আজগর ও কয়েকটি অনুজীব
ছোট গল্পটি তারিখে Yasin Khan লিখেছেন · ৯ মিনিট পড়ার সময় ·
আজগর আলী ও কয়েকটি অনুজীব
১
আজগর আলী,
বয়স, তেইশ কি চব্বিশ, কিন্তু দেখা যায় ,চুপশে যাওয়া
কিসমিসের মত , যদি সোজা কথায় বলি , আজগর আলীকে
দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না, সে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিদ্যায় স্নাতক সমমানের
তৃতীয় বর্ষের ছাত্র । দেখলে মনে হবে ,সে নাইন বা
টেইনে পড়ে,চোখে ভারী চশমা , ছোটখাটো দেহেরগরণ ,
আর সব সময় চুলে তেল দেয় । বরাবরি সে ক্লাসের
ছাত্রছাত্রী মধ্যে প্রথম হয়, মাঝে মধ্যে সে স্যারদের
বদলি হিসেবে প্রথম বর্ষে ক্লাশ নিয়ে থাকে। প্রায়ই,
ছাত্রছাত্রীরা তাকে নিয়ে মজা করে, হাঁসি ঠ্যাট্টা
করে,আজগর এই সব কিছুতে মন দেয় না বা গায়েও লাগায়
না, সুবদ বালকের মত ক্লাশ শেষ করে কাউকে কিছু না
বলে বের হয়ে যায়। বিভাগীয় যে ল্যাব আছে, সেখানে
ক্লাশের পড়ে আজগর নানাবিদ কাজে মগ্ন থাকে ।
বিভাগীয় প্রধানের নাম হাসান রেহেমান, লোকটা
অনেক বিজ্ঞ ও জ্ঞানী , সব সময় সাদা পায়জামা-
প্যাঞ্জাবি পড়েন , তিনি একসময় ওয়েলস
বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করেছেন, দেশে ফিরে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় যোগদান করেন। উনি, কাজ শেষে যখন
বাড়ি যান প্রায়ই দেখেন , আজগর ল্যাবে কাজ করছে।
হাসান সাহেব , আজগরকে নিয়ে খুব আশাবাদী।
বেশ কিছুদিন ধোরে , আজগরের দেখা নেই, ক্লাশেও
আসে না , প্রায়ই , দু-সপ্তাহ পর আসলো আজগর। অবশ্য
হাসান সাহেব , অফিস সহকারীকে বলে দিয়েছেন
যেখানেই দেখবে আজগরকে, আমার কাছে নিয়ে আসবে
বা আমার সাথে দেখা করতে বলবে । আজগর বিভাগে
এসে, সরাসরি বিভাগীয় প্রধানের রুমে ঢুকে পড়লো।
স্যরের টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে
থাকল।
-আজগর, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এতদিন
কোথায় ছিলে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলে?
আজগর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বলছে না।
মনে মনে ভাবছে, এই লোকটি , আমার জন্য অনেক
করেছে, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে ভাতার
ব্যবস্থা, বদলি ক্লাশের জন্য মাসে মাসে কিছু টাকা
ব্যবস্থা করে দিয়েছেন , উনি আমাকে নিয়ে অনেক
আশা করেন , আমি কিভাবে বলি ??
-আজগর , তোমার কি হয়েছে ? তোমাকে এমন দেখা
যাচ্ছে কেন? এতোদিন কোথায় ছিলে ,কথা বল?
২
_ স্যার , আমি আর এই বিভাগে পড়বো না।
হাসান সাহেব , অনেকটা ধাক্কা খেলেন মনে হয়।
- কেন কি হয়েছে? তোমার কি টাকা পয়সার সমস্যা?
- না স্যার ।
- তবে কি হয়েছে?
- স্যার কয়দিন ধরে খেয়াল করছি, ল্যাবে কাজ করার
সময় , অনুগুলি আমার সাথে কথা বলে।
- হোয়াট!!!! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো ?
- ন্যা , স্যার, বাসায়ও যখন আমি ল্যাবের কাজ করতে
যাই তখন অনুগুলি আমার সাথে কথা বলে।
- তুমি কি বলছো তুমি বুঝতে পারছো?
- জি স্যার।
- আচ্ছা অনুগুলি তোমাকে কি বলে?
