মূল বিষয়বস্তুতে যান

নির্মলেন্দু গুণ এর রচনাবলি

স্বাধীনতা উলঙ্গ কিশোর

জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে, মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থ...

নির্মলেন্দু গুণ

শ্রমিক ও ঈশ্বর

'দল বেঁধে কী খোঁজো তোমরা এত মন্দিরে গীর্জায়? কিছু হারিয়েছো বুঝি?'- ভক্তবৃন্দ গর্জে ওঠে প্রায়: 'হায় লোকটা পাগল?শয়তান? নাকি রাতকানা? 'আমরা ঈশ্বর খুঁজি, তুমি বুঝি কিছুই জানো না ? 'জানি,তবে জীবনে কখনো ঈশ্...

নির্মলেন্দু গুণ

সে যেন আমার চেয়ে বেশিদিন বাঁচে

সাবানে জড়ানো দীর্ঘ কালো চুল তুমি ভুল করে রেখে গিয়েছিলে। খুলতে গিয়েও আমি তা খুলিনি। এই হোক বিহঙ্গের শেষ-আলিঙ্গন। বাথটাবে জলপদ্ম ভাসে। বুঝি ওটা জলপদ্ম নয়--, তোমার অবর্তমানে তোমার প্রণয়চিহ্ন হাসে। পুরুষে...

নির্মলেন্দু গুণ

স্বপ্ন নব-ভৌগোলিক শিখা

এখন আমার বয়স কত হবে? একশ? নব্বই? আশি? হায়রে আমার বেশি-বয়সের স্বপ্ন, আমার একশ হবে না । আমি ময়মনসিংহের কবি, নীরার একান্ত বাধ্য স্বামী, আমার বয়স পঁয়ত্রিশ, আমি ঢাকায় এসেছি স্বরচিত কবিতা পড়তে । আমার বড় ভাই...

নির্মলেন্দু গুণ

আকাশ

আমার সমস্ত ভাবনা যখন তোমাকে ছোঁয়, আমার সমস্ত উপলব্ধি যখন তোমার আত্মাকে স্পর্শ করে, আমার সমস্ত বোধ যখন তোমার বোধিতে নিমজ্জিত হয়, তখন আমার প্রাণের গভীর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত মোহন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয় এক...

নির্মলেন্দু গুণ

কৃতজ্ঞতা

জানি না, আমাকে এমন সুন্দর করে সৃষ্টি করেছে কে? জানি না এই মানুষী-সত্তার জন্য, আমি কার কাছে ঠিক কতখানি ঋণী ; তবে এটুকু নিশ্চিত জানি, কারো কাছে নিজকে খুবই ঋণী মনে হয় । আমি জানি না সেই সত্তাটি কে? আমার ...

নির্মলেন্দু গুণ

জানে মৌন মহাকাল

এই বৃষ্টি আমাকে দেবেনা জলধারা, এইসব বৃক্ষপত্র দূরাচারী দখিনা বাতাসে জানি হবে আত্মহারা। পৃথিবীর স্নেহ পৃষ্ঠ থেকে রাত্রিভেজা প্রেমপুষ্পগুলি তুলে নিয়ে বৃষ্টি বালিকারা তোমাকে অঞ্জলী দেবে। বেলা অবেলায় এই জ...

নির্মলেন্দু গুণ

অনন্ত বরফবীথি

মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে কংশের জলে ভাসিয়ে দিও। যদি শিমুলের তুলা হতাম, বাতাসে উড়িয়ে দিতে বলতাম, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি বাতাসের চেয়ে হালকা নই। আমাকে তোমরা কাঠের আগুনে পুড়িয়ে ফেলো না, কিংবা মাটি খুঁড়ে ...

নির্মলেন্দু গুণ

পাড়ি

মহাত্মা গান্ধীর মতো ভালোবাসা পাড়ি দিচ্ছে সময়ের নড়বড়ে সাঁকো। আমি তাকে হাত ধরে পরান সখার মতো নিয়ে যাচ্ছি নদীর ওপারে। স্রোতস্বিনীর জলে কাঁপিতেছে দুু’জনের ছায়া, ভালোবাসা এবং আমার। তুমি শুধু দূরে বসে আমাদে...

নির্মলেন্দু গুণ

কাল সে আসিবে

আর কিছু নয়, রাজ্য চাই না, চাই না তিলক, চাই না তালুক; চাই শুধু মন-মানুষে মিলুক কবিতা আমার। সেই বিশ্বাসে যারা কাছে আসে, আর মাঝে মাঝে অপমানিতের হয়ে কথা বলি । বাঁশি যে বাজায় সে তো কংকাল, প্রাণের ভিতরে আপন...

নির্মলেন্দু গুণ

ওটা কিছু নয়

এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ? একটু দাঁড়াও আমি তৈরী হয়ে নিই । এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ? তেমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার । ওটা নয়, ওটা চুল ।...

নির্মলেন্দু গুণ

একটি খোলা কবিতা

আসুন আমরা আগুন সম্পর্কে বৃথা বাক্য ব্যয় না করে একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দিয়ে বলিঃ 'এই হচ্ছে প্রকৃত আগুন । মীটসেফ খোলা রেখে, বিড়ালকে উপদেশ দিয়ে অযথা সময় নষ্ট ক'রে লাভ নেই, আসুন আমরা মীটসেফের দরোজ...

নির্মলেন্দু গুণ

আমার জলেই টলমল করে আঁখি

নিজের জলেই টলমল করে আঁখি, তাই নিয়ে খুব বিব্রত হয়ে থাকি। চেষ্টা করেও রাখতে পারি না ধরে- ভয় হয় আহা, এই বুঝি যায় পড়ে। এমনিই আছি নদীমাতৃক দেশে, অশ্রুনদীর সংখ্যা বাড়াবো শেষে? আমার গঙ্গা আমার চোখেই থাক্ আসু...

