেল শে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুচি
রামানন্দ পেলেন গুরুর পদ– সারাদিন তার কাটে জপে তপে, সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরকে ভোজ্য করেন নিবেদন, তার পরে ভাঙে তাঁর উপবাস যখন অন্তরে পান ঠাকুরের প্রসাদ। সেদিন মন্দিরে উৎসব– রাজা এলেন, রানী এলেন, এলেন পণ্ডিতে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুভক্ষণ
ওগো মা, রাজার দুলাল যাবে আজি মোর ঘরের সমুখপথে, আজি এ প্রভাতে গৃহকাজ লয়ে রহিব বলো কী মতে। বলে দে আমায় কী করিব সাজ, কী ছাঁদে কবরী বেঁধে লব আজ, পরিব অঙ্গে কেমন ভঙ্গে কোন্ বরনের বাস। মা গো, কী হল তোমার, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জলযাত্রা
নৌকো বেঁধে কোথায় গেল, যা ভাই মাঝি ডাকতে মহেশগঞ্জে যেতে হবে শীতের বেলা থাকতে। পাশের গাঁয়ে ব্যাবসা করে ভাগ্নে আমার বলাই, তার আড়তে আসব বেচে খেতের নতুন কলাই। সেখান থেকে বাদুড়ঘাটা আন্দাজ তিনপোয়া, যদুঘ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ কথা (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
মাঝে মাঝে মনে হয়, শত কথা-ভারে হৃদয় পড়েছে যেন নুয়ে একেবারে। যেন কোন্ ভাবযজ্ঞ বহু আয়োজনে চলিতেছে অন্তরের সুদূর সদনে। অধীর সিন্ধুর মতো কলধ্বনি তার অতি দূর হতে কানে আসে বারম্বার। মনে হয় কত ছন্দ, কত-না রা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ। ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন। নয়ন আমার রূপের পুরে সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে, শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন। তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার বাজাই আমি বাঁশি। গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শূন্য ঝুলি নিয়ে হায়
শূন্য ঝুলি নিয়ে হায় ভিক্ষু মিছে ফেরে, আপনারে দেয় যদি পায় সকলেরে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শূন্য ছিল মন
না-কোলাহলে-ঢাকা নানা-আনাগোনা-আঁকা দিনের মতন। নানা-জনতায়-ফাঁকা কর্মে-অচেতন শূন্য ছিল মন। জানি না কখন এল নূপুরবিহীন নিঃশব্দ গোধূলি। দেখি নাই স্বর্ণরেখা কী লিখিল শেষ লেখা দিনান্তের তুলি। আমি যে ছিলাম একা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শূন্য পাতার অন্তরালে
শূন্য পাতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে বাণী, কেমন করে আমি তারে বাইরে ডেকে আনি। যখন থাকি অন্যমনে দেখি তারে হৃদয়কোণে, যখন ডাকি দেয় সে ফাঁকি— পালায় ঘোমটা টানি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাও যদি সত্যরূপে
চাও যদি সত্যরূপে দেখিবারে মন্দ– ভালোর আলোতে দেখো, হোয়ো নাকো অন্ধ। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনরহস্য যায়
জীবনরহস্য যায় মরণরহস্য-মাঝে নামি, মুখর দিনের আলো নীরব নক্ষত্রে যায় থামি। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ বেলা
এল বেলা পাতা ঝরাবারে; শীর্ণ বলিত কায়া, আজ শুধু ভাঙা ছায়া মেলে দিতে পারে। একদিন ডাল ছিল ফুলে ফুলে ভরা নানা-রঙ-করা। কুঁড়ি ধরা ফলে কার যেন কী কৌতূহলে উঁকি মেরে আসা খুঁজে নিতে আপনার বাসা। ঋতুতে ঋতুতে আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ খেয়া
দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা-পরা ওই ছায়া ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ। ও পারেতে সোনার কূলে আঁধারমূলে কোন্ মায়া গেয়ে গেল কাজ-ভাঙানো গান। নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ যাবার মুখে যায় যারা ফেরার পথে ফিরেও নাহ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ চিঠি