- প্রথম বলতো , আমি নাকি একটা গাধা।
- কেন তোমাকে গাধা ভাবচ্ছে , তা জিজ্ঞাসা করনি??
- জি স্যার করেছি, তারা বলে আপনি নাকি , আমার
গবেষনা পত্র চুরি করে, আপনার নামে চালিয়ে দিবেন।
- ও আচ্ছা। তো এখন কি বলে?
- আপনি নাকি আমাকে আপনার মেয়ের সাথে বিয়ে
দিয়ে ঘর জামাই করার পায়তারা করছেন। আগে গাধা
বলতো , এখন উল্লুক বলছে। স্যার যখনি কাজ করতে চাই
,তখনি উল্লুক উল্লুক বলে ডাকে আমাকে। তাই স্যার
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি , যে অনু আপনাকে সম্মান
দিতে যানে না, তাদের নিয়ে আমি কাজ করবো না।
- আমারো তোমাকে এখন উল্লুক বলতে ইচ্ছে করছে। আমি
বলছি তুমি আরোও এক সপ্তাহ ক্লাশ অফ রাখো ।
বিশ্রাম করো , সব ঠিক হয়ে যাবে, সব সময় ল্যাবে
অনুজীবদের নিয়ে গবেষণা করতে করতে তোমার
ম্যান্টালিটি কলাপ্স করেছে।
- স্যার , আমি ঠিকি আছি।
- তুমি এক সপ্তাহ বিশ্রাম করো , তারপর দেখো কি হয় ?
- আচ্ছা ,স্যার আপনি যখন বলছেন দেখি কি হয়।
এই কথা বলে , রেহেমান সাহেবকে সালাম দিয়ে আজগর
চলে গেলো। রেহেমান সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন।
৩
প্রায় আটদিন পর আবার আজগর বিভাগীয় প্রধানের রুমে
প্রবেশ করল।
- স্যার, আসসালামুলাইকুম, কেমন আছেন?
- ভালো , তুমি কেমন আছো? তোমার অনুজীবদের খবর
কি? তারা কি আর তোমার সাথে কথা বলে?
- স্যার, আগের চেয়ে , এখন অবস্থা আরো খারাপ ?
- বলো কি ? কি হয়েছে?
- স্যার, আগে যখন শুধু কাজ করতে যেতাম , তখননি কথা
বলতো ,আর এখন সব সময় কথা বলে।
- বলো কি!! জি , স্যার , যেমন , এখনো কথা বলছে , তবে
স্যার, আমি ছাড়া সেই সব কথা কেউ শুনে না। স্যার ,
একটা মজার ব্যাপার আছে, তারা দুইজন, আর তারা
দুইজনি পুরুষ সম্প্রদায়, একজনের নাম কিলাই আর
অন্যজনের নাম ফিলাই ।
- কি বলছো এই সব?
- স্যার , এরা এখন আবার বিবাহ করতে চায় স্ত্রী খুঁজার
দায়িত্বটা আমাকে দিয়েছে। বলছে , আজগর ভাই,
আপনিতো অনুজীব্দের নিয়ে গবেষণা করেন, আপনি যদি
,ভালো কোন মেয়ে অনু পান তাহলে , আমাদের বইলেন,
আমরাতো অনু তাই ভাই আমাদের দুইজনের একটা বউ
হলেই চলবে।
- বুঝতে পারছি , তোমার মানষিক অবস্থা বেশি ভালো
না। তো , এখানে কোথায় থাকো?
- স্যার, কার্জন হলের পিছনে ডান দিক দিয়ে গেলে
হাতের বাঁয়ে এক বন্ধুর সাথে রুম শেয়ার করে থাকি।
- গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়া?
- স্যার, গ্রামে আমার তেমন কেঊ নেই। মা-বাবা মারা
যাওয়ার পর চাচার কাছে মানুষ হয়েছি।
- জাহাঙ্গীর (রেহেমান সাহেবের অফিস সহকারী)
গাড়ি বের করতে বলো।
- আজগর, আমার সাথে চলো।
- কোথায় স্যার ?
- আমারা বাড়িতে, যে কদিন তুমি ঠিক হচ্ছো না , সেই
কয়দিন আমার বাড়ি থেকো।
৪
গাড়িতে আজগর ও রেহেমান সাহেবের মধ্যে কথা হচ্ছে
- স্যার , ম্যাডাম মানে, আপনার স্ত্রী যদি কিছু মনে
করে?