নির্মলেন্দু গুণ

আমার বসন্ত

এ না হলে বসন্ত কিসের? দোলা চাই অভ্যন্তরে, মনের ভিতর জুড়ে আরো এক মনের মর্মর, পাতা ঝরা, স্বচক্ষে স্বকর্ণে দেখা চাঁদ, জ্যোৎস্নাময় রাতের উল্লাসে কালো বিষ । এ না হলে বসন্ত কিসের ? গাছের জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়েছ...

নির্মলেন্দু গুণ

আত্মকেন্দ্রিক স্বপ্ন

প্রাণে জ্বলে ওঠে গগনচুম্বী বাসনা ঢেউ, তোমাকে পাবে না পরান ভরিয়া আমি ছাড়া কেউ । তাই বুঝি এই ঘটনাটি কত ধ্রুব, অবশ্য; আমাকেও দ্রুত হতে হবে জানি দৃঢ়, স্ববশ্য । আমি চলে যাব পার হয়ে নদী থামব না মোটে, দে...

নির্মলেন্দু গুণ

আকাশ ও মানুষ

কবে থেকে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে একা, তার বুক থেকে খসে পড়েছে কত তারা। বেঁচে থাকলে আরো কত তারাই খসবে, তা নিয়ে আকাশ কি দুঃখ করতে বসবে? না, বসবে না, আমি বলছি, লিখে নাও, আকাশকে তো মহান মানি এ-কারণেই। মনুষ্যবৎ হল...

নির্মলেন্দু গুণ

আসমানী প্রেম

নেই তবু যা আছের মতো দেখায় আমরা তাকে আকাশ বলে ডাকি, সেই আকাশে যাহারা নাম লেখায় তাদের ভাগ্যে অনিবার্য ফাঁকি ! জেনেও ভালোবেসেছিলাম তারে , ধৈর্য ধরে বিরহ ভার স’বো ; দিনের আলোয় দেখাবো নিষ্প্রভ জ্বলবো...

নির্মলেন্দু গুণ

বাৎস্যায়ন ০৮

এক ডাকে অরণ্যের বাঘও যায় না ছুটে, আমি যাই, আমি ছুটে যাই ; আমি কামভিখিরির মত কপর্দকশূন্য করপুটে তোমার অগ্নির টানে ছুটে যাই, হাওয়া । রাজৈশ্বর্যের চেয়েও ঢের বেশী মূল্যবান মণিরত্ন ছিল আমার সুবর্ণ-অর্ণবপে...

নির্মলেন্দু গুণ

যাত্রাভঙ্গ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে মন বাড়িয়ে ছুঁই, দুইকে আমি এক করি না এক কে করি দুই। হেমের মাঝে শুই না যবে, প্রেমের মাঝে শুই তুই কেমন করে যাবি? পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া আমাকেই তুই পাবি। তবুও তুই বলিস যদি যাই, দেখব...

নির্মলেন্দু গুণ

মনের পৃথিবী নিয়ে

বাইরের পৃথিবীটা বড় বেশি ছোটো, তার চারপাশে চাঁদ-তারা, গ্রহর দেয়াল। আমি বাঁচি আমার মনের পৃথিবী নিয়ে। বাইরের পৃথিবীটা বড় বেশি কুৎসিত, তার মৃগনাভি কৃমি-কীটে ভরা। আমি বাঁচি আমার মনের পৃথিবী নিয়ে। বাইরের পৃ...

নির্মলেন্দু গুণ

দুঃখ করো না বাঁচো

দুঃখকে স্বীকার করো না, –সর্বনাশ হয়ে যাবে । দুঃখ করো না, বাঁচো, প্রাণ ভ’রে বাঁচো । বাঁচার আনন্দে বাঁচো । বাঁচো, বাঁচো এবং বাঁচো । জানি মাঝে-মাঝেই তোমার দিকে হাত বাড়ায় দুঃখ, তার কালো লোমশ হাত প্রায়ই তোম...

নির্মলেন্দু গুণ

শিয়রে বাংলাদেশ

আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিল, তুই তখনও ছিলি আমার স্বপ্নে । আমি পাঁজর খুলে বলেছিলাম তোকে, আমার বুকে যা আছে তুই সব নে ।। আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিল, তুই তখনও ছিলি মায়ের ভ্রূণে । আমি অস্ত্রজ্ঞান...

নির্মলেন্দু গুণ

ভয়ে-ভয়ে

বলা তো যায় না, যা দিনকাল পড়েছে ! আমার বুক কবুতরের বুকের মত কাঁপে, পাছে তোমায় আড়াল করে কেহ---, তাই চোখের সামনে রাখি তোমার দেহ । তোমার জন্য ছেড়েছি বিদেশ-যাওয়া, বলা তো যায় না, যা দিনকাল পড়েছে, অন্য কবি ...

নির্মলেন্দু গুণ

কসাই

কসাই নির্মলেন্দু গুণ একদিন এক বিজ্ঞ কসাই ডেকে বললোঁ ‘এই যে মশাই, বলুন দেখি, পাঁঠা কেন হিন্দুরা খায়, গরু কেন মুসলিমে?’ আমি বললামঃ ‘ সে অনেক কথা, ফ্রেশ করে তা লিখতে হবে কর্ণফুলীর এক রীমে।‘ কসাই শুনে মু...

