মেঘ
ছোট গল্পটি তারিখে ফয়সল অভি লিখেছেন · ৬ মিনিট পড়ার সময় ·
এক
আমাদের বাড়ি থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে মাঠের ভেতর দিয়ে প্রায় একশ কদম হাটতে হবে। তাহলেই পাওয়া যাবে একটা রাস্তা। রাস্তায় ওঠে সোজা পূর্ব দিকে আরও পঞ্চাশ কদম হাটার পর ডানদিকে তাকালে পাওয়া যাবে একটা বড়সর দীঘি। লোকে বলে পদ্মদীঘি। যদিও এখন বর্ষাকাল, তারপরও গত সাতদিন ধরে বৃষ্টির কোন নামগন্ধ নেই । এমনকি এর মধ্যে আসমানের কোন কোণেই কালো মেঘের দৈত্যরা হানা দেয় নি। বড্ড গরম পড়েছে আজ। আষাঢ়ের এই পড়ন্ত বিকেলেও বারান্দায় বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সমস্ত থানার মধ্যে সম্ভবত একমাত্র আমাদের গ্রামেই বিদ্যুৎ আসে নি। মায়ের তৈরি একটা তালপাতার পাখা হাতে নিয়ে বসে বসে পদ্মদীঘির কথা ভাবছিলাম।
দীঘিটার নাম কেন যে পদ্মদীঘি হল কিছুতেই মাথায় আসছে না। ছোটবেলায় এর কালো জলে কত সাতার কেটেছি। কিন্তু কোনকালেই পদ্ম ফুটতে দেখিনি। পরিচিতজনদের মধ্যেও কেউ কখনো দেখেছে বলে শুনিনি। তবে শাপলা ফোটে অজস্র। পুরোনো দিনের লোকেরা হয়ত শাপলাকেই পদ্ম ভেবে এমন নামকরণ করেছে। আবার এমনও তো হতে পারে যে, কোন কালে হয়ত এখানে পদ্ম ফুটত। এখন হয়ত কালের বিবর্তনে সেগুলো হারিয়ে গেছে। কত কিছুই তো হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে।
হঠাৎ একটা মৃদু সুবাস এসে লাগল নাকে। মনে হচ্ছে আগেও কোথায় যেন পেয়েছি গন্ধটা। হবে হয়ত বর্ষার কোন ফুল। পাশের জঙ্গলটাতে তো আর গাছের অভাব নেই। গ্রামের পথে ঘাটেই অনেক ফুল ফোটে থাকে। গন্ধটা বাড়ছে। আমার কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এ গন্ধটা শুধু আমার জন্যেই। কিন্তু আমার এমন লাগছে কেন? এ কিসের গন্ধ?
কি হল? এ কিসের শব্দ। কোথাও বাজ পড়ল বুঝি? কিন্তু কোন দিকে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখিনি তো ! বুকের ভিতর এমন লাগছে কেন? গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। তবু মনে হচ্ছে ঝড় আসবে।
আকাশ জুড়ে কতগুলো সাদা ঘোড়া উড়ে বেড়াচ্ছে। মেঘের ঘোড়া। দেখতে পাতলা পেঁজাতুলোর মত মেঘ। এদেও নাম হল “Cirrus”। এরকম মেঘে ঝড় তো দূরের কথা বৃষ্টিই হয় না। বৃষ্টি হওয়ার জন্য চাই ঘোর কালো মেঘ “Altro-Stratus”। পুরো আকাশটার কোথাও এমন কালো মেঘ নেই। তবে ঝড় আসবে কোত্থেকে?
ওফ, গন্ধটা আরও বাড়ছে।
একটা দমকা হাওয়া। হ্যা, একটা দমকা হাওয়াই তো, হঠাৎ কানের কাছে এসে বলল, “এসো”। আর মূহুর্তে যেন আমার শরীরের সকল রত্তবিন্দুর গায়ে লেগে প্রতিধ্ধনিত হল, “এসো”। লক্ষ কোটি স্বর একসাথে চিৎকার করে উঠল, “এসো”। তীরের ফলার মতন এই চিৎকার আমার বুকে এসে বিধল, “এসো”।
কে? কে ডাকে আমায় ওভাবে?
আমার হৃদপিণ্ড থেকে জবাব এলো, সে এসেছে।
আমি পাথর হয়ে গেলাম একমূহুর্তের জন্যে। সত্যিই সে এসেছে?