মনে হচ্ছে শূন্য বাড়িটা অপ্রসন্ন, অপরাধ হয়েছে আমার তাই আছে মুখ ফিরিয়ে। ঘরে ঘরে বেড়াই ঘুরে, আমার জায়গা নেই-- হাঁপিয়ে বেরিয়ে চলে আসি। এ বাড়ি ভাড়া দিয়ে চলে যাব দেরাদুনে। অমলির ঘরে ঢুকতে পারি নি বহুদিন মোচ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিত্ত তোমায় নিত্য হবে
আমার চিত্ত তোমায় নিত্য হবে সত্য হবে - ওগো সত্য, আমার এখন সুদিন। ঘটবে কবে। সত্য সত্য সত্য জপি, সকল বুদ্ধি সত্যে সঁপি, সীমার বাঁধন পেরিয়ে যাব নিখিল ভবে - সত্য তোমার পূর্ণ প্রকাশ দেখব কবে। তোমায় দূরে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরায়মানা
যেমন আছ তেমনি এসো, আর কোরো না সাজ। বেণী নাহয় এলিয়ে রবে, সিঁথি নাহয় বাঁকা হবে, নাই-বা হল পত্রলেখায় সকল কারুকাজ। কাঁচল যদি শিথিল থাকে নাইকো তাহে লাজ। যেমন আছ তেমনি এসো, আর করো না সাজ।। এসো দ্রুত চরণ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সর্দিকে সোজাসুজি সর্দি ব’লেই বুঝি
সর্দিকে সোজাসুজি সর্দি ব’লেই বুঝি মেডিকেল বিজ্ঞান না শিখে। ডাক্তার দেয় শিষ, টাকা নিয়ে পঁয়ত্রিশ ভাবনায় গেল ঘুম, ওষুধের লাগে ধুম, শঙ্কা লাগালো পারিভাষিকে। আমি পুরাতন পাপী, শুনেই কাঁপি, ডরিনেকো সাদাসিধে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাঙ্গ হয়েছে রণ
সাঙ্গ হয়েছে রণ। অনেক যুঝিয়া অনেক খুঁজিয়া শেষ হল আয়োজন। তুমি এসো এসো নারী, আনো তব হেমঝারি। ধুয়ে-মুছে দাও ধূলির চিহ্ন, জোড়া দিয়ে দাও ভগ্ন-ছিন্ন, সুন্দর করো সার্থক করো পুঞ্জিত আয়োজন। এসো সুন্দরী নারী, শি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সম্মিলন
সেথায় কপোত-বধূ লতার আড়ালে দিবানিশি গাহে শুধু প্রেমের বিলাপ । নবীন চাঁদের করে একটি হরিণী আমাদের গৃহদ্বারে আরামে ঘুমায় । তার শান্ত নিদ্রাকালে নিশ্বাস পতনে প্রহর গণিতে পারি স্তব্ধ রজনীর । সুখের আবাসে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মদিন আসে বারে বারে
জন্মদিন আসে বারে বারে মনে করাবারে— এ জীবন নিত্যই নূতন প্রতি প্রাতে আলোকিত পুলকিত দিনের মতন। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাই গো আমি তোমারে চাই
চাই গো আমি তোমারে চাই তোমায় আমি চাই– এই কথাটি সদাই মনে বলতে যেন পাই। আর যা-কিছু বাসনাতে ঘুরে বেড়াই দিনে রাতে মিথ্যা সে-সব মিথ্যা ওগো তোমায় আমি চাই। রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে আলোর প্রার্থনাই– তেমনি গভীর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্যামল ঘন বকুলবন
শ্যামল ঘন বকুলবন- ছায়ে ছায়ে যেন কী সুর বাজে মধুর পায়ে পায়ে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরজনমের বেদনা
চিরজনমের বেদনা, ওহে চিরজীবনের সাধনা। তোমার আগুন উঠুক হে জ্বলে, কৃপা করিয়ো না দুর্বল ব’লে, যত তাপ পাই সহিবারে চাই, পুড়ে হোক ছাই বাসনা। অমোঘ যে ডাক সেই ডাক দাও আর দেরি কেন মিছে। যা আছে বাঁধন বক্ষ জড়ায়ে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্বশুরবাড়ির গ্রাম
শ্বশুরবাড়ির গ্রাম, নাম তার কুলকাঁটা, যেতে হবে উপেনের– চাই তাই চুল-ছাঁটা। নাপিত বললে, “কাঁচি খুঁজে যদি পাই বাঁচি– ক্ষুর আছে, একেবারে করে দেব মূল-ছাঁটা। জেনো বাবু, তাহলেই বেঁচে যায় ভুল-ছাঁটা।’ (খাপছাড়া ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষের কবিতা