নির্মলেন্দু গুণ

পাথরের সাপ

আমি সূর্য স্পর্শ করে দেখেছি দুপুর, আকাশে নীল গালে মুখ ঘষে আকাশ দেখেছি, পূর্ণ চাঁদের ঠোঁটে চুমু খেয়ে দেখেছি পূর্ণিমা। পরীর পাথর ছুঁয়ে দেখেছি পাহাড, আমি সাপকেও বুকে নিয়ে বহুরাত কাটিয়ে দিয়েছি। আজ কোনো স্...

নির্মলেন্দু গুণ

পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু

একদিন চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে; একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয় বন্ধু হবে, একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না। একদি চুল কাটতে যাব না সেলুনে একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো। একদিন কা...

নির্মলেন্দু গুণ

বসন্ত বন্দনা

হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্র-সঙ্গীতে যতো আছে, হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে বনের কুসুমগুলি ঘিরে । আকাশে মেলিয়া আঁখি তবুও ফুটেছে জবা,--দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে, তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্তপথিক ।...

নির্মলেন্দু গুণ

রবীন্দ্র-সঙ্গীত

ধূলির ভিতরে কোনো জীবরেন গান আছে কনিা, জানে রুদ্র বৈশাখের বিহ্বল বাতাস, সে তাকে ওড়ায়। নদীর চঞ্চল স্রোতে মিলনের সুর আছে কিনা সে কথা সমুদ্র জানে, সে নদীকে টানে। পাতার মর্মরধ্বনি বাঁধা আছে কীভাবে নিশ্ছদ্র...

নির্মলেন্দু গুণ

দাসবংশ

কোনো কাজকর্ম তো নাই, খাচ্ছেন দাচ্ছেন, আর যখন যা চাচ্ছেন হাতের কাছে তাই পেয়ে যাচ্ছেন। স্প্যানিশ অলিভ অয়েল মালিশ করে পালিশ করছেন বেগম সাহেবার পাছা, আর নিজের বীচির চামড়া। আর আমরা আমাগো হুগায় মাখছি ভে...

নির্মলেন্দু গুণ

মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক

মিউনিসিপ্যালিটির ভাঙা-ট্রাকে শহরের সবকিছু, আমাদের যাবতীয় শোভন খাদ্যের পরিণতি, ড্রামের আবর্জনা, ড্রেনের হলুদ বমি, রোগীদের কাশ, পচা-মুরগির রান, পাখা, কলার বাকল প্রতিদিন খুব ভোরে তুলে দেবে কতিপয় নির্দিষ্...

নির্মলেন্দু গুণ

বসন্তচিত্র

একজন চিত্রক্রেতার সবিনয় অনুরোধে আমি আঁকতে বসেছি একটি আমগাছের ছবি— যে তার দেহচ্ছায়া রামসুন্দর পাঠাগারের সবুজ টিনের চালের ওপরে বিছিয়ে দিয়েছে। গাছের সবুজ পাতারা সবইপ্রায় ঢাকা পড়েছে হালকা হলুদ রঙের ...

নির্মলেন্দু গুণ

মুঠোফোনের কাব্য ০০১

মুঠোফোনের কাব্য শুনে বিঠোফেন বললেন : 'ভালো হচ্ছে, এভাবেই প্রাচীন ঐতিহ্য ফের লাভ করে নব-প্রাণ। লিখে যান, আমি তো এভাবেই তৈরি করেছি আমার সিম্ফনি।' গুরুর উসকানি পেয়ে কবির অন্তরখানি বাতাসের বক্ষ ভেদ ক...

নির্মলেন্দু গুণ

বউ

কে কবে বলেছে হবে না? হবে,বউ থেকে হবে । একদি আমিও বলেছিঃ 'ওসবে হবে না ।' বাজে কথা । আজ বলি,হবে,বউ থেকে হবে । বউ থেকে হয় মানুষের পুনর্জন্ম,মাটি,লোহা, সোনার কবিতা, ---কী সে নয়? গোলাপ,শেফালি,যুঁই,ভোরের আক...

নির্মলেন্দু গুণ

মোনালিসা

চোখ বন্ধ করলে আমি দেখতে পাই সদ্য-রজঃস্বলা এক কিশোরীরে− যে জানে না, কী কারণে হঠাৎ এমন তীব্র তুমুল আনন্দ-কাতরতা ছড়িয়ে পড়েছে তার নওল শরীরে। মনুর ভাষায় গৌরী, এইটুকুনু মেয়ে চমকে ওঠে নিজের পানে চেয়ে− দেখে ত...

নির্মলেন্দু গুণ

ভালোবাসা,ভারসাম্যহীন

বাঁশির কাছে যে-সুরের প্রত্যাশা সে-প্রত্যাশা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার বাঁশিটি বাজাতে চাই। যে-পর্যন্ত স্থলিত হয়না বীর্য সে-পর্যন্ত জীবের সঙ্গম। জয়ী না-হওয়া পর্যন্ত আমি পরাভাবকে স্বীকার করি না। ভাল...

নির্মলেন্দু গুণ

প্রলেতারিয়েত

যতক্ষণ তুমি কৃষকের পাশে আছো, যতক্ষণ তুমি শ্রমিকের পাশে আছো, আমি আছি তোমার পাশেই। যতক্ষণ তুমি মানুষের শ্রমে শ্রদ্ধাশীল যতক্ষণ তুমি পাহাড়ী নদীর মতো খরস্রোতা যতক্ষণ তুমি পলিমৃত্তিকার মতো শস্যময় ততক্ষণ ...

নির্মলেন্দু গুণ

নাস্তিক

নেই স্বর্গলোভ কিংবা কল্প নকরে ভয় অলীক সাফলমুক্ত কর্মময় পৃথিবী আমার। চর্মচোখে যা যা দেখি, শারীরিক ইন্দ্রিয় যা ধরে তাকেই গ্রহণ করি। জানি নিরাকার অপ্রত্যক্ষ শুধুই ছলনা, বিশ্বাস করি না ভাগ্যে, দেবতার বরে ...

নির্মলেন্দু গুণ

সূর্য আমাকে চুম্বন করেছে

ঘুমাতে যাওয়ার আগে, জানালার পর্দা টেনে দিয়ে ঘরটাকে অন্ধকার করতে গিয়ে আমার চোখ পড়লো কোটিকোটি, লক্ষলক্ষ জবা-কুসুমের মতো লাল সূর্যটার ওপর। আমি সূর্যকে বললাম--"ডুবে যাবার আগে আমার কপালে একটা চুমু দাও না সো...

নির্মলেন্দু গুণ

ভয়

আজকাল পাইপের তামাক পুড়িয়ে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ওঠে ধোঁয়া, দেখে খুব হাসি পায়, আবার ভয়ও হয় । এতদিন তো যেতো না, আজকাল আগুনের দিকে চোখ ছুটছে কেন ? আমিও শেষে মরেটরে যাবো নাকি ! মৃত্যুকে এক বিন্দু বিশ্বাস করি না...

নির্মলেন্দু গুণ

স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায় বা প্রচ্ছদের জন্য

স্বপ্ন-জড়ানো অবাক কণ্ঠে আঁধার পালালো সাদা পালকের শারদ সকালে নবজাতকের পদ্মচোখের সহসা আড়াল লাল উদয়ন নয়ন মেলালো গন্ধ ছড়ানো পুবের আকাশে রক্তের ছাপ লাল প্রচ্ছদ নিপুণ তুলির হলুদ ফড়িং আমরা ক'জন আগামী দিনের চ...

নির্মলেন্দু গুণ

সেই প্রজাপতি

ফুলের মতো দেয়ালটাতে একটি প্রজাপতি, দুঃসাহসে বসলো এসে আলোর মুখোমুখি; চিত্রিত নয় কালো রঙের পাখনা দু'টি মেলে । এবার বুঝি এলে ? দেয়াল জুড়ে লাগল তার ঘরে ফেরার কাঁপন, প্রাণের মাছে ফিরল বুঝি চিরকালের আপন...

নির্মলেন্দু গুণ

পৃথিবী

তুমি ডেকেছিলে, আমি চলে এসেছিলাম একা । কোনো কিছু সঙ্গে নিইনি, সঙ্গে করে নিইনি পানীয়, তিল-তিসি-তামা বা বিছানা বালিশ, তুমি বলেছিলে সব পাওয়া যাবে, --এ শহর নেশার ও নারীর । তুমি ডেকেছিলে, জননীর কোমল বিছানা ...

নির্মলেন্দু গুণ

তুমি চলে যাচ্ছো

তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে, কালো ধুঁয়ার ধস ধস আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে তোমার ক্লান্ত অপস্রিয়মাণ মুখশ্রী,-সেই কবে থেকে তোমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার চল...

নির্মলেন্দু গুণ

তুলনামূলক হাত

তুমি যেখানেই স্পর্শ রাখো সেখানেই আমার শরীর৷ তোমার চুলের ধোয়া জল তুমি যেখানেই খোঁপা ভেঙ্গে বিলাও মাটিকে; আমি এসে পাতি হাত, জলভারে নতদেহ আর চোখের সামগ্রী নিয়ে ফিরি ঘরে, অথবা ফিরি না ঘরে, তোমার চতুর্দি...

নির্মলেন্দু গুণ

তোমার চোখ এতো লাল কেন

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক, শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ আমাক...

নির্মলেন্দু গুণ

বাৎস্যায়ন ০৬

সাদা আকাশ কালো মেঘের ধর্ষণে কম্পিত । নগরে সে বর্ষা কোথায় ? সে ছিল ঐ গ্রামে । আমি তাকে পেয়েছিলাম জন্মদিনের দামে । জন্মেছিলাম সাত আষাঢ়ের বর্ষাডাকা ভোরে, আঁতুর ঘরে তুষ ভিজেছে উশ্যিলারই তোড়ে । সে-দাবী...

নির্মলেন্দু গুণ

নাম দিয়েছি ভালবাসা

আমরা মিশিনি ভালবেসে সব মানুষ যেভাবে মেশে, আমরা গিয়েছি প্রাজ্ঞ আঁধারে না-জানার টানে ভেসে। ভাসতে ভাসতে আমরা ভিড়িনি যেখানে নদীর তীর, বুনোবাসনার উদবেল স্রোতে আশ্লেষে অস্থির। আমরা দুজনে রচনা করেছি একে অপরে...

নির্মলেন্দু গুণ

দুজনের ভাত

গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে খেতে মনে কি পড়ে না? পড়ে । ভালো কি বাসি না? বাসি । শ্লথ টেপ থেকে সারা দিন জল ঝরে, সেই বেনোজলে এঁটো মুখ ধুয়ে আসি । গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে খেতে প্রেম কি জাগে না? জাগে । কিছু...

নির্মলেন্দু গুণ

নখের বকুল

হাত ভেবে যেই ছুঁতে গেছি, তুমি বললে, ছি! ওটা আমার পা। একটুখানি থমকে গেলাম। গুণে দেখলুম পাঁচটি আঙ্গুল, পাঁচখানি নখ, পাঁচটি বকুল; হাতের মতই ভাগ্যরেখা, লাল টুকটুক গা। আমি যতই হাত বলছি, তুমি বলছো “না”।...

নির্মলেন্দু গুণ

প্রথম অতিথি

এরকম বাংলাদেশ কখনো দেখোনি তুমি, মুহুর্তে সবুজ ঘাস পুড়ে যায়, ত্রাসের আগুন লেগে লাল হয়ে জ্বলে উঠে চাঁদ, নরম নদীর চর হা করা কবর হয়ে গ্রাস করে পরম শত্রুকে, মিত্রকে জয়ের চিহ্ন, পদতলে প্রেম, ললাটে ধুলো...