- আরে বোকা ,থাকলে তো মনে করবে। আমার স্ত্রী
মারা গিয়েছে আজ পনের বছর আগে, আমার একমাত্র
মেয়ে , ডালিয়া আর আমি এই হল আমার পরিবার। তুমি
,এই সব নিয়ে চিন্তা করো না। তবে আজগর, তোমার
অনুজীবেরা আমাকে নিয়ে আর কিছু বলেছে ?
- না, স্যার ,এরা জানি কোথায় চলে যায়, মাঝে মধ্যে
এসে কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকে । তবে ,
স্যার প্রথম যেমন খারাপ মনে হয়েছিল ,এরা আসলে
তেমনটা খারাপ নয়। মেসে যখন ,রাতে পড়া শেষ করে
ঘুমাতে যাই তখন এসে শুরু করে কথা। ইদানিং , এরা
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়েও খুব চিন্তিত।
- কেন ? এই সব নিয়ে আবার ,এরা এতো চিন্তা করছে
কেন?
- স্যার, এরাও তো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে বাস
করে , সে হিসেবে তারাও এই দেশের নাগরিক। তবে
স্যার , এরা বলতে চাচ্ছে ,সবার যেমন পরিচয়পত্র আছে
,এদেরো তেমন পরিচয়পত্র দেওয়া হোক।
- এরা পরিচয়প্ত্র দিয়ে কি করবে?
- স্যার , রোহিংগা আর বিদেশী অনুজীবেরা
বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এই বিষয়টা তারা ভালো
চোখে দেখছে না
- আজগর , তুমি আর একটাও কথা বলবে না। চুপ করে বসে
থাকো।
৫
গাড়ি গেয়ে থামল , রেহেমান সাহেবের বাড়ির সামনে ,
বিশাল বড় ফটক। দারোয়ান দরজা খুলে দিলো, গাড়ি
গেইটের ভেতর প্রবেশ করল। একটি অল্প বয়সের মেয়ে
বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রেহেমান সাহেব ,
প্রথম গাড়ি থেকে নামলেন তারপর আজগর । মেয়েটি
সামনে এগিয়ে আসল।
-বাবা, এতো দেরি করে আসলে কেন?
- আর বলিস না , ঢাকা শহরে যা অবস্থা!!
- বাবা, ওনিকে।
- ওর, কথাই তোকে বলেছিলাম।
- মানে, তোমার অনুজীবী মানুষ?
- ডালিয়া, তুই যা টেবিলে খাবার দে।
- আচ্ছা বাবা।
- আজগর, তুমি কিছু মনে করনিতো?
- মা মরা মেয়েতো, তাই আর কি একটু বখে গেছে। আমার
মেয়েটা অনেকটা শামুকের মত, অনেক ভালো মনের
মেয়ে, আমার মেয়ে বলে বলছি না।
- স্যার, আমি কিছু মনে করি নাই।
- চলো ,খাবার টেবিলে দিকে যাওয়া যাক।
৬
খাওয়া –দাওয়ার পর আজগর একটা ঘুম দিলো। অনেকদিন
পর আজগর , এতো সব ভালো খাবার সমানে পেয়ে একটু
বেশি খেয়ে ফেলেছে। ঘুম থেকে উঠে , বসার রুমের
কাছে পায়চারি করছিলো ।
ডালিয়া পিছন থেকে আজগরকে বলল
- আজগর সাহেব , বাবাতো বাইরে গেছেন। আপনি ছাঁদে
যান , আমি আপনার জন্য চা বানিয়ে আনছি। সোজা
গিয়ে বাঁয়ে ছাঁদে উঠার সিঁড়ি।
- আচ্ছা ঠিক আছে ।
ছাঁদের এক কোনে আজগর, দাঁড়ানো ছিল। ডালিয়ে ,
এসে তার হাতে একটি কালো রঙয়ের কাপ দিলো। প্রথম
মেয়েটাকে যেমন মনে হয়েছিলো আসলে তেমন না ,
মেয়েটা বেশ ভালো । দুপুরবেলা খাবার সময় আজগর ঠিক
করে ডালিয়ার দিকে তাকায়নি।এখন ,সে ডালিয়ার
সামনাসামনি তাকালো । দেখতে অস্বাভাবিক সুন্দর
মেয়েটা, নীল রঙয়ের জামা পড়েছে , মনে হচ্ছে যেন
নীল পরী পথ ভুল করে রেহেমান সাহেবের বাড়ির ছাঁদে
এসে দাড়িয়েছে । পড়ন্ত বিকালের সোনালি আভা ,
ডালিয়ার মুখে এসে পড়ছে। , লম্বা চুলে কিরণ এসে
একপ্রকারের সোনালি আভা সৃষ্টি করছে । আজগরের
আগে কোন মেয়েকে দেখে এমনটা হয়নি। আজগর
,শরীরের মধ্যে কিছুটা মৃদু কম্পন অনুভব করল ।
- দু-চামিচ চিনি দিয়েছি, ঠিক আছে?