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও? তারি রথ নিত্য উধাও। জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল তুলে নিল দ্রুত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষের অবগাহন সাঙ্গ করো, কবি, প্রদোষের
শেষের অবগাহন সাঙ্গ করো, কবি, প্রদোষের নির্মল তিমির তলে। ভৃতি তব সেবার শ্রমের সংসার যা দিয়েছিল আঁকড়িয়া রাখিয়ো না বুকে; এক প্রহরের মূল্য আরেক প্রহরে ফিরে নিতে কুণ্ঠা কভু নাহি তার; বাহির দ্বারের যে দ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চির-আমি
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে, চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা, মিটিয়ে দেব লেনা-দেনা বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে - আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্যামা
উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ , গলায় পলার হারখানি । চেয়েছি অবাক মানি তার পানে । বড়ো বড়ো কাজল নয়ানে অসংকোচে ছিল চেয়ে নবকৈশোরের মেয়ে , ছিল তারি কাছাকাছি বয়স আমার । স্পষ্ট মনে পড়ে ছবি । ঘরের দক্ষিণে খোলা ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রান্তি
সুখশ্রমে আমি , সখী , শ্রান্ত অতিশয় ; পড়েছে শিথিল হয়ে শিরার বন্ধন । অসহ্য কোমল ঠেকে কুসুমশয়ন , কুসুমরেণুর সাথে হয়ে যাই লয় । স্বপনের জালে যেন পড়েছি জড়ায়ে । যেন কোন্ অস্তাচলে সন্ধ্যাস্বপ্নময় রবির ছবির মত...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সংশয়ী
কোথায় যেতে ইচ্ছে করে শুধাস কি মা , তাই ? যেখান থেকে এসেছিলেম সেথায় যেতে চাই । কিন্তু সে যে কোন্ জায়গা ভাবি অনেকবার । মনে আমার পড়ে না তো একটুখানি তার । ভাবনা আমার দেখে বাবা বললে সেদিন হেসে , ' সে - জা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা
অবদানশতক অনাথপিণ্ডদ বুদ্ধের একজন প্রধান শিষ্য ছিলেন "প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি, ওগো পুরবাসী, কে রয়েছে জাগি, অনাথপিণ্ডদ কহিলা অম্বুদ- নিনাদে। সদ্য মেলিতেছে তরুণ তপন আলস্যে অরুণ সহাস্য লোচন শ্রা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্যামলা
যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি তোমারে দেখিয়া ভাবি তুমি তারি আছ কাছাকাছি। হৃদয়ের বিস্তীর্ণ আকাশে উন্মুক্ত বাতাসে চিত্ত তব স্নিগ্ধ সুগভীর। হে শ্যামলা, তুমি ধীর, সেবা তব সহজ সুন্দর, কর্মেরে বেষ্টিয়া তব আত্মসমা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্ম ও মরণ
সে তো সেদিনের কথা বাক্যহীন যবে এসেছিনু প্রবাসীর মতো এই ভবে বিনা কোন পরিচয়, রিক্ত শূন্য হাতে, একমাত্র ক্রন্দন সম্বল লয়ে সাথে। আজ সেথা কী করিয়া মানুষের প্রীতি কণ্ঠ হতে টানি লয় যত মোর গীতি। এ ভুবনে মোর চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সজনি সজনি রাধিকালো
সজনি সজনি রাধিকালো দেখ অবহুঁ চাহিয়া, মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে মৃদুল গান গাহিয়া। পিনহ ঝটিত কুমুম হার, পিনহ নীল আঙিয়া। সুন্দরি সিন্দূর দেকে সীঁথি করছ রাঙিয়া। সহচরি সব নাচ নাচ মধুর গীত গাওরে, চঞ্চল মঞ্জ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সখিরে—পিরীত বুঝবে কে
