কুয়াশায়
এই কবিতাটি লিখেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় · ২ মিনিট পড়ার সময় ·
ছিলাে টিলা, হয়ে ওঠে মেঘ।
যদি নামি, যদি আমি ভূপৃষ্ঠে দাঁড়াই
তার মানে টিলা থেকে নিচে আছে আকাড়া খােয়াই--
মাঠ, আলপথ, জল, আলপথ, জল
মাঝেমধ্যে গম-নাড়া, মাঝেমধ্যে ওঁরাও বসতি,
তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে কুয়াশা তাড়িয়ে
কুয়াশার মধ্যে আছে শাদা সুঁচ, পিতলের মতাে
কখন সে পুবদিকে উঠে এসে দাঁড়াবে উঠোনে।
সেকথা এখন নয়, এখন শীতের বুড়াে মুখ
দেখে-দেখে ক্লান্ত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে মাঠের
দরজার সামনে এসে দাঁড়ানে …কখন রক্ত পড়ে!
ভিতরে সবুজ কন্ঠ বলে যায় অন্য ইতিহাস
কণ্ঠের ভিতরে আজ বলে যায় অন্য ইতিহাস
ভিতরে কে কড়া নাড়ে, দরজার ওপাশে---
কেন আসাে , এতে ভােরবেলা ?
নিশ্চিত জানি না কেন, চলে আসি, অতি গূঢ় মাঠ
পার হয়ে, টিলা থেকে সমতলে, যখন-যেভাবে
আসতে ইচ্ছে হয়, আসি। উত্তর দেবার
সময় নয়তাে ভােরবেলা, তুমি কাজ করাে
তােমার কী যেন কাজ ছিলাে সন্ধে-রাতে
তােমার কী কাজ ছিলাে বিখ্যাত প্রভাতে
তুমি কাজ করাে।
পাথরে ছিলাে না জল, আমি এসে গেছি
পাথর মাড়িয়ে, জল ছিলাে না পাথরে।
' দুহাত ভরেই জল, তাই ঠাণ্ডা লাগে…
দস্তানা তােমার নেই, আমি বুনে দেবাে।
কিছুতে বলবে না কাউকে, গালে হাত রাখাে
যতােই জলের হাত, গ্রীষ্মের খরতা
তুমি সঙ্গে নিয়ে এলে, চা, কফি বানাবাে?
কিন্তু, তা এখন নয়, উল্টোদিকে বসাে
পা দুখানি স্পষ্ট করাে, হাতে রাখাে হাত
তুমি কাজ করাে ।
' কাজ করা সম্ভব এখন?
‘ কেনই বা নয় , কাজ , কাজ ছিলাে পাথরের নদী
কেমন বহতা শীতে, এতাে নয় বৃষ্টি সর্বজয়া
গ্রীশ্মের সন্ন্যাস নয়, এতাে শীতে দুখানি চরণ
আমার হাতের মধ্যে নিয়ে নেওয়া
পৌষী প্রভাতে
অর্জুনের ছল কারা ছড়িয়ে রেখেছে,
রেশমের গুটি ছেড়ে পালিয়েছে কীট,
বৃষ্টি পড়ে এ-সময়ে শালের জঙ্গলে।
বাঘের মাঘের শীত গায়ে আমাদের
বৃষ্টি পড়ে, এ-সময়ে আমাদের গানে
বৃষ্টি পড়ে, দুরে থাক শালের মঞ্জরী
লুপংগুটু ঝর্না নয়, আর্টিজীয় কূপ…
সেই ভােরবেলা উঠে দুজনে চলেছি
দুজন একজন হতে পারিনি এখনাে।
অর্জুনের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি,
পথে পড়েছিলাে বােরো, পার হয়ে এসেছি
হেঁটেছি মাইল দুই, কুয়াশা-কানিতে
সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে এসে পৌঁছেছি কুপের।
উনুনের মতাে টিলা, সে-টিলা মাড়িয়ে
অর্জুনের শিরা ছিলাে তার উপর বসে
একটি হাত দিয়ে ওর কাঁধটি জড়িয়ে
একা একা বসে আছি, দুপ্রান্তে দুজন---
দুজন একজন হতে পারিনি এখনাে।
ভােরবেলা চুম্বনের শীত ওষ্ঠে লাগে।
দুটি করতলে করে সে-মুখ স্থাপন
আবার চুম্বন করি সেই ওষ্ঠাধরে,
তখন উষ্ণতা পাই শরীরে উন্মুখ
হয়ে পড়ে ইন্দ্রিয়েরা
তখনি শালের
ভিতরের বুকের মধ্যে দুটি হাত রাখি।
ও কিছু বলে না, শুধু অন্ধের মতন
চোখ বুজে স্থির থাকে পাথরের মতাে।
‘ আমি তাে পাথর হতে চাইনি কখনাে
কেন যে এমন হয়, কিছুতে বুঝি না !
‘ তুমি বড়াে ভয় পাও, সেজন্য ঘরের
বাহিরে এনেছি আজ কিছু পাবাে বলে--- '
‘ এই কি যথেষ্ট পাওয়া , এর বেশি নয়?
সে-পাওয়া পরের, আমি তুলে রেখে দেবাে
যেদিন বিবাহ হবে একসঙ্গে পাবাে
তােমার সমগ্র '
' যদি বিবাহ না হয়।'
' তাহলেও যা পেয়েছি, তাও তো অনেক
কুয়াশায় যা পেয়েছি তাও তো অনেক।
যথেষ্ট, যথেষ্ট॥
কাব্যগ্রন্থ -- প্রকাশকাল :
এই তো মর্মর মুর্তি' জানুয়ারি-১৯৮৭
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।