- জি চলবে।
- আপনি নাকি অণুজীবদের সাথে কথা বলেন ?
- না , আমি কথা বলি না ওরা আমার সাথে বলে।
- কি বলে , অনেক ধরনের কথা ।
- আচ্ছা বাদ দিন আপনার বাড়িতে কে কে আছেন ?
- তেমন কেউ নেই বলার মত।
- বাবা, আপনাকে এতো পছন্দ করেন কেন ?
- জানি না , স্যার অনেক ভালো মানুষ।
- আপনি গান শুনেন?
- হুম শুনতাম , এখন আর শুনি না ?
- মানে?
- এখন অবসরে অনুজীবগুলো কানের কাছে এসে হাজির
হয় ,ওদের সাথে কথা বলি ,এরপর তেমন সময় পাই না।
- কি কথা বলে ওরা ?
- অনেক ধরনের কথা ...।।
- যেমন?
- দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি , মাঝে মধ্যে বৈশিক
বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ।
- আপনি কি বলছেন এই সব? আপনি রুমে গিয়ে বিশ্রাম
নিন । বাবা , বলেছে আপনার সাথে রাতে ফিরে কি
জেনো জরুরি কথা বলবে।
- আচ্ছা , তাহলে আমি রুম যাই ।
- হুম, যান ।
৭
রেহেমান সাহেব রাতে বাড়ি ফিরে , আজগরকে তার
রুমে ডাকলেন।।
- তুমি ড্রিংকস , করো নাকি ?
- না, স্যার।
- আমি করি , আমি তোমার সামনে যদি কিছুটা মদ্য পান
করি তোমার কি কোন সমস্যা হবে?
- না , স্যার।
- বুঝো না , একাকী মানুষ , খেতে হয় আর কি।
- আজ আর অনুজীবদের সাথে কথা হয়েছে?
- না, স্যার , তবে আপনার বাসায় আসার আগে হয়েছিলো
।
- ডালিয়ার সাথে কথা হয়েছে ?
- জি স্যার ।
- কেমন আমার মেয়েটা ?
- জি স্যার , আপনার কথা সত্যি , ডালিয়া ম্যাডাম ,
অনেকটা শামুকের মত।
- মা মরা মেয়ে আমার , তুমিতো জানো আমি পেশাগত
কাজে কত ব্যস্ত থাকি ।
- আমার মেয়েটা সামনের সপ্তাহে সুইডেন চলে যাবে।
আমি চাই ডালিয়া বিয়ে করে ,ওর হাসব্যান্ডকে নিয়ে
সুইডেন যাক তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হতে পারতাম ।
- জি স্যার তাহলে অনেক ভালো হয়।
- হুম , জিজ্ঞাসা করলে না , ছেলেটা কে ?
- কে স্যার ?
- তুমি
- মানে স্যার ?
- আমার ডালিয়ার সাথে কথা হয়েছে , সে তোমাকে
পছন্দ করেছে ।
- তুমি আগামীকাল সকালে হ্যাঁ বা না জানাবে। এখন
রুমে যাওয়া।
পরেরদিন সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে ডালিয়া ,
আজগর ও রেহেমান সাহেব।
- আজগর ,তুমি কিছু বললে না ?