সখিরে— পিরী ত বুঝবে কে ? অঁধার হৃদয়ক দুঃখ কাহিনী বোলব , শুনবে কে ? রাধিকার অতি অন্তর বেদন কে বুঝবে অয়ি সজনী কে বুঝবে সখি রোয়ত রাধা কোন দুখে দিন রজনী ? কলঙ্ক রটায়ব জনি সখি রটাও কলঙ্ক নাহিক মানি , স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সজনি গো শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা
সজনি গো , শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা নিশীথযামিনী রে । কুঞ্জপথে সখি , কৈসে যাওব অবলা কামিনী রে । উন্মদ পবনে যমুনা তর্জিত , ঘন ঘন গর্জিত মেহ । দমকত বিদ্যুত , পথতরু লুন্ঠত , থরহর কম্পত দেহ । ঘন ঘন রিম্ ঝিম্ র...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথম পূজা
ত্রিলোকেশ্বরের মন্দির। লোকে বলে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তার ভিত-পত্তন করেছিলেন কোন্ মান্ধাতার আমলে, স্বয়ং হনুমান এনেছিলেন তার পাথর বহন করে। ইতিহাসের পণ্ডিত বলেন, এ মন্দির কিরাত জাতের গড়া, এ দেবতা কিরাতের। এক...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল
আগা বলে, আমি বড়ো, তুমি ছোটো লোক। গোড়া হেসে বলে, ভাই, ভালো তাই হোক। তুমি উচ্চে আছ ব’লে গর্বে আছ ভোর, তোমারে করেছি উচ্চ এই গর্ব মোর। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (দ্বিতীয় সর্গ)
যেও না! যেও না! দুয়ারে আঘাত করে কে ও পান্থবর? ‘কে ওগো কুটীরবাসি ! দ্বার খুলে দাও আসি! ’ তবুও কেন রে কেউ দেয় না উত্তর? আবার পথিকবর আঘাতিল ধীরে! “বিপন্ন পথিক আমি, কে আছে কুটিরে?” তবুও উত্তর নাই, নীরব ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোহ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে; কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাঝে মাঝে বিধাতার ঘটে একি ভুল
মাঝে মাঝে বিধাতার ঘটে একি ভুল– ধান পাকাবার মাসে ফোটে বেলফুল। হঠাৎ আনাড়ি কবি তুলি হাতে আঁকে ছবি, অকারণে কাঁচা কাজে পেকে যায় চুল। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে তরু, এ ধরাতলে
হে তরু, এ ধরাতলে রহিব না যবে তখন বসন্তে নব পল্লবে পল্লবে তোমার মর্মরধ্বনি পথিকেরে কবে, "ভালো বেসেছিল কবি বেঁচে ছিল যবে।" (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বদেশদ্বেষী
কেঁচো কয়, নীচ মাটি, কালো তার রূপ। কবি তারে রাগ ক’রে বলে, চুপ চুপ! তুমি যে মাটির কীট, খাও তারি রস, মাটির নিন্দায় বাড়ে তোমারি কি যশ! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে
কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে গাহিতে তোমার গান কহিল সকলে সহসা রুধিয়া গেল হৃদয়ের দ্বার– যেথায় আসন তব, গোপন আগার। স্থানভেদে তব গান– মূর্তি নব নব– সখাসনে হাস্যোচ্ছ্বাস সেও গান তব, প্রিয়াসনে প্রিয়ালাপ, ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বলের অপেক্ষা বলী
ধাইল প্রচণ্ড ঝড়, বাধাইল রণ— কে শেষে হইল জয়ী? মৃদু সমীরণ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেই আমাদের দেশের পদ্ম
সেই আমাদের দেশের পদ্ম তেমনি মধুর হেসে ফুটেছে, ভাই, অন্য নামে অন্য সুদূর দেশে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ
পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ, খড়কে দিয়ে উসকে দিচ্ছে থেকে থেকে। হাতির দাঁতের মতো কোমল সাদা পঙ্খের কাজ-করা মেজে; তার উপরে খান-দুয়েক মাদুর পাতা। ছোটো ছেলেরা জড়ো হয়েছি ঘরের কোণে মিটমিটে আলোয়। বুড়ো মো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালো অন্ধকারের তলায়
