মূল বিষয়বস্তুতে যান

জীবনানন্দ দাস এর রচনাবলি

এই পথ দিয়ে

এই পথ দিয়ে কেউ চ'লে যেতো জানি এই ঘাস নীলাকাশ_ এ সব শালিখ সোনালি ধান নরনারীদের ছায়া-কাটাকুটি কালো রোদে সে তার নিজের ছায়া ফেলে উবে যেতো; আসন্ন রাত্রির দিকে সহসা দিনের আলো নষ্ট হ'য়ে গেলে কোথাও নতুন ভোর র...

জীবনানন্দ দাস

আমাদের রূঢ় কথা শুনে

আমাদের রূঢ় কথা শুনে তুমি সরে যাও আরো দূরে বুঝি নীলাকাশ; তোমার অনন্ত নীল সোনালি ভোমরা নিয়ে কোনো দূর শান্তির ভিতরে ডুবে যাবে? কত কাল কেটে গেল, তবু তার কুয়াশার পর্দা না সরে পিরামিড্‌ বেবিলন শেষ হল — ঝরে ...

জীবনানন্দ দাস

মহিলা

এইখানে শূন্যে অনুধাবনীয় পাহাড় উঠেছে ভোরের ভিতর থেকে অন্য এক পৃথিবীর মতো; এইখানে এসে প’ড়ে- থেমে গেলে- একটি নারীকে কোথাও দেখেছি ব’লে স্বভববশত মনে হয়;- কেননা এমন স্থান পাথরের ভারে কেটে তবু প্রতিভাত হয়ে থ...

জীবনানন্দ দাস

অনেক নদীর জল

অনেক নদীর জল উবে গেছে — ঘরবাড়ি সাকো ভেঙে গেল; সে-সব সময় ভেদ করে ফেলে আজ কারা তবু কাছে চ'লে এলো। যে সুর্য অয়নে নেই কোনো দিন, — মনে তাকে দেখা যেত যদি — যে নারী দেখে নি কেউ — ছ'সাতটি তারার তিমিরে হৃদয়ে এ...

জীবনানন্দ দাস

সারাৎসার

এখন কিছুই নেই—এখনে কিছুই নেই আর, অমল ভোরের বেলা র’ইয়ে গেছে শুধু; আশ্বিনের নীলাকাশ স্পষ্ট ক’রে দিয়ে সূর্য আসে; অনেক আবছা জল জেগে উঠে নিজ প্রয়োজনে নদী হয়ে সমস্ত রৌদ্রের কাছে জানাতেছে দাবি; নক্ষত্রেরা মা...

জীবনানন্দ দাস

এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি

এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি বসে নিজ মনে একা; চালতার পাতা থেকে টুপ — টুপ জ্যোৎস্নায় ঝরছে শিশির; কুয়াশায় সি’র হয়ে ছিল স্নান ধানসিড়ি নদীটির তীরে; বাদুড় আধাঁর ডানা মেলে হিম জ্যোৎস্নায় কাটিয়াছে রেখা আকাঙ্খার...

জীবনানন্দ দাস

সুবিনয় মুস্তফী

সুবিনয় মুস্তফীর কথা মনে পড়ে এই হেমন্তের রাতে। একসাথে বিড়াল ও বিড়ালের-মুখে-ধরা-ইঁদুর হাসাতে এমন আশ্চর্য শক্তি ছিল ভূয়োদর্শী যুবার। ইঁদুরকে খেতে-খেতে শাদা বিড়ালের ব্যবহার, অথবা টুকরো হ’তে-হ’তে সেই ভারিক...

জীবনানন্দ দাস

আকাশলীনা

সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি, বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে; ফিরে এসো সুরঞ্জনা : নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে; ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে; ফিরে এসো হৃদয়ে আমার; দূর থেকে দূরে - আরও দূরে যুবকের সাথে...

জীবনানন্দ দাস

অঘ্রাণ

আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি- বিকেলের এই রঙ- রঙের শূন্যতা রোদের নরম রোম- ঢালু মাঠ- বিবর্ণ বাদামি পাখি- হলুদ বিচালি পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে-ঘাসে- কুড়ুনির মুখে তাই নাই কোনো কথা, ধানের সোনার কাজ ফুরায়েছে- জীব...

জীবনানন্দ দাস

১৯৩৬

সমুদ্রের পথে- পথে ঘুরে ফেরে সারাদিন- তবু- তারপর- ঘুমের সময় আসে অন্ধকারে নদীদের ঢেউয়ের ভিতর অনেক মাছের প্রাণে; চারিদিকে চেয়ে থাকে অগণন ঘাস ধূসর পাখির মতো থেমে থাকে নক্ষত্রের নির্লিপ্ত আকাশ; বাঁশের বনের...

জীবনানন্দ দাস

অনুপম ত্রিবেদী

এখন শীতের রাতে অনুপম ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে। যদিও সে নেই আজ পৃথিবীর বড়ো গোল পেটের ভিতরে সশরীরে; টেবিলের অন্ধকারে তবু এই শীতের স্তব্ধতা এক পৃথিবীর মৃত জীবিতের ভিড়ে সেই স্মরণীয় মানুষের কথা হৃদয়ে জাগায়ে ...

জীবনানন্দ দাস

উন্মেষ

কোথাও নদীর পারে সময়ের বুকে- দাঁড়ায়ে রয়েছে আজো সাবেককালের এক স্তিমিত প্রাসাদ; দেয়ালে একটি ছবিঃ বিচারসাপেক্ষ ভাবে নৃসিংহ উঠেছে; কোথাও মঙ্গল সংঘটন হ’য়ে যাবে অচিরাৎ। নিবিড় রমণী তার জ্ঞানময় প্রেমিকের খোঁজে...

জীবনানন্দ দাস

এই নিদ্রা

আমার জীবনে কোনো ঘুম নাই মৎস্যনারীদের মাঝে সবচেয়ে রূপসী সে নাকি এই নিদ্রা? গায় তার ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ- অবসাদ সুখ চিন্তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন-বিমুখ প্রাণ তার এই দিন এই রাত্রি আসে যায়- বুঝিতে দেয় ন...

জীবনানন্দ দাস

সামান্য মানুষ

একজন সামান্য মানুষকে দেখা যেতো রোজ ছিপ হাতে চেয়ে আছে; ভোরের পুকুরে চাপেলী পায়রাচাঁদা মৌরলা আছে; উজ্জ্বল মাছের চেয়ে খানিকটা দূরে আমার হৃদয় থেকে সেই মানুষের ব্যবধান; মনে হয়েছিলো এক হেমন্তের সকালবেলায়; এ...

জীবনানন্দ দাস

সারা দিন ট্রাম-বাস

সারাদিন ট্রাম-বাস-ফেরিওলাদের ডাক- কুষ্ঠরোগী পথের উপর- হাড়ভাঙা মহিষের গাড়িগুলো-বাজারের রুক্ষ শব্দ-বস্তির চিৎকার। আমার হৃদয়ে যেই শঙ্খমালা কিশোরীটি বাঁধিতে আসিয়াছিল ঘর তাহারে ফিরায়ে দেয় শহরের পথ থেকে পাড়...

জীবনানন্দ দাস

সপ্তক

এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে;- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা। অনেক হয়েছে শোয়া;- তারপর একদিন চ’লে গেছে কোন দূর মেঘে। অন্ধকার শেষ হ’লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগেঃ সরোজিনী চ’লে গেল অতদূর? সিঁড়ি ছাড়া- পাখি...

জীবনানন্দ দাস

আমার এ ছোটো মেয়ে

আমার এ ছোটো মেয়ে — সব শেষ মেয়ে এই শুয়ে আছে বিছানার পাশে – শুয়ে থাকে —উঠে বসে —পাখির মতন কথা কয় হামাগুড়ি দিয়ে ফেরে মাঠে মাঠে আকাশে আকাশে ভুলে যাই ওর কথা — আমার প্রথম মেয়ে সেই মেঘ দিয়ে ভেসে আসে যেন বলে ...

জীবনানন্দ দাস

আমি কবি-সেই কবি

আমি কবি-সেই কবি- আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে! মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে! দাদুরী-কাঁদা...

জীবনানন্দ দাস

সূর্যসাগরতীরে

সূর্যের আলো মেটায় খোরাক কার; সেই কথা বুঝা ভার অনাদি যুগের অ্যামিবার থেকে আজিকে ওদের প্রাণ গড়িয়া উঠিল কাফ্রির মতো সূর্যসাগরতীরে কালো চামড়ার রহস্যময় ঠাস বুনোনিটি ঘিরে। চারিদিকে স্থির-ধুম্র নিবিড় পিড়ামিড...

জীবনানন্দ দাস

শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ

শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ — বহুকাল গেয়ে গেছ গান সোনালি চিলের মতো উড়ে উড়ে আকাশের রৌদ্র আর মেঘে, — লক্ষ্মীর বাহন যেই স্নিগ্ধ পাখি আশ্বিনের জ্যোৎস্নার আবেগে গান গায় — গুনিয়াছি রাখিপূর্ণিমার রাতে তোমার আহ...

জীবনানন্দ দাস

উত্তরপ্রবেশ

পুরনো সময় সুর ঢের কেটে গেল। যদি বলা যেত: সমুদ্রের পারে কেটে গেছে সোনার বলের মতো সুর্য ছিল পুবের আকাশে– সেই পটভূমিকায় ঢের ফেনশীর্ষ ঢেউ, উড়ন্ত ফেনার মতো অগণন পাখি। পুরনো বছর দেশ ঢের কেটে গেল রোদের ভিতরে...

জীবনানন্দ দাস

এই শতাব্দী-সন্ধীতে মৃত্যু

(অগণন সাধারণের) সে এক বিচ্ছিন্ন দিনে আমাদের জন্ম হয়েছিলো ততোধিক অসুস্থ সময়ে আমাদের মৃত্যু হয়ে যায়। দূরে কাছ শাদা উঁচু দেয়ালের ছায়া দেখে ভয়ে মনে করে গেছি তাকে- ভালোভাবে মনে ক'রে নিলে- এইখানে জ্ঞান হতে ...

জীবনানন্দ দাস

অন্য এক প্রেমিককে

মাথার উপর দিয়ে কার্তিকের মেঘ ভেসে যায়; দুই পা স্নিগ্ধ করে প্রান্তরের ঘাস; উঁচু-উঁচু গাছের অস্পষ্ট কথা কী যেন অন্তিম সূত্র নিয়ে, বাকিটুকু অবিরল গাছের বাতাস। চিলের ডানার থেকে ঠিকরিয়ে রোদ চুমোর মতন চ...

জীবনানন্দ দাস

সুরঞ্জনা

সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো; পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন; কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছ; গ্রিক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা – নগরীর গায়ে কী চেয়েছে? কী পে...

জীবনানন্দ দাস

উপলব্ধি

যা পেয়েছি সে সবের চেয়ে আরো স্থির দিন পৃথিবীতে আসে; আসে না কি? চারিদিকে হিংসা দ্বেষ কলহ রয়েছে; সময়ের হাত এসে সে সবের অমিলন, মলিন প্রেরণা তবুও তো মুছে দিয়ে যেতে পারে,- ভাবি। সেই আদিকাল থেকে আজকের মুহুর্...

জীবনানন্দ দাস

শ্যামলী

শ্যামলী, তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতন: যখন জাহাজে চড়ে যুবকের দল সুদূরে নতুন দেশে সোনা আছে ব’লে মহিলারই প্রতিভায় সে ধাতু উজ্জ্বল টের পেয়ে, দ্রাক্ষা দুধ ময়ুরশয্যার কথা ভুলে সকালের রূঢ় রৌদ্র ডুবে যেত কোথ...

জীবনানন্দ দাস

একটি কবিতা

আমার আকাশ কালো হ'তে চায় সময়ের মির্মম আঘাতে জানি, তবু ভোরে রাত্রে, এই মহাসময়ের কাছে নদী খেত বনানীর ঝাউয়ের ঝরা সোনার মতন সূর্য তারাবীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে। হে সুবর্ণ, হে গভীর গতির প্রবাহ, আমি মন সচ...

জীবনানন্দ দাস

একদিন খুঁজেছিনু যারে

একদিন খুঁজেছিনু যারে বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আঁধারে, মালতীলতার বনে, কদমের তলে, নিঝুম ঘুমের ঘাটে-কেয়াফুল, শেফালীর দলে! -যাহারে খুজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে হেমন্তের হিম ঘাসে যাহারে খুজিয়াছিনু ...

জীবনানন্দ দাস

সূর্যতামসী

কোথাও পাখির শব্দ শুনি; কোনো দিকে সমুদ্রের সুর; কোথাও ভোরের বেলা র’য়ে গেছে – তবে। অগণন মানুষের মৃত্যু হ’লে – অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয় বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে; এ কোন সিন্ধুর সুর: মরণের – জীবনের? এ ...

জীবনানন্দ দাস

অবসরের গান

শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার — চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ, তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান, দেহের স্বাদের কথা কয় – বিকালের আ...

জীবনানন্দ দাস

সূর্য রাত্রি নক্ষত্র

এইখানে মাইল-মাইল ঘাস ও শালিখ রৌদ্র ছাড়া কিছু নেই। সূর্যালোকিত হ'য়ে শরীর ফসল ভালোবাসি আমারি ফসল সব- মীনকন্যা এসে ফলালেই বৃশ্চিক কর্কট তুলা মেষ সিংহ রাশি বলয়িত হ'য়ে উঠে আমাকে সূর্যের মতো ঘিরে নিরবধি কাল...

জীবনানন্দ দাস

অশ্বত্থ বটের পথে

অশ্বত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী; ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে; সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে গিয়েছি অনেক দিন দেখিয়াছি ধূপ জ্বালো, ধরো সন্ধ্যাবাতি থোড়ের মতন...

জীবনানন্দ দাস

হাঁস

নয়টি হাঁসকে রোজ চোখ মেলে ভোরে দেখা যায় জলপাই পল্লবের মতো স্নিগ্ধ জলে; তিনবার তিনগুনে নয় হয় পৃথিবীর পথে; এরা তবু নয়জন মায়াবীর মতো জাদুবলে! সে-নদীর জল খুব গভীর-গভীর; সেইখানে শাদা মেঘ- লঘু মেঘ এসে দিনমান...

জীবনানন্দ দাস

একদিন জলসিড়ি নদীর ধারে

একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে বিশীর্ন বটের নীচে শুয়ে রব- পশমের মত লাল ফল ঝরিবে বিজন ঘাসে-বাঁকা চাঁদ জেগে রবে- নদীটির জল বাঙ্গালি মেয়ের মত বিশালাক্ষী মন্দিরের ধূসর কপাটে আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে ভ...

জীবনানন্দ দাস

আমি যদি হতাম

আমি যদি হতাম বনহংস; বনহংসী হতে যদি তুমি; কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে ধানক্ষেতের কাছে ছিপছিপে শরের ভিতর এক নিরালা নীড়ে; তাহলে আজ এই ফাল্পুনের রাতে ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে আমরা নিম্নভূম...

জীবনানন্দ দাস

সোনালি অগ্নির মতো

সোনালি অগ্নির মতো আকাশ জ্বলছে স্থির নীল পিলসুজে; পৃথিবীর শেষ রৌদ্র খুঁজে কেউ কি পেয়েছে কিছু কোনো দিকে? পায় নি তো কেউ। তারপর বাদুড়ের কালো কালো ঢেউ উড়ায়ে শঙ্খচিল কোথায় ডুবল চোখ বুজে। অনেক রক্তাক্ত সোনা ...

জীবনানন্দ দাস

হেমন্ত কুয়াশায়

সকাল-সন্ধ্যাবেলা আমি সেই নারীকে দেখেছি জেনেছি অনেক দিন- তারপর তবুও ভেবেছি। তারপর ঢের দিন পৃথিবীর সেই শাদা সাধারণ কথা ছোট বড় জিনিসের বিস্মরণে ক্রমে ভুলে গেছি। আকাশ আমাকে বলেঃ 'সে না তুমি আত্মসমাহিতি?' ...

জীবনানন্দ দাস

হৃদয়ে প্রেমের দিন

হৃদয়ে প্রেমের দিন কখন যে শেষ হয় — চিতা শুধু পড়ে থাকে তার, আমরা জানি না তাহা; — মনে হয় জীবনে যা আছে আজো তাই শালিধান রূপশালি ধান তাহা… রূপ, প্রেম… এই ভাবি… খোসার মতন নষ্ট ম্লান একদিন তাহাদের অসারতা ...

জীবনানন্দ দাস

হঠাৎ-মৃত

অজস্র বুনো হাঁস পাখা মেলে উড়ে চলেছে জ্যোৎস্নার ভিতর কাউকে মৃত্যু ফেলে দিলো নিচে- অন্ধকারের অচল অভ্যাসের ভিতর। রূপসী প্রথম প্রেমের আস্বাদ পেতে যাচ্ছিলো : শোনো- গলার ভিতরে তার মৃত্যুর গোঙরানি; সে নিজেও ...

জীবনানন্দ দাস

ঊনিশশো চৌত্রিশের

একটা মোটরকার খটকা নিয়ে আসে। মোটরকার সব-সময়েই একটা অন্ধকার জিনিস, যদিও দিনের রৌদ্র-আলোর পথে রাতের সুদীপ্ত গ্যাসের ভিতর আলোর সন্তানদের মধ্যে তার নাম সবচেয়ে প্রথম। একটা অন্ধকার জিনিস : পরিষ্কার ভোরের বেল...

জীবনানন্দ দাস

গভীর এরিয়েলে

ডুবলো সূর্য; অন্ধকারের অন্তরালে হারিয়ে গেছে দেশ। এমনতর আঁধার ভালো আজকে কঠিন রুক্ষ শতাব্দীতে। রক্ত-ব্যথা ধনিকতার উষ্ণতা এই নীরব স্নীগ্ধ অন্ধকারের শীতে নক্ষত্রদের স্থির সমাসীন পরিষদের থেকে উপদেশ পায় না ...

জীবনানন্দ দাস

সৌরকরোজ্জ্বল

পরের ক্ষেতের ধানে মই দিয়ে উঁচু করে নক্ষত্রে লাগানো সুকঠিন নয় আজ; যে-কোনো পথের বাঁকে ভাঙনের নদীওর শিয়রে তাদের সমাজ। তবুও তাদের ধারা- ধর্ম অর্থ কাম কলরব কুশীলব- কিংবা এ-সব থেকে আসন্ন বিপ্লব ঘনারে- ফসল ফ...

জীবনানন্দ দাস

এই ডাঙা ছেড়ে হায়

এই ডাঙা ছেড়ে হায় রূপ কে খুঁজিতে যায় পৃথিবীর পথে। বটের শুকনো পাতা যেন এক যুগান্তের গল্প ডেকে আনে: ছড়ায়ে রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রানে;- তাদের উপেক্ষা ক’রে কে যাবে বিদেশে বলো- আমি কোনো-মত...

জীবনানন্দ দাস

সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি

সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি— এই নদী নক্ষত্রের তলে সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন– সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে! আমি চলে যাব ব’লে চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে? লক্ষ্মীপ...

জীবনানন্দ দাস

কেন মিছে নক্ষত্রেরা

কেন মিছে নক্ষত্রেরা আসে আর? কেন মিছে জেগে ওঠে নীলাভ আকাশ? কেন চাঁদ ভেসে ওঠেঃ সোনার ময়ূরপঙ্খী অশ্বত্থের শাখার পিছনে? কেন ধুলো সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠে শিশিরের চুমো খেয়ে- গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে ওঠে কাশ? খঞ্জনারা...

জীবনানন্দ দাস

স্বভাব

যদিও আমার চোখে ঢের নদী ছিলো একদিন পুনরায় আমাদের দেশে ভোর হ’লে, তবুও একটি নদী দেখা যেতো শুধু তারপর; কেবল একটি নারী কুয়াশা ফুরোলে নদীর রেখার পার লক্ষ্য ক’রে চলে; সূর্যের সমস্ত গোল সোনার ভিতরে মানুষের ...

জীবনানন্দ দাস

স্বাতীতারা

স্বাতীতারা, কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি দশ-পনেরো বছর আগে; সময় তখন তোমার চুলে কালো মেঘের মতন লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালাল তোমার নিশিত নারীমুখের-জানো তো অন্তর্যামী। তোমার মুখ; চারিদিকে অন্ধকারে জলের...

জীবনানন্দ দাস

কোহিনূর

তোমারে ঘেরিয়া জাগে কত স্বপ্ন–স্মৃতির শ্মশান, ভুলুণ্ঠিত লুব্ধ অভিযান; সাম্রাজ্যের অশ্রু, রক্ত, সমাধি, পতন হে হীরক, একে একে করেছ চুম্বন! স্পর্শে তব অনাদি অতীত যেন নিরন্তর মর্মে ওঠে ধ্বনি! মাধবের বক্ষে ত...

জীবনানন্দ দাস

আশা অনুমিতি

সূর্যের আকাশের মত মানুষেরা অনুভাবনায় স্থির এক আশ্বাস রয়ে গেছে পৃথিবীতে, রয়ে গেছে আমাদের হৃদয়ে যে এই ইতিহাস পৃথিবীর রক্তাক্ত নদীর কেবলি আয়ত উৎসারণ অন্ধকারে নিজেরে প্রচুর ক’রে তবু স্তিমিত হয়ে পড়ে; মতুন ...