- স্যার , আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। আমার
কোন সমস্যা নেই।
ঠিক তখনি আজগর আলীর কানের কাছে অণুজীব বলে
উঠল , আজগর ভাই , আমরা আপনাকে বলেছিলাম না, ভাই
অনুজীবরা মিথ্যা কথা বলতে পারে না ...হি হি হি।
১
আজগর আলী,
বয়স, তেইশ কি চব্বিশ, কিন্তু দেখা যায় ,চুপশে যাওয়া
কিসমিসের মত , যদি সোজা কথায় বলি , আজগর আলীকে
দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না, সে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিদ্যায় স্নাতক সমমানের
তৃতীয় বর্ষের ছাত্র । দেখলে মনে হবে ,সে নাইন বা
টেইনে পড়ে,চোখে ভারী চশমা , ছোটখাটো দেহেরগরণ ,
আর সব সময় চুলে তেল দেয় । বরাবরি সে ক্লাসের
ছাত্রছাত্রী মধ্যে প্রথম হয়, মাঝে মধ্যে সে স্যারদের
বদলি হিসেবে প্রথম বর্ষে ক্লাশ নিয়ে থাকে। প্রায়ই,
ছাত্রছাত্রীরা তাকে নিয়ে মজা করে, হাঁসি ঠ্যাট্টা
করে,আজগর এই সব কিছুতে মন দেয় না বা গায়েও লাগায়
না, সুবদ বালকের মত ক্লাশ শেষ করে কাউকে কিছু না
বলে বের হয়ে যায়। বিভাগীয় যে ল্যাব আছে, সেখানে
ক্লাশের পড়ে আজগর নানাবিদ কাজে মগ্ন থাকে ।
বিভাগীয় প্রধানের নাম হাসান রেহেমান, লোকটা
অনেক বিজ্ঞ ও জ্ঞানী , সব সময় সাদা পায়জামা-
প্যাঞ্জাবি পড়েন , তিনি একসময় ওয়েলস
বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করেছেন, দেশে ফিরে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় যোগদান করেন। উনি, কাজ শেষে যখন
বাড়ি যান প্রায়ই দেখেন , আজগর ল্যাবে কাজ করছে।
হাসান সাহেব , আজগরকে নিয়ে খুব আশাবাদী।
বেশ কিছুদিন ধোরে , আজগরের দেখা নেই, ক্লাশেও
আসে না , প্রায়ই , দু-সপ্তাহ পর আসলো আজগর। অবশ্য
হাসান সাহেব , অফিস সহকারীকে বলে দিয়েছেন
যেখানেই দেখবে আজগরকে, আমার কাছে নিয়ে আসবে
বা আমার সাথে দেখা করতে বলবে । আজগর বিভাগে
এসে, সরাসরি বিভাগীয় প্রধানের রুমে ঢুকে পড়লো।
স্যরের টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে
থাকল।
-আজগর, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এতদিন
কোথায় ছিলে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলে?
আজগর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বলছে না।
মনে মনে ভাবছে, এই লোকটি , আমার জন্য অনেক
করেছে, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে ভাতার
ব্যবস্থা, বদলি ক্লাশের জন্য মাসে মাসে কিছু টাকা
ব্যবস্থা করে দিয়েছেন , উনি আমাকে নিয়ে অনেক
আশা করেন , আমি কিভাবে বলি ??
-আজগর , তোমার কি হয়েছে ? তোমাকে এমন দেখা
যাচ্ছে কেন? এতোদিন কোথায় ছিলে ,কথা বল?
২
_ স্যার , আমি আর এই বিভাগে পড়বো না।
হাসান সাহেব , অনেকটা ধাক্কা খেলেন মনে হয়।
- কেন কি হয়েছে? তোমার কি টাকা পয়সার সমস্যা?
- না স্যার ।
- তবে কি হয়েছে?
- স্যার কয়দিন ধরে খেয়াল করছি, ল্যাবে কাজ করার
সময় , অনুগুলি আমার সাথে কথা বলে।
- হোয়াট!!!! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো ?
- ন্যা , স্যার, বাসায়ও যখন আমি ল্যাবের কাজ করতে
যাই তখন অনুগুলি আমার সাথে কথা বলে।
- তুমি কি বলছো তুমি বুঝতে পারছো?
- জি স্যার।
- আচ্ছা অনুগুলি তোমাকে কি বলে?
- প্রথম বলতো , আমি নাকি একটা গাধা।
- কেন তোমাকে গাধা ভাবচ্ছে , তা জিজ্ঞাসা করনি??