কালো অন্ধকারের তলায় পাখির শেষ গান গিয়েছে ডুবে। বাতাস থমথমে, গাছের পাতা নড়ে না, স্বচ্ছরাত্রের তারাগুলি যেন নেমে আসছে পুরাতন মহানিম গাছের ঝিল্লি-ঝংকৃত স্তব্ধ রহস্যের কাছাকাছি। এমন সময়ে হঠাৎ আবেগে আম...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কষ্টের জীবন (মানুষ কাঁদিয়া হাসে)
মানুষ কাঁদিয়া হাসে, পুনরায় কাঁদে গো হাসিয়া। পাদপ শুকায়ে গেলে, তবুও সে না হয় পতিত, তরণী ভাঙিয়া গেলে তবু ধীরে যায় সে ভাসিয়া, ছাদ যদি পড়ে যায়, দাঁড়াইয়া রহে তবু ভিত। বন্দী চলে যায় বটে, তবুও তো রহে কারাগার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কল্পনামধুপ
প্রতিদিন প্রাতে শুধু গুন্ গুন্ গান , লালসে অলস-পাখা অলির মতন । বিকল হৃদয় লয়ে পাগল পরান কোথায় করিতে যায় মধু অন্বেষণ । বেলা বহে যায় চলে — শ্রান্ত দিনমান , তরুতলে ক্লান্ত ছায়া করিছে শয়ন , মুরছিয়া পড়িতেছে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কৃতীর প্রমাদ
টিকি মুণ্ডে চড়ি উঠি কহে ডগা নাড়ি, হাত-পা প্রত্যেক কাজে ভুল করে ভারি। হাত-পা কহিল হাসি, হে অভ্রান্ত চুল, কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুমারসম্ভবগান
যখন শুনালে, কবি, দেবদম্পতিরে কুমারসম্ভবগান, চারি দিকে ঘিরে দাঁড়ালো প্রমথগণ—শিখরের ‘পর নামিল মন্থর শান্ত সন্ধ্যামেঘস্তর স্থগিত-বিদ্যুৎ-লীলা, গর্জনবিরত, কুমারের শিখী করি পুচ্ছ অবনত স্থির হয়ে দাঁড়াইল পার...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুঁড়ির ভিতর কাঁদিছে গন্ধ অন্ধ হয়ে
কুঁড়ির ভিতর কাঁদিছে গন্ধ অন্ধ হয়ে– কাঁদিছে আপন মনে, কুসুমের দলে বন্ধ হয়ে করুণ কাতর স্বনে। কহিছে সে,”হায় হায়, বেলা যায় বেলা যায় গো ফাগুনের বেলা যায়।’ ভয় নাই তোর, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, কিছু নাই তোর ভাবনা। ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালের প্রবল আবর্তে প্রতিহত
কালের প্রবল আবর্তে প্রতিহত ফেনপুঞ্জের মতো, আলোকে আঁধারে রঞ্জিত এই মায়া, অদেহ ধরিল কায়া। সত্তা আমার,জানি না, সে কোথা হতে হল উত্থিত নিত্যধাবিত স্রোতে। সহসা অভাবনীয় অদৃশ্য এক আরম্ভ-মাঝে কেন্দ্র রচিল স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুহুর্ত মিলায়ে যায়
মুহুর্ত মিলায়ে যায় তবু ইচ্ছা করে— আপন স্বাক্ষর রবে যুগে যুগান্তরে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্তিকা খোরাকি দিয়ে
মৃত্তিকা খোরাকি দিয়ে বাঁধে বৃক্ষটারে, আকাশ আলোক দিয়ে মুক্ত রাখে তারে। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্লান্ত মোর লেখনীর
ক্লান্ত মোর লেখনীর এই শেষ আশা— নীরবের ধ্যানে তার ডুবে যাবে ভাষা। (স্ফুলিঙ্গ)...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অধিকার
অধিকার বেশি কার বনের উপর সেই তর্কে বেলা হল, বাজিল দুপর। বকুল কহিল, শুন বান্ধব-সকল, গন্ধে আমি সর্ব বন করেছি দখল। পলাশ কহিল শুনি মস্তক নাড়িয়া, বর্ণে আমি দিগ্বিদিক রেখেছি কাড়িয়া। গোলাপ রাঙিয়া উঠি করিল জ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেই পুরাতন কালে ইতিহাস যবে
সেই পুরাতন কালে ইতিহাস যবে সংবাদে ছিল না মুখরিত নিস্তব্ধ খ্যাতির যুগে-- আজিকার এইমতো প্রাণযাত্রাকল্লোলিত প্রাতে যাঁরা যাত্রা করেছেন মরণশঙ্কিল পথে আত্মার অমৃত-অন্ন করিবারে দান দূরবাসী অনাত্মীয় জনে, দল...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোথায়