নির্মলেন্দু গুণ

পুনশ্চ ক্যামেলিয়া

ভাবিনি দেখবো কোনোদিন। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ক্যামেলিয়া কবিতায়, বহু-চেষ্টায় একবার একখানা কল্পনায় ফুটেছিলো বটে। এই বিশ্বতল্লাটে তাকে বাস্তবে দেখিনি কখনও। আমার প্রথম ক্যামেলিয়া দেখা হলো মেলবোর্নে। দেখলাম...

নির্মলেন্দু গুণ

পৌত্তলিক

যখন আমি তোমার মুখের দিকে তাকাই, মনে হয় দুটি শিল্পিত হাতের দশটি আঙ্গুল চীনামাটির ফ্লাওয়ার-ভাসের মতো আদর করে ধরে রেখেছে তোমার গৌরবর্ণ স্নিগ্ধ মুখখানি। সেই কবে একদিন সুদূর শৈশবে মাটির প্রতিমা দেখে মুগ্ধ ...

নির্মলেন্দু গুণ

ফুলদানি

যেকোনো বাগান থেকে যেটা ইচ্ছে সেই ফুল, যেকোনো সময় আমি তুলে নিয়ে যদি কভু তোমার খোঁপায়, আহা, অজগর তোমার খোঁপায় সাজাবার সুজোগ পেতাম–; তাহলে দেখতে লীলা, তোমার শরীর ছুঁয়ে লাবণ্যের লোভন ফুলেরা উদ্বেল হৃ...

নির্মলেন্দু গুণ

প্রেমাংশুর রক্ত চাই

নিষিদ্ধ ভুবনগুলি অতিক্রম করে গেলো যারা, রাতের আঁধার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যে ক্রুদ্ধ জীবন-জনতা অতিক্রম করে গেল বাধা, অথবা অতিক্রমণের মুখে যারা রোজ রোজ বাঁধা পড়ে, সেইদিনও বাঁধা পড়েছিল এবং আগামী রাতেও বিদ্ধ হবে য...

নির্মলেন্দু গুণ

যুদ্ধ

যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা, যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা৷ কাব্যগ্রন্থঃ --প্রেমাংশুর রক্ত চাই...

নির্মলেন্দু গুণ

প্রশ্নাবলী

কী ক'রে এমন তীক্ষ্ণ বানালে আখিঁ, কী ক'রে এমন সাজালে সুতনু শিখা? যেদিকে ফেরাও সেদিকে পৃথিবী পোড়ে । সোনার কাঁকন যখন যেখানে রাখো, সেখানে শিহরে, ঝংকার ওঠে সুরে । সুঠাম সবুজ মরাল বাঁশের গ্রীবা কঠিন হাতের ...

নির্মলেন্দু গুণ

বহুগামীর স্বীকারোক্তি

কতো নারী-সরোবরে থেমেছে আমার রথ; কতো ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়েছে জীবন। যখন পড়েছি প্রেমে পাগলের মত পড়েছি। বহু-জীবনের বহু-বাসনায় আমি বহুগামী। তবে আমি একা বহুমাগিতার ভূতে-পাওয়া এক কামতুর কবি, একথা বিশ্বাস করি ...

নির্মলেন্দু গুণ

বাংলাবাজারে পূর্ণিমা

আকাশে কী চমৎকার চাঁদ। বিউটি বোর্ডিং-এর ছাদ বেয়ে ট্যাংকের জলের মতো গড়িয়ে পড়ছে সোনারঙের জোৎস্না । আজ রাতে বাংলাবাজারের পথে পথে চাঁদ কুড়ানোর ধূম। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'চাঁদের অমাবস্যা' বুঝি অকস্মাৎ 'পাণ্ডুল...

নির্মলেন্দু গুণ

বৃদ্ধা

নববিপ্লবে তুমিও তরুণী হবে তোমার আকাশে ফুটবে হাজার তারা, চন্দ্রনাভির উদ্দাম অনুভবে জ্বলবে তরুণ উন্মাদ দিশেহারা। বৃদ্ধা, তোমার বেদনা কিসের বলো? নারীযৌবন নদীর জোয়ার জানে, তুমি হবে ফের অগ্নিতে ঝলোমলো শীতর...

নির্মলেন্দু গুণ

ভয় পাওয়ার দায়

জীবন্ত মানুষ সমুদ্রকে ভয় পায় । অচেনা-অসীম আকাশকে তার ভয় । সে ভয় পায় দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু মরুভূমির সামনে দাঁড়িয়ে । সে ভয় পায় যখন লকলকে শিখা বাড়িয়ে শ্মশানের চিতা তাকে ডাকে । সে ভয় পায় যখন কবর খোঁড়ার শব্...

নির্মলেন্দু গুণ

ভালোবাসার জন্য ছুটি

গতকাল সিন্ধান্ত নিয়েছি,আমি আবার ভালবাসবো। ভেবেছিলাম আমি আর কাউকে ভালবাসবো না,কিন্তু তোমাকে দেখার পরই আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টেছি, আমি আবার কিছুদিনের জন্য তোমাকে ভালবাসবো। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার কেব...

নির্মলেন্দু গুণ

মানুষ

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম, হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়; মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌঁড়ে পালায়। আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি, গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাক...

নির্মলেন্দু গুণ

মুজিব মানে মুক্তি

মুজিব মানে আর কিছু না মুজিব মানে মুক্তি ; পিতার সাথে সন্তানের ঐ না-লেখা প্রেম চুক্তি । মুজিব মানে আর কিছু না মুজিব মানে শক্তি ; গর্বিত শির বীর-বাঙালির চিরকালের ভক্তি । মুজিব মানে আর কিছু না এক-যমুনা র...