- জি স্যার করেছি, তারা বলে আপনি নাকি , আমার
গবেষনা পত্র চুরি করে, আপনার নামে চালিয়ে দিবেন।
- ও আচ্ছা। তো এখন কি বলে?
- আপনি নাকি আমাকে আপনার মেয়ের সাথে বিয়ে
দিয়ে ঘর জামাই করার পায়তারা করছেন। আগে গাধা
বলতো , এখন উল্লুক বলছে। স্যার যখনি কাজ করতে চাই
,তখনি উল্লুক উল্লুক বলে ডাকে আমাকে। তাই স্যার
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি , যে অনু আপনাকে সম্মান
দিতে যানে না, তাদের নিয়ে আমি কাজ করবো না।
- আমারো তোমাকে এখন উল্লুক বলতে ইচ্ছে করছে। আমি
বলছি তুমি আরোও এক সপ্তাহ ক্লাশ অফ রাখো ।
বিশ্রাম করো , সব ঠিক হয়ে যাবে, সব সময় ল্যাবে
অনুজীবদের নিয়ে গবেষণা করতে করতে তোমার
ম্যান্টালিটি কলাপ্স করেছে।
- স্যার , আমি ঠিকি আছি।
- তুমি এক সপ্তাহ বিশ্রাম করো , তারপর দেখো কি হয় ?
- আচ্ছা ,স্যার আপনি যখন বলছেন দেখি কি হয়।
এই কথা বলে , রেহেমান সাহেবকে সালাম দিয়ে আজগর
চলে গেলো। রেহেমান সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন।
৩
প্রায় আটদিন পর আবার আজগর বিভাগীয় প্রধানের রুমে
প্রবেশ করল।
- স্যার, আসসালামুলাইকুম, কেমন আছেন?
- ভালো , তুমি কেমন আছো? তোমার অনুজীবদের খবর
কি? তারা কি আর তোমার সাথে কথা বলে?
- স্যার, আগের চেয়ে , এখন অবস্থা আরো খারাপ ?
- বলো কি ? কি হয়েছে?
- স্যার, আগে যখন শুধু কাজ করতে যেতাম , তখননি কথা
বলতো ,আর এখন সব সময় কথা বলে।
- বলো কি!! জি , স্যার , যেমন , এখনো কথা বলছে , তবে
স্যার, আমি ছাড়া সেই সব কথা কেউ শুনে না। স্যার ,
একটা মজার ব্যাপার আছে, তারা দুইজন, আর তারা
দুইজনি পুরুষ সম্প্রদায়, একজনের নাম কিলাই আর
অন্যজনের নাম ফিলাই ।
- কি বলছো এই সব?
- স্যার , এরা এখন আবার বিবাহ করতে চায় স্ত্রী খুঁজার
দায়িত্বটা আমাকে দিয়েছে। বলছে , আজগর ভাই,
আপনিতো অনুজীব্দের নিয়ে গবেষণা করেন, আপনি যদি
,ভালো কোন মেয়ে অনু পান তাহলে , আমাদের বইলেন,
আমরাতো অনু তাই ভাই আমাদের দুইজনের একটা বউ
হলেই চলবে।
- বুঝতে পারছি , তোমার মানষিক অবস্থা বেশি ভালো
না। তো , এখানে কোথায় থাকো?
- স্যার, কার্জন হলের পিছনে ডান দিক দিয়ে গেলে
হাতের বাঁয়ে এক বন্ধুর সাথে রুম শেয়ার করে থাকি।
- গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়া?
- স্যার, গ্রামে আমার তেমন কেঊ নেই। মা-বাবা মারা
যাওয়ার পর চাচার কাছে মানুষ হয়েছি।
- জাহাঙ্গীর (রেহেমান সাহেবের অফিস সহকারী)
গাড়ি বের করতে বলো।
- আজগর, আমার সাথে চলো।
- কোথায় স্যার ?
- আমারা বাড়িতে, যে কদিন তুমি ঠিক হচ্ছো না , সেই
কয়দিন আমার বাড়ি থেকো।
৪
গাড়িতে আজগর ও রেহেমান সাহেবের মধ্যে কথা হচ্ছে
- স্যার , ম্যাডাম মানে, আপনার স্ত্রী যদি কিছু মনে
করে?