হায় কোথা যাবে! অনন্ত অজানা দেশ, নিতান্ত যে একা তুমি, পথ কোথা পাবে! হায়, কোথা যাবে! কঠিন বিপুল এ জগৎ, খুঁজে নেয় যে যাহার পথ। স্নেহের পুতলি তুমি সহসা অসীমে গিয়ে কার মুখে চাবে। হায়, কোথা যাবে! মোরা কেহ স...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোনো জাপানি কবিতার ইংরাজি অনুবাদ হইতে
বাতাসে অশথপাতা পড়িছে খসিয়া, বাতাসেতে দেবদারু উঠছে শ্বসিয়া। দিবসের পরে বসি রাত্রি মুদে আঁখি, নীড়েতে বসিয়া যেন পাহাড়ের পাখি। শ্রান্ত পদে ভ্রমি আমি নগরে নগরে বিজন অরণ্য দিয়া পর্বতে সাগরে। উড়িয়া ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বেসুর
ভাগ্য তাহার ভুল করেছে-- প্রাণের তানপুরার গানের সাথে মিল হল না, বেসুরো ঝংকার। এমন ত্রুটি ঘটল কিসে আপনিও তা বোঝে নি সে, অভাব কোথাও নেই-যে কিছুই এই কি অভাব তার। ঘরটাকে তার ছাড়িয়ে গেল ঘরেরই আসবাবে। মনটা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যর্থ
যদি প্রেম দিল না প্রাণে কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে? কেন তারার মালা গাঁথা, কেন ফুলের শয়ন পাতা, কেন দখিন হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?। যদি প্রেম দিলে না প্রাণে কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বের আলোকলুপ্ত তিমিরের অন্তরালে এল
বিশ্বের আলোকলুপ্ত তিমিরের অন্তরালে এল মৃত্যুদূত চুপে চুপে, জীবনের দিগন্ত আকাশে যত ছিল সূক্ষ্ম ধূলি স্তরে স্তরে দিল ধৌত করি ব্যথার দ্রাবক রসে দারুণ স্বপ্নের তলে তলে চলেছিল পলে পলে দৃঢ়হস্তে নিঃশব্দে মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনিত্যের যত আবর্জনা
অনিত্যের যত আবর্জনা পূজার প্রাঙ্গণ হতে প্রতি ক্ষণে করিয়ো মার্জনা।...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভগ্ন মন্দির
ভাঙা দেউলের দেবতা, তব বন্দনা রচিতে ছিন্ন বীণার তন্ত্রী বিরতা - সন্ধ্যাগগনে ঘোষে না শঙ্খ তোমার আরতিবারতা তব মন্দির স্থিরগম্ভীর ভাঙা দেউলের দেবতা। তব জনহীন ভবনে থেকে থেকে আসে ব্যাকুল গন্ধ নববসন্তপবনে যে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গণিতে রেলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়
গণিতে রেলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায় দিনরাত একা ব’সে কাটালো সে পাবনায়– নাম তার চুনিলাল, ডাক নাম ঝোড়্কে। ১ গুলো সবই ১ সাদা আর কালো কি, গণিতের গণনায় এ মতটা ভালো কি। অবশেষে সাম্যের সামলাবে তোড় কে। একের বহর ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সে তো সে দিনের কথা, বাক্যহীন যবে
সে তো সে দিনের কথা, বাক্যহীন যবে এসেছিনু প্রবাসীর মতো এই ভবে বিনা কোনো পরিচয়, রিক্ত শূন্য হাতে, একমাত্র ক্রন্দন সম্বল লয়ে সাথে। আজ সেথা কী করিয়া মানুষের প্রীতি কণ্ঠ হতে টানি লয় যত মোর গীতি। এ ভুবনে মো...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গর্ব করে নিই নে ও নাম
গর্ব করে নিই নে ও নাম, জান অন্তর্যামী, আমার মুখে তোমার নাম কি সাজে। যখন সবাই উপহাসে তখন ভাবি আমি আমার কণ্ঠে তোমার নাম কি বাজে। তোমা হতে অনেক দূরে থাকি সে যেন মোর জানতে না রয় বাকি, নামগানের এই ছদ্মবেশে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেয়া
খেয়া নৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে। দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানাশোনা, সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা। পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ, নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস, রক্তপ্রবাহের মাঝ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্নেহগ্রাস