রক্তবিন্দুরা জবাব দিল, সত্যি।
আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। কোথায় সে?
রক্তবিন্দুরা বলল, এখনো বুঝতে পারছো না? চিনতে পারছো না তার সুবাস? ধিক তোমায়! ওই সুবাস ধরে এগিয়ে যাও, ওকে পেয়ে যাবে।
তাই তো, এ তো সেই সুবাস। একদিন বেখেয়ালে আমার আত্মার সাথে মিশে গেছে। এ জন্যেই বুঝি সবকিছু এমন উল্টাপাল্টা লাগছিল। একটা ঝড়ের আভাস পাচ্ছিলাম।
পদ্মদীঘি। এখন বেশ বুঝতে পারছি, ওই পদ্মদীঘি থেকেই আসছে এই সুবাস। তবে কি পদ্মদীঘির কালো জলের ধারেই আমার প্রেমের গোলাপ দাঁড়িয়ে আছে?
ওহ,বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
নিমেষে পা দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল।
শুরু হল ম্যারাথন। জীবনে কখনো এতো জোরে দৌড় দেই নি। এখন উসাইন বোল্টও আমার সাথে এই দৌড়ে অংশ নিলে ফেল মারত। কিন্তু পথ শেষ হচ্ছে না কেন?
আজ হটাৎ করে মাঠটা লম্বা হয়ে গেল নাকি? গতি আরো বাড়াই। কিন্তু রাস্তাটা এতো দূরে মনে হচ্ছে কেন?
‘আরো জোরে’।
কে বলল?
দূর ছাই, কালাচোরার বাপ বলুক। পারলে মাঠের ওই লাল গরুটা বলুক। তাতে আমার কি? আর বলেছে তো ঠিকই। আমাকে পৌছুতে হবে। সে এসে দাড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে পৌছুতে হবে।
ওই তো রাস্তা দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা হাসছে। একটু দাড়াব কি ওর নিচে? না থাক, তাকে নিয়ে এসেই বসব গাছটার নিচে।
রাস্তায় ওঠে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখলাম, পদ্মদীঘির পাড়ে দাড়িয়ে আছে এক উর্বশী । পিছনটা দেখা যাচ্ছিল তার। একটা সরু দেহ । এতটা সরু নয় যাকে দেখলে লোকের ভয় হতে পারে যে বাতাস হয়ত উড়িয়ে নিয়ে যাবে । বড় বেশি লম্বা নয়, আবার এতটা খাটোও নয় যে লোকে বেটে বলবে । ওর দেহের গড়নটা এমনই যে,একটু বড় বড় চোখের সাথে কিছুটা ছোট নাক, গোলাপী গালের সাথে মিষ্টি ঠোট আর সরু দেহের সাথে মাঝারি উচ্চতা নিখুতভাবে মানিয়ে যায় । আমার মনে হয় এ শুধু ওকেই মানায়। সোনালী চুলগুলো ফর্সা কাঁধের উপর এসে থেমে গেছে। মেরুন রঙের একটা কামিজের সাথে ম্যাচ করা সালোয়ার। পায়ে জুতা নেই । একটা অলৌকিক আলো যেন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে । আজকের এই শান্ত প্রকৃতির চেয়েও ও অনেক বেশি শান্ত। চুপচাপ আনমনে তাকিয়ে আছে কালো জলের দিকে। ও যেন রাণী হয়ে দাড়িয়ে আছে সকলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ।
পশ্চিম আকাশটাতে আগুন লাগিয়ে সূর্যটা একটু একটু করে দিগন্তের পানে এগিয়ে যাচ্ছে । কতগুলো নাম না জানা পাখি উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। বেলা শেষ। এবার নিড়ে ফেরার পালা। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ওর পাশে গিয়ে দাড়ালাম। কি আশ্চর্য ! কৃষ্ণচূড়া গাছটাও সাথে চলে এসেছে । সে এখন গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমি একবারও ওর মুখের দিকে তাকালাম না। কালো জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই ওর পাশে বসে আস্তে করে বললাম, কেমন আছো ?
ভালো ।
কখন এসেছো?
এই তো কিছুক্ষণ।
হঠাৎ ?
কেন এখানে আসতে বুঝি বারণ আছে ?
না ঠিক তা নয়, তুমি তো কখনো আমার কাছে আসো না। আর আমার ঠিকানাই বা জানলে কি করে?