নির্মলেন্দু গুণ

মানুষের হৃদয়ে ফুটেছি

গতকাল ছিল কালো-লালে মেশা একটি অদ্ভুত টুনটুনি । লাফাচ্ছিল ডাল থেকে ডালে, পাতার আড়ালে, ফুল থেকে ফুলে । তার সোনামুখী ঠোঁট, যেন কলমের ডগায় বসানো একরত্তি হীরে । প্রতিটি আঁচড়ে কেটে ভাগ করছিল ফুল থেকে মধু...

নির্মলেন্দু গুণ

যতটুকু প্রেমে

বৈরীতে বিশ্বাসী নই, হিংস্রতা মানায় সিংহে, বনরাজ্যে, তাই জীবজ্ঞানে ক্ষমা করি সব অরণ্যের ক্ষিপ্র ব্যভিচার। সিংহ নেই, ছড়ানো ভুবন জুড়ে প্রেমার্ত বোধের অশ্ব ছোটে প্রতিদিন। রেশমী কেশর থেকে ঝরে নিত্য মানবিক ...

নির্মলেন্দু গুণ

যুদ্ধ

যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা।...

নির্মলেন্দু গুণ

মুঠোফোনের কাব্য ০০২

মহামান্যা মহারানী, সুপ্রভাত। হে ভদ্রে, আপনার অনুগত ভক্ত ও পদানত প্রেমান্ধ প্রজাকুলের মোবাইল ম্যাসেজ কি আপনি গ্রহন করতে শুরু করেছেন? তার আগে জানি, গত রজনীতে আপনার নিদ্রাকুসুমে কোনােরূপ ব্যাঘাত ঘটেনি ...

নির্মলেন্দু গুণ

মুঠোফোনের কাব্য ০০৩

যখন সে সমুদ্রে নামে, লাল । সমুদ্রও কবি হয়ে যায় । সুন্দরের ছটা দেখে ছুটে এসে সমুদ্র লুটায় তার পায় । যেন সর্বস্ব হারিয়ে পাওয়া এ-ই তার সর্বশেষ ধন । অনন্ত আপন । যখন সে সমুদ্রে নামে, লাল । যখন সে উঠে আসে, ...

নির্মলেন্দু গুণ

লজ্জা

আমি জানি, সে তার প্রতিকৃতি কোনোদিন ফটোতে দেখেনি, আয়নায়, অথবা সন্দ্বীপে বসে যেরকম সর্বনাশা সমুদ্রে দেখা যায়, তার জলে মুখ দেখে হঠাৎ লজ্জায় সে শুধুই ম্লান হতো একদিন । আমি জানি পিঠ থেকে সুতোর কাপড় কোনোদিন...

নির্মলেন্দু গুণ

শুধু তোমার জন্য

কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন। তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও কতবার যে আমি সে কথা বলিনি সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন। তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উ...

নির্মলেন্দু গুণ

শোকগাথা : ১৬ আগস্ট ১৯৭৫

আজ সারাদিন আমার চতুর্দিকে বড় শোকাচ্ছন্ন নীরবতা ছিল। একটি মৌমাছি আমার বুকে বসে আজ সারাদিন আমাকে তার মধু-সংগ্রহের সংগ্রামী ইতিহাস শুনিয়েছে : কাছেই কোথাও জন্ম হবে এক নতুন শিশুর, তার চিৎকার-করা মুখের জন...

নির্মলেন্দু গুণ

সেই রাত্রির কল্পকাহিনী

তোমার ছেলেরা মরে গেছে প্রতিরোধের প্রথম পর্যায়ে, তারপর গেছে তোমার পুত্রবধূদের হাতের মেহেদী রঙ, তারপর তোমার জন্মসহোদর, ভাই শেখ নাসের, তারপর গেছেন তোমার প্রিয়তমা বাল্যবিবাহিতা পত্নী, আমাদের নির্যাতিতা মা...

নির্মলেন্দু গুণ

স্ববিরোধী

আমি জন্মেছিলাম এক বিষণ্ন বর্ষায়, কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত । আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে, কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল । আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে, কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি। আমি জন্মে...

নির্মলেন্দু গুণ

তোমার পায়ের নিচে পৃথিবীর ঘাস আছে বলে

যখন তোমাকে বলি “ভালোবাসি”- তার মানে এই নয়, আমি তুমি ছাড়া আর কিছু ভালোই বাসি না। যখন তোমাকে বলি ভালোবাসি- পাশাপাশি আমি কি তখন দেখি না আকাশে মেঘ? পাতার আড়ালে ফুল? ফুলের উপরে পাখি? তোমাকে দেখার নামে আমি ...

নির্মলেন্দু গুণ

আক্রোশ

আকাশের তারা ছিঁড়ে ফেলি আক্রোশে, বিরহের মুখে স্বপ্নকে করি জয়ী; পরশমথিত ফেলে আসা দিনগুলি ভুলে গেলে এতো দ্রুতো,হে ছলনাময়ী? পোড়াতে পোড়াতে চৌচির চিতা নদী চন্দনবনে আগ্নির মতো জ্বলে, ভূকম্পনের শিখরে তোমার মু...

নির্মলেন্দু গুণ

অসমাপ্ত কবিতা

মাননীয় সভাপতি। সভাপতি কে? কে সভাপতি? ক্ষমা করবেন সভাপতি সাহেব, আপনাকে আমি সভাপতি মানি না। তবে কি রবীন্দ্রনাথ? সুভাষচন্দ্র বসু? হিটলার? মাও সে তুং? না, কেউ না, আমি কাউকে মানি না, আমি নিজে সভাপতি এই মহত...