- আরে বোকা ,থাকলে তো মনে করবে। আমার স্ত্রী
মারা গিয়েছে আজ পনের বছর আগে, আমার একমাত্র
মেয়ে , ডালিয়া আর আমি এই হল আমার পরিবার। তুমি
,এই সব নিয়ে চিন্তা করো না। তবে আজগর, তোমার
অনুজীবেরা আমাকে নিয়ে আর কিছু বলেছে ?
- না, স্যার ,এরা জানি কোথায় চলে যায়, মাঝে মধ্যে
এসে কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকে । তবে ,
স্যার প্রথম যেমন খারাপ মনে হয়েছিল ,এরা আসলে
তেমনটা খারাপ নয়। মেসে যখন ,রাতে পড়া শেষ করে
ঘুমাতে যাই তখন এসে শুরু করে কথা। ইদানিং , এরা
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়েও খুব চিন্তিত।
- কেন ? এই সব নিয়ে আবার ,এরা এতো চিন্তা করছে
কেন?
- স্যার, এরাও তো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে বাস
করে , সে হিসেবে তারাও এই দেশের নাগরিক। তবে
স্যার , এরা বলতে চাচ্ছে ,সবার যেমন পরিচয়পত্র আছে
,এদেরো তেমন পরিচয়পত্র দেওয়া হোক।
- এরা পরিচয়প্ত্র দিয়ে কি করবে?
- স্যার , রোহিংগা আর বিদেশী অনুজীবেরা
বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এই বিষয়টা তারা ভালো
চোখে দেখছে না
- আজগর , তুমি আর একটাও কথা বলবে না। চুপ করে বসে
থাকো।
৫
গাড়ি গেয়ে থামল , রেহেমান সাহেবের বাড়ির সামনে ,
বিশাল বড় ফটক। দারোয়ান দরজা খুলে দিলো, গাড়ি
গেইটের ভেতর প্রবেশ করল। একটি অল্প বয়সের মেয়ে
বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রেহেমান সাহেব ,
প্রথম গাড়ি থেকে নামলেন তারপর আজগর । মেয়েটি
সামনে এগিয়ে আসল।
-বাবা, এতো দেরি করে আসলে কেন?
- আর বলিস না , ঢাকা শহরে যা অবস্থা!!
- বাবা, ওনিকে।
- ওর, কথাই তোকে বলেছিলাম।
- মানে, তোমার অনুজীবী মানুষ?
- ডালিয়া, তুই যা টেবিলে খাবার দে।
- আচ্ছা বাবা।
- আজগর, তুমি কিছু মনে করনিতো?
- মা মরা মেয়েতো, তাই আর কি একটু বখে গেছে। আমার
মেয়েটা অনেকটা শামুকের মত, অনেক ভালো মনের
মেয়ে, আমার মেয়ে বলে বলছি না।
- স্যার, আমি কিছু মনে করি নাই।
- চলো ,খাবার টেবিলে দিকে যাওয়া যাক।
৬
খাওয়া –দাওয়ার পর আজগর একটা ঘুম দিলো। অনেকদিন
পর আজগর , এতো সব ভালো খাবার সমানে পেয়ে একটু
বেশি খেয়ে ফেলেছে। ঘুম থেকে উঠে , বসার রুমের
কাছে পায়চারি করছিলো ।
ডালিয়া পিছন থেকে আজগরকে বলল
- আজগর সাহেব , বাবাতো বাইরে গেছেন। আপনি ছাঁদে
যান , আমি আপনার জন্য চা বানিয়ে আনছি। সোজা
গিয়ে বাঁয়ে ছাঁদে উঠার সিঁড়ি।
- আচ্ছা ঠিক আছে ।
ছাঁদের এক কোনে আজগর, দাঁড়ানো ছিল। ডালিয়ে ,
এসে তার হাতে একটি কালো রঙয়ের কাপ দিলো। প্রথম
মেয়েটাকে যেমন মনে হয়েছিলো আসলে তেমন না ,
মেয়েটা বেশ ভালো । দুপুরবেলা খাবার সময় আজগর ঠিক
করে ডালিয়ার দিকে তাকায়নি।এখন ,সে ডালিয়ার
সামনাসামনি তাকালো । দেখতে অস্বাভাবিক সুন্দর
মেয়েটা, নীল রঙয়ের জামা পড়েছে , মনে হচ্ছে যেন
নীল পরী পথ ভুল করে রেহেমান সাহেবের বাড়ির ছাঁদে
এসে দাড়িয়েছে । পড়ন্ত বিকালের সোনালি আভা ,
ডালিয়ার মুখে এসে পড়ছে। , লম্বা চুলে কিরণ এসে
একপ্রকারের সোনালি আভা সৃষ্টি করছে । আজগরের
আগে কোন মেয়েকে দেখে এমনটা হয়নি। আজগর
,শরীরের মধ্যে কিছুটা মৃদু কম্পন অনুভব করল ।
- দু-চামিচ চিনি দিয়েছি, ঠিক আছে?