জীবনানন্দ দাস

কোথাও দেখিনি আহা এমন বিজন ঘাস

কোথাও দেখিনি, আহা, এমন বিজন ঘাস – প্রান্তরের পারে নরম বিমর্ষ চোখে চেয়ে আছে-নীল বুকে আছে তাহাদের গঙ্গাফড়িঙের নীড়, কাঁচপোকা, প্রজাপতি, শ্যামাপোকা ঢের, হিজলের ক্লান- পাতা,- বটের অজস্র ফল ঝরে বারে বারে তা...

জীবনানন্দ দাস

আমাকে তুমি

আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন; মস্ত বড় ময়দান — দেবদারু পামের নিবিড় মাথা — মাইলের পর মাইল; দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়; জোয়ারের মতো ফিরে আসে আব...

জীবনানন্দ দাস

রজনীগন্ধা

এখন রজনীগন্ধা-প্রথম-নতুন- একটি নক্ষত্র শুধু বিকেলের সমস্ত আকাশে; অন্ধকার ভালো বলে শান্ত পৃথিবীর আলো নিভে আসে। অনেক কাজের পরে এইখানে থেমে থাকা ভালো; রজনীগন্ধার ফুলে মৌমাছির কাছে কেউ নেই, কিছু নেই, তবু ...

জীবনানন্দ দাস

রবীন্দ্রনাথ

অনেক সময় পাড়ি দিয়ে আমি অবশেষে কোন এক বলয়িত পথে মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন এক বিভা দেখেছি রাত্রির রঙে বিভাসিত হয়ে থেকে আপনার প্রাণের প্রতিভা বিচ্ছুরিত ক'রে দেয় সঙ্গীতের মত কণ্ঠস্বরে! হৃদয়ে নিমীল হয়ে অন...

জীবনানন্দ দাস

সে কামনা নিয়ে

যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা! খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি, রঙের মাঝারে হেরি রঙডুবি! পরাগের ঠোঁটে পরিমলগুঁড়ি- হারায়ে ফেলি গো দিশা! আমি প্রজাপতি-মিঠা মাঠে মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে; ...

জীবনানন্দ দাস

আছে

এখন চৈত্রের দিন নিভে আসে- আরো নিভে আসে; এখানে মাঠের 'পরে শুয়ে আছি ঘাসে; এসে শেষ হ’য়ে যায় মানুষের ইচ্ছা কাজ পৃথিবীর পথে, দু-চারটে- বড়ো জোর একশো শরতে; উর ময় চীন ভারতের গল্প বহিঃপৃথিবীর শর্তে হ’য়ে গেছে শ...

জীবনানন্দ দাস

ভোর ও ছয়টি বমারঃ ১৯৪২

কোথাও বাইরে গিয়ে চেয়ে দেখি দু'চারটে পাখি। ঘাসের উপরে রোদে শিশিরে শুকায় নিজেদের ক্ষেতে ধান- চার পাঁচজন লোক মানবের মতন একাকী। মাটিরও তরঙ্গ স্বর্গীয় জ্যামিতির প্রত্যাশায় মিশে গেছে অতীত ও আজকের সমস্ত আকাশ...

জীবনানন্দ দাস

বলিল অশ্বত্থ সেই

বলিল অশ্বত্থ ধীরে: ‘কোন দিকে যাবে বলো- তোমরা কোথায় যেতে চাও? এতদিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে: ম্লান খোড়ো ঘরগুলো-আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে; এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন দিকে কোন পথে ফের তোমরা যেতেছ...

জীবনানন্দ দাস

মাঘসংক্রান্তির রাতে

হে পাবক, অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি, অন্ধকারে তোমার পবিত্র অগ্নি জ্বলে। অমাময়ী নিশি যদি সুজনের শেষ কথা হয়, আর তার প্রতিবিম্ব হয় যদি মানব-হৃদয়, তবুও আমার জ্যোতি সৃষ্টির নিবিড় মনোবলে জ্ব’লে ওঠে সময়ের আকাশের...

জীবনানন্দ দাস

মরীচিকার পিছে

ধূম্র তপ্ত আঁধির কুয়াশা তরবারি দিয়ে চিরে সুন্দর দূর মরীচিকাতটে ছলনামায়ার তীরে ছুটে যায় দুটি আঁখি! -কত দূর হায় বাকি! উধাও অশ্ব বগ্লাবিহীন অগাধ মরুভূ ঘিরে পথে পথে তার বাধা জমে যায়-তবু সে আসে না ফিরে! দূ...

জীবনানন্দ দাস

গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা

গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা কোনদিন চোখে দেখি নাই একদিন ভাবিলাম মাঠে মাঠে কুয়াশায় যদি আমি কোনোদিন বিদিশায় যাই— মাঠে মাঠে কুয়াশায় ভাবিলাম এই কথা বহু দিন বহু বহু রাত ধ’রে আমি যদি আমি—কোনোদি...

জীবনানন্দ দাস

কোথাও চলিয়া যাবো একদিন

কোথাও চলিয়া যাব একদিন;-তারপর রাত্রির আকাশ অসংখ্য নক্ষত্র নিয়ে ঘুরে যাবে কতকাল জানিব না আমি; জানিব না কতকাল উঠানে ঝরিবে এই হলুদ বাদামী পাতাগুলো-মাদারের ডুমুরের-সোঁদা গন্ধ-বাংলার শ্বাস বুকে নিয়ে তাহাদের...

জীবনানন্দ দাস

এই পৃথিবীর

এই পৃথিবীর বুকের ভিতরে কোথাও শান্তি আছে; অঘ্রাণ মাস রাত্রি হ’লে অনেক বিষয়াবিষের সমাধান মাঠে জলে পাখির নীড়ে নক্ষত্রেতে থাকে; অমেয় গোলকধাঁধাঁয় ঘুরে প্রাণ চেষ্টা করে সমাজ জাতি সময় সৃষ্টি সঠিক বুঝে নিতে। ...

জীবনানন্দ দাস

কোনোদিন দেখিব না তারে আমি

কোনোদিন দেখিব না তারে আমি: হেমন্তে পাকিবে ধান, আষাঢ়ের রাতে কালো মেঘ নিঙড়ায়ে সবুজ বাঁশের বন গেয়ে যাবে উচ্ছ্বাসের গান সারারাত, — তবু আমি সাপচরা অন্ধ পথে — বেনুবনে তাহার সন্ধান পাবো নাকে: পুকুরের পাড়ে সে...

জীবনানন্দ দাস

কখন সোনার রোদ নিভে গেছে

কখন সোনার রোদ নিভে গেছে — অবিরল শুপুরির সারি আঁধারে যেতেছে ডুবে — প্রান্তরের পার থেকে গরম বাতাস ক্ষুধিত চিলের মতো চৈত্রের এ অন্ধকার ফেলিতেছে শ্বাস; কোন চৈত্রে চলে গেছে সেই মেয়ে — আসিবে না করে গেছে আড়ি...

জীবনানন্দ দাস

কবিতা

আমাদের হাড়ে এক নির্ধূম আনন্দ আছে জেনে পঙ্কিল সময়স্রোতে চলিতেছে ভেসে; তা না হ'লে সকলি হারায়ে যেতো ক্ষমাহীন রক্তের- নিরুদ্দেশে। হে আকাশ, একদিন ছিলে তুমি প্রভাতের তটিনীর; তারপর হ'য়ে গেছ দূর মেরুনিশীথের স...

জীবনানন্দ দাস

সোনালী ডানার শঙ্খচিল

মনে পড়ে সেই কলকাতা–সেই তেরোশো তিরিশ– বস্তির মতো ঘর, বৌবাজারের মোড়ে দিনমান ট্রাম করে ঘরঘর। আমাদের কিছু ছিল না তখন ছিল শুধু যৌবন, সাগরের মতো বেগুনি আকাশে সোনালি চিলের মন। ছেঁড়া শাড়ি পরে কাটাইতে দিন বাঁট...

জীবনানন্দ দাস

এখানে আকাশ নীল

এখানে আকাশ নীল- নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল ফুটে থাকে হিম শাদা- রং তার আশ্বিনের আলোর মতন; আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ রৌদ্রের দুপুর ভ’রে;- বারবার রোদ তার সুচিক্বণ চুল কাঁঠাল জামের বুকে নি...

জীবনানন্দ দাস

জর্নাল: ১৯৩৪

খানিকটা দুরে লাইন- রেলের কঠিন লাইন সব অন্ধকারে রয়েছে নীরব; এখানে ঘাসের 'পরে শুয়ে আছি কার্তিকের রাতে: অসংখ্য আলোর বিন্দু নেভাতে- নেভাতে আবার জ্বালায় বারে-বারে নক্ষত্রেরা আকাশের এপারে- ওপারে। হঠাৎ রেলের...

জীবনানন্দ দাস

চিরদিন শহরেই থাকি

চিরদিন শহরেই থাকি পড়ে থাকি পাটের আড়তে করি কেরানির কাজ—শুভে-লাভে যদি কোনোমতে দিন যায় চ’লে আকাশের তলে নক্ষত্রেরা কয় কোন্‌ কথা জোৎস্নায় প্রাণের জড়তা ব্যথা কেন পায় সে সব খবর নিয়ে কাজ কিবা হায় বিয়ে হয়েছিল ...

জীবনানন্দ দাস

জয়জয়ন্তী সূর্য

কোনো দিন নগরীর শীতের প্রথম কুয়াশায় কোনো দিন হেমন্তের শালিখের রঙে ম্লান মাঠের বিকেলে হয়তো বা চৈত্রের বাতাসে চিন্তার সংবেগ এসে মানুষের প্রাণে হাত রাখেঃ তাহাকে থামায়ে রাখে। সে-চিন্তার প্রাণ সাম্রাজ্যের উ...

জীবনানন্দ দাস

নগ্ন নির্জন হাত

আবার আকাশের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে : আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার। যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে অথচ যার মুখ আমি কোনদিন দেখিনি, সেই নারীর মতো ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়েছে উঠছে। মনে হয় কোনো বিল...

জীবনানন্দ দাস

জীবনে অনেক দূর

জীবনে অনেক দূর সময় কাটিয়ে দিয়ে- তারপর তবু চলার কিছুটা আরো পথ আছে টের পাই;- সুমুখে বিস্ময়;- দেখেছি সূর্যের আলো মাঝে মাঝে জলের কম্পন; আশ্বিনের ঘন নীল আশ্চর্য আকাশে দেখেছি আরোহী হাঁস বাষ্পের ভিতর থেকে আস...

জীবনানন্দ দাস

পথহাঁটা

কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে; তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে: সারারাত গ্যাস লাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো কর...

জীবনানন্দ দাস

তবু

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার বছরে বয়সী আমি; বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে চ’লে যেতে দেখে— তবু—অবিরল অশান্তির দীপ্ত...

জীবনানন্দ দাস

তবুও পায়ের চিহ্ন

ঘড়ির দুইটি ছোটো কালো হাত ধীরে আমাদের দু’জনকে নিতে চায় সেই শব্দহীন মাটি ঘাসে সাহস সংকল্প প্রেম আমাদের কোনোদিন সেদিকে যাবে না তবুও পায়ের চিহ্ন সেদিকেই চলে যায় কি গভীর সহজ অভ্যাসে।...

জীবনানন্দ দাস

তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও

তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও—আকাশের রৌদ্র ধুলো ধোঁয়া থেকে স’রে এইখানে চ’লে এসো; পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন তোমাদের কথা শুনিয়াছি—তোমাদের ম্লান-মুখ দেখিয়াছি—তোমাদের ক্লান্ত রক্তাক্ততা দেখিয়াছি কত দিন—ব্যথিত ...

জীবনানন্দ দাস

চলে যাব শুকনো পাতা-ছাওয়া ঘাসে

চলে যাব শুকনো পাতা-ছাওয়া ঘাসে — জামরুল হিজলের বনে; তলতা বাঁশের ছিপ হাতে রবে — মাছ আমি ধরিব না কিছু; — দীঘির জলের গন্ধে রূপালি চিতল আর রূপসীর পিছু জামের গভীর পাতা — মাখা শান — নীল জলে খেলিছে গোপনে; আন...

জীবনানন্দ দাস

চারিদিকে শান্ত বাতি

চারিদিকে শান্ত বাতি — ভিজে গন্ধ — মৃদু কলরব; খেয়ানৌকোগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে; পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল;- এশিরিয়া ধুলো আজ — বেবিলন ছাই হয়ে আছে।...

জীবনানন্দ দাস

কতদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে

কতদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়াছি আমরা দুজনে; আকাশ প্রদীপ জ্বেলে তখন কাহারা যেন কার্তিকের মাস সাজায়েছে, — মাঠ থেকে গাজন গানের স্নান ধোঁয়াটে উচ্ছ্বাস ভেসে আসে; ডানা তুলে সাপমাসী উড়ে যায় আপনার মনে আকন্দ ...

জীবনানন্দ দাস

তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও

তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও — আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে নেচে চলে-একবা...

জীবনানন্দ দাস

তোমাকে

মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্রে অই; কুলবধুর বহিরাশ্রয়িতার মতন অনেক উড়ে হিজল গাছে জামের বনে হলুদপাখির মতো রূপসাগরের পার থেকে কি পাখনা বাড়িয়ে বাস্তবিকই রৌদ্র এখন? সত্যিকারের পাখি? কে যে কোথায় কার হৃ...

জীবনানন্দ দাস

ঘাসের বুকের থেকে

ঘাসের বুকের থেকে কবে আমি পেয়েছি যে আমার শরীর – সবুজ ঘাসের থেকে; তাই রোদ ভালো লাগে — তাই নীলাকাশ মৃদু ভিজে সকরুণ মনে হয়; — পথে পথে তাই এই ঘাস জলের মতন স্নিগ্ধ মনে হয়, — কউমাছিদের যেন নীড় এই ঘাস; — যত দ...

জীবনানন্দ দাস

জীবন ভালোবেসে

দেখা হল অনেক রক্ত রৌদ্র কোলাহল; চারিদিকে অধোমুখে মানুষেরা শব বহন করে; আজকে শতাব্দীতে মৃত্যু প্রথম কথা। তবু এ সব মৃত অবশেষে ঘুমের ভিতরে জুড়োয় গিয়ে দূর পৃথিবীর ঘাস পৃথিবী জলে এরা নদী সূর্য প্রেমের দিন ফ...

জীবনানন্দ দাস

এখানে প্রাণের স্রোত আসে যায়

এখানে প্রাণের স্রোত আসে যায় — সন্ধ্যায় ঘুমায় নীরবে মাটির ভিটের ‘পরে — লেগে থাকে অন্ধকারে ধুলোর আঘ্রাণ তাহাদের চোখে — মুখে; — কদমের ডালে পেঁচা কথা কবে — কাঁঠালের ডাল থেকে হিজলের ডালে গিয়ে করিবে আহ্বান ...

জীবনানন্দ দাস

ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন

ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে; তখনো যৌবন প্রাণে লেগে আছে হয়তো বা — আমার তরুণ দিন তখনো হয়নি শেষ- সেই ভালো — ঘুম আসে-বাংলার তৃণ আমার বুকের নিচে চোখ বুজে-বাংলার আমের পাতাতে কাঁচপোকা ঘুমায়ে...

জীবনানন্দ দাস

কার্তিক-অঘ্রাণ ১৯৪৬

পাহাড়, আকাশ, জল অনন্ত প্রান্তরঃ সৃজনের কী ভীষণ উৎস থেকে জেগে কেমন নীরব হয়ে রয়েছে আবেগ; যেন বজ্রবাতাসের ঝড় ছবির ভিতরে স্থির- ছবির ভিতরে আরো স্থির। কোথাও উজ্জ্বল সূর্য আসে; জ্যোতিষ্কেরা জ্ব'লে ওঠে সপ্রত...

জীবনানন্দ দাস

কতদিন তুমি আর আমি এসে এইখানে বসিয়াছি

কতদিন তুমি আর আমি এসে এইখানে বসিয়াছি ঘরের ভিতর খড়ের চালের নিচে, অন্ধকারে; — সন্ধ্যার ধূসর সজল মৃদু হাত খেলিতেছে হিজল জামের ডালে — বাদুড় কেবল করিতেছে আসা-যাওয়া আকাশের মৃদু পথে — ছিন্ন ভিজে খড় বুকে নিয়ে...

জীবনানন্দ দাস

ডাহুকী

মালঞ্চে পুষ্পিত লতা অবনতমুখী,- নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী বিজন- তরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে বনচ্ছায়া- অন্তরালে তরল তিমিরে! -আকাশে মন্থর মেঘ, নিরালা দুপুর! -নিস্তব্ধ পল্লীর পথে কুহকের সুর বাজিয়া উঠ...

জীবনানন্দ দাস

তিমির হননের গান

কোনো হ্রদে কোথাও নদীর ঢেউয়ে কোনো এক সমুদ্রের জলে পরস্পরের সাথে দু'-দণ্ড জলের মতো মিশে সেই এক ভোরবেলা শতাব্দীর সূর্যের নিকটে আমাদের জীবনের আলোড়ন- হয়তো বা জোবনকে শিখে নিতে চেয়েছিলো। অন্য এক আকাশের মতো চ...

জীবনানন্দ দাস

তুমি

নক্ষত্রের চলাফেরা ইশারায় চারি দিকে উজ্জ্বল আকাশ; বাতাসে নীলাভ হয়ে আসে যেন প্রান্তরের ঘাস; কাঁচপোকা ঘুমিয়েছে — গঙ্গাফড়িং সেও ঘুমে; আম নিম হিজলের ব্যাপ্তিতে পড়ে আছ তুমি। ‘মাটির অনেক নীচে চলে গেছ? কিংবা ...

জীবনানন্দ দাস

পরিচায়ক

মাঝে-মাঝে মনে হয় এ-জীবন হংসীর মতন- হয়তো-বা কোনো-এক কৃপণের ঘরে; প্রভাতে সোনার ডিম রেখে যায় খড়ের ভিতরে; পরিচিত বিস্ময়ের অনুভবে ক্রমে-ক্রমে দৃঢ় হয় গৃহস্থের মন। তাই সে হংসীরে আর চায় নাকো দুপুরে নদীর ঢালু ...

জীবনানন্দ দাস

পটভূমির

পটভূমির ভিতরে গিয়ে কবে তোমার দেখেছিলাম আমি দশ-পনেরো বছর আগে;—সময় তখন তোমার চুলে কালো মেঘের ভিতর লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালালো তোমার নিশিত নারীমুখের;—জানো তো অন্তর্যামী। তোমার মুখঃ চারিদিকে অন্ধকারে জলে...

জীবনানন্দ দাস

নির্দেশ

জীর্ণ শীর্ণ মাকু নিয়ে এখন বাতাসে তামাসা চালাতে আছে পুনরায় সময় একাকী। তবুও সে ভোরবেলা হরিয়াল পাখি ধূসর চিতল মাছে- নির্ঝরের ফাঁসে খেলা ক'রে কাকে দিয়েছিল তবে ফাঁকি? বসন্তবউরী দুটো এই ব'লে হা-হা ক'রে হাসে...

জীবনানন্দ দাস

পাখি

ঘুমায়ে রয়েছ তুমি ক্লান্ত হ'য়ে, তাই আজ এই জ্যোৎস্নায় কাহারে জানাই আমার এ-বিস্ময়- বিস্ময়ের ঠাঁই, নক্ষত্রের থেকে এলো;- তুমি জেগে নাই, আমার বুকের 'পরে এই এক পাখি; পাখি? না ফড়িং কীট? পাখি না জোনাকি? বাদামি...

জীবনানন্দ দাস

পঁচিশ বছর পরে (মাঠের গল্প)

শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে বলিলাম: ‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!– পঁচিশ বছর পরে!’ এই বলে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে; তারপর কতবার চাঁদ আর তারা, মাঠে মাঠে মরে গেল, ইদুর — ...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবী ও সময়

সময়ের উপকণ্ঠে রাত্রি প্রায় হয়ে এল আজ সূর্যকে পশ্চিমে দেখি সারা শতাব্দীর অক্লান্ত রক্তের বোঝা গুছায়ে একাকী তবুও আশার মত মেঘে মেঘে বলয়িত হয়ে শেষ আলো ঢেলে যায়;- জ্যোতিঃপ্রাণধর্মী সূর্য অই; একদিন অ্যামিবা...

জীবনানন্দ দাস

দেশ কাল সন্ততি

কোথাও পাবে না শান্তি—যাবে তুমি এক দেশ থেকে দূরদেশে? এ-মাঠ পুরানো লাগে—দেয়ালে নোনার গন্ধ—পায়রা শালিখ সব চেনা? এক ছাঁদ ছেড়ে দিয়ে অন্য সূর্যে যায় তারা-লক্ষ্যের উদ্দেশে তবুও অশোকস্তম্ভ কোনো দিকে সান্তনা দ...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত

পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত কোন্‌খানে সফলতা শক্তির ভিতর, কোন্‌খানে আকাশের গায়ে রূঢ় মনুমেন্ট উঠিতেছে জেগে, কোথায় মাস’ল তুলে জাহাজের ভিড় সব লেগে আছে মেঘে, জানি নাকো, আমি এই বাংলার পাড়াগাঁয়ে বাধিঁয়াছি ঘর: সন্ধ্য...