অন্ধ মোহবন্ধ তব দাও মুক্ত করি— রেখো না বসায়ে দ্বারে জাগ্রত প্রহরী হে জননী, আপনার স্নেহ-কারাগারে সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে। বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে, জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে, মনুষ্যত্...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেলা (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
পথের ধারে অশথতলে মেয়েটি খেলা করে ; আপন-মনে আপনি আছে সারাটি দিন ধরে । উপর-পানে আকাশ শুধু , সমুখ-পানে মাঠ , শরৎকালে রোদ পড়েছে , মধুর পথঘাট । দুটি-একটি পথিক চলে , গল্প করে , হাসে । লজ্জাবতী বধূটি গেল ছায়...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিত্ত আমার হারাল আজ
চিত্ত আমার হারাল আজ মেঘের মাঝখানে, কোথায় ছুটে চলেছে সে কোথায় কে জানে। বিজুলি তা’র বীণার তারে আঘাত করে বারে বারে, বুকের মাঝে বজ্র বাজে কী মহাতানে। পুঞ্জ পুঞ্জ ভারে ভারে নিবিড় নীল অন্ধকারে জড়াল রে অঙ্গ ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্তন
১ নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল , বিকশিত যৌবনের বসন্তসমীরে কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে , সৌরভসুধায় করে পরান পাগল । মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে । কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্যাকরা
কার লাগি এই গয়না গড়াও যতন-ভরে। স্যাকরা বলে, একা আমার প্রিয়ার তরে। শুধাই তারে, প্রিয়া তোমার কোথায় আছে। স্যাকরা বলে, মনের ভিতর বুকের কাছে। আমি বলি, কিনে তো লয় মহারাজাই। স্যাকরা বলে, প্রেয়সীরে আগে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমব্যথী
যদি খোকা না হয়ে আমি হতেম কুকুর-ছানা— তবে পাছে তোমার পাতে আমি মুখ দিতে যাই ভাতে তুমি করতে আমায় মানা? সত্যি করে বল্ আমায় করিস নে মা, ছল— বলতে আমায় ‘দূর দূর দূর। কোথা থেকে এল এই কুকুর'? যা মা, তবে যা মা...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সারাবেলা
হেলাফেলা সারাবেলা এ কী খেলা আপন - সনে ! এই বাতাসে ফুলের বাসে মুখখানি কার পড়ে মনে ! আঁখির কাছে বেড়ায় ভাসি কে জানে গো কাহার হাসি ! দুটি ফোঁটা নয়নসলিল রেখে যায় এই নয়ন কোণে । কোন্ ছায়াতে কোন্ উদাসী দূরে ব...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বৈতরণী
অশ্রুস্রোতে স্ফীত হয়ে বহে বৈতরণী , চৌদিকে চাপিয়া আছে আঁধার রজনী । পূর্ব তীর হতে হু হু আসিছে নিশ্বাস , যাত্রী লয়ে পশ্চিমেতে চলেছে তরণী । মাঝে মাঝে দেখা দেয় বিদ্যুৎ – বিকাশ , কেহ কারে নাহি চেনে ব’সে নতশ...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
কেন গো এমন স্বরে বাজে তব বাঁশি , মধুর সুন্দর রূপে কেঁদে ওঠে হিয়া , রাঙা অধরের কোণে হেরি মধুহাসি পুলকে যৌবন কেন উঠে বিকশিয়া ! কেন তনু বাহুডোরে ধরা দিতে চায় , ধায় প্রাণ দুটি কালো আঁখির উদ্দেশে , হায় যদি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনেক হাজার বছরের
অনেক হাজার বছরের মরু-যবনিকার আচ্ছাদন যখন উৎক্ষিপ্ত হল, দেখা দিল তারিখ-হারানো লোকালয়ের বিরাট কঙ্কাল;-- ইতিহাসের অলক্ষ্য অন্তরালে ছিল তার জীবনক্ষেত্র। তার মুখরিত শতাব্দী আপনার সমস্ত কবিগান বাণীহীন অতলে...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর