নব প্রভাতের আলো
গল্পটি তারিখে syed Junaed লিখেছেন · ৩ মিনিট পড়ার সময় ·
রাত বারোটার দিকে প্রুফ দেখা শেষ করে অফিস থেকে বেরিয়ে শীতের রাতে শরীরটাকে কিছুটা চাঙ্গা করার জন্য নিকটস্থ চায়ের দোকান থেকে আদা দিয়ে এক কাপ রং চা থেয়ে আর এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট কিনে সেই প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সেটাকে ধরিয়ে টানতে টানতে কারওয়ানবাজারের সামনে এসে রাস্তার উপর বসা তরকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে তরি-তরকারি কিনে বাসায় যাওয়ার জন্য পঞ্চাশোর্ধ আকবর আলী একটা রিক্সায় চড়ে বসে।রিক্সাওয়ালা রিক্সা চালিয়ে মার্কেটের সামনে থেকে বেরিয়ে রেললাইন পর্যন্ত এসে বামদিকে ঘুরে রেল লাইনের বিপরীত দিকে থাকা কলার আড়তের ঠিক পিছনের একটি গলিতে ঢুকে তিনটি ভবন পেরিয়ে গলির শেষ মাথায় একটি ভবনের সামনে গিয়ে রিক্সা থামায়। রিক্সা থেকে নেমে নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে সেই ভবনের প্রধান ফটকের তালা খুলে ভবনের মধ্যে প্রবেশ করে পুনরায় প্রধান ফটক ভালো ভাবে বন্ধ করে ভবনের পাঁচতলায় যাওয়ার জন্য সিড়ি ভেঙ্গে সে উপরে উঠতে আরম্ভ করে।
পনেরো ভাই বোনের মধ্যে আকবর আলীর অবস্থান সপ্তম। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকায় স্থানীয় কলেজ থেকে কোনরকমে ডিগ্রী পাস করে কিছুদিন গ্রামে থেকেই কিছু একটা করার চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। ততদিনে ভালোবেসে নিজের পছন্দের মানুষ কে বিয়ে করে এক ছেলের বাপ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই দুই হাজার সালের প্রথম দিকে জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে এক বন্ধুর মেসে উঠে চারিদিকে সে চাকরির সন্ধান করতে থাকে। চাকরি না পাওয়ায় প্রখমদিকে মেসের ভাড়া ও নিজের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য প্রায় পাঁচ ছয় মাস অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকা শহরে সে রিক্সা চালায়। পরে নিজের সেই বন্ধুর পরিচিত এক সাংবাদিক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার অফিসে সে প্রুফ রিডার এর চাকরি পায়। সেই যে শুরু হলো, এর পর কেটে গেছে প্রায় একুশ বছর। সেই তখন থেকে এখন অবধি সেই পুরাতন কর্মস্থলেই প্রুফ রিডার হিসাবেই সে কর্মরত রয়েছে। এখন সে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটি পাঁচতলা ভবনর পাঁচতলায় বাসা ভাড়া করে থাকলেও দীর্ঘ একটা সময় স্ত্রী, পুত্র আর কন্যাকে সাথে নিয়ে এসে অফিসের পিছনে কারওয়ানবাজার রেল বস্তিতে স্বল্পমূল্যে ঘর ভাড়া করে সে থেকেছে। বস্তির নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে মন সায় না দিলেও শুধুমাত্র আর্থিক অসংগতির কারনে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে সে বাস করেছে। সেখানে থেকে অনেক কষ্ট করে নিজের দুই সন্তানকে সে মানুষ করেছে। স্কুল আর কলেজের গন্ডী পেরিয়ে তারা এখন দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সন্তানরা অর্নাসে পড়াশুনা করার সময় থেকেই টিউশনি করে আর কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে নিজের খরচ মিটিয়ে বাড়তি অংশটুক সংসারে দিলেও বাবা হিসাবে তার আশা ওরা দুজনই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো একটা চাকরি করে এই প্রাণহীন শহরে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করুক। নিজে বেঁচে থাকতে থাকতেই ভালো একটা পরিবার দেখে ওদের বিয়ে দিতে পারলেই তার ছুটি। তখন তার আর কোন মানসিক কষ্ট থাকবে না। এর অন্যাথায় ঘটলে সে যে মরেও শান্তি পাবে না।
দুই হাতে তরি-তরকারি দিয়ে পরিপূর্ণ দুটি ব্যাগ নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে পাঁচতলায় উঠতে উঠতে আকবর আলী বেশ ভালো মতোই ঘেমে যায়। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে সে সদর দরজার বাইরে দাড়িয়ে কলিংবেল বাজায়।কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে তার স্ত্রী আছিয়া বেগম এসে দরজা খুলে দেয়।স্ত্রীর হাতে ব্যাগ দুটো দিয়ে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পায়ের জুতা বসার ঘরে রাখা বেতের সোফার পাশে রেখে শোবার ঘরে গিয়ে বাইরের কাপড় বদলে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গোসল সেরে স্ত্রীর সাথে আলু ভর্তা, মূলা দিয়ে পুটি মাছের ঝোল আর মাসকলাইয়ের ডাল দিয়ে সে ভাত খায়। খাওয়া শেষে শোবার ঘরে গিয়ে শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে পুনরায় প্যাকেট টা শার্টের পকেটে রেখে আর পকেট থেকে লাইটার বের করে সেটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে একপাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে আরাম করে বসে স্ত্রী দেখে ফেলার আগেই সিগারেট টা ধরিয়ে দ্রুত কয়েক টানে শেষ করে রুমে এসে আর রাত না জেগে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নানাবিধ দুঃচিন্তা অনবরত মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকায় ঘুম না আসায় বিছানায় শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে।কেন যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়।রাত শেষে নব প্রভাতের আলো দেখার জন্য অধীর আগ্রহে সে অপেক্ষা করতে থাকে। তার কেন যেন বারবার মনে হতে থাকে নিকোষ কালো আঁধার ভেদ করে পুব আকাশে জেগে ওঠা সেই রক্তিম লাল আলো চারপাশের অন্ধকার দূর করার সাথে সাথে তার জীবনের আকাশে কালো অন্ধকারের ন্যায় ঘনীভূত হওয়া যাবতীয় দুঃচিন্তাগুলোকেও চিরতরে দূর করে দিবে। আবারও বুক ভরে সে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