নির্মলেন্দু গুণ

কাক

কাকের মুখে তুলে দিয়েছি নষ্ট ডিম, এ নষ্ট জীবন আমি কার কাছে দেবো? বাসন্তী কোকিল হতে গিয়ে আমি ভুল করে হয়ে গেছি কাক। অথবা ছিলাম কাক, অপরাধে এই জন্মে নষ্ট ডিমের মত হয়েছি মানুষ। এরকম নষ্ট মানুষ আমি কোথায় লু...

নির্মলেন্দু গুণ

অগ্নিতে যার আপত্তি নেই

থামাও কেন? গড়াতে দাও, গড়াক; জড়াতে চায়? জড়াতে দাও, জড়াক । যদি পাকিয়ে ওঠে জট, তৈরি হবে নতুন সংকট সুখ না হলে দুঃখ দিয়ে পূর্ণ হবে ঘট । ডরাও কেন? এগোতে দাও জাগুক; সরাও কেন? আগুনে হাত লাগুক । জীবন শেষে মরণ ...

নির্মলেন্দু গুণ

আবার যখনই দেখা হবে

আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ 'ভালোবাসি'। এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে, অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়, আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে তোমার প্রতিম...

নির্মলেন্দু গুণ

আনন্দকুসুম

হয়তো দূরে কেউ কল্পনার বলে শুক্র-সমাধির স্বপ্ন দেখেছিল, মোহন যামিনীর মেদুর মেঘনীড়ে গোপন অভিসারে চরণ রেখেছিল। হয়তো ছিল তার আমারি মত কিছু পূর্ণ-মিলনের পথের পিছুটান, স্বামীর সোহাগের বিবেকী দংশনে যন্ত্রণার...

নির্মলেন্দু গুণ

আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো

এসেছে কান্নার দিন, কাঁদো বাঙালি, কাঁদো। জানি, দীর্ঘদিন কান্নার অধিকারহীন ছিলে তুমি, হে ভাগ্যহত বাংলার মানুষ, আমি জানি, একুশ বছর তুমি কাঁদতে পারোনি। আজ কাঁদো। আজ প্রাণ ভরে কাঁদো, এসেছে কান্নার দিন, দীর...

নির্মলেন্দু গুণ

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি, রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি। আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি। শহিদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি...

নির্মলেন্দু গুণ

আমার জন্ম

তপ শেষে যখন বাল্মীকি তাঁর মুদিত নয়ন খুলিলেন, দেখিলেন লব নেই; চোখের সমুখে দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু শূন্য তপোবন প’ড়ে আছে৷ ‘কোথা লব, কোথা লব? ফিরে আয়৷’ ডাকিলেন মুনি, ফিরে এলো প্রতিধ্বনি, শিশু লব দিলো না উত...

নির্মলেন্দু গুণ

আমার সংসার

সংসার মানে সোনার কাঁকনে জীবনের রঙ লাগা, সংসার মানে রক্তে মাংসে সারারাত্রির জাগা। সংসার মানে অপেক্ষমাণ এক জোড়া চোখে দাবি, সংসার মানে সাজানো ভুবন, আঁচলের খোঁটে চাবি। সংসার মানে অনাগত শিশু, পুতুলে সাজানো...

নির্মলেন্দু গুণ

আমার কিছু স্বপ্ন ছিল

আমার কিছু স্বপ্ন ছিল, আমার কিছু প্রাপ্য ছিল, একখানা ঘর সবার মতো আপন করে পাবার, একখানা ঘর বিবাহিত, স্বপ্ন ছিল রোজ সকালে একমুঠো ভাত লঙ্কা মেখে খাবার। সামনে বাগান, উঠোন চাইনি, চেয়েছিলাম একজোড়া হাঁস, একজো...

নির্মলেন্দু গুণ

কবিতা কেন টিকে থাকবে

শেষ-পর্যন্ত টিকে থাকবে কবিতা। কেননা, কবিতা হচ্ছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং আত্মার সঙ্গম থেকে উৎসরিত এক অবিনশ্বর শক্তির প্রকাশ। ধ্বংসের মুহুর্তে বস্তুর ভিতর থেকে সে অনায়াসে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। সে পারে...

নির্মলেন্দু গুণ

ইয়াহিয়াকাল ০২

(ইতিহাস না জানা এবং ইতিহাস ভুলে যাওয়া, বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালির কাছে স্বল্পপরিসরে মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস রসঘনপথে বর্ণনা করার জন্যই আমি পালাগানের আদল গ্রহন করেছি। তাই বেদনাদীর্ণ বহু ঘটনাকে আমি পরিবেশ...

নির্মলেন্দু গুণ

ইয়াহিয়াকাল ০১

(ইতিহাস না জানা এবং ইতিহাস ভুলে যাওয়া, বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালির কাছে স্বল্পপরিসরে মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস রসঘনপথে বর্ণনা করার জন্যই আমি পালাগানের আদল গ্রহন করেছি। তাই বেদনাদীর্ণ বহু ঘটনাকে আমি পরিবেশ...

নির্মলেন্দু গুণ

উল্লেখযোগ্য স্মৃতি

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত কোনো স্মৃতি নেই, যাকে ঠিক ভালোবাসা কিংবা প্রেম বলা যায়। একদিন টুকুদি নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে বলেছিল: তোর বউ তোকে খুব ভালোবাসবে দেখিস।' সে-ই আমার প্রেম, সে...

নির্মলেন্দু গুণ

উপেক্ষা

অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য শিখিনি৷ তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি সমস্ত বোধের উত্স গ্রাস করা প্রেম; যদি চাও ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও৷ আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভি...