দুঃখিত, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা । আপনি কার কথা বলছেন?
তুমি আমাকে আপনি করে বলছ কেন? এখনো রাগ কমে নি বুঝি?
আমি আপনার সাথে রাগ করব কেন? আপনার কাছে তো আসিনি।
খুব দাম বেড়েছে না ? আমার কাছে আসো নি তো কার কাছে এসেছো ?
দেখুন আপনি ভুল করছেন। আমি সত্যিই আপনাকে চিনি না। আর আপনার কাছেও আসিনি। এসেছি এই পদ্মদীঘি দেখব বলে। আপনার কাছে কেউ কি আসার কথা ছিল ? কে সে?
দেখ মেঘ, অনেক কষ্ট দিয়েছো,দয়া করে আর কাঁদিয়ো না । এবার আমাকে ক্ষমা কর। এই আমি কান ধরে উঠবস করছি। আর কোনদিন তোমাকে কষ্ট দিব না।
আরে আরে, কি ছেলেমানুষি করছেন। উঠুন বলছি। আমি মেঘ, তবে আপনার পরিচিত মেঘ নই।
তবে কে তুমি? আমি ও মেঘ, আপনার নই অন্য কোন আকাশের মেঘ। মেঘ শর্মা।
কেউ কখনো অনেক কষ্ট করে হিমালয়ের চূড়ায় উঠেছে ভেবে যদি দেখে যে সে আসলে নিচেই দাড়িয়ে আছে তাহলে তখন তার যে অবস্থা হবে আমারও ঠিক তাই হল। মনে হল এই যে ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা তা আর কোনদিনই ফিরে আসবে না আলো ছড়াতে। পৃথিবীটা চিরকাল আধারেই ডুবে থাকবে। অন্তত আমার পৃথিবীটা।
আমি বুঝতেই পারছিলাম না এত মিল হয় কি করে। সেই মুখ সেই মিষ্টি ঠোট । গোলাপী গালের মানচিত্র একই। ডাগর চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন তো আমি এর মাঝেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চোখ দেখলেই বোঝা যায় এ মেয়ে নিজের বোঝা নিজে টেনেই অভ্যস্ত। কোকড়া চুলগুলো সেই ছোটই আছে শুধুমাত্র চুলের রঙটা বদলে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম কোন বিউটিশিয়ানের কল্যাণে হয়ত এমন হয়েছে। মেঘের পাশে আমি যতক্ষণ থাকতাম একটা স্বর্গীয় সুবাস আমাকে মাতাল করে রাখত। ও যদি মেঘ নাই হবে তবে মেঘের কাছে আসলে আমার মনের ভেতর যে স্বপ্নের ঘোড়াগুলো ছুটে বেড়াত তাদের পায়ের আওয়াজ এখন শুনতে পাচ্ছি কেন? এমনকি নামটাও মিলে গেছে। শর্মা, শুধুমাত্র এই শর্মাটা নিয়েই যত বিপত্তি। শর্মা তো হিন্দুদের উপাধি কিন্তু মেঘ তো হিন্দু ছিল না।
হঠাৎ সবকিছু থেমে গেল। সূর্যটা পুরোপুরি ডুবে গেল। আমি মেঘকে দেখতে পাচ্ছিনা। কৃষ্ণচূড়া গাছটাও নেই। মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। ইস, এখন যদি কেউ আমার মাথাটা ফাটিয়ে দুভাগ করে ফেলত তবে হয়ত শান্তি পেলাম। দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলাম।
চোখ খুলে দেখি বালিশটা মাথার নিচে নেই। মেঝেতে পড়ে আছে। হারিকেনটা নিভু নিভু করেও নিভছেনা। কতগুলো বড় বড় পোকা এই সামান্য আলোটার চতুর্দিকে ভিড় করেছে। ভাগ্যিস হারিকেনে চিমনি থাকে। ওরাতো আর জানেনা যে আলোর আকর্ষণে ওরা ছুটে এসেছে তার মাঝে পড়লেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। চারপাশে খুব ভালভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। নেই, কোথাও আমার আলোটা নেই। মেঘ নেই কোথাও।
আমার বিশ্বাসই হচ্ছেনা ওটা স্বপ্ন ছিল। স্বন্ন কখনো এত বাস্তব মনে হয় নাকি! আমি এখনো গন্ধটা পাচ্ছি। এখনো…
আমাদের বাড়ি থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে মাঠের ভেতর দিয়ে প্রায় একশ কদম হাটতে হবে। তাহলেই পাওয়া যাবে একটা রাস্তা। রাস্তায় ওঠে সোজা পূর্ব দিকে আরও পঞ্চাশ কদম হাটার পর ডানদিকে তাকালে পাওয়া যাবে একটা বড়সর দীঘি। লোকে বলে পদ্মদীঘি। যদিও এখন বর্ষাকাল, তারপরও গত সাতদিন ধরে বৃষ্টির কোন নামগন্ধ নেই । এমনকি এর মধ্যে আসমানের কোন কোণেই কালো মেঘের দৈত্যরা হানা দেয় নি। বড্ড গরম পড়েছে আজ। আষাঢ়ের এই পড়ন্ত বিকেলেও বারান্দায় বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সমস্ত থানার মধ্যে সম্ভবত একমাত্র আমাদের গ্রামেই বিদ্যুৎ আসে নি। মায়ের তৈরি একটা তালপাতার পাখা হাতে নিয়ে বসে বসে পদ্মদীঘির কথা ভাবছিলাম।
দীঘিটার নাম কেন যে পদ্মদীঘি হল কিছুতেই মাথায় আসছে না। ছোটবেলায় এর কালো জলে কত সাতার কেটেছি। কিন্তু কোনকালেই পদ্ম ফুটতে দেখিনি। পরিচিতজনদের মধ্যেও কেউ কখনো দেখেছে বলে শুনিনি। তবে শাপলা ফোটে অজস্র। পুরোনো দিনের লোকেরা হয়ত শাপলাকেই পদ্ম ভেবে এমন নামকরণ করেছে। আবার এমনও তো হতে পারে যে, কোন কালে হয়ত এখানে পদ্ম ফুটত। এখন হয়ত কালের বিবর্তনে সেগুলো হারিয়ে গেছে। কত কিছুই তো হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে।
হঠাৎ একটা মৃদু সুবাস এসে লাগল নাকে। মনে হচ্ছে আগেও কোথায় যেন পেয়েছি গন্ধটা। হবে হয়ত বর্ষার কোন ফুল। পাশের জঙ্গলটাতে তো আর গাছের অভাব নেই। গ্রামের পথে ঘাটেই অনেক ফুল ফোটে থাকে। গন্ধটা বাড়ছে। আমার কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এ গন্ধটা শুধু আমার জন্যেই। কিন্তু আমার এমন লাগছে কেন? এ কিসের গন্ধ?
কি হল? এ কিসের শব্দ। কোথাও বাজ পড়ল বুঝি? কিন্তু কোন দিকে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখিনি তো ! বুকের ভিতর এমন লাগছে কেন? গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। তবু মনে হচ্ছে ঝড় আসবে।
আকাশ জুড়ে কতগুলো সাদা ঘোড়া উড়ে বেড়াচ্ছে। মেঘের ঘোড়া। দেখতে পাতলা পেঁজাতুলোর মত মেঘ। এদেও নাম হল “Cirrus”। এরকম মেঘে ঝড় তো দূরের কথা বৃষ্টিই হয় না। বৃষ্টি হওয়ার জন্য চাই ঘোর কালো মেঘ “Altro-Stratus”। পুরো আকাশটার কোথাও এমন কালো মেঘ নেই। তবে ঝড় আসবে কোত্থেকে?
ওফ, গন্ধটা আরও বাড়ছে।
একটা দমকা হাওয়া। হ্যা, একটা দমকা হাওয়াই তো, হঠাৎ কানের কাছে এসে বলল, “এসো”। আর মূহুর্তে যেন আমার শরীরের সকল রত্তবিন্দুর গায়ে লেগে প্রতিধ্ধনিত হল, “এসো”। লক্ষ কোটি স্বর একসাথে চিৎকার করে উঠল, “এসো”। তীরের ফলার মতন এই চিৎকার আমার বুকে এসে বিধল, “এসো”।
কে? কে ডাকে আমায় ওভাবে?
আমার হৃদপিণ্ড থেকে জবাব এলো, সে এসেছে।
আমি পাথর হয়ে গেলাম একমূহুর্তের জন্যে। সত্যিই সে এসেছে?
রক্তবিন্দুরা জবাব দিল, সত্যি।
আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। কোথায় সে?
রক্তবিন্দুরা বলল, এখনো বুঝতে পারছো না? চিনতে পারছো না তার সুবাস? ধিক তোমায়! ওই সুবাস ধরে এগিয়ে যাও, ওকে পেয়ে যাবে।
তাই তো, এ তো সেই সুবাস। একদিন বেখেয়ালে আমার আত্মার সাথে মিশে গেছে। এ জন্যেই বুঝি সবকিছু এমন উল্টাপাল্টা লাগছিল। একটা ঝড়ের আভাস পাচ্ছিলাম।
পদ্মদীঘি। এখন বেশ বুঝতে পারছি, ওই পদ্মদীঘি থেকেই আসছে এই সুবাস। তবে কি পদ্মদীঘির কালো জলের ধারেই আমার প্রেমের গোলাপ দাঁড়িয়ে আছে?
ওহ,বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
নিমেষে পা দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল।
শুরু হল ম্যারাথন। জীবনে কখনো এতো জোরে দৌড় দেই নি। এখন উসাইন বোল্টও আমার সাথে এই দৌড়ে অংশ নিলে ফেল মারত। কিন্তু পথ শেষ হচ্ছে না কেন?
আজ হটাৎ করে মাঠটা লম্বা হয়ে গেল নাকি? গতি আরো বাড়াই। কিন্তু রাস্তাটা এতো দূরে মনে হচ্ছে কেন?
‘আরো জোরে’।
কে বলল?
দূর ছাই, কালাচোরার বাপ বলুক। পারলে মাঠের ওই লাল গরুটা বলুক। তাতে আমার কি? আর বলেছে তো ঠিকই। আমাকে পৌছুতে হবে। সে এসে দাড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে পৌছুতে হবে।
ওই তো রাস্তা দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা হাসছে। একটু দাড়াব কি ওর নিচে? না থাক, তাকে নিয়ে এসেই বসব গাছটার নিচে।
রাস্তায় ওঠে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখলাম, পদ্মদীঘির পাড়ে দাড়িয়ে আছে এক উর্বশী । পিছনটা দেখা যাচ্ছিল তার। একটা সরু দেহ । এতটা সরু নয় যাকে দেখলে লোকের ভয় হতে পারে যে বাতাস হয়ত উড়িয়ে নিয়ে যাবে । বড় বেশি লম্বা নয়, আবার এতটা খাটোও নয় যে লোকে বেটে বলবে । ওর দেহের গড়নটা এমনই যে,একটু বড় বড় চোখের সাথে কিছুটা ছোট নাক, গোলাপী গালের সাথে মিষ্টি ঠোট আর সরু দেহের সাথে মাঝারি উচ্চতা নিখুতভাবে মানিয়ে যায় । আমার মনে হয় এ শুধু ওকেই মানায়। সোনালী চুলগুলো ফর্সা কাঁধের উপর এসে থেমে গেছে। মেরুন রঙের একটা কামিজের সাথে ম্যাচ করা সালোয়ার। পায়ে জুতা নেই । একটা অলৌকিক আলো যেন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে । আজকের এই শান্ত প্রকৃতির চেয়েও ও অনেক বেশি শান্ত। চুপচাপ আনমনে তাকিয়ে আছে কালো জলের দিকে। ও যেন রাণী হয়ে দাড়িয়ে আছে সকলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ।
পশ্চিম আকাশটাতে আগুন লাগিয়ে সূর্যটা একটু একটু করে দিগন্তের পানে এগিয়ে যাচ্ছে । কতগুলো নাম না জানা পাখি উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। বেলা শেষ। এবার নিড়ে ফেরার পালা। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ওর পাশে গিয়ে দাড়ালাম। কি আশ্চর্য ! কৃষ্ণচূড়া গাছটাও সাথে চলে এসেছে । সে এখন গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমি একবারও ওর মুখের দিকে তাকালাম না। কালো জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই ওর পাশে বসে আস্তে করে বললাম, কেমন আছো ?
ভালো ।
কখন এসেছো?
এই তো কিছুক্ষণ।
হঠাৎ ?
কেন এখানে আসতে বুঝি বারণ আছে ?
না ঠিক তা নয়, তুমি তো কখনো আমার কাছে আসো না। আর আমার ঠিকানাই বা জানলে কি করে?
দুঃখিত, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা । আপনি কার কথা বলছেন?
তুমি আমাকে আপনি করে বলছ কেন? এখনো রাগ কমে নি বুঝি?
আমি আপনার সাথে রাগ করব কেন? আপনার কাছে তো আসিনি।
খুব দাম বেড়েছে না ? আমার কাছে আসো নি তো কার কাছে এসেছো ?
দেখুন আপনি ভুল করছেন। আমি সত্যিই আপনাকে চিনি না। আর আপনার কাছেও আসিনি। এসেছি এই পদ্মদীঘি দেখব বলে। আপনার কাছে কেউ কি আসার কথা ছিল ? কে সে?
দেখ মেঘ, অনেক কষ্ট দিয়েছো,দয়া করে আর কাঁদিয়ো না । এবার আমাকে ক্ষমা কর। এই আমি কান ধরে উঠবস করছি। আর কোনদিন তোমাকে কষ্ট দিব না।
আরে আরে, কি ছেলেমানুষি করছেন। উঠুন বলছি। আমি মেঘ, তবে আপনার পরিচিত মেঘ নই।
তবে কে তুমি? আমি ও মেঘ, আপনার নই অন্য কোন আকাশের মেঘ। মেঘ শর্মা।
কেউ কখনো অনেক কষ্ট করে হিমালয়ের চূড়ায় উঠেছে ভেবে যদি দেখে যে সে আসলে নিচেই দাড়িয়ে আছে তাহলে তখন তার যে অবস্থা হবে আমারও ঠিক তাই হল। মনে হল এই যে ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা তা আর কোনদিনই ফিরে আসবে না আলো ছড়াতে। পৃথিবীটা চিরকাল আধারেই ডুবে থাকবে। অন্তত আমার পৃথিবীটা।
আমি বুঝতেই পারছিলাম না এত মিল হয় কি করে। সেই মুখ সেই মিষ্টি ঠোট । গোলাপী গালের মানচিত্র একই। ডাগর চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন তো আমি এর মাঝেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চোখ দেখলেই বোঝা যায় এ মেয়ে নিজের বোঝা নিজে টেনেই অভ্যস্ত। কোকড়া চুলগুলো সেই ছোটই আছে শুধুমাত্র চুলের রঙটা বদলে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম কোন বিউটিশিয়ানের কল্যাণে হয়ত এমন হয়েছে। মেঘের পাশে আমি যতক্ষণ থাকতাম একটা স্বর্গীয় সুবাস আমাকে মাতাল করে রাখত। ও যদি মেঘ নাই হবে তবে মেঘের কাছে আসলে আমার মনের ভেতর যে স্বপ্নের ঘোড়াগুলো ছুটে বেড়াত তাদের পায়ের আওয়াজ এখন শুনতে পাচ্ছি কেন? এমনকি নামটাও মিলে গেছে। শর্মা, শুধুমাত্র এই শর্মাটা নিয়েই যত বিপত্তি। শর্মা তো হিন্দুদের উপাধি কিন্তু মেঘ তো হিন্দু ছিল না।
হঠাৎ সবকিছু থেমে গেল। সূর্যটা পুরোপুরি ডুবে গেল। আমি মেঘকে দেখতে পাচ্ছিনা। কৃষ্ণচূড়া গাছটাও নেই। মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। ইস, এখন যদি কেউ আমার মাথাটা ফাটিয়ে দুভাগ করে ফেলত তবে হয়ত শান্তি পেলাম। দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলাম।
চোখ খুলে দেখি বালিশটা মাথার নিচে নেই। মেঝেতে পড়ে আছে। হারিকেনটা নিভু নিভু করেও নিভছেনা। কতগুলো বড় বড় পোকা এই সামান্য আলোটার চতুর্দিকে ভিড় করেছে। ভাগ্যিস হারিকেনে চিমনি থাকে। ওরাতো আর জানেনা যে আলোর আকর্ষণে ওরা ছুটে এসেছে তার মাঝে পড়লেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। চারপাশে খুব ভালভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। নেই, কোথাও আমার আলোটা নেই। মেঘ নেই কোথাও।
আমার বিশ্বাসই হচ্ছেনা ওটা স্বপ্ন ছিল। স্বন্ন কখনো এত বাস্তব মনে হয় নাকি! আমি এখনো গন্ধটা পাচ্ছি। এখনো…
লগইন করুন প্রতিক্রিয়া জানাতে
নিউজলেটার
নতুন লেখা সম্পর্কে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আপনি লগইন করে মন্তব্য করতে পারবেন।