--------------------------
পনেরো ভাই বোনের মধ্যে আকবর আলীর অবস্থান সপ্তম। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকায় স্থানীয় কলেজ থেকে কোনরকমে ডিগ্রী পাস করে কিছুদিন গ্রামে থেকেই কিছু একটা করার চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। ততদিনে ভালোবেসে নিজের পছন্দের মানুষ কে বিয়ে করে এক ছেলের বাপ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই দুই হাজার সালের প্রথম দিকে জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে এক বন্ধুর মেসে উঠে চারিদিকে সে চাকরির সন্ধান করতে থাকে। চাকরি না পাওয়ায় প্রখমদিকে মেসের ভাড়া ও নিজের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য প্রায় পাঁচ ছয় মাস অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকা শহরে সে রিক্সা চালায়। পরে নিজের সেই বন্ধুর পরিচিত এক সাংবাদিক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার অফিসে সে প্রুফ রিডার এর চাকরি পায়। সেই যে শুরু হলো, এর পর কেটে গেছে প্রায় একুশ বছর। সেই তখন থেকে এখন অবধি সেই পুরাতন কর্মস্থলেই প্রুফ রিডার হিসাবেই সে কর্মরত রয়েছে। এখন সে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটি পাঁচতলা ভবনর পাঁচতলায় বাসা ভাড়া করে থাকলেও দীর্ঘ একটা সময় স্ত্রী, পুত্র আর কন্যাকে সাথে নিয়ে এসে অফিসের পিছনে কারওয়ানবাজার রেল বস্তিতে স্বল্পমূল্যে ঘর ভাড়া করে সে থেকেছে। বস্তির নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে মন সায় না দিলেও শুধুমাত্র আর্থিক অসংগতির কারনে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে সে বাস করেছে। সেখানে থেকে অনেক কষ্ট করে নিজের দুই সন্তানকে সে মানুষ করেছে। স্কুল আর কলেজের গন্ডী পেরিয়ে তারা এখন দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সন্তানরা অর্নাসে পড়াশুনা করার সময় থেকেই টিউশনি করে আর কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে নিজের খরচ মিটিয়ে বাড়তি অংশটুক সংসারে দিলেও বাবা হিসাবে তার আশা ওরা দুজনই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো একটা চাকরি করে এই প্রাণহীন শহরে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করুক। নিজে বেঁচে থাকতে থাকতেই ভালো একটা পরিবার দেখে ওদের বিয়ে দিতে পারলেই তার ছুটি। তখন তার আর কোন মানসিক কষ্ট থাকবে না। এর অন্যাথায় ঘটলে সে যে মরেও শান্তি পাবে না।
দুই হাতে তরি-তরকারি দিয়ে পরিপূর্ণ দুটি ব্যাগ নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে পাঁচতলায় উঠতে উঠতে আকবর আলী বেশ ভালো মতোই ঘেমে যায়। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে সে সদর দরজার বাইরে দাড়িয়ে কলিংবেল বাজায়।কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে তার স্ত্রী আছিয়া বেগম এসে দরজা খুলে দেয়।স্ত্রীর হাতে ব্যাগ দুটো দিয়ে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পায়ের জুতা বসার ঘরে রাখা বেতের সোফার পাশে রেখে শোবার ঘরে গিয়ে বাইরের কাপড় বদলে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গোসল সেরে স্ত্রীর সাথে আলু ভর্তা, মূলা দিয়ে পুটি মাছের ঝোল আর মাসকলাইয়ের ডাল দিয়ে সে ভাত খায়। খাওয়া শেষে শোবার ঘরে গিয়ে শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে পুনরায় প্যাকেট টা শার্টের পকেটে রেখে আর পকেট থেকে লাইটার বের করে সেটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে একপাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে আরাম করে বসে স্ত্রী দেখে ফেলার আগেই সিগারেট টা ধরিয়ে দ্রুত কয়েক টানে শেষ করে রুমে এসে আর রাত না জেগে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নানাবিধ দুঃচিন্তা অনবরত মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকায় ঘুম না আসায় বিছানায় শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে।কেন যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়।রাত শেষে নব প্রভাতের আলো দেখার জন্য অধীর আগ্রহে সে অপেক্ষা করতে থাকে। তার কেন যেন বারবার মনে হতে থাকে নিকোষ কালো আঁধার ভেদ করে পুব আকাশে জেগে ওঠা সেই রক্তিম লাল আলো চারপাশের অন্ধকার দূর করার সাথে সাথে তার জীবনের আকাশে কালো অন্ধকারের ন্যায় ঘনীভূত হওয়া যাবতীয় দুঃচিন্তাগুলোকেও চিরতরে দূর করে দিবে। আবারও বুক ভরে সে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
--------------------------
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।