জীবনানন্দ দাস

দেয়াল (সম্প্রতি পাঠোদ্ধার করা কবিতা)

সেই যুবা পুরুষের (অথবা সে প্রৌঢ় নাকি) আবির্ভাব হয়েছিল আমাদের হেমন্তের পথে তখন আকাশ ঢালু হয়ে এসে নদীর কিনার দিয়ে নিষ্প্রভ জল ছুঁয়ে আছে – এ সব সান্ত্বনা নয়, শান্ত কথা মনে পড়ে শুধু বিকেলের হলুদ আলোক ...

জীবনানন্দ দাস

তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে

তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার সন্তান বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে; যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে, আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে ডুবে যায়, – কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে-দিকে রপশালী ধান একদিন; – হয়...

জীবনানন্দ দাস

পরবাসী

যাহাদের পায়ে পায়ে চলে চলে জাগিয়াছে আঁকাবাঁকা চেনা পথগুলি দিকে দিকে পড়ে আছে যাহাদের দেহমাটি—করোটির ধূলি, যাহারা ভেনেছে ধান গান গেয়ে—খুঁটেছে পাখির মতো মিঠে খুদকুঁড়া, যাহাদের কামনায় ইশারায় মাটি হল পানপাত...

জীবনানন্দ দাস

নিঃসরণ

দুর্গের গৌরবে ব'সে প্রাংশু আত্মা ভাবিতেছে টের পূর্বপুরুষের কথাঃ যারা তারে জঙ্ঘা দিল,- তবু আজ তরবার পরিত্যাগ করার ক্ষমতা যারা দিল;- প্রাচীন পাথর তারা এনেছিল পর্বতের থেকে স্থির কিছু গড়িবার প্রয়োজনে; তার...

জীবনানন্দ দাস

পাখিরা

ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে — বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে আছি; — এখন সে কত রাত! অই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর, স্কাইলাইট মাথার উপর আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে? তাদের ডানার ঘ্রাণ চারি...

জীবনানন্দ দাস

নিজেকে নিয়মে ক্ষয়

নিজেকে নিয়মে ক্ষয় ক’রে ফেলে রোজই চ’লেছে সময়; তবুও স্থিরতা এক র’য়ে গেছে, সময় ক্ষয়ের মতো নয়। অঘ্রাণের সকালের আব্‌ছা আভার মতন অসংখ্য কুয়াশায়, আশ্বিনে আকাশ রোদ মাঠের ভিতরে, নদীর বিস্তীর্ণ জলে, অথবা ঝড়ের ব...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবীর রৌদ্রে

কেমন আশার মতো মনে হয় রোদের পৃথিবী, যতদূর মানুষের ছায়া গিয়ে পড়ে মৃত্যু আর নিরুৎসাহের থেকে ভয় আর নেই এ-রকম ভোরের ভিতরে। যতদূর মানুষের চোখ চ’লে যায় ঊর ময় হরপ্পা আথেন্‌স্‌ রোম কলকাতা রোদের সাগরে অগণন মানু...

জীবনানন্দ দাস

দীপ্তি

তোমার নিকট থেকে যত দূর দেশে আমি চলে যাই তত ভালো। সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো- তবু কেউ সময়স্রোতের ‘পরে সাঁকো বেঁধে দিতে চায়; ভেঙ্গে যায়; যত ভাঙ্গে তত ভালো। যত স্রোত বয়ে যায় সময়ের সময়ের মতন নদীর জলসিঁড়ি, ন...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবীতে

শস্যের ভিতরে রৌদ্রে পৃথিবীর সকালবেলায় কোনো এক কবি ব’সে আছে; অথবা সে কারাগারে ক্যাম্পে অন্ধকারে; তবুও সে প্রীত অবহিত হ’য়ে আছে। এই পৃথিবীর রোদে-এখানে রাত্রির গন্ধে-নক্ষত্রের তরে। তাই সে এখানকার ক্লান্ত ...

জীবনানন্দ দাস

পাড়াগাঁর দু পহর ভালোবাসি

পাড়াগাঁর দু’পহর ভালোবাসি — রৌদ্র যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের; — কোন গল্প, কি কাহিনী, কি স্বপ্ন যে বাঁধিয়াছে ঘর আমার হৃদয়ে, আহা, কেউ তাহা জানে নাকো — কেবল প্রান্তর জানে তাহা, আর ওই প্রান্তরের শঙ্খচিল; তা...

জীবনানন্দ দাস

দিনরাত্রি

সমস্ত দিন সমস্ত পৃথিবীই যেন আকাশ। চারদিকে রৌদ্রের ভিতর রয়ে গেছে নির্মল জলের অনুভূতি; জল আকাশ ও আগুনের থেকে এই সব রাত্রির জন্ম হয়; অন্তহীন শুভ্রবিবেকী নক্ষত্রের; এই সব স্থায়ী জিনিস চল-বিশ্বলোকের; মানব্...

জীবনানন্দ দাস

নাবিকী

হেমন্ত ফু্রায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে ; এ-রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে সময়ের কুয়াশায় ; মাঠের ফসলগুলো বার বার ঘরে তোলা হ’তে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেছে। মৃত্তিকার ওই দিক আকাশ...

জীবনানন্দ দাস

নব নবীনের লাগি

-নব নবীনের লাগি প্রদীপ ধরিয়া আঁধারের বুকে আমার রয়েছি জাগি! ব্যর্থ পঙ্গু খর্ব প্রাণের বিকল শাসন ভেঙে, নব আকাঙক্ষা আশার স্বপনে হৃদয় মোদের রেঙে, দেবতার দ্বারে নবীন বিধান-নতুন ভিক্ষা মেগে দাঁড়ায়েছি মোরা ত...

জীবনানন্দ দাস

কমলালেবু

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে? আবার যেন ফিরে আসি কোনো এক শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে কোমো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।...

জীবনানন্দ দাস

দুজন

আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু – একই আলো পৃথিবীর পারে আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে য...

জীবনানন্দ দাস

নারীসবিতা

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে,– হাওয়ায় তুমি ভেসে যেতে দখিণ দিকে– যেই খানেতে যমের দুয়ার আছে; অভিচারী বাতাসে বুক লবণ– বিলুন্ঠি...

জীবনানন্দ দাস

প্রয়াণপটভূমি

বিকেলবেলার আলো ক্রমে নিভেছে আকাশ থেকে। মেঘের শরীর বিভেদ ক’রে বর্শাফলার মতো সূর্যকিরণ উঠে গেছে নেমে গেছে দিকে-দিগন্তরে; সকলি ছুপ কী এক নিবিদ প্রণয়বশত। কমলা হলুদ রঙের আলো- আকাশ নদী নগরী পৃথিবীকে সূর্য থ...

জীবনানন্দ দাস

কত দিন ঘাসে আর মাঠে

কত দিন ঘাসে আর মাঠে আমার উৎসাহে প্রাণ কাটে খড় খুঁটি—অশ্বথ্থের শুকনো পাতা চুপে উল্টাই দু’একটা পোকা যদি পাই আমারে চেনো না নাকি: আমি যে চড়াই। কতদিন তোমাদের ভোরের উঠানে দু’-একটা খই আর মুড়কির ঘ্রাণে উড়ে আস...

জীবনানন্দ দাস

পেঁচা

প্রথম ফসল গেছে ঘরে, হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে হিম হয়ে আসে বাঁশাপাতা– মরা ঘাস — আকাশের তারা! বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা! ধানক্ষেতে– মাঠে জমিছে ধোঁয়াটে ধারালো কুয়া...

জীবনানন্দ দাস

নীলিমা

রৌদ্র ঝিল্‌মিল, উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে! -উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে ...

জীবনানন্দ দাস

এখন ওরা

এখন ওরা ভোরের বেলা সবুজ ঘাসের মাঠে হো-হো ক’রে হাসে- হো-হো হি-হি ক’রে, অসংখ্য কাল ভোর এসেছে- আজকে তবু ভোরে সময় যেন ঘোড়ার মত নিজের খুরের নাল হারিয়ে ফেলে চমকে গিয়ে অনন্ত সকাল হয়ে এখন বিভোর হয়ে আছে; মাঠের...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রির কোরাস

এখন সে কতো রাত; এখন অনেক লোক দেশ-মহাদেশের সব নগরীর গুঞ্জরণ হ'তে ঘুমের ভিতরে গিয়ে ছুটি চায়। পরস্পরের পাশে নগরীর ঘ্রাণের মতন নগরী ছড়ায়ে আছে। কোনো ঘুম নিঃসাড় মৃত্যুর নামান্তর। অনেকেরই ঘুম জেগে থাকা। নগরী...

জীবনানন্দ দাস

রেনকোট কাঁধে রেখে

রেনকোট কাঁধে রেখে শহরের রাস্তায় কত বার নেমেছি যে রাতে কত যে গভীর রাত হেঁটেছি হেঁটেছি শুধু স্তব্ধ গ্যাসপোস্টদের সাথে কেবল গিয়েছি চলে পিছল পথের থেকে আরো দূর অন্ধকার পথে গলির ঘুঁজির ফাঁকে- ডাস্টবিন ইঁদুর...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রি দিন

একদিন এ-পৃথিবী জ্ঞানে আকাঙ্ক্ষায় বুঝি স্পষ্ট ছিলো, আহা; কোনো এক উন্মুখ পাহাড়ে মেঘ আর রৌদ্রের ধারে ছিলাম গাছের মতো ডানা মেলে- পাশে তুমি রয়েছিলে ছায়া। একদিন এ-জীবন সত্য ছিলো শিশিরের মতো স্বচ্ছতায়; কোনো ...

জীবনানন্দ দাস

শতাব্দী শেষ

সূর্যগরিমার নিচে মানুষের উচ্ছ্রিত জীবন শুরু হ’ল- যখন সে শিশুর মতন; নদীর জলের মত আশা দিয়ে উচ্চারিত হয়ে তবুও সে মানুষের মন। রঙীন খেলনা, ঘোড়া, জাপানী লাটিম, আরব্যোপন্যাসের সেই পরী জিন উড্ডীন বক নিয়ে খেলে...

জীবনানন্দ দাস

শহর

হৃদয়, অনেক বড়ো-বড়ো শহর দেখেছো তুমি; সেই সব শহরের ইটপাথর, কথা, কাজ, আশা, নিরাশার ভয়াবহ হৃত চক্ষু আমার মনের বিস্বাদের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও শহরের বিপুল মেঘের কিনারে সূর্য উঠতে দেখেছি; বন্দ...

জীবনানন্দ দাস

সূর্য নিভে গেলে

সূর্য, মাছরাঙা, আমি উত্তীর্ণ হয়েছে পাখী মদী সূর্যের অন্ধ আবেগের দু’মুহূর্তে আনন্দের পরীক্ষার বুঝি। নিভে গেছে;- আমি কেন তবু সূর্য খুঁজি। তুমি জানি না কোথায় তুমি- সূর্য নিভে গেছে; তোমার মননে আজ স্থির সন...

জীবনানন্দ দাস

মকরসংক্রান্তি প্রাণে

তুমি আমার মনে এলে। বালুঘড়ি বিকল রাতের বেলা। থেকে থেকে পড়ছে মনে সে কোন ধূসর বেবিলনে কবের গ্রীসের অলিভবনে তোমার সাথে সূর্যতীরে হয়েছিলো খেলা। জানি সবই ফুরিয়ে গেলে অতল সনাতনে থেকে থেকে তাঁবা নদীর অতল উৎসা...

জীবনানন্দ দাস

বনের চাতক-মনের চাতক

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়- মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়! ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে- সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়! পুবে...

জীবনানন্দ দাস

প্রেম অপ্রেমের কবিতা

নিরাশার খাতে ততোধিক লোক উৎসাহ বাঁচায়ে রেখেছে; অগ্নিপরীক্ষার মতো কেবলি সময় এসে দ’হে ফেলে দিতেছে সে-সব। তোমার মৃত্যুর পরে আগুনের একতিল বেশি অধিকার সিংহ মেষ কন্যা মীন করেছে প্রত্যক্ষ অনুভব। পৃথিবী ক্রমশ ...

জীবনানন্দ দাস

হরিণেরা

স্বপ্নের ভিতরে বুঝি–ফাল্গুনের জোছনার ভিতরে। দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে হরিণেরা; রূপালি চাঁদের হাত শিশিরে পাতায়; বাতাস ঝরিছে ডানা — মুক্তা ঝ’রে যায় পল্লবের ফাঁকে ফাঁকে-বনে বনে-হরিণের চোখে; হরিণেরা খেল...

জীবনানন্দ দাস

সবিতা

সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে: ভূমধ্যসাগর ঘিরে সেই সব জাতি, তাহাদের সাথে সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন; মনেপড়ে নিবিড় মেরুন আলো, মুক্তার শিকারী, রেশম, মদের সার্থবাহ, দুধের ম...

জীবনানন্দ দাস

হাওয়ার রাত

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল- অসংখ্য নক্ষত্রের রাত; সারারাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে; মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো, কখনো বিছানা ছিঁড়ে নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে, এক-একবা...

জীবনানন্দ দাস

সে কত পুরনো কথা

সে কত পুরনো কথা-যেন এই জীবনের ঢের আগে আরেক জীবন তোমারে সিঁড়ির পথে তুলে দিয়ে অন্ধকারে যখন গেলাম চুপে তুমিও ফের নি পিছে-তুমিও ডাকনি আর; আমারও নিবিড় হলো মন যেন এক দেশলাই জ্বলে গেছে-জ্বলিবেই-হালভাঙ্গা জাহ...

জীবনানন্দ দাস

হাজার বছর শুধু খেলা করে

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো : চারিদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান- বালির উপরে জ্যেৎস্না- দেবদারু ছায়া ইতস্তত বিচূর্ণ থামের মতো; দ্বারকার- দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত ম্লান শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ আমাদের- ঘ...

জীবনানন্দ দাস

সোনালি সিংহের গল্প

আমাদের পরিজন নিজেদের চিনেছিলো না কি? এই সব সংকল্পের পিছে ফিরে হেমন্তের বেলাবেলি দিন নির্দোষ আমোদ সাঙ্গ ক'রে ফেলে চায়ের ভিতরে; চায়ের অসংখ্য ক্যান্টিন। আমাদের উত্তমর্ণদের কাছে প্রতিজ্ঞার শর্ত চেয়ে তবু ত...

জীবনানন্দ দাস

সেদিন এ-ধরণীর

সেদিন এ ধরণীর সবুজ দ্বীপের ছায়া-উতরোল তরঙ্গের ভিড় মোর চোখে জেগে জেগে ধীরে ধীরে হল অপহত- কুয়াশায় ঝ’রে পড়া আতসের মতো! দিকে দিকে ডুবে গেল কোলাহল,- সহসা উজার জলে ভাটা গেল ভাসি! অতি দুর আকাশের মুখখানা...

জীবনানন্দ দাস

হাজার বর্ষ আগে

সেই মেয়েটি এর থেকে নিকটতর হ’লো না : কেবল সে দূরের থেকে আমার দিকে একবার তাকালো আমি বুঝলাম চকিত হয়ে মাথা নোয়ালো সে কিন্তু তবুও তার তাকাবার প্রয়োজন – সপ্রতিভ হয়ে সাত-দিন আট-দিন ন-দিন দশ-দিন সপ্রতিভ হয়ে —...

জীবনানন্দ দাস

হিন্দু-মুসলমান

মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে-পুণ্য ভারতপুরে পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নমাজের সুরে-সুরে! আহ্নিক হেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে, মুয়াজ্জেনদের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে, জপে ঈদগাতে তসবি ফকির, পূজারী মন্ত্র প...

জীবনানন্দ দাস

যদিও দিন

যদিও দিন কেবলি নতুন গল্পবিশ্রুতির তারপরে রাত অন্ধকারে থেমে থাকাঃ—লুপ্তপ্রায় নীড় সঠিক ক’রে নেয়ার মতো শান্ত কথা ভাবা; যদিও গভীর রাতের তারা (মনে হয়) ঐশী শক্তির; তবুও কোথাও এখন আর প্রতিভা আভা নেই; অন্ধকার...

জীবনানন্দ দাস

যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকে

যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকে – দূর কুয়াশায় চ’লে যাবো, সেদিন মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর ভিক্ষা ক’রে লয়ে যাবে;- সেদিন দু’দও এই বাংলার তীর — এই নীল বাংলার তীরে শুয়ে একা একা কি ভাবিব, হায়;- সেদিন র’বে...

জীবনানন্দ দাস

সন্ধ্যা হয়ে আসে

সন্ধ্যা হয়ে আসে- সন্ধ্যা হয়ে আসে একা একা মাঠের বাতাসে ঘুরি আমি- বসি আমি ঘাসে ওই দূরে দেখা যায় কার লাল পাড় প্রসাদের বউ বুঝি-পাশে বুঝি তার প্রসাদ রয়েছে বসে-বাড়িতেছে সন্ধ্যার আঁধার বছর আরেক হ’ল হয়েছিলো দ...

জীবনানন্দ দাস

শঙ্খমালা

কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে, বলিল , তোমারে চাই : বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি – কুয়াশার পাখনায় - সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক জো...

জীবনানন্দ দাস

শকুন

মাঠ থেকে মাঠে মাঠে — সমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে আকাশে শকুনেরা চড়িতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি — নিস্তব্ধ প্রান্তর শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে আরেক আকাশ যেন — সেইখানে ...

জীবনানন্দ দাস

শীত শেষ

আজ রাতে শেষ হ'য়ে গেল শীত- তারপর কে যে এলো মাঠে-মাঠে খড়ে হাঁস গাভী শাদা-প্লেট আকাশের নীল পথে যেন মৃদু মেঘের মতন, ধানের সোনার ছড়া নাই মাঠে- ইঁদুর তবুও আর যাবে নাকো ঘরে তাহার রূপালি রোম একবার জ্যোৎস্নায় ...

জীবনানন্দ দাস

শীতের রাতের কবিতা

গভীর শীতের রাত এই সব,- তবু চারিদিকে যুবাদের হৃদয়ের জীবনের কথা মৃত্যুর উপর দিয়ে সাঁকোর মতন চেয়ে দেখে মরণের অপ্রমেয়তা সেতুর ছবির মত মিলে গিয়ে জলের ভিতরে জীবনের জয়- আর মরণের স্তব্ধতাকে অনুভব করে। অনুভব ক...

জীবনানন্দ দাস

শীত রাত

এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে; বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা, কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো। শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে - সার্কাসের ব্যথি...

জীবনানন্দ দাস

শ্মশান

কুহেলির হিমশয্যা অপসারি ধীরে রূপময়ী তন্বী মাধবীরে ধরণী বরিয়া লয় বারে-বারে-বারে! -আমাদের অশ্রুর পাথারে ফুটে ওঠে সচকিতে উৎসবের হাসি,- অপরূপ বিলাসের বাঁশি! ভগ্ন প্রতিমারে মোরা জীবনের বেদীতটে আরবার গড়ি, ফ...

জীবনানন্দ দাস

শ্রাবণরাত

শ্রাবণের গভীর অন্ধকার রাতে ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে যায় কোথায় দূরে বঙ্গোপসাগরের শব্দ শুনে? বর্ষণ অনেকক্ষণ হয় থেমে গেছে, যত দূর চোখ যায় কালো আকাশ মাটির শেষ তরঙ্গকে কোলে করে চুপ করে রয়েছে যেন; নিস্তব্ধ হয়ে দূ...

জীবনানন্দ দাস

শেষ হল জীবনের সব লেনদেন

শেষ হল জীবনের সব লেনদেন বনলতা সেন কোথায় গিয়াছ তুমি এই বেলা মাছরাঙ্গা ভোলে নি তো দুপুরের খেলা শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন। তুমি নেই বনলতা সেন তোমার মত কেউ কি ছিল কোথাও কেন...

জীবনানন্দ দাস

সূর্য নক্ষত্র নারী

তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিলো সব চেয়ে আগে; জানি আমি। সে-দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই। তুমি যে এ-পৃথিবীতে র’য়ে গেছো। আমাকে বলেনি কেউ। কোথাও জল্কে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জল র’য়ে গেছে;– যে যার...

জীবনানন্দ দাস

সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়

চোখদুটো ঘুমে ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন- স্বপন কদিন রয়! এসেছে গোধূলি গোলাপীবরণ-এ তবু গোধূলি নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়, আমাদের মুখ সারাট...

জীবনানন্দ দাস

সহজ

আমার এ গান কোনোদিন শুনিবে না তুমি এসে– আজ রাত্রে আমার আহ্বান ভেসে যাবে পথের বাতাসে– তবুও হৃদয়ে গান আসে! ডাকিবার ভাষা তবুও ভুলি না আমি– তবু ভালোবাসা জেগে থাকে প্রাণে! পৃথিবীর কানে নক্ষত্রের কানে তবু গা...

জীবনানন্দ দাস

সাগর বলাকা

ওরে কিশোর, বেঘোর ঘুমের বেহুঁশ হাওয়া ঠেলে পাতলা পাখা দিলি রে তোর দূর-দুরাশায় মেলে! ফেনার বৌয়ের নোন্‌তা মৌয়ের মদের গেলাস লুটে, ভোর-সাগরের শরাবখানায়–মুসল্লাতে জুটে হিমের ঘুণে বেড়াস খুনের আগুনদানা জ্বেলে!...

জীবনানন্দ দাস

সিন্ধু

বুকে তব সুরপরী বিরহবিধুর গেয়ে যায়, হে জলধি, মায়ার মুকুর! কোন্‌ দূর আকাশের ময়ুর-নীলিমা তোমারে উতলা করে! বালুচরসীমা উলঙ্ঘি তুলিছ তাই শিরোপা তোমার,- উচ্ছৃঙ্খল অট্টহাসি-তরঙ্গের বাঁকা তলোয়ার! গলে মৃগতৃষ্ণা...

জীবনানন্দ দাস

সুদর্শনা

একদিন ম্লান হেসে আমি তোমার মতন এক মহিলার কাছে যুগের সঞ্চিত পণ্যে লীন হতে গিয়ে অগ্নিপরিধির মাঝে সহসা দঁড়িয়ে শুনেছি কিন্নরকন্ঠ দেবদারু গাছে, দেখেছি অমৃতসুর্য আছে। সবচেয়ে আকাশ নক্ষত্র ঘাস চন্দ্রমল্লিকার ...

জীবনানন্দ দাস

সিন্ধুসারস

দু-এক মুহূর্তে শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে তুমি আর আমি হে সিন্ধুসারস, মালাবার পাহাড়ের কোল ছেড়ে অতি দূর তরঙ্গের জানালায় নামি নাচিতেছে টারান্‌টেলা- রহস্যের; আমি এই সমুদ্রের পারে চুপে থামি চেয়ে দেখি বরফের ...

জীবনানন্দ দাস

সুচেতনা

সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে; সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে নির্জনতা আছে। এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়। কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে; তবুও তোমার কাছে আ...

জীবনানন্দ দাস

সুদর্শনা (অপ্রকাশিত)

সুদর্শনা মিশে যায় অন্ধকার রাতে নদীর এ পারে বসে একদিনও দেখে নি ওপার প্রকৃতি চায় নি সেই মেয়েটি এ আলো আর রাত্রির আঘাতে পৃথিবীকে কূট চোখে দেখে নেবে- বুঝে নেবে জীবনের গ্লানি অন্ধকার চায় নি সে কলমীর ফুলভরা ...

জীবনানন্দ দাস

সূর্য কখন

সূর্য কখন পশ্চিমে ঢ’লে মশালের মত ভেঙে লাল হয়ে উঠে সমুদ্দুরের ভিতরে নিভছে গিয়ে; সে যে রোজ নেভে সকলেই জানে, তবু আজো ডুবে যায় সময়মতন সকলের অজানিতে। নারী সাপ যখ বণিক ভিখিরী পিশাচ সকলে মিলে ভোরবেলা থেকে মন...

জীবনানন্দ দাস

সূর্যকরোজ্জ্বলা

আমরা কিছু চেয়েছিলাম প্রিয়; নক্ষত্র মেঘ আশা আলোর ঘরে ঐ পৃথিবীর সূর্যসাগরে দেখেছিলাম ফেনশীর্ষ আলোড়নের পথে মানুষ তাহার ছায়ান্ধকার নিজের জগতে জন্ম নিল- এগিয়ে গেল; - কত আগুন কত তুষার যুগ শেষ করে সে আলোর লক...

জীবনানন্দ দাস

সৃষ্টির তীরে

বিকেলের থেকে আলো ক্রমেই নিস্তেজ হ'য়ে নিভে যায়- তবু ঢের স্মরণীয় কাজ শেষ হ'য়ে গেছেঃ হরিণ খেয়েছে তার আমিষাশী শিকারীর হৃদয়কে ছিঁড়ে; সম্রাটের ইশারায় কঙ্কালের পাশাগুলো একবার সৈনিক হয়েছে; স্বচ্ছল কঙ্কাল হ'য়ে...

জীবনানন্দ দাস

সূর্যপ্রতিম

আমরণ কেবলই বিপন্ন হয়ে চলে তারপর যে বিপদ আসে জানি হৃদয়ঙ্গম করার জিনিস; এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। বালুচরে নদীটির জল ঝরে, খেলে যায় সূর্যের ঝিলিক, মাছরাঙা ঝিকমিক্ করে উড়ে যায়, মৃত্যু আর করুণার দুটো তরোয়াল আড়া...

জীবনানন্দ দাস

সে

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে; বলেছিলোঃ 'এ নদীর জল তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল; সব ক্লান্তি রক্তের থেকে স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি; এই নদী তুমি।' 'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?' মাছরাঙাদের বললাম; গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছি...

জীবনানন্দ দাস

সেইদিন এই মাঠ

সেইদিন এই মাঠ স্তব্ধহবে নাকো জানি---এই নদী নক্ষত্রের তলে সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন---সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আ ঝরে ! আমি চলে যাব ব ’লে চালতাফুল কি অর ভিজিবে না শিশিরের জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে? লক্ষ্মী...

জীবনানন্দ দাস

সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি

সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি আর শুকের মতন; কি গল্প শুনিতে চাও তোমরা আমার কাছে — কোন্‌ কোন্‌ গান, বলো, তাহলে এ — দেউলের খিলানের গল্প ছেড়ে চলো, উড়ে চলো, — যেখানে গভীর ভোরে নোনাফল পাকিয়াছে, — আছে আতাবন,...

জীবনানন্দ দাস

স্বপ্ন

পাণ্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে; শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে; নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি উড়ে গেলো কুয়াশায়,- কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো। তাহারি পাখার হাওয়া প...

জীবনানন্দ দাস

স্থান থেকে

স্থান থেকে স্থানচ্যুত হ'য়ে চিহ্ন ছেড়ে অন্য চিহ্নে গিয়ে ঘড়ির কাঁটার থেকে সময়ের স্নায়ুর স্পন্দন খসিয়ে বিমুক্ত ক'রে তাকে দেখা যায় অবিরল শাদা-কালো সময়ের ফাঁকে সৈকত কেবলই দূর সৈকতে ফুরায় ; পটভূমি বার-বার প...

জীবনানন্দ দাস

স্থবির যৌবন

তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যৃর দূত এসে কহিবেঃতোমারে চাই- তোমারেই,নারী; এইসব সোনা রূপা মসলিন যুবাদের ছাড়ি চ’লে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে। বলিলাম;শুনিল সেঃ’তুমি তবু মৃত্যুর দূত নও-তুমি-‘ ‘নগর-বন্দর ঢের খ...

জীবনানন্দ দাস

স্মৃতি

থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি- বললে, আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি! -যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে, শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে, ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে; তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃ...

জীবনানন্দ দাস

স্বপ্নের হাত

পৃথিবীর বাধা — এই দেহের ব্যাঘাতে হৃদয়ে বেদনা জমে — স্বপনের হাতে আমি তাই আমারে তুলিয়া দিতে চাই। যেই সব ছায়া এসে পড়ে দিনের রাতের ঢেউয়ে — তাহাদের তরে জেগে আছে আমার জীবন; সব ছেড়ে আমাদের মন ধরা দিত যদি এই ...

জীবনানন্দ দাস

স্বপ্নের ধ্বনিরা

ন্বপ্নের ধ্বনিরা এসে বলে যায় : স্থবিরতা সব চেয়ে ভালো; নিস্তব্ধ শীতের রাতে দীপ জ্বেলে অথবা ণিভায়ে দীপ বিছানায় শুয়ে স্থবিরের চোখে যেন জমে ওঠে অন্য কোনো বিকেলের আলো। সেই আলো চিরদিন হয়ে থাকে স্থির, সব ছেড়...

জীবনানন্দ দাস

হঠাৎ তোমার সাথে

হঠাৎ তোমার সাথে কলকাতাতে সে এক সন্ধ্যায় উনিশশো চুয়াল্লিশে দেখা হ’ল- কত লোক যায় তড়াম বাস ট্যাক্সি মোটর জিপ হেঁকে যাদের হৃদয়ে বেশি কথা হাতে কাজ কম- তাদের অনেকে পায়ে হেঁটে চলে যায়। কেবলি ক্লান্তিতে ধুঁকে...

জীবনানন্দ দাস

হায় পাখি একদিন কালীদহে ছিল না কি

হায় পাখি, একদিন কালীদহে ছিল না কি – দহের বাতাসে আষাঢ়ের দু’পহরে কলরব কর নি কি এই বাংলায়! আজ সারাদিন এই বাদলের কোলাহলে মেঘের ছায়ায় চাঁদ সদাগর: তার মধুকর ডিঙাটির কথা মনে আসে, কালীদহে কবে তারা পড়েছিলো একদ...

জীবনানন্দ দাস

হায় চিল

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই মেঘের ভিজে দুপুরে তুমি আর কেঁদো নাকে উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে তোমার কান্নার সূরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ ন...

জীবনানন্দ দাস

হায় চিল

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে! তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে। পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছ...

জীবনানন্দ দাস

হে হৃদয়

হে হৃদয় নিস্তব্ধতা? চারিদিকে মৃত সব অরণ্যেরা বুঝি? মাথার ওপরে চাঁদ চলছে কেবলি মেঘ কেটে পথ খুঁজে- পেঁচার পাখায় জোনাকির গায়ে ঘাসের ওপরে কী যে শিশিরের মতো ধূসরতা দীপ্ত হয় না কিছু? ধ্বনিও হয় না আর? হলুদ দ...

জীবনানন্দ দাস

হেমন্তের রাতে

শীতের ঘুমের থেকে এখন বিদায় নিয়ে বাহিরের অন্ধকার রাতে হেমন্তলক্ষ্মীর সব শেষ অনিকেত অবছায়া তারাদের সমাবেশ থেকে চোখ নামায়ে একটি পাখির ঘুম কাছে পাখিনীর বুকে ডুবে আছে,– চেয়ে দেখি;– তাদের উপরে এই অবিরল কালো...

জীবনানন্দ দাস

হে হৃদয় (অগ্রন্থিত)

হে হৃদয়, একদিন ছিলে তুমি নদী পারাপারহীন এক মোহনায় তরণীর ভিজে কাঠ খুঁজিতেছে অন্ধকার স্তব্ধ মহোদধি। তোমার নির্জন পাল থেকে যদি মরণের জন্ম হয়, হে তরণী, কোনো দূর পীত পৃথিবীর বুকে ফাল্গুনিক তবে ঝরনার জল আজো...

জীবনানন্দ দাস

হেমন্ত

আজ রাতে মনে হয় সব কর্মক্লান্তি অবশেষে কোনো এক অর্থ শুষে গেছে। আমাদের সব পাপ- যদি জীব কোনো পাপ ক’রে থাকে পরস্পর কিংবা দূর নক্ষত্র গুল্ম, গ্যাস, জীবানুর কাছে- হিয়েছে ক্ষয়িত হয়ে। বৃত্ত যেন শুদ্ধতায় নিরুত...

জীবনানন্দ দাস

অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে

অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে নীল বাংলার বনে মাঠে মাঠে ফিরি একা: মনে হয় বাংলার জীবনে সঙ্কট শেষ হয়ে গেছে আজ; — চেয়ে দেখ কতো শত শতাব্দীর বট হাজার সবুজ পাতা লাল ফল বুকে লয়ে শাখার ব্যজনে আকাঙ্খার গান...

জীবনানন্দ দাস

১৩৩৩

তোমার শরীর — তাই নিয়ে এসেছিলে একবার — তারপর — মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন্‌ দিকে জানি নি তা — মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোনদিকে জানি নি তা — হয়েছে মলিন চক্ষু এই...

জীবনানন্দ দাস

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই - প্রীতি নেই - করুণার আলোড়ন নেই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। যাদের গভীর আস্থা আছে ...

জীবনানন্দ দাস

মহাত্মা গান্ধী

অনেক রাত্রির শেষে তারপর এই পৃথিবীকে ভালো ব’লে মনে হয়;—সময়ের অমেয় আঁধারে জ্যোতির তারণকণা আসে, গভীর নারীর চেয়ে অধিক গভীরতর ভাবে পৃথিবীর পতিতকে ভালোবাসে, তাই সকলেরই হৃদয়ের ’পরে এসে নগ্ন হাত রাখে; আমরাও আ...

জীবনানন্দ দাস

অন্য প্রেমিককে

মাছরাঙা চ’লে গেছে — আজ নয় কবেকার কথা; তারপর বারবার ফিরে এসে দৃশ্যে উজ্জল। দিতে চেয়ে মানুষের অবহেলা উপেক্ষায় হ’য়ে গেছে ক্ষয়; বেদনা পেয়েছে তবু মানুষের নিজেরও হৃদয় প্রকৃতির অনির্বচনীয় সব চিহ্ন থে...

জীবনানন্দ দাস

শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন

শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন, বনলতা সেন। কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন, তুমি নাই বনলতা সেন। তোমার মতন কেউ ছিল কি ...

জীবনানন্দ দাস

অনেক মুহূর্ত আমি করেছি ক্ষয়

অনেক মুহূর্ত আমি করেছি ক্ষয় করে ফেলে বুঝছি সময় যদিও অনন্ত, তবু প্রেম যেন অনন্ত নিয়ে নয়। তবু তোমাকে ভালোবেসে মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে বুঝেছি অকূলে জেগে রয় ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয় ।...

জীবনানন্দ দাস

বেড়াল

সারাদিন একটা বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলই আমার দেখা হয় : গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতর, বাদামি পাতার ভিড়ে; কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির ম...

জীবনানন্দ দাস

মরুবালু

হাড়ের মালা গলায় গেঁথে – অট্টহাসি হেসে উল্লাসেতে টলছে তারা,—জ্বলছে তারা খালি ! ঘুরছে তারা লাল মশানে কপাল—কবর ঘেঁসে , বুকের বোমাবারুদ দিয়ে আকাশটারে জ্বালি পাঁয়জোরে কাল মহাকালের পাঁজর ফেড়ে ফেড়ে মড়ার বুকে...

জীবনানন্দ দাস

বেদিয়া

চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি! পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি? উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে, গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে; নয় সে বান্দা রংমহলের, ...

জীবনানন্দ দাস

বিবেকানন্দ

জয়, তরুণের জয়! জয় পুরোহিত আহিতাগ্নিক, জয় জয় চিন্ময়! স্পর্শে তোমার নিশা টুটেছিল, উষা উঠেছিল জেগে পূর্ব তোরণে, বাংলা আকাশে , অরুণ-রঙিন মেঘে; আলোকে তোমার ভারত, ইশয়া-জগৎ গেছিল রেঙে। হে যুবক মুসাফের, স্থবি...

জীবনানন্দ দাস

ফিরে এসো

ফিরে এসো সমুদ্রের ধারে ফিরে এসো প্রান্তরের পথে; যেইখানে ট্রেন এসে থামে আম নিম ঝাউয়ের জগতে ফিরে এসো; একদিন নীল ডিম করেছ বুনন আজও তারা শিশিরে নীরব; পাখির ঝর্ণা হয়ে কবে আমারে করিবে অনুভব!...

জীবনানন্দ দাস

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে অন্য সব সত্য থেকে ছুটি নিয়ে সব জল হয়ে মিশে যেতে চায়; পৃথিবীর চলমান স্পন্দনের বিহবলতায় রণ আছে, রক্ত আছে, রুজি আর রুটি আছে-খাঁটি ভালোবাসা দিতে গিয়ে ত্রুটি হয়ে যায়;অন্ধকারে হৃদয়ের দায় বিমুক্ত ক...

জীবনানন্দ দাস

কাউকে ভালোবেসেছিলাম

কাউকে ভালোবেসেছিলাম জানি তবুও ভালোবাসা, দুপুরবেলার সূর্যে ভোরের শিশির নেমে আসা, ভোরের দিকে হৃদয় ফেরাই যাই চলে যাই- নীল সকালে যাই চলে যাই- একটি নদী একটি অরূণ শিউলি শিশির পাখি- 'আমরা মায়ার মনের জিনিস মা...

জীবনানন্দ দাস

বাতাসের শব্দ এসে

বাতাসের শব্দ এসে কিছুক্ষণ হরিতকী গাছের শাখায় মিথিরিত হয়ে থেমে যায়, তার মৃত্যু হলো বলে। এক পা দুই পা করে দুই-চার মাইল প্রান্তরের সাথে আরো পরিচিত হলে এমনি প্রান্তর থাকে রৌদ্রময়, শব্দবিহীন, যতক্ষণ অপরাহ্...

জীবনানন্দ দাস

মনোবীজ

জামিরের ঘন বন অইখানে রচেছিলো কারা? এইখানে লাগে নাই মানুষের হাত। দিনের বেলায় যেই সমারূঢ় চিন্তার আঘাত ইস্পাতের আশা গড়ে- সেই সব সমুজ্জ্বল বিবরণ ছাড়া যেন আর নেই কিছু পৃথিবীতেঃ এই কথা ভেবে যাহারা রয়েছে ঘুম...

জীবনানন্দ দাস

মকরসংক্রান্তির রাতে

(আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন) কে পাখি সূর্যের থেকে সূর্যের ভিতরে নক্ষত্রের থেকে আরো নক্ষত্রের রাতে আজকের পৃথিবীর আলোড়ন হৃদয়ে জাগিয়ে আরো বড়ো বিষয়ের হাতে সে সময় মুছে ফেলে দিয়ে কি এক গভীর সুসময়...

জীবনানন্দ দাস

ভিখিরী

একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়, একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুরবাগানে, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো--- তবে আমি হেঁটে চ ’লে যাবো মানে মানে । ---ব’ লে সে বাড়ায়ে দিলো অন্ধকারে হাত । আগাগোড়া শরীরটা নিয়ে ...

জীবনানন্দ দাস

মনোসরণি

মনে হয় সমাবৃত হয়ে আছি কোন্‌ এক অন্ধকার ঘরে– দেয়ালের কর্নিশে মক্ষিকারা স্থিরভাবে জানে : এইসব মানুষেরা নিশ্চয়তা হারায়েছে নক্ষত্রের দোষে; পাঁচফুট জমিনের শিষ্টতায় মাথা পেতে রেখেছে আপোষে। হয়তো চেঙ্গিস আজও ...

জীবনানন্দ দাস

বর্ষ-আবাহন

ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে প্রভাত রবি উঠলো জেগে দিব্য পরশ পেয়ে, নাই গগণে মেঘের ছায়া যেন স্বচ্ছ স্বর্গকায়া ভুবন ভরা মুক্ত মায়া মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে। অতীত নিশি গেছে চ'লে চিরবিদায় বার্তা ব'লে...

জীবনানন্দ দাস

১৯৪৬-৪৭

দিনের আলোয় ওই চারিদিকে মানুষের অস্পষ্ট ব্যস্ততা: পথে ঘাটে ট্রাক ট্রাম লাইনে ফুটপাতে; কোথাও পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে-মনে হয়, জলের মতন দামে। সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে র্পৌছুবে সকলের আগে সকলেই তাই। অনেকে...

জীবনানন্দ দাস

ছায়া-প্রিয়া

দুপুর রাতে ও কার আওয়াজ গান কে গাহে, গান না! কপোতবধূ ঘুমিয়ে আছে নিঝুম ঝিঁঝির বুকের কাছে; অস্তচাঁদের আলোর তলে এ কার তবে কান্না! গান কে গাহে, গান না! সার্সি ঘরের উঠছে বেজে উঠছে কেঁপে পর্দা! বাতাস আজি ঘুম...

জীবনানন্দ দাস

আট বছর আগের এক দিন

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ মরিবার হল তার সাধ। বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিল; প্রেম ছিল,আশা ছিল-জোৎসনায়,-তবে সে দেখিল কোন ...

জীবনানন্দ দাস

অনির্বাণ

সর্বদাই এরকম নয়, তবু মাঝে মাঝে মনে হয় কোন দূর উত্তরসাগরে কোনো ঢেউ নেই; তুমি আর আমি ছাড়া কেউ সেখানে ঢোকার পথ হারিয়ে ফেলেছে নেই নীলকণ্ঠ পাখিদের ডানা গুঞ্জরণ ভালোবেসে আমাদের পৃথিবীর এই রৌদ্র; কলকাতার আকা...

জীবনানন্দ দাস

মনোকণিকা

ও. কে. একটি বিপ্লবী তার সোনা রুপো ভালোবেসেছিলো; একটি বণিক আত্মহত্যা করেছিলো পরবর্তী জীবনের লোভে; একটি প্রেমিক তার মহিলাকে ভালোবেসেছিলো; তবুও মহিলা প্রীত হয়েছিলো দশজন মূর্থের বিক্ষোভে। বুকের উপরে হাত ...

জীবনানন্দ দাস

ঐখানে সারা দিন

ঐখানে সারা দিন উঁচু ঝাউবন খেলা করে হলদে সবুজ নীল রঙ্গ তার বুকে; পাখি মেঘ রৌদ্রের; তবু আজও হদয়ের গভীর অসুখে মানবেরা পড়ে আছে কেন। আজ অন্ধ শতাব্দীর শতচ্ছিদ্রতার ভিতর আলোর খোঁজে যদি চলে যায় তবুও শাশ্বত হয়...

জীবনানন্দ দাস

অনন্দা

এই পৃথিবীর এ এক শতচ্ছিদ্র নগরী। দিন ফুরুলে তারার আলো খানিক নেমে আসে। গ্যাসের বাতি দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বাতাসে। দ্রুতগতি নরনারীর ক্ষণিক শরীর থেকে উৎসারিত ছায়ার কালো ভারে আঁধার আলোয় মনে হ’তে পারে এ-সব দেয়...

জীবনানন্দ দাস

অনন্ত জীবন যদি পাই আমি

অনন্ত জীবন যদি পাই আমি তাহ’লে অনন্তকাল একা পৃথিবীর পথে আমি ফিরি যদি দেখিবো সবুজ ঘাস ফুটে উঠে দেখিবো হলুদ ঘাস ঝরে যায় দেখিবো আকাশ শাদা হয়ে উঠে ভোরে- ছেঁড়া মুনিয়ার মত রাঙা রক্ত—রেখা লেগে থাকে বুকে তার স...

জীবনানন্দ দাস

অনেক আকাশ

গানের সুরের মতো বিকালের দিকের বাতাসে পৃথিবীর পথ ছেড়ে — সন্ধ্যার মেঘের রঙ খুঁজে হৃদয় ভাসিয়া যায় — সেখানে সে কারে ভালোবাসে! — পাখির মতন কেঁপে — ডানা মেলে — হিম চোখ বুজে অধীর পাতার মতো পৃথিবীর মাঠের সবুজ...

জীবনানন্দ দাস

আজ

অন্ধ সাগরের বেগে উৎসারিত রাত্রির মতন আলোড়ন মানুষের প্রিয়তর দিক নির্ণয়ের পথ আজ প্রতিহত; তবুও কোথাও নির্মল সন্ততি দেশ সময়ের নব নব তীর- পেতে পায়ে হয়তো বা মানব হৃদয়; মহাপতনের দিনে আজ অবহিত হয়ে নিতে হয়। যদ...

জীবনানন্দ দাস

অঘ্রাণ প্রান্তরে

‘জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ আমাকে খোঁজে না আর পৃথিবীর’ পরে- বলে চুপে থামলাম, কেবলি অশত্থ পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে শুকনো মিয়োনো ছেঁড়া;- অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে; সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে হেমন...

জীবনানন্দ দাস

অনিবার

যেখানে রয়েছে আলো পাহাড় জলের সমবায়- তবুও সেখানে যদি আবিষ্কার করি প্যারাফিন অনেক মাটির নীচে,- অথবা সেখানে যদি সংগ্রাম-বিলীন অজস্র অস্পষ্ট মুণ্ড অনুকম্পা হৃদয়ে জাগায়, তাহ'লে প্রভাত এলে মনিয়া পাখিরা পিছে ...

জীবনানন্দ দাস

অদ্ভুত আঁধার এক

অদ্ভুত আঁধার এক আসিয়াছে পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষে...

জীবনানন্দ দাস

অন্ধকারে জলের কোলাহল

বিকেলবেলা গড়িয়ে গেলে অনেক মেঘের ভিড় কয়েক ফলা দীর্ঘতম সূর্যকিরণ বুকে জাগিয়ে তুলে হলুদ নীল কমলা রঙের আলোয় জ্বলে উঠে ঝরে গেল অন্ধকারের মুখে। যুবারা সব যে যার ঢেউয়ে- মেয়েরা সব যে যার প্রিয়ের সাথে কোথায় আছ...

জীবনানন্দ দাস

অনুসূর্যের গান

কোনো এক বিপদের গভীর বিস্ময় আমাদের ডাকে। পিছে-পিছে ঢের লোক আসে। আমরা সবের সাথে ভিড়ে চাপা প’ড়ে- তবু- বেঁচে নিতে গিয়ে জেনে বা না-জেনে ঢের জনতাকে পিষে- ভিড় ক’রে, করুণার ছোট বড় উপকন্ঠে- সাহসিক নগরে বন্দরে ...

জীবনানন্দ দাস

অন্ধকার থেকে

গাঢ় অন্ধকার থেকে আমরা এ-পৃথিবীর আজকের মুহূর্তে এসেছি। বীজের ভেতর থেকে কী ক’রে অরণ্য জন্ম নেয়,- জলের কণার থেকে জেগে ওঠে নভোনীল মহান সাগর, কী ক’রে এ-প্রকৃতিতে—পৃথিবীতে, আহা, ছায়াচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে মানব ...

জীবনানন্দ দাস

অনেক রাত্রিদিন

অনেক রাত্রিদিন ক্ষয় ক'রে ফেলে এখন এসেছি এক উৎসের ভিতরে; মাঠের উপরে ক্রমে ছায়া নেমে আসে, দু-চারটে উঁচু গাছ রোদে খেলা করে। পৃথিবী রক্তপাত অশান্তি এখন; অর্থময়তা তবু পেতে পারে মন। কেউ নেই - শুধু এই মননের ...

জীবনানন্দ দাস

অন্ধকার

গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে । ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম- পউষের রাতে...

জীবনানন্দ দাস

অনেক মৃত বিপ্লবী স্মরণে

তারা সব মৃত । ইতিহাসে তবুও তাদের কেবলি বাঁচার প্রয়োজন ব’লে তাদের উত্তর অধিকার কোনো কোনো মানবের হাতে আসে। তারা ম’রে গেছে। সবারই জীবনে আলো প্রয়োজন জেনে সকলের জন্যে স্পষ্ট পরিমিত সূর্য পেতে গিয়ে তবুও বিল...

জীবনানন্দ দাস

অবশেষে

এখানে প্রশান্ত মনে খেলা করে উঁচু উঁচু গাছ। সবুজ পাতার ‘পরে যখন নেমেছে এসে দুপুরের সূর্যের আঁচ নদীতে স্মরণ করে একবার পৃথিবীর সকালবেলাকে। আবার বিকলে হলে অতিকায় হরিণের মতো শান্ত থাকে এই সব গাছগুলো, -যেন ...

জীবনানন্দ দাস

অবরোধ

বহুদিন আমার এ-হৃদয়কে অবরোধ ক’রে র’য়ে গেছে; হেমন্তের স্তব্ধতায় পুনরায় ক’রে অধিকার। কোথায় বিদেশে যেন এক তিল অধিক প্রবীণ এক নীলিমায় পারে তাহাকে দেখিনি আমি ভালো ক’রে,- তবু মহিলার মনন-নিবিড় প্রাণ কখন আমার ...

জীবনানন্দ দাস

আদিম

প্রথম মানুষ কবে এসেছিল এই সবুজ মাঠের ফসলের উৎসবে! দেহ তাহাদের এই শস্যের মতো উঠেছিল। ফলে, এই পৃথিবীর ক্ষেতের কিনারে, সবজির কোলে কোলে এসেছিল তারা ভোরের বেলায় রৌদ্র পোহাবে ব’লে— এসেছিল তারা পথ ধরে এই জলে...

জীবনানন্দ দাস

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে-আসিয়াছে শান- অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে; আমার চোখের পরে ...

জীবনানন্দ দাস

উত্তরসাময়িকী

আকাশের থেকে আলো নিভে যায় ব’লে মনে হয়। আবার একটি দিন আমাদের মৃগতৃষ্ণার মতো পৃথিবীতে শেষ হয়ে গেল তবে;— শহরের ট্রাম উত্তেজিত হয়ে উঠে সহজেই ভবিতব্যতার যাত্রীদের বুকে নিয়ে কোন্‌ এক নিরুদ্দেশ কুড়োতে চলেছে। ...

জীবনানন্দ দাস

অস্তচাঁদে

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী! -অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী, নিঝ্ঝুম বিছানার পরে মেঘবৌ'র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,- চেয়ে থাকি চোখ তুলে'-যেন মোর পলাতকা প...

জীবনানন্দ দাস

অভিভাবিকা

তবুও যখন মৃত্যু হবে উপস্থিত আর-একটি প্রভাতের হয়তো বা অন্যতর বিস্তীর্ণতায়,- মনে হবে অনেক প্রতীক্ষা মোরা ক'রে গেছি পৃথিবীতে চোয়ালের মাংস ক্রমে ক্ষীণ ক'রে কোনো এক বিশীর্ণ কাকের অক্ষি-গোলকের সাথে আঁখি-তার...

জীবনানন্দ দাস

আকাশে চাঁদের আলো

১ আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ বাতাসে ঘুঘুর ডাক—অশত্থে ঘুঘুর ডাক—হৃদয়ে ঘুঘু যে ডাকে—নরম ঘুঘুর ডাক আজ তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার...

জীবনানন্দ দাস

আজকে রাতে

আজকে রাতে তোমায় কাছে আমার কাছে পেলে কথা বলা যেত; চারিদিকে হিজল শিরীষ নক্ষত্র ঘাস হাওয়ার প্রান্তর। কিন্তু যেই নীট নিয়মে ভাবনা আবেগ ভাব বিশুদ্ধ হয় বিষয় ও তার যুক্তির ভিতর; আমিও সেই ফলাফলের ভিতরে থেকে গি...

জীবনানন্দ দাস

আজকের এক মুহূর্ত

হে মৃত্যু, তুমি আমাকে ছেড়ে চলেছো ব’লে আমি খুব গভীর খুশি? কিন্তু আরো-খানিকটা চেয়েছিলাম; চারিদিকে তুমি হাড়ের পাহাড় বানিয়ে রেখেছো;- যে-ঘোড়ায় চ’ড়ে আমি অতীত-ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাবো এইখানে মৃতব...

জীবনানন্দ দাস

আজ তারা কই সব

আজ তারা কই সব? ওখানে হিজল গাছ ছিল এক — পুকুরের জলে বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার; তারপর কি যে তার মনে হল কবে কখন সে ঝরে গেল, কখন ফুরাল, আহা, — চলে গেল কবে যে নীরবে, তাও আর জানি নাকো; ঠোট ভাঙা দাঁড়কাক ঐ বেল...

জীবনানন্দ দাস

আবার আসিব ফিরে

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে - এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় - হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়; হয়তো বা ...

জীবনানন্দ দাস

আদিম দেবতারা

আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে তোমাকে দিলো রূপ- কী ভয়াবহ নির্জন রূপ তোমাকে দিলো তারা; তোমার সংস্পর্শের মানুষদের রক্তে দিলো মাছির মতো কামনা৷ আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কি...

জীবনানন্দ দাস

আমাকে একটি কথা দাও

আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতো সহজ মহৎ বিশাল, গভীর; – সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভুকদের রক্তে মলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন, আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারীর। সেই রাত্রির নক্ষত...

জীবনানন্দ দাস

কত ভোরে- দু’-পহরে

কত ভোরে- দু’-পহরে – সন্ধ্যায় দেখি নীল শুপুরির বন বাতাসে কাঁপিছে ধীরে;- খাঁচার শুকের মতো গাহিতেছে গান কোন এক রাজকন্যা- পরনে ঘাসের শাড়ি- কালো চুলে ধান বাংলার শালিধান- আঙিনায় ইহাদের করেছে বরণ, হৃদয়ে জলের...

জীবনানন্দ দাস

ওগো দরদিয়া

-ওগো দরদিয়া তোমারে ভুলিবে সবে, যাবে সবে তোমারে ত্যজিয়া; ধরণীর পসরায় তোমারে পাবে না কেহ দিনান্তেও খুঁজে কে জানে রহিবে কোথা নিশিভারে নেশাখোর আঁখি তব বুজে! -হয়তো সিন্ধুর পারে শ্বেতশঙ্খ ঝিনুকের পাশে তোমার...

জীবনানন্দ দাস

কয়েকটি লাইন

কেউ যাহা জানে নাই কোনো এক বাণী – আমি বহে আনি; একদিন শুনেছ যে সুর – ফুরায়েছে পুরনো তা — কোনো এক নতুন কিছুর আছে প্রয়োজন, তাই আমি আসিয়াছি, আমার মতন আর নাই কেউ! সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে আমি এক ঢেউ আজিকার: শেষ...

জীবনানন্দ দাস

কার্তিক ভোরে : ১৩৪০

কার্তিকের ভোরবেলা কবে চোখে মুখে চুলের উপরে যে- শিশির ঝরলো তা শালিখ ঝরালো ব'লে ঝরে আমলকী গাছ ছুঁয়ে তিনটি শালিখ কার্তিকের রোদে আর জলে আমারি হৃদয় দিয়ে চেনা তিন নারীর মতন সূর্য? না কি সূর্যের চপ্পলে পা গল...

জীবনানন্দ দাস

কবি

ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপনে! নিরালায় সুর সাথি, বাঁধি মোর মানসীর বেণী, মানুষ দেখে নি মোরে কোনোদিন, আমারে চেনে নি! কোনো ভিড় কোনোদিন দাঁড়ায় নি মোর ...

জীবনানন্দ দাস

কার্তিক মাঠের চাঁদ

জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ — পাহাড়ের মতো অই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতে আকাশে যখন তোমারে! — মৃত কে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে! ছেঁড়া ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চলে তরাসে ছেলের মতো– আকাশে...

জীবনানন্দ দাস

কুড়ি বছর পরে

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা যদি হয় আবার বছর কুড়ি পরে- হয়তো ধানের ছড়ার পাশে কার্তিকের মাসে- তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী নরম নরম শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে ! অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর, ব্...

জীবনানন্দ দাস

কিশোরের প্রতি

যৌবনের সুরাপাত্র গরল-মদির ঢালো নি অধরে তব, ধরা-মোহিনীর উর্ধ্বফণা মায়া-ভুজঙ্গিনী আসে নি তোমার কাম্য উরসের পথটুকু চিনি চুমিয়া চুমিয়া তব হৃদয়ের মধু বিষবহ্নি ঢালে নিকো বাসনার বধূ অন্তরের পানপাত্রে তব; অম্...

জীবনানন্দ দাস

কার্ত্তিকের ভোর - ১৩৫০

চারিদিকে ভাঙনের বড় শব্দ, পৃথিবী ভাঙার কোলাহল; তবুও তাকালে সূর্য পশ্চিমের দিকে অস্ত গেলে,... চাঁদের ফসল পূবের আকাশে হৃদয় বিহীনভাবে আন্তরিকতা ভালবাসে। তেরোশো পঞ্চাশ সালে কার্ত্তিকের ভোর; সূর্যালোকিত সব ...

জীবনানন্দ দাস

কোনো এক ব্যথিতাকে

এখন অনেক রাতে বিছানা পেয়েছ। নরম আঁধার ঘর শান্তি নিস্তব্ধতা; এখন ভেবো না কোনো কথা এখন শোনো না কোনো স্বর রক্তাক্ত হৃদয় মুছে ঘুমের ভিতর রজনীগন্ধার মতো মুদে থাকো।...

জীবনানন্দ দাস

কোথায় গিয়েছে

কোথায় গিয়েছে আজ সেইসব পাখি-আর সেইসব ঘোড়া- সেই শাদা দালানের নারী? বাবলা ফুলের গন্ধে-সোনালি রোদের রঙ্গে ওড়া সেইসব পাখি-আর সেইসব ঘোড়া চলে গেছে আমাদের এ পৃথিবী ছেড়ে; হৃদয় কোথায় বলো-কোথায় গিয়েছে আজ সব অন্ধ...

জীবনানন্দ দাস

কোথাও দেখি নি

কোথাও দেখি নি, আহা, এমন বিজন ঘাস — প্রান্তরের পারে নরম বিমর্ষ চোখে চেয়ে আছে– নীল বুকে আছে তাহাদের গঙ্গাফরিঙের নীড়,কাঁচপোকা, প্রজাপতি শ্যামাপোকা ঢের, হিজলের ক্লান্ত পাতা– বটের অজস্র ফল ঝরে বারে বারে তা...

জীবনানন্দ দাস

কোথাও মঠের কাছে

কোথাও মঠের কাছে — যেইখানে ভাঙা মঠ নীল হয়ে আছে শ্যাওলায় — অনেক গভীর ঘাস জমে গেছে বুকের ভিতর, পাশে দীঘি মজে আছে — রূপালী মাছের কন্ঠে কামনার স্বর যেইখানে পটরানী আর তার রূপসী সখীরা শুনিয়াছে বহু বহু দিন আগ...

জীবনানন্দ দাস

গতিবিধি

সর্বদাই প্রবেশের পথ র'য়ে গেছে; এবং প্রবেশ ক'রে পুনরায় বাহির হবার;- অরণ্যের অন্ধকার থেকে এক প্রান্তরের আলোকের পথে; প্রান্তরের আলো থেকে পুনরায় রাত্রির আঁধারে; অথবা গৃহের তৃপ্তি ছেড়ে দিয়ে নারী, ভাঁড়, মক্...

জীবনানন্দ দাস

ক্যাম্পে

এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি; সারারাত দখিনা বাতাসে আকাশের চাঁদের আলোয় এক ঘাইহরিণীর ডাকে শুনি – কাহারে সে ডাকে! কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার; বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে, আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই য...

জীবনানন্দ দাস

খুঁজে তারে মরো মিছে

খুঁজে তারে মরো মিছে — পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর; রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে — তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক নাই আর; — অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক দাঁড়কাক দেখা যেত দিন-রাত, — সে আমার ছেলেবেলাকার...

জীবনানন্দ দাস

ক্ষেতে প্রান্তরে

ঢের সম্রাটের রাজ্যে বাস ক'রে জীব অবশেষে একদিন দেখেছে দু-তিন ধনু দূরে কোথাও সম্রাট নেই, তবুও বিপ্লবী নেই, চাষা বলদের নিঃশব্দতা ক্ষেতের দুপুরে। বাংলার প্রান্তরের অপরাহ্ন এসে নদীর খাড়িতে মিশে ধীরে বেবিলন...

জীবনানন্দ দাস

গুবরে ফড়িং শুধু উড়ে যায় আজ

গুবরে ফড়িং শুধু উড়ে যায় আজ এই সন্ধ্যার বাতাসে, খড়কুটা ঝড়ে শুধু শাইকের মুখ থেকে চুপে। আবার শালিখা, সেই খড়গুনো কুড়ায় নিশ্চুপে। সন্ধ্যার লাল শিরা মৃদু চোখে ঘরে ফিরে আসে ঘুঘুর নরম ডাকে—নীরব আকাশে নক্ষত্রে...

জীবনানন্দ দাস

গোধূলি সন্ধির নৃত্য

দরদালানের ভিড়- পৃথিবীর শেষে যেইখানে প'ড়ে আছে- শব্দহীন- ভাঙ্গা- সেইখানে উঁচু-উঁচু হরীতকী গাছের পিছনে হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল- রাঙা- চুপে-চুপে ডুবে যায়- জ্যোৎস্নায়। পিপুলের গাছে ব'সে পেঁচা শুধু একা চ...

জীবনানন্দ দাস

ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে

ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে শিয়রে বৈশাখ মেঘ-শাদা-শাদা যেন কড়ি-শঙ্খের পাহাড় নদীর ওপার থেকে চেয়ে রবে- কোনো এক শঙ্খবালিকার ধূসর রূপের কথা মনে হবে-এই আম জামের ছায়াতে কবে যেন তারে আমি দেখি...

জীবনানন্দ দাস

ঘরের ভিতরে দীপ জ্বলে ওঠে সন্ধ্যায়

ঘরের ভিতরে দীপ জ্বলে ওঠে সন্ধ্যায়—ধীরে ধীরে বৃষ্টি ক্ষান্ত হয় ভিজে চালে ডুমুরের পাতা ঝরে—শালিখ বসিয়া থাকে মুহূর্ত সময় জানালার কাছে এসে, ভিজে জানালার কাছে মৌমাছি বহুক্ষণ মৃদু গুমরায় এইসব ভালো লাগে : এই...

জীবনানন্দ দাস

গোলপাতা ছাউনির বুক চুমে

গোলপাতা ছাউনির বুক চুমে নীল ধোঁয়া সকালে সন্ধ্যায় উড়ে যায়- মিশে যায় আমবনে কার্তিকের কুয়াশার সাথে; পুকুরের লাল সর ক্ষীণ ঢেউয়ে বার-বার চায় সে জড়াতে করবীর কচি ডাল; চুমো খেতে চায় মাছরাঙাটির পায়; এক-একটি ইট...

জীবনানন্দ দাস

ধান কাটা হয়ে গেছে

ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন – ক্ষেতে মাঠে পড়ে আছে খড় পাতা কুটো ভাঙা ডিম – সাপের খোলস নীড় শীত। এই সব উৎরায়ে ঐখানে মাঠের ভিতর ঘুমাইতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ – কেমন নিবিড়। ঐখানে একজন শুয়ে আছে- দিনরাত দেখা ...

জীবনানন্দ দাস

ঘাসের ভিতরে সেই চড়ায়ের শাদা ডিম

ঘাসের ভিতরে সেই চড়ায়ের শাদা ডিম ভেঙে আছে — আমি ভালোবাসি নিস্তব্ধ করুণ মুখ তার এই — কবে যেন ভেঙেছিল — ঢের ধুলো খড় লেগে আছে বুকে তার — বহুক্ষণ চেয়ে থাকি; — তারপর ঘাসের ভিতর শাদা শাদা ধুলোগুলো পড়ে আছে, দ...

জীবনানন্দ দাস

ঘাস

কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয় পুথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা; কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস-তেমনি সুঘ্রাণ- হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিড়ে নিচ্ছে। আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গেলাসে – গেলাস...

জীবনানন্দ দাস

ঘাটশিলা—ঘটশিলা—

ঘাটশিলা—ঘটশিলা— কলকাতা ছেড়ে বল ঘাটশিলা কে যায় মিছাই চিরদিন কলতাকা থাকি আমি, ঘাটশিলা ছাই। চিঠির উপরে তবু চিঠি কয়েকটা দিন এইখানে এসে তুমি থেকে যাও চিঠিগুনো হয়ে গেল পুরোনো মলিন তবু আমি গেলাম না যদিও দেখে...

জীবনানন্দ দাস

আবহমান

পৃথিবী এখন এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম। সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হ’য়ে যেন আসে; যদিও আকাশ সিন্ধু ভ’রে গেল অগ্নির উল্লাসে; যেমন যখন বিকেলবেলা কাটা হয় ক্ষেতের গোধূম চিলের কান্নার মতো শব্দ ক’রে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ...

জীবনানন্দ দাস

নদী

বঁইচির ঝোপ শুধু — শাঁইবাবলার ঝাড়–আর জাম হিজলের বন– কোথাও অর্জুন গাছ–তাহার সমস্ত ছায়া এদের নিকটে টেনে নিয়ে কোন কথা সারাদিন কহিতেছে অই নদী?–এ নদী কে?–ইহার জীবন হৃদয়ে চমক আনে;যেখানে মানুষ নাই–নদী শুধু–সে...

জীবনানন্দ দাস

দেশবন্ধু

বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা অশান্ত সন্তান ওগো, বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদীমাতা। কাল বৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইতে রক্তপুঞ্জ তব উত্তাল ঊর্মির তালে-বক্ষে তবু লক্ষ কোটি পন্নগ-উৎসব উদ্যত ফ...

জীবনানন্দ দাস

ঘোড়া

আমরা যাইনি ম’রে আজো- তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয় : মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জোৎস্নার প্রান্তরে; প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনও ঘাসের লোভে চরে পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর 'পরে। আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে...

জীবনানন্দ দাস

ঘোড়া

আমরা যাইনি মরে আজও - তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়: মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে; প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন - এখনও ঘাসের লোভে চরে পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর 'পরে। আস্তাবলের ঘ্রা...

জীবনানন্দ দাস

উদয়াস্ত

পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থেকে যখন হয়েছে পূর্ণ সময়ের অভিপ্রায়- আগাগোড়া জীবনের দিক চেয়ে কে আবার আয়ু চায়? যদিও চোখের ঘুম ভুলে গিয়ে মননের অহঙ্কারে চর্বি জ্বালায় অপ্রেমিক, কোনো কিছু শেষ সত্য জেনে নেবে বিষয়ের...

জীবনানন্দ দাস

আমি হাত প্রসারিত করে দেই

আমি হাত প্রসারিত ক'রে দেই বায়ুর ভিতরে, অনেক জীবাণূ এসে রোমকূপে জমে- এই এক আলোড়ন রয়ে গেছে পৃথিবীতে। মানুষের অন্তরেও এ- রকম; কোনো এক রমনীকে দেখে প্রীতি, কোনো জননায়কের অবয়ব দেখে বিস্ময়, কোনো বিষয়ীর জানুর...

জীবনানন্দ দাস

আলেয়া

প্রান্তরের পারে তব তিমিরের খেয়া নীরবে যেতেছে দুলে নিদালি আলেয়া! -হেথা, গৃহবাতায়নে নিভে গেছে প্রদীপের শিখা, ঘোমটায় আঁখি ঘেরি রাত্রি-কুমারিকা চুপে চুপে চলিতেছে বনপথ ধরি! আকাশের বুকে বুকে কাহাদের মেঘের গ...

জীবনানন্দ দাস

আলোক পত্র

হে নদী আকাশ মেঘ পাহাড় বনানী, সৃজনের অন্ধকার অনির্দেশ উৎসের মতন আজ এই পৃথিবীতে মানুষের মন মনে হয়; অধঃপতিত এক প্রাণী। প্রেম তার সব চেয়ে ছায়া, নিরাধার নিঃস্বতায়- অকৃত্রিম আগুনের মত নিজেকে না চিনে আজ রক্ত...

জীবনানন্দ দাস

আলোপৃথিবী

ঢের দিন বেঁচে থেকে দেখেছি পৃথিবীভরা আলো তবুও গভীর গ্লানি ছিল কুরুবর্ষে রোমে ট্রয়ে; উত্তরাধিকার ইতিহাসের হৃদয়ে বেশি পাপ ক্রমেই ঘনালো। সে গরল মানুষ ও মনীষীরা এসে হয়তো বা একদিন ক’রে দেবে ক্ষয়; আজ তবু কন্...

জীবনানন্দ দাস

ইতিবৃত্ত

একদিন কোন এক আঞ্জির গাছের ডালে সকালের রোদের ভিতর সোনালি সবুজ এক ডোরাকাটা রাক্ষুসে মাকড়কে আমি একটি মিহিনসুতো নিয়ে দুলে নির্জন বাতাসে দেখেছি স্বর্গের থেকে পৃথিবীর দিকে এল নেমে, পৃথিবীর থেকে ক্রমে চলে গে...

জীবনানন্দ দাস

আশা ভরসা

ইতিহাসপথ বেয়ে অবশেষে এই শতাব্দীতে মানুষের কাজ আশায় আলোয় শুরু হয়েছিল বুঝি- শুভ্র কথা বলা হতেছিল;- রৌদ্রে জলে ভালোলেগেছিল শরীরকে- জীবনকে। কিন্তু তবু সবি প্রিয় মানুষের হাতে অপ্রিয় প্রহার হয়ে মূল্যহীন মান...

জীবনানন্দ দাস

ইহাদেরি কানে

একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে – একবার বেদনার পানে অনেক কবিতা লিখে চলে গেলো যুবকের দল; পৃথিবীর পথে-পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে শুনিল আধেক কথা – এই সব বধির নিশ্চল সোনার পিত্তল মূর্তি: তবু, আহা, ইহাদেরি কান...

জীবনানন্দ দাস

ইতিহাসযান

সেই শৈশবের থেকে এ-সব আকাশ মাঠ রৌদ্র দেখেছি; এই সব নক্ষত্র দেখেছি। বিস্ময়র চোখে চেয়ে কতবার দেখা গেছে মানুষের বাড়ি রোদের ভিতরে যেন সমুদ্রের পারে পাখিদের বিষণ্ণ শক্তির মতো আয়োজনে নির্মিত হতেছে; কোলাহলে-ক...

জীবনানন্দ দাস

উদয়াস্ত (অগ্রন্থিত)

সূর্যের উদয় সহসা সমস্ত নদী চমকিত ক'রে ফেলে- অকস্মাৎ দ্যাখা দিয়ে- চ'লে যায়; হাড়ের ভিতরে মেঘেদের অন্ধকার; স্তম্ভিত বন্ধুর মতো ভোর এইখানে সাধু রাত্রির হাত ধ'রে তাকে শ্রেয়তর চালানির মূল জেনে নিখিলের- মৃত ...

জীবনানন্দ দাস

এই কি সিন্ধুর হাওয়া

এই কি সিন্ধুর হাওয়া? রোদ আলো বনানীর বুকের বাতাস কোথায় গভীর থেকে আসে! অগণন পাখী উড়ে চ'লে গেলে তবু নীলাকাশ কথা বলে নিজের বাতাসে। রাঙা মেঘ- আদি সূর্য- স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবহার সব ফুরিয়ে গিয়েছে কত দূরে। ...

জীবনানন্দ দাস

এই জল ভালো লাগে

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে ধুয়েছে আমার দেহ — বুলায়ে দিয়েছে চুল — চোখের উপরে তার শান — স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, — আবেগের ভরে ঠোঁটে এসে চুমা দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে; এ...

জীবনানন্দ দাস

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি — আমি হৃষ্ট কবি আমি এক; — ধুয়েছি আমার দেহ অন্ধকারে একা একা সমুদ্রের জলে; ভালোবাসিয়াছি আমি রাঙা রোদ, ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে — ঘাসের আঁচলে ফড়িঙের মতো আমি বেড়ায়েছি ...

জীবনানন্দ দাস

এই সব

বারবার সেই সব কোলাহল সমারোহ রীতি রক্ত,- ক্লান্তি লাগে যেন; তাহারা অনেক জানে- এই দূর মাঠে আমি খুঁজি নাকো জীবনের মানে শুধু এই মাঠ- রাত- আমারে ডেকেছে, আহা, বলেছি- 'যাবোনা আর'- কেন কেন যাবো? এই ধুলো গাভী ...

জীবনানন্দ দাস

এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে

এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে – সবচেয়ে সুন্দর করুণ : সেখানে সবুজ ডাঙা ভ’রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল; সেখানে গাছের নাম : কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল; সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগিছে অরুণ; সেখানে ...

জীবনানন্দ দাস

এইসব ভাল লাগে

(এই সব ভালো লাগে) : জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের সোনালি রোদ এসে আমারে ঘুমাতে দেখে বিছানায়,—আমার কাতর চোখ, আমার বিমর্ষ ম্লান চুল – এই নিয়ে খেলা করে: জানে সে যে বহুদিন আগে আমি করেছি কি ভুল পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষ...

জীবনানন্দ দাস

এই সব দিনরাত্রি

মনে হয় এর চেয়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ভালো । এইখানে পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারার-দেশে এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে তাদের সম্রাট নেই,সেনাপতি নেই; - তাদের হৃদয়ে কোনো সভাপতি নেই; শরীর বিবশ হ’লে অবশেষ...

জীবনানন্দ দাস

এইখানে সূর্যের

এইখানে সূর্যের ততদূর উজ্জ্বলতা নেই। মানুষ অনেক দিন পৃথিবীতে আছে। 'মানুষের প্রয়াণের পথে অন্ধকার ক্রমেই আলোর মতো হ’তে চায়;'- ওরা বলে, ওরা আজো এই কথা ভাবে। একদিন সৃষ্টির পরিধি ঘিরে কেমন আশ্চর্য এক আভা দে...

জীবনানন্দ দাস

একদিন কুয়াশার এই মাঠে

একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি; হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন — গিয়েছে যে শান — হিম ঘরে, অথবা সান্ত্বনা পেতে দেরি হবে কিছু কাল — পৃথিবীর এই মাঠখানি ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছু দিন, এ...

জীবনানন্দ দাস

একটি পুরোনো কবিতা

আমরা মৃত্যুর দিকে জেগে উঠে দেখি চারিদিকে ছায়া ভরা ভিড় কুলোর বাতাসে উড়ে ক্ষুদের মতন পেয়ে যায়- পেয়ে যায়- অণুপরমাণুর শরীর একটি কি দু’টি মুখ- তাদের ভিতরে যদিও আমি দেখিনি কোনোদিন- তবুও বাতাসে প্রথম ...

জীবনানন্দ দাস

একদিন এই দেহ ঘাস

একদিন এই দেহ ঘাস থেকে ধানের আঘ্রাণ থেকে এই বাংলায় জেগেছিল; বাঙালী নারীর মুখ দেখে রূপ চিনেছিলো দেহ একদিন; বাংলার পথে পথে হেঁটেছিলো গাঙচিল শালিখের মতন স্বাধীন; বাংলার জল দিয়ে ধূয়েছিল ঘাসের মতন স্ফুট দেহ...

জীবনানন্দ দাস

একটি নক্ষত্র আসে

একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ’লে ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে সে আসবে মনে হয়; – আমার দুয়ার অন্ধকারে কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে! হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে সকল সমুদ্র স...

জীবনানন্দ দাস

একদিন যদি আমি

একদিন যদি আমি কোনো দূর বিদেশের সমুদ্রের জলে ফেনার মতন ভাসি শীত রাতে — আসি নাকো তোমাদের মাঝে ফিরে আর — লিচুর পাতার ‘পরে বহুদিন সাঁঝে যেই পথে আসা-যাওয়া করিয়াছি, — একদিন নক্ষত্রের তলে কয়েকটা নাটাফল তুলে ...

জীবনানন্দ দাস

একদিন পৃথিবীর পথে

একদিন পৃথিবীর পথে আমি ফেলিয়াছি, আমার শরীর নরম ঘাসের পথে হাঁটিয়াছে; বসিয়াছে ঘাসে দেখিয়াছে নক্ষত্রের জোনাকিপোকার মতো কৌতুকের অমেয় আকাশে খেলা করে; নদীর জলের গন্ধে ভরে যায় ভিজে স্নিগ্ধ তীর অন্ধকারে; পথে প...

জীবনানন্দ দাস

চলছি উধাও

চলছি উধাও, বল্গাহারা- ঝড়ের বেগে ছুটে শিকল কে সে বাঁধছে পায়ে! কোন্‌ সে ডাকাত ধরছে চেপে টুটি! -আঁধার আলোর সাগরশেষে প্রেতের মতো আসছে ভেসে! আমার দেহের ছায়ার মতো, জড়িয়ে আছে মনের সনে, যেদিন আমি জেগেছিলাম, স...

জীবনানন্দ দাস

চক্ষুস্থির

ক্লান্ত জনসাধারণ আমি আজ,- চিরকাল;- আমার হৃদয়ে পৃথিবীর দণ্ডীদের মত পরিমিত ভাষা নেই। রাত্রিবেলা বহুক্ষণ মোমের আলোর দিকে চেয়ে, তারপর ভোরবেলা যদি আমি হাত পেতে দিই সূর্যের আলো দিকে,- তবুও আমার সেই একটি ভাব...

জীবনানন্দ দাস

এখানে নক্ষত্রে ভ'রে

এখানে নক্ষত্রে ভ'রে রয়েছে আকাশ, সারাদিন সূর্য আর প্রান্তরের ঘাস; ডালপালা ফাঁক ক'রে উঁচু -উঁচু গাছে নীলিমা সিঁড়ির মতো সোজা, আঁকাবাঁকা হ'য়ে আছে যে যাবে- যে যেতে পারে তার; নিচে রোদের ভিতরে অনেক জলের শব্...

জীবনানন্দ দাস

কেমন বৃষ্টি ঝরে

কেমন বৃষ্টি ঝরে—মধুর বৃষ্টি ঝরে—ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরে—রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ কেমন সবুজ পাতা—জামীর সবুজ আরও—ঘাস যে হাসির মতো—রোদ যে সোনার মতো ঘাসে সোনার রেখার মতো—সোনার রিঙের মতো—রোদ যে মেঘের কোলে—তোমার গা...

জীবনানন্দ দাস

এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে

এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে; এখানে সবুজ শাখা আঁকাবাঁকা হলুদ পাখিরে রাখে ঢেকে; জামের আড়ালে সেই বউকথাকওটিরে যদি ফেল দেখে একবার — একবার দু’পহর অপরাহ্নে যদি এই ঘুঘুর গুঞ্জনে ধরা দাও —...

জীবনানন্দ দাস

চারিদিকে প্রকৃতির

চারিদিকে প্রকৃতির ক্ষমতা নিজের মতো ছড়ায়ে রয়েছে। সূর্য আর সূর্যের বনিতা তপতী মনে হয় ইহাদের প্রেম মনে ক’রে নিতে গেলে, চুপে তিমিরবিদারী রীতি হয়ে এরা আসে আজ নয়,- কোনো এক আগামী আকাশে। অন্নের ঋণ,বিমলিন স্মৃ...

জীবনানন্দ দাস

চেতনা-লিখন

শতাব্দীর এই ধূসর পথে এরা ওরা যে যার প্রতিহারী। আলো অন্ধকারের ক্ষণে যে যার মনে সময়সাগরের ক্লান্তিবিহীন শব্দ শোনে; অথবা তা নাড়ীর রক্তস্রোতের মতন ধ্বনি না শুনে শোনা যায়। সময় গতির শব্দময়তাকে তবু ধীরে ধীরে...

জীবনানন্দ দাস

পিরামিড

বেলা বয়ে যায় গোধূলির মেঘ-সীমানায় ধূম্র মৌন সাঁঝে নিত্য নব দিবসের মৃতু্যঘন্টা বাজে! শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভষ্মবহ্নি জ্বলে! পান্থ ম্লান চিতার কবলে একে একে ডুবে যায় দেশ, জাতি,--সংসার, সমাজ, কার লা...

জীবনানন্দ দাস

চাঁদিনীতে

বেবিলোন কোথা হারায়ে গিয়েছে-মিশর-অসুর কুয়াশাকালো; চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক, মেঘের পালকে ঢালিছে আলো! সে যে জানে কত পাথারের কথা, কত ভাঙা হাট মাঠের স্মৃতি! কত যুগ কত যুগান্তরের সে ছিল জোছনা, শুক্লা তিথি! হয়...

জীবনানন্দ দাস

জার্মানীর রাত্রিপথেঃ ১৯৪৫

সে এক দেশ অনেক আগের শিশুলোকের থেকে সাগরগামী নদীর মত স্বরে আমার মনের ঘুঘুমরালহংসী ঝাউয়ের বনে আধো আলোছায়াচ্ছন্ন ভাবে মনে পড়ে টিউটনের গল্পে ছড়ায় সাগরে সূর্যালোকে গ্রিমের থেকে...... শিলাত সানুজ দানবীয় গ্য...

জীবনানন্দ দাস

জয়জয়ন্তীর সূর্য

কোনো দিন নগরীর শীতের প্রথম কুয়াশায় কোনো দিন হেমন্তের শালিখের রঙে ম্লান মাঠের বিকেলে হয়তো বা চৈত্রের বাতাসে চিন্তার সংবেগ এসে মানুষের প্রাণে হাত রাখে; তাহাকে থামায়ে রাখে। সে চিন্তার প্রাণ সাম্রাজ্যের উ...

জীবনানন্দ দাস

জীবন

চারিদিকে বেজে ওঠে অন্ধকার সমুদ্রের স্বর- নতুন রাত্রির সাথে পৃথিবীর বিবাহের গান! ফসল উঠিছে ফলে-রসে রসে ভরিছে শিকড়; লক্ষ নক্ষত্রের সাথে কথা কয় পৃথিবীর প্রাণ। সে কোন প্রথম ভোরে পৃথিবীতে ছিল যে সন্তান অঙ্...

জীবনানন্দ দাস

জনান্তিকে

তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই- তবু, গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই- তুমি আজো এই পৃথিবীতে র'য়ে গেছি। কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ; বহুদিন থেকে শান্তি নেই। নীড় নেই পাখিরো মতন কোনো হৃদয়ের তর। পাখি নেই। মানুষের হ...

জীবনানন্দ দাস

তবু তাহা ভুল জানি

তবু তাহা ভুল জানি — রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা: তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ় — আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার, আরো ঢের জল, জল আরো; তোমারো পৃথিবী পথ; নক্ষত্রের সাথে তুমি খেলিতেছ পাশা:...

জীবনানন্দ দাস

জীবন সঙ্গীত

স্ট্রেচারের পরে শুয়ে কুয়াসা ফিরিছে বুঝি তোমার দুচোখেঃ ভয় নেই, মৃত্যু নয় কোনো এক অপদার্থ অন্যায় আলোক; তা’হ্লে কি এত লোক ম’রে যেত মশালের লালসায়- মাছির মতন? অমৃতের সিড়ি ব’লে মানুষেরা গড়িত কি এত শাদা শ্লো...

জীবনানন্দ দাস

জীবন অথবা মৃত্যু চোখে রবে

জীবন অথবা মৃত্যু চোখে র’বে – আর এই বাংলার ঘাস র’বে বুকে; এই ঘাস:সীতারাম রাজারাম রামনাথ রায়- ইহাদের ঘোড়া আজো অন্ধকারে এই ঘাস ভেঙে চ’লে যায়- এই ঘাস:এরি নিচে কস্কাবতী শঙ্খশালা করিতেছে বাস: তাদের দেহের গন...

জীবনানন্দ দাস

জীবন-মরণ দুয়ারে আমার

সরাইখানার গোলমাল আসে কানে, ঘরের সার্সি বাজে তাহাদের গানে, পর্দা যে উড়ে যায় তাদের হাসির ঝড়ের আঘাতে হায়! -মদের পাত্র গিয়েছে কবে যে ভেঙে! আজও মন ওঠে রেঙে দিলদারদের দরাজ গলায় রবে, সরায়ের উৎসবে! কোন্‌ কিশো...

জীবনানন্দ দাস

প্রার্থনা

আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাওঃ মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে? পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন- আর যারা ভাঙে- গড়ে;- মশাল যাহারা জ্বালায় যেমন জেঙ্গিস যদি হালে দাঁড়ায় মদির ছায়ার মতন- যত অগণন মগজের কাঁচা মালে; যে-সব ...

জীবনানন্দ দাস

জুহু

সান্টাক্রুজ থেকে নেমে অপরাহ্নে জহুর সমুদ্রপারে গিয়ে কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিলো সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত; বাংলার থেকে এত দূরে এসে- সমাজ, দর্শন, তত্ত্ব, বিজ্ঞান হারিয়ে, প্রেমকেও যৌবনের কামাখ্য...

জীবনানন্দ দাস

ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল

ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল,- ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার রাঙা, আপেলের মতো লাল যার গাল, চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন, আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে-কত দিন! মোর জানালার পাশে তা...

জীবনানন্দ দাস

ঝরা ফসলের গান

আঁধারে শিশির ঝরে ঘুমোনো মাঠের পানে চেয়ে চেয়ে চোখ দুটো ঘুমে ভরে আজিকে বাতাসে ভাসিয়া আসিছে হলুদ পাতার ঘ্রাণ কাশের গুচ্ছ ঝ’রে পড়ে হায় খ’সে প’ড়ে যায় ধান বিদায় জানাই-গেয়ে যাই আমি ঝরা ফসলের গান,- নিভায়ে ফেল...

জীবনানন্দ দাস

তার স্থির প্রেমিকের নিকট

বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই,- -আমি বলিনাতো। কারো লাভ আছে;– সকলেরই;– হয়তো বা ঢের। ভাদ্রের জ্বলন্ত রৌদ্রে তবু আমি দূরতর সমুদ্রের জলে পেয়েছি ধবল শব্দ– বাতাসতাড়িত পাখিদের। মোমের প্রদীপ বড়ো ধীরে জ্ব’লে– ধীরে জ...

জীবনানন্দ দাস

তুমি আলো

তুমি আলো হতে আরো আলোকের পথে চলেছ কোথায়! তোমার চলার পথে কি গো তপতীর, ছায়ার মতন থাকা যায়! হয়তো আলোর ছায়া নেই; আলো তুমি তবুও তো- আলো তুমি ছায়ারও মনেই; বাহিরে বিশাল ঐ পৃথিবীর জাতীয়তা অ-জাতীয়তায় তুমি আলো। ...

জীবনানন্দ দাস

তুমি কেন বহু দূরে

তুমি কেন বহু দূরে — ঢের দূর — আরো দূরে — নক্ষত্রের অস্পষ্ট আকাশ তুমি কেন কোনদিন পৃথিবীর ভিড়ে এসে বলো নাকো একটিও কথা; আমরা মিনার গড়ি — ভেঙে পড়ে দুদিনেই — স্বপনের ডানা ছিড়ে ব্যথা রক্ত হয়ে ঝরে শুধু এইখান...

জীবনানন্দ দাস

তোমাকে ভালোবেসে

আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল এই জীবনের পদ্মপাতার জল; তবুও এ-জল কোথা থেকে এক নিমিষে এসে কোথায় চ'লে যায়; বুঝেছি আমি তোমাকে ভালোবেসে রাত ফুরোলে পদ্মের পাতায়। আমার মনে অনেক জন্ম ধ'রে ছিলো ব্যথা বুঝে তুমি এই জন...

জীবনানন্দ দাস

তোমায় আমি

তোমায় আমি দেখেছিলাম বলে তুমি আমার পদ্মপাতা হলে; শিশিরকণার মতন শূণ্যে ঘুরে শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে, খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে। নদী সাগর কোথায় চলে বয়ে পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হয়ে জানি না কিছু -...

জীবনানন্দ দাস

তোমাকে (অপ্রকাশিত)

একদিন মনে হতো জলের মতন তুমি। সকালবেলার রোদে তোমার মুখের থেকে বিভা– অথবা দুপুরবেলা — বিকেলের আসন্ন আলোয়– চেয়ে আছে — চলে যায় — জলের প্রতিভা। মনে হতো তীরের উপরে বসে থেকে। আবিষ্ট পুকুর থেকে সিঙাড়ার ফল কেউ...

জীবনানন্দ দাস

তোমায় আমি দেখেছিলাম

তোমায় আমি দেখেছিলাম ঢের শাদা কালো রঙ্গের সাগরের কিনারে এক দেশে রাতের শেষে–দিনের বেলার শেষে। এখন তোমায় দেখি না তবু আর সাতটি সাগর তেরো নদীর পার যেখানে আছে পাঁচটি মরুভূমি তার ওপারে গেছ কি চ’লে তুমি ঘাসের...

জীবনানন্দ দাস

দক্ষিণা

প্রিয়ার গালেতে চুমো খেয়ে যায় চকিতে পিয়াল রেণু!- এল দক্ষিণা-কাননের বীণা, বনানীপথের বেণু! তাই মৃগী আজ মৃগের চোখেতে বুলায়ে নিতেছে আখিঁ, বনের কিনারে কপোত আজিকে নেয় কপোতীরে ডাকি! ঘুঘুর পাখায় ঘুঙুর বাজায় আজ...

জীবনানন্দ দাস

দাও-দাও সূর্যকে জাগিয়ে দাও

দাও-দাও সূর্যকে জাগিয়ে দাও হে দিন, জ্বালাও তুমি আলো। যখন নির্বাণ ছিলো- কোনো দিকে জ্যোতিষ্ক ছিলো না, যখন শূন্যের সাথে শূন্যের চুম্বনে গাঢ় নীল নীহারিকা শিখা, সাধ জেগে উঠেছিলো যখন উদ্দেশ্যহীন আর্ত অন্ধ র...

জীবনানন্দ দাস

দু-দিকে

দু-দিকে ছড়িয়ে আছে দুই কালো সাগরের ঢেউ মাঝখানে আজ এই সময়ের ক্ষণিকের আলো যে নারীর মতো এই পৃথিবীতে কোনোদিন কেউ নেই আর- সে এসে মনকে নীল- রৌদ্রনীল শ্যামলে ছড়ালো কবে যেন- আজকে হারিয়ে গেছে সব; ভুলে গেছি পটভূ...

জীবনানন্দ দাস

দুটি তুরঙ্গম

আকাশে সমস্ত দিন আলো; পাতায় পালকে রোদ ঝিকমিক করে; জলগুলো চ'লে গেছে চেনা পথ ধ'রে অবিরল আরো দূর জলের ভিতরে। যদিও গভীরভাবে সময়ের সাগর উজ্জ্বল- কি এক নিঃশব্দ নিবিড় আবেগে তাকে কালো দু'টি তুরঙ্গম যেন অনন্তের...

জীবনানন্দ দাস

দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে

দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে আমার এ বাঙালির মন আজ রাতে; একদিন মৃত্যু এসে যদি দূর নক্ষত্রের তলে অচেনা ঘাসের বুকে আমারে ঘুমায়ে যেতে বলে তবুও সে ঘাস এই বাংলার অবিরল ঘাসের মতন মউরীর মৃদু গন্ধে ভরে রবে, — কিশ...

জীবনানন্দ দাস

নাবিক

কবে তব হৃদয়ের নদী বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি! সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন! পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন! কারাগার-মর্মরের তলে নিরাশ...

জীবনানন্দ দাস

নবপ্রস্থান

শীতের কুয়াশা মাঠে; অন্ধকারে এইখানে আমি। আগত ও অনাগত দিন যেন নক্ষত্রবিশাল শূন্যতার এই দিক- অথবা অপর দিক; দুয়েরি প্রাণের বিচিত্র বিষয়জ্ঞানে মিলে গেছে- তবুও প্রেমের অমর সম্মতিক্রমে। পৃথিবীর যে কোনো মানব ...

জীবনানন্দ দাস

নিখিল আমার ভাই

নিখিল আমার ভাই, -কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে আমি সে বেদনা পাই; যে প্রাণ গুমরি কাঁদিছে নিরালা শুনি যেন তার ধ্বনি, কোন্‌ ফণী যেন আকাশে বাতাসে তোলে বিষ গরজনি! কী যেন যাতনা মাটির বুকেতে আনিবার ওঠে রণি, আম...

জীবনানন্দ দাস

নিরালোক

একবার নক্ষত্রের দিকে চাই — একবার প্রান্তরের দিকে আমি অনিমিখে। ধানের ক্ষেতের গন্ধ মুছে গেছে কবে জীবনের থেকে যেন; প্রান্তরের মতন নীরবে বিচ্ছিন্ন খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে ঘুম পায় তার; নক্ষত্রেরা বাতি জ্বেলে জ...

জীবনানন্দ দাস

নিরঙ্কুশ

মালয় সমুদ্র পারে সে এক বন্দর আছে শ্বেতাঙ্গিনীদের। যদিও সমুদ্র আমি পৃথিবীতে দেখে গেছি ঢেরঃ নীলাভ জলের রোদে কুয়ালালুম্পুর, জাভা, সুমাত্রা ও ইন্দোচীন, বালি অনেক ঘুরেছি আমি- তারপর এখানে বাদামী মলয়ালী সমুদ...

জীবনানন্দ দাস

নির্জন স্বাক্ষর

তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে! যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে, পথের পাতার মতন তুমিও তখন আমার বুকের প’রে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন সেদিন তোমার! তোমার এ জী...

জীবনানন্দ দাস

পটভূমি বিসার

কবের সে বেবিলন থেকে আজ শতান্দীর পরমায়ু শেষ কি এক নিমেষ শুধু মানুষের অন্তহীন সহিষ্ণুতায়?- নক্ষত্রের এক রাত্রি- একটি ধানের গুচ্ছ- এক বেলা সূর্যের মত? কেবলি মুষলপর্ব শেষ ক'রে নব শান্তিবাচনের পথে মানবের অ...

জীবনানন্দ দাস

পটভূমি

আকাশ ভ'রে যেন নিখিল বৃক্ষ ছেয়ে তারা জেগে আছে কূলের থেকে কূলে; মানব্জাতির দু-মুহূর্তের সময়-পরিসর অধীর অবুঝ শিশুর শব্দ তুলে চেয়ে দেখে পারাপারের ব্যাপ্ত নক্ষত্রেরা আগুন নিয়ে বিষম, তবু অক্ষত স্থির জীবনে আ...

জীবনানন্দ দাস

পতিতা

আগার তাহার বিভীষিকাভরা, জীবন মরণময়! সমাজের বুকে অভিশাপ সে যে – সে যে ব্যাধি, সে যে ক্ষয়; প্রেমের পসরা ভেঙে ফেলে দিয়ে ছলনার কারাগারে রচিয়াছে সে যে, দিনের আলোয় রুদ্ধ ক’রেছে দ্বার! সূর্যকিরণ চকিতে নিভায়ে...

জীবনানন্দ দাস

পরস্পর

মনে পড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার, কহিলাম, শোনো তবে — শুনিতে লাগিল সবে, শুনিল কুমার; কহিলাম, দেখেছি সে চোখ বুজে আছে, ঘুমানো সে এক মেয়ে — নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে: সেইখানে আর নাই কেহ — এক ঘরে পালঙ্...

জীবনানন্দ দাস

পিপাসার গান

কোনো এক অন্ধকারে আমি যখন যাইব চলে — আরবার আসিব কি নামি অনেক পিপাসা লয়ে এ মাটির তীরে তোমাদের ভিড়ে! কে আমারে ব্যথা দেছে — কে বা ভালোবাসে — সব ভুলে, শুধু মোর দেহের তালাসে শুধু মোর স্নায়ু শিরা রক্তের তরে ...

জীবনানন্দ দাস

পলাতকা

পাড়ার মাঝারে সব চেয়ে সেই কুদুঁলি মেয়েটি কই! কতদিন পরে পল্লীর পথে ফিরিয়া এসেছি ফের সারাদিনমান মুখখানি জুড়ে ফুটিত যাহার খই কই কই বালা আজিকে তোমার পাই না কেন গো টের! তোমার নখের আঁচড় আজিও লুকায়ে যায় নি বু...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে

পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরে গেলে দিন আলোকিত হয়ে ওঠে—রাত্রি অন্ধকার হয়ে আসে; সর্বদাই, পৃথিবীর আহ্নিক গতির একান্ত নিয়ম, এই সব; কোথাও লঙ্ঘন নেই তিলের মতন আজো; অথবা তা হতে হলে আমাদের জ্ঞাতকুলশীল মানবীয় সময়কে...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন বাস করে

পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন বাস করে হৃদয়ের নরম কাতর অনেক নিভৃত কথা জানিয়াছি; পৃথিবীতে আমি বহুদিন কাটায়েছি; বনে বনে ডালপালা উড়িতেছে — যেন পরী জিন্‌ কথা কয়; ধূসর সন্ধ্যায় আমি ইহাদের শরীরের পর খইয়ের ধানের মতো...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবী আজ

প্রকৃতি থেকে ফসল নীলকন্ঠ এলো; সময়পাপচক্র থেকে বাহির হলো ব্যথিত নিঃসহায়। সবের পথে শতাব্দীর এই রাত্রি ব্যাপকতা প্রশান্তি নয়- ক্রমেই বেশি স্পষ্টতা জাগায়। সময় এখন চারদিকেতে ঘনান্ধকার দেখে বলছে: নগর নরক ব্...

জীবনানন্দ দাস

প্যারাডিম

সময়ের সুতো নিয়ে কেটে গেছে ঢের দিন এক আধবার শুধু নিশিত ক্ষমতা এনেছিল,- তারপরে নিভে- মিশে গেছে; হৃদয় কাটাল কান। বালুঘড়ি ব'লে গেলঃ সময় রয়েছে ঢের সেই সুর দূর এক আশ্চর্য কক্ষের চোখের ভিতরে গিয়ে স্বর্ণ দীনা...

জীবনানন্দ দাস

প্রতীতি

বাতাবীলেবুর পাতা উড়ে যায় হাওয়ায়- প্রান্তরে,- সার্সিতে ধীরে-ধীরে জলতরঙ্গের শব্দ বাজে; একমুঠো উড়ন্ত ধূলোয় আজ সময়ের আস্ফোট রয়েছে; না হ'লে কিছুই নেই লবেজান লড়ায়ে জাহাজে। বাইরে রৌদ্রের ঋতু বছরের মতো আজ ফুর...

জীবনানন্দ দাস

পৃথিবীলোক

দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙ্গে গ্রাম পতনের শব্দ হয়; মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, দেয়ালে তাদের ছায়া তবু ক্ষতি,মৃত্যু,ভয় বিহবলতা ব’লে মনে হয়। এসব শূণ্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ কিছু নেই সময়ের তীরে...

জীবনানন্দ দাস

মৃত্যুর আগে

আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়, দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার কবেকার পাড়াগার মেয়েদের মতো যেন হায় তারা সব আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল জোনাকিতে ভরে, গে...

জীবনানন্দ দাস

মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প

আঁধারে হিমের আকাশের তলে এখন জ্যোতিষ্কে কেউ নেই। সে কারা কাদের এসে বলেঃ এখন গভীর পবিত্র অন্ধকার; হে আকাশ, হে কালশিল্পী, তুমি আর সূর্য জাগিয়ো না; মহাবিশ্বকারুকার্য, শক্তি, উৎস, সাধঃ মহনীয় আগুনের কি উচ্ছ...

জীবনানন্দ দাস

ফুটপাথে

অনেক রাত হয়েছে- অনেক গভীর রাত হয়েছে; কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে- ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে- কয়েকটি আদিম সর্পিণী সহোদরার মতো এই-যে ট্র্যামের লাইন ছড়িয়ে আছে পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের বিষাক্ত বিস্বাদ...

জীবনানন্দ দাস

যতোদিন পৃথিবীতে

যতোদিন পৃথিবীতে জীবন রয়েছে দুই চোখ মেলে রেখে স্থির মৃত্যু আর বঞ্চনার কুয়াশার পায়ে সত্য সেবা শান্তি যুক্তির নির্দেশের পথ ধ'রে চ'লে হয়তো-বা ক্রমে আরো আলো পাওয়া যাবে বাহিরে- হৃদয়ে; মানব ক্ষয়িত হয় না জাতি...

জীবনানন্দ দাস

প্রেম

আমরা ঘুমায়ে থাকি পৃথিবীর গহ্বরের মতো — পাহাড় নদীর পারে অন্ধকারে হয়েছে আহত — একা — হরিণের মতো আমাদের হৃদয় যখন! জীবনের রোমাঞ্চের শেষ হলে ক্লান্তির মতন পান্ডুর পাতার মতো শিশিরে শিশিরে ইতস্তত আমরা ঘুমায়ে ...

জীবনানন্দ দাস

প্রিয়দের প্রাণে

অনেক পুরোনো দিন থেকে উঠে নতুন শহরে আমি আজ দাঁড়ালাম এসে। চোখের পলকে তবউ বোঝা গেল জনতাগভীর তিথি আজ; কোনো ব্যতিক্রম নেই মানুষবিশেষে। এখানে রয়েছে ভোর,- নদীর সমস্ত প্রীত জল;- কবের মনের ব্যবহারে তবু হাত বাড়...

জীবনানন্দ দাস

বনলতা সেন

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ত প্রাণ...

জীবনানন্দ দাস

বাংলার মুখ

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতো বড় পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দয়েলপাখি - চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ জাম-বট...

জীবনানন্দ দাস

ভেবে ভেবে ব্যথা পাব

ভেবে ভেবে ব্যথা পাব: মনে হবে, পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে দেখিতাম সেই লক্ষ্মীপেঁচাটির মুখ যারে কোনোদিন ভালো করে দেখি নাই আমি – এমনি লাজুক পাখি, — ধূসর ডানা কি তার কুয়াশার ঢেউয়ে ওঠে নেচে; যখন সাতটি ত...

জীবনানন্দ দাস

বাঙালি পাঞ্জাবি মারাঠি গুজরাটি

বাঙালি পাঞ্জাবি মারাঠি গুজরাটি বেহারি উৎকলি-আর সব সাগরপারের দেশের মানুষ এই কলকাতায় আমরা লক্ষ লক্ষ লোক, কোটি কোটি প্রাণ-রোজ ভোরে জাগি, অন্ধকারে ঘুমাই এই কি শুধু? এর প্রচণ্ড রহস্যের কথা তোমাদের মনে জাগে...

জীবনানন্দ দাস

বিকেলের আলোয়

রাতের কিনারে বসে নয় বিকেলের আলোয় স্বপ্ন দেখলামঃ কোন্‌ এক সুদূর মরুভূমিতে চলে গেছি সেখানে গভীর জোছনারাতে বালির গায়ে বালুকণার শব্দ (পৃথিবীর পাতা ঝরার মতো) স্ফটিকের নির্জন আলোর মতো বাতাস কুমারীর নির্মল ম...

জীবনানন্দ দাস

বাতাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি

বাতাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি — ঝরিতেছে ধীরে ধীরে অপরাহ্নে ভরে; সোনালি রোদের রঙ দেখিয়াছি — দেহের প্রথম কোন প্রেমের মতন রূপ তার — এলোচুল ছড়ায়ে রেখেছ ঢেকে গূঢ় রূপ — আনারস বন; ঘাস আমি দেখিয়াছি; দেখেছি সজনে ...

জীবনানন্দ দাস

বুনো হাঁস

পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে- জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহবানে বুনো হাঁস পাখা মেলে- শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার; এক-দুই-তিন চার-অজস্র-অপার- রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া এঞ্জিনের ...

জীবনানন্দ দাস

বিস্ময়

কখনো বা মৃত জনমানবের দেশে দেখা যাবে বসেছে কৃষাণঃ মৃত্তিকা-ধূসর মাথা আপ্ত বিশ্বাসে চক্ষুষ্মান। কখনো ফুরুনো ক্ষেতে দাঁড়ায়েছে সজারুর গর্তের কাছে; সেও যেন বাবলার কান্ড এক অঘ্রাণের পৃথিবীর কাছে। সহসা দেখেছ...

জীবনানন্দ দাস

বিপাশা

অনেক বছর হ’ল সে কোথায় পৃথিবীর মনে মিশে আছে। জেগে থেকে কথা ব’লে অন্য নারীমুখ দেখে কেউ কোনোমতে কেবলি কঠিন ঋণ দীর্ঘকাল আপামর পৃথিবীর কাছে চেয়ে নিয়ে তার পর পাশ কেটে, মেয়েটির ঘুমের জগতে দেনা শোধ ক’রে দিতে ...

জীবনানন্দ দাস

বিভিন্ন কোরাস

পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থাকে আমাদের আয়ু এখন মৃত্যুর শব্দ শোনে দিনমান। হৃদয়কে চোখঠার দিয়ে ঘুমে রেখে হয়তো দুর্যোগে তৃপ্তি পেতে পারে কান; এ রকম একদিন মনে হয়েছিলো; অনেক নিকটে তবু সেই ঘোর ঘনায়েছে আজ; আমাদের...

জীবনানন্দ দাস

ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ দুপুর

ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ-দুপুর — চিল একা নদীটির পাশে জারুল গাছের ডালে বসে বসে চেয়ে থাকে ওপারের দিকে; পায়রা গিয়েছে উড়ে তবু চরে, খোপে তার; — শসাতাটিকে, ছেড়ে গেছে মৌমাছি; — কালো মঘে জমিয়াছে মাঘের আকাশে, মরা প...