নির্মলেন্দু গুণ

স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’ এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না, এই বৃক্ষে ফুলে...

নির্মলেন্দু গুণ

ঐ সব অর্বাচীন ধারণাসমূহ

পাপড়ির কোমলতাহেতু অহংকারী ছিল ফুল, বর্ণের ঔজ্জ্বল্য নিয়ে গর্ব ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার, বুকের সুগন্ধ নিয়ে গর্ব ছিল লাল গোলাপের, মাংসের দন্তসুখ নিয়ে গর্ব ছিল বন্য হরিণের ; আলিঙ্গনপটুরূপে খ্যাতিশীর্ষে ছিল অক্টো...

নির্মলেন্দু গুণ

এবারই প্রথম তুমি

ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে এবারই প্রথম তুমি৷ এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে৷ এবারই প্রথম তুমি৷ এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না৷ ফুলে...

নির্মলেন্দু গুণ

জনাকীর্ণ মাঠে জিন্দাবাদ

বাসন্তী হলুদে হাঁটো, তাই বাস থেকে নেমে পড়ি নীল মেডিকেলে; অথচ টিকিটগুলো শ্যামলী শ্যামলী। তুমি বোললে খোলাচুলে কালো-ব্যাজ, শোকচিহ্ন হয়, বুকে কালো ফিতে বাঁধা পুরুষে মানায়; তুমি বােললে তাই, পাঞ্জাবিতে ক...

নির্মলেন্দু গুণ

চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা

চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা নদীর জল তোমাকে যেভাবে পেয়েছে আমি সেভাবে পাই নি! লাক্স সাবান যেভাবে তোমাকে ছুঁয়েছে আমি সেভাবে ছুঁইনি। মেডলিন লিপস্টিক যেভাবে তোমাকে চুমু খেয়েছে আমি সে সুযোগ পাই নি। প্রসাধন ঘরের ...

নির্মলেন্দু গুণ

হাসানের জন্যে এলিজি

প্রেমিকারা নয়, নাম ধরে যারা ডাকে তারা ঝিঁঝি, তাদের যৎসামান্য পরিচয় জানা থাকা ভালো; বলতেই মৃত্তিকারা বক্ষ চিরে তোমাকে দেখালো–; অভ্যন্তরে কী ব্যাকুল তুমি পড়ো ডুয়িনো এলিজি । কবরে কী করে লেখো? মাটি কি কাগ...

নির্মলেন্দু গুণ

হুলিয়া

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর, আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ, শোঁ শোঁ করছে হাওয়া। আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে৷ কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, ট্রেনে সিগারেট জ্বাল...

নির্মলেন্দু গুণ

আগ্নেয়াস্ত্র

পুলিশ স্টেশনে ভিড়,আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার স্বীকৃত মানৎ; টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত। আমি শুধু সামরিক ...

নির্মলেন্দু গুণ

আকাশ সিরিজ

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব, ঐ আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন। শুধু তোমাকে একবার ছোঁব, অহংকারে মুছে যাবে সকল দীনতা। শুধু তোমাকে একবার ছোঁব, স্পর্শসুখে লিখা হবে অজস্র কবিতা। শুধু তোমাকে একবার ছোঁব, শুধু একবার ...

নির্মলেন্দু গুণ

অক্সি-এসিটিলিনের শিখা

হাজার হাজার কোটি শব্দের ভিড়ে মিশে-যাওয়া তোমার নাম টন টন অন্ধকারের ভিতর থেকে মুহূর্তের মধ‌্যে জ্বলে উঠলো কম্পিউটারের রূপালি পর্দায়, যেন অক্সি-এসিটিলিনের শিখা। আর তা দেখামাত্র আমি অপেক্ষমাণ প্রেমিক-প...

নির্মলেন্দু গুণ

কাশফুলের কাব্য

ভেবেছিলাম প্রথম যেদিন ফুটবে তোমায় দেখব, তোমার পুষ্প বনের গাথা মনের মত লেখব। তখন কালো কাজল মেঘ তো ব্যস্ত ছিল ছুটতে, ভেবেছিলাম ক'দিন আরো যাবে তোমার ফুটতে। সবে তো এই বর্ষা গেল শরত এলো মাত্র, এরই মধ্যে শু...

নির্মলেন্দু গুণ

উন্নত হাত

আগুন লেগেছে রক্তে মাটির গ্লোবে, যুবক গ্রীষ্মে ফাল্গুন পলাতক। পলিমাখা চাঁদ মিছিলে চন্দ্রহার উদ্বত পথে উন্নত হাত ডাকে, সূর্য ভেঙেছে অশ্লীল কারাগার। প্রতীক সূর্যে ব্যাকুল আগ্নি জ্বলে, সাম্যবাদের গর্বিত ক...

নির্মলেন্দু গুণ

এখন তোমার বোধনবেলা

এই শরতে, এখন তোমার বোধনবেলা । ভক্তরা সব সদলবলে তোমার দ্বারে ভিড় করেছে, তাদের হাতে পূজার থালা ধুপগন্ধে, ফুলে-ফলে, ধান-দুর্বায় পূর্ণ । আমার জন্মশূন্য হাত দু'খানা নিয়ে, আমি তোমার দ্বারে এসেছি আজ প্রিয়ে ...

নির্মলেন্দু গুণ

আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও

আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, মাথার চুল মেঘের মতো উড়ুক । আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, স্বপ্নগুলো ছায়ার মতো ঘুরুক । আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, আটোমেটিক ঘড়ির মতো চলতে থাকি একা । আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, অন্ধকারে সলতে ...

নির্মলেন্দু গুণ

Loading...