- জি চলবে।
- আপনি নাকি অণুজীবদের সাথে কথা বলেন ?
- না , আমি কথা বলি না ওরা আমার সাথে বলে।
- কি বলে , অনেক ধরনের কথা ।
- আচ্ছা বাদ দিন আপনার বাড়িতে কে কে আছেন ?
- তেমন কেউ নেই বলার মত।
- বাবা, আপনাকে এতো পছন্দ করেন কেন ?
- জানি না , স্যার অনেক ভালো মানুষ।
- আপনি গান শুনেন?
- হুম শুনতাম , এখন আর শুনি না ?
- মানে?
- এখন অবসরে অনুজীবগুলো কানের কাছে এসে হাজির
হয় ,ওদের সাথে কথা বলি ,এরপর তেমন সময় পাই না।
- কি কথা বলে ওরা ?
- অনেক ধরনের কথা ...।।
- যেমন?
- দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি , মাঝে মধ্যে বৈশিক
বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ।
- আপনি কি বলছেন এই সব? আপনি রুমে গিয়ে বিশ্রাম
নিন । বাবা , বলেছে আপনার সাথে রাতে ফিরে কি
জেনো জরুরি কথা বলবে।
- আচ্ছা , তাহলে আমি রুম যাই ।
- হুম, যান ।
৭
রেহেমান সাহেব রাতে বাড়ি ফিরে , আজগরকে তার
রুমে ডাকলেন।।
- তুমি ড্রিংকস , করো নাকি ?
- না, স্যার।
- আমি করি , আমি তোমার সামনে যদি কিছুটা মদ্য পান
করি তোমার কি কোন সমস্যা হবে?
- না , স্যার।
- বুঝো না , একাকী মানুষ , খেতে হয় আর কি।
- আজ আর অনুজীবদের সাথে কথা হয়েছে?
- না, স্যার , তবে আপনার বাসায় আসার আগে হয়েছিলো
।
- ডালিয়ার সাথে কথা হয়েছে ?
- জি স্যার ।
- কেমন আমার মেয়েটা ?
- জি স্যার , আপনার কথা সত্যি , ডালিয়া ম্যাডাম ,
অনেকটা শামুকের মত।
- মা মরা মেয়ে আমার , তুমিতো জানো আমি পেশাগত
কাজে কত ব্যস্ত থাকি ।
- আমার মেয়েটা সামনের সপ্তাহে সুইডেন চলে যাবে।
আমি চাই ডালিয়া বিয়ে করে ,ওর হাসব্যান্ডকে নিয়ে
সুইডেন যাক তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হতে পারতাম ।
- জি স্যার তাহলে অনেক ভালো হয়।
- হুম , জিজ্ঞাসা করলে না , ছেলেটা কে ?
- কে স্যার ?
- তুমি
- মানে স্যার ?
- আমার ডালিয়ার সাথে কথা হয়েছে , সে তোমাকে
পছন্দ করেছে ।
- তুমি আগামীকাল সকালে হ্যাঁ বা না জানাবে। এখন
রুমে যাওয়া।
পরেরদিন সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে ডালিয়া ,
আজগর ও রেহেমান সাহেব।
- আজগর ,তুমি কিছু বললে না ?
- স্যার , আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। আমার
কোন সমস্যা নেই।
ঠিক তখনি আজগর আলীর কানের কাছে অণুজীব বলে
উঠল , আজগর ভাই , আমরা আপনাকে বলেছিলাম না, ভাই
অনুজীবরা মিথ্যা কথা বলতে পারে না ...হি হি হি।
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।