জীবনানন্দ দাস

ভাষিত

আমার এ-জীবনের ভোরবেলা থেকে- সে-সব ভূখণ্ড ছিলো চিরদিন কন্ঠস্থ আমার; একদিন অবশেষে টের পাওয়া গেল আমাদের স’জনার মতো দাঁড়াবার তিল ধারণের স্থান তাহাদের বুকে আমাদের পরিচিত পৃথিবীতে নেই। একদিন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞ...

জীবনানন্দ দাস

বোধ

আলো — অন্ধকারে যাই — মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে! স্বপ্ন নয় — শান্তি নয় — ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়! আমি তারে পারি না এড়াতে সে আমার হাত রাখে হাতে; সব কাছ তুচ্ছ হয়, ...

জীবনানন্দ দাস

ভিখিরী

একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়, একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুড়বাগানে, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো– তবে আমি হেঁটে চ’লে যাবো মানে মানে। –ব’লে সে বাড়ায়ে দিলো অন্ধকারে হাত। আগাগোড়া শরীরটা নিয়ে এক কানা ...

জীবনানন্দ দাস

মনে হয় একদিন আকাশের

মনে হয় একদিন আকাশের শুকতারা দেখিব না আর; দেখিব না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে এক ঝাড় জোনাকি কখন নিভে যায়; দেখিব না আর আমি পরিচিত এই বাঁশবন, শুকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মাটি হয়ে যাবে গভীর আঁধার আমার চোখের কাছে; লক্...

জীবনানন্দ দাস

মনমর্মর

আমার মনের ভিতরে ছায়া আলো এসে পড়ে; যেইসব অনুভূতি ঝরে গেছে তাদের কঙ্কাল নদীকে দিয়েছি আমি-বিকেলকে-নক্ষত্রের দাহনে বিশাল আকাশকে; ফিরে আসে নবদিকচিহ্ন নিয়ে মর্মের ভিতরে। সময়ের ঢের উৎস গ্রন্থ ছবি মননের পদ্ধত...

জীবনানন্দ দাস

ভোর হয়

ভোর হয়, কি যেন আমাকে দিতে চায় শেষরাত— কোন আভা, পূর্বাভাস? হয়তোবা শেষরাত আমাকে দিতে চায় তার ভোর হয়ে ওঠা। নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা পাখি, দু’ একবার ডাক দিয়ে, চুপ ক’রে থেকে নিজ অনুক্রমিক ডাকের মধ্যকার নীরবতা ...

জীবনানন্দ দাস

মরুতৃণোজ্জ্বলা

হেঁয়ালি রেখো না কিছু মনে; হৃদয় রয়েছে ব’লে চাতকের মতন আবেগ হৃদয়ের সত্য উজ্জ্বল কথা নয়,- যদিও জেগেছে তাতে জলভারানত কোনো মেঘ; হে প্রেমিক, আত্মরতিমদির কি তুমি? মেঘ;মেঘ, হৃদয়ঃ হৃদয়, আর মরুভূমি শুধু মরুভূমি...

জীবনানন্দ দাস

মহাগ্রহণ

অনেক সংকল্প আশা নিভে মুছে গেল; হয়তো এমনই শুরু হবে। আজকের অবস্থান ফুরিয়ে যাবে কি নতুন ব্যাপ্তির অনুভবে। মানুষ এ পৃথিবীতে ঢের দিন আছে; সময়ের পথে ছায়া লীন হয়নি এখনও তার, তবুও সে মরুর ভিতরে একটি বৃক্ষের ম...

জীবনানন্দ দাস

মহাগোধূলি

সোনালী খড়ের ভারে অলস গোরুর গাড়ি—বিকেলের রোদ প’ড়ে আসে কালো নীল হলদে পাখিরা ডানা ঝাপটায় ক্ষেতের ভাঁড়ারে, শাদা পথ ধুলো মাছি—ঘুম হয়ে মিশিছে আকাশে, অস্ত-সূর্য গা এলিয়ে অড়র ক্ষেতের পারে-পারে শুয়ে থাকে; রক্ত...

জীবনানন্দ দাস

মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি

মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি পৃথিবীর পথে এসে — হাসির আস্বাদ পেয়ে গেছি; দেখেছি আকাশে দূরে কড়ির মতন শাদা মেঘের পাহাড়ে সূর্যের রাঙা ঘোড়া; পক্ষিরাজের মতো কমলা রঙের পাখা ঝাড়ে রাতের কুয়াশা ছিঁড়ে; দেখেছি শরের...

জীবনানন্দ দাস

মানুষ যা চেয়েছিল

গোধূলির রঙ লেগে অশ্বত্থ বটের পাতা হতেছে নরম; খয়েরী শালিখগুলো খেলছে বাতাবীগাছে—তাদের পেটের শাদা রোম সবুজ পাতার নীচে ঢাকা প’ড়ে একবার পলকেই বার হয়ে আসে, হলুদ পাতার কোলে কেঁপে-কেঁপে মুছে যায় সন্ধ্যার বাতা...

জীবনানন্দ দাস

সন্ধ্যা হয়

সন্ধ্যা হয় — চারিদিকে মৃদু নীরবতা কুটা মুখে নিয়ে এক শালিখ যেতেছে উড়ে চুপে; গোরুর গাড়িটি যায় মেঠো পথ বেড়ে ধীরে ধীরে; আঙিনা ভরিয়া আছে সোনালি খড়ের ঘন স্তূপে; পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে; পৃথিবীর ...

জীবনানন্দ দাস

মিশর

‘মমী’র দেহ বালুর তিমির জাদুর ঘরে লীন- ‘স্ফীঙ্ক্‌স-দানবীর অরাল ঠোঁটের আলাপ আজি চুপ! ঝাঁ ঝাঁ মরুর ‘লু’য়ের ফুঁয়ে হচ্চে বিলীন-ক্ষীণ মিশর দেশের কাফন্‌ পাহাড়-পিরামিতের স্তুপ! নিভে গেছে ঈশিশের রই বেদীর থেকে ...

জীবনানন্দ দাস

মুহূর্ত

আকাশে জ্যোৎস্না- বনের পথে চিতা বাঘের গায়ের ঘ্রাণ; হৃদয় আমার হরিণ যেনঃ রাত্রি এই নীরবতার ভিতর কোন্‌ দিকে চলেছি! রূপালি পাতার ছায়া আমার শরীরে, কোথাও কোনো হরিণ নেই আর; যত দূর যাই কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদ শ...

জীবনানন্দ দাস

মিতাভাষণ

তোমার সৌন্দর্য নারি, অতীতের দানের মতন। মধ্যসাগরের কালো তরঙ্গের থেকে ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির সঙ্ঘের দিকে — ধর্মে — নির্বাণে, তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। অনেক ...

জীবনানন্দ দাস

মৃত্যু সূর্য সংকল্প

সর্বদাই অন্ধকারে মৃত্যু এক চিন্তার মতন; আমাদের এই শতাব্দীর সাধ, স্বপ্ন, কাজ, প্রাণ আচ্ছাদন ক'রে দিতে আসে। ভোরের নিশ্চিন্ত মন কেমন সাহসে অনায়াসে আলো হয়- সূর্য হয়- দেখ; নদী- মেঘ- দিগন্তের পাহাড়ের নীল বি...

জীবনানন্দ দাস

সময়ের তীরে

নিচে হতাহত সৈন্যদের ভিড় পেরিয়ে, মাথার ওপর অগণন নক্ষত্রের আকাশের দিকে তাকিয়ে, কোনো দূর সমুদ্রের বাতাসের স্পর্শ মুখে রেখে, আমার শরীরের ভিতর অনাদি সৃষ্টির রক্তের গুঞ্জরণ শুনে, কোথায় শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম আ...

জীবনানন্দ দাস

সময় মুছিয়া ফেলে সব এসে

সময় মুছিয়া ফেলে সব এসে, সময়ের হাত সৌন্দর্যেরে করে না আঘাত মানুষের মনে যে সৌন্দর্য জন্ম লয়- শুকনো পাতার শুকনো পাতার মতো ঝরে নাকো বনে ঝরে নাকো বনে। নক্ষত্রও মুছে যায়- মুছে যায়- পৃথিবীর পুরাতন পথ শেষ হয়-...

জীবনানন্দ দাস

যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে র’ব

যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে র’ব—অন্ধকারে নক্ষত্রের নিচে কাঁঠাল গাছের তলে হয়তো বা ধলেশ্বরী চিলাইয়ের পাশে— দিনমানে কোনো মুখ হয়তো সে শ্মশানের কাছে নাহি আসে— তবুও কাঁঠাল জাম বাংলার—তাহাদের ছায়া যে পড়িছে আ...

জীবনানন্দ দাস

যতদিন বেঁচে আছি

যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে অপরাজিতার মতো নীল হয়ে-আরো নীল-আরো নীল হয়ে আমি যে দেখিতে চাই;- সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে লয়ে কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে, আমি যে দেখিতে চাই;- আ...

জীবনানন্দ দাস

যতিহীন

বিকেলবেলা গড়িয়ে গেলে অনেক মেঘের ভিড় কয়েক ফলা দীর্ঘতম সূর্যকিরণ বুকে জাগিয়ে তুলে হলুদ নীল কমলারঙের আলোয় জ্ব’লে উঠে ঝরে গেল অন্ধকারের মুখে। যুবারা সব যে যার ঢেউয়ে,- মেয়েরা সব যে যার প্রিয়ের সাথ...

জীবনানন্দ দাস

যাত্রী

মানুষের জীবনের ঢের গল্প শেষ হ’য়ে গেলে র’য়ে যায় চারি দিক ঘিরে এই দেশ; নদী মাঠ পাখিদের ওড়াওড়ি গাছের শিয়রে কমলা রঙের ঢেউয়ে এসে কিছুক্ষণ খেলা করে। মনে হয় কোথাও চিহ্নিত এই রৌদ্র ছিল কবে; মানুষ সার্থক ময়- ত...

জীবনানন্দ দাস

যে কামনা নিয়ে

যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা! খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি, রঙের মাঝারে হেরি রঙডুবি! পরাগের ঠোঁটে পরিমলগুঁড়ি- হারায়ে ফেলি গো দিশা! আমি প্রজাপতি-মিঠা মাঠে মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে; বোদের...

জীবনানন্দ দাস

বিড়াল

সারাদিন একটি বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে কেবলি আমার দ্যাখা হয়; গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে কোথায় কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর তারপর শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির ...

জীবনানন্দ দাস

শান্তি

জীবন কি নীরক্ত সম্রাট এক সুধাখোর: কুট ব্যবসায়ী নীল পাশ্বচরগুলো তার মৃত্যুর উৎসব? মানুষের তরে তবে কোন পথ: কোন অন্তরীক্ষে তারে নিয়ে যাবে আসন্ন সময়? সেইখানে বালুঘড়ি, বলো, তবে স্তব্ধতার মতো: একদিন বাতাসের...

জীবনানন্দ দাস

মেঠো চাঁদ

মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে আমার মুখের দিকে, ডাইনে আর বাঁয়ে পোড়ো জমি- খড়- নাড়া- মাঠের ফাটল, শিশিরের জল। মেঠো চাঁদ- কাস্তের মত বাঁকা, চোখা- চেয়ে আছে; এমনি সে তাকায়েছে কতো রাত- নাই লেখা-জোখা। মেঠো চাঁদ বলেঃ ...

জীবনানন্দ দাস

যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়

যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়-সে তো আর ফিরে নাহি আসে: কাঞ্চনমালা যে কবে ঝরে গেছে;-বনে আজো কলমীর ফুল ফুটে যায়-সে তবু ফেরে না, হায়;-বিশালাক্ষ্মী: সেও তো রাতুল চরণ মুছিয়া নিয়া চলে গেছে;-মাঝপথে জলের উচ্ছ্বাসে ...

জীবনানন্দ দাস

যতদিন পৃথিবীতে

যতদিন পৃথিবীতে জীবন রয়েছে দুই চোখ মেলে রেখে স্থির মৃত্যু আর বঞ্চনার কুয়াশার পারে সত্য সেবা শান্তি যুক্তির নির্দেশের পথ ধ’রে চ’লে হয়তো-বা ক্রমে আরো আলো পাওয়া যাবে বাহিরে—হৃদয়ে; মানব ক্ষয়িত হয় না জাতির ...

জীবনানন্দ দাস

মৃত মাংস

ডানা ভেঙে ঘুরে-ঘুরে প’ড়ে গেলো ঘাসের উপর; কে তার ভেঙেছে ডানা জানে না সে ;- আকাশের ঘরে কোনোদিন-কোনোদিন আর তার হবে না প্রবেশ ? জানে না সে; কোনো-এক অন্ধকার হিম নিরুদ্দেশ ঘনায়ে এসেছে তার ? জানে না সে, আহা,...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রি (আলোপৃথিবী)

অইখানে কিছু আগে- বিরাট প্রাসাদে- এক কোণে জ্ব'লে যেতেছিল ধীরে এক্‌সটেন্‌শন্‌ লেকচারের আলো। এখন দেয়ালে রাত- তেমন ততটা কিছু নয়; পথে পথে গ্যাসলাইট র'য়েছে ঝাঁঝালো এখনো সূর্যের তেজ উপসংহারের মত জেগে। এখনো ট...

জীবনানন্দ দাস

শিরীষের ডালপালা

শিরীষের ডালপালা লেগে আছে বিকেলের মেঘে, পিপুলের ভরা বুকে চিল নেমে এসেছে এখন; বিকেলের শিশুসূর্যকে ঘিরে মায়ের আবেগে করুণ হয়েছে ঝাউবন। নদীর উজ্জ্বল জল কোরালের মতো কলরবে ভেসে নারকেলবনে কেড়ে নেয় কোরালীর ভ্র...

জীবনানন্দ দাস

শিকার

ভোর; আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল : চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছে : পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলী – মদির মেয়েটির মতো; কিংবা মিশরের মানুষী তার...

জীবনানন্দ দাস

শব

যেখানে রূপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর, যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর; যেখানে সোনালি মাছ খুঁটে-খুঁটে খায় সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙ্ক্ষায়? নির্জন মাছের রঙে যেইখানে হ’য়ে আছে চুপ পৃথিবীর একপাশে এ...

জীবনানন্দ দাস

সমুদ্রের জলে আমি দেহ ধুয়ে

সমুদ্রের জলে আমি দেহ ধুয়ে, চেয়ে থাকি নক্ষত্রের আকাশের পানে চারিদিকে অন্ধকার: নারীর মতন হাত, কালো চোখ, ম্লান চুল ঝরে যতদূর চোখ যায় নীলজল হৃষ্ট মরালের মতো কলরব করে রাত্রিরে ডাকিতে চায় বুকে তার, প্রেম-মূ...

জীবনানন্দ দাস

লোকেন বোসের জর্নাল

সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি — এখনো কি ভালোবাসি? সেটা অবসরে ভাববার কথা, অবসর তবু নেই; তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে এখন শেলফে চার্বাক, ফ্রয়েড, প্লেটো, পাভলভ ভাবে সুজাতাকে আমি ভালোবাসি কি না! পুরোনো...

জীবনানন্দ দাস

লোকসামান্য

অন্ধভাবে আলোকিত হয়েছিলো তারা জীবনের সাগরে-সাগরেঃ বঙ্গোপসাগরে, চীনের সমুদ্রে- দ্বীপপুঞ্জের সাগরে। নিজের মৎসর নিয়ে নিশানের 'পরে সূর্য এঁকে চোখ মেরেছিলো তারা নীলিমার সূর্যের দিকে। তারা সব আজ রাতে বিলোড়িত...

জীবনানন্দ দাস

সময়ের কাছে

সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ'লে যেতে হয় কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি। সেই সব একদিন হয়তো বা কোনো এক সমুদ্রের পারে আজকের পরিচিত কোনো নীল আভার পাহাড়ে অন্ধকারে হাড়কঙ্করের মতো শুয়ে নিজের আয়ুর দিন তবুও গণ...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রি

হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কূষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল; অথবা সে-হাইড্র্যান্ট হয়তো না গিয়েছিলো ফেঁসে। এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে। একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে অস্থির পেট্রল ঝেঁড়ে; সতত সতর্ক থেকে তবু ...

জীবনানন্দ দাস

যদি আমি ঝরে যাই একদিন

যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়; যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে-ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে, যখন চড়াই পাখি কাঁঠালিচাপাঁর নীড়ে ঠোঁট আছে গুজে, যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে খয়েরি পাতায়, যখন পুকুরে হাঁস সোঁদ...

জীবনানন্দ দাস

সমুদ্রচিল

সমুদ্রচিলের সাথে আজ এই রৌদ্রের প্রভাতে কথা ব’লে দেখিয়াছি আমি; একবার পাহাড়ের কাছে আসে, চকিতে সিন্ধুর দিকে যেতেছে সে নামি; হামাগুড়ি দিয়ে ভাসে ফেনার উপরে, মুছে যায় তরঙ্গের ঝড়ে। দাঁড়ায়েছি শতাব্দীর ধুলো কা...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রি ও ভোর

শীতের রাতের এই সীমাহীন নিষ্পন্দন গহ্বরে জীবন কি বেঁচে আছে তবে? ডানা-ভাঙ্গা নক্ষত্রের মতন উৎসবে আঁধারের ভিতরে কি করে কেবলি স্ফুলিঙ্গ অন্ধ সংক্রান্তির মতো? বহুদিন ক্ষমাহীন সময়ের ভিতরে সে অনেক জ্বলেছে আছ...

জীবনানন্দ দাস

রাত্রি, মন, মানবপৃথিবী

এ অন্ধকার জলের মতো; এই পৃথিবীর সকল কিণার ঘিরে নরক নগর তাপী পাপীর শান্ত শুশ্রুষায় কোথার থেকে এসে কোথায় লক্ষ্যে চ'লে যায়; সকল উত্তেজনায় আসে স্নিগ্ধ শরীরে কে ব্যাহত পাখির মতো প্রাণাকাশে ওড়ার পথে সময়শায়কে...

জীবনানন্দ দাস

যেই সব শেয়ালেরা

যেই সব শেয়ালেরা জন্ম- জন্ম শিকারের তরে, দিনের বিশ্রুত আলো নিভে গেলে পাহাড়ের বনের ভিতরে নীরবে প্রবেশ করে,- বার হয়- চেয়ে দেখে বরফের রাশি জ্যোৎস্নায় প’ড়ে আছে;- উঠিতে পারিত যদি সহসা প্রকাশি সেই সব হৃদযন্ত...

জীবনানন্দ দাস

মিতাভাষণ

তোমার সৌন্দর্য নারি, অতীতের দানের মতন। মধ্যসাগরের কালো তরঙ্গের থেকে ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির সঙ্ঘের দিকে — ধর্মে — নির্বাণে, তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। অনেক ...

জীবনানন্দ দাস

লঘু মুহূর্ত

এখন দিনের শেষে তিনজন আধো আইবুড়ো ভিখিরীর অত্যন্ত প্রশান্ত হ'লো মন; ধূসর বাতাস খেয়ে এক গাল- রাস্তার পাশে ধূসর বাতাস দিয়ে ক'রে নিলো মুখ আচমন। কেননা এখন তারা যেই দেশে যাবে তাকে রাঙা নদী বলে; সেইখানে ধোপা ...

জীবনানন্দ দাস

সময়সেতুপথে

ভোরের বেলায় মাঠ প্রান্তর নীলকন্ঠ পাখি, দুপুরবেলার আকাশে নীল পাহাড় নীলিমা, সারাটি দিন মীনরৌদ্রমুখর জলের স্বর– অনবসিত বাহির ঘরের ঘরণীর এই সীমা। তবুও রৌদ্র সাগরে নিভে গেল; বলে গেল : ‘অনেক মানুষ মরে গেছে'...

জীবনানন্দ দাস

শতাব্দী

চারিদিকে নীল সাগর ডাকে অন্ধকারে, শুনি; ঐখানেতে আলোকস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে ঢের একটি-দুটি তারার সাথে;- তারপরেতে অনেকগুলো তারা; অন্নে ক্ষুধা মিটে গেলেও মনের ভিতরের ব্যথার কোনো মীমাংসা নেই জানিয়ে দিয়ে আকাশ ভ’...

জীবনানন্দ দাস

সমারূঢ়

‘বরং নিজেই তুমি লিখোনাকো একটি কবিতা-‘ বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর; বুঝিলাম সে তো কবি নয়- সে যে আরূঢ় ভণিতা পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের পর ব’সে আছে সিংহাসনে-কবি নয়- অজর অক্ষর অ...

জীবনানন্দ দাস

মিতাভাষন

তোমার সৌন্দর্য নারী, অতীতের দানের মতন। মধ্যসাগরের কালো তরঙ্গের থেকে ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির সঙ্ঘের দিকে — ধর্মে — নির্বাণে; তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। অনেক ...

জীবনানন্দ দাস

রিস্টওয়াচ

কামানের ক্ষোভে চূর্ণ হ’য়ে আজ রাতে ঢের মেঘ হিম হ’য়ে আছে দিকে-দিকে! পাহাড়ের নিচে- তাহাদের কারু- কারু মণিবন্ধে ঘড়ি সময়ের কাঁটা হয়তো বা ধীরে-ধীরে ঘুরাতেছে; চাঁদের আলোর নিচে এই সব অদ্ভুত প্রহরী কিছুক্ষণ কথ...

জীবনানন্দ দাস

Loading...