মূল বিষয়বস্তুতে যান

যতীন্দ্রমোহন বাগচী এর রচনাবলি

ক্ষ্যাপা

(বাউল) ওরে ক্ষ্যাপা, যদি প্রাণ দিতে চাস্- এই বেলা তুই দিয়ে দে না; ওরে, মানের তরে প্রাণটি দেবার এমন সুযোগ আর হবে না! যখন, দু-দিন আগে দু-দিন পরে- তফাৎ মাত্র এই, তখন অমূল্য এই মানবজীবন বৃথায় দিতে নেই- (ও...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

প্রভাতে বিদায়

সঙ্কীর্ণ তীরের সীমা সাগরে ঘিরেছে একেবারে; সমুজ্জ্বল সূর্যালোক দেখা যায় শৈল-পরপারে, সরল সে পথখানি, তার লাগি স্বর্ণালোক ভরা- আর মোর লাগি-কোথা কর্মময় লোকময় ধরা!...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

মিলন

কাল রজনীতে উঠে নাই চাঁদ, ফুটেনি একটি তারা, বিরহী বাতাস আঁধারের মাঝে হয়েছিল দিশাহারা। জোনাকি জ্বলেনি যুথি-মালঞ্চে, ঝিঁঝিটি ডাকেনি ঝাড়ে, টিটিপাখি শুধু টিকারি দিয়া কেঁদেছে দীঘির পাড়ে; তারি মাঝে আমি ইমন-ব...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

পাঞ্চজন্য

দুখে গাঁথা এই জীবনের মালা, তবু এবে ভালো লাগে;-কালো আকাশের অন্ধ বেদনা রঞ্জিত উষারাগে! গন্ধ বিলায়ে ঝরে পড়ে ফুল সন্ধ্যার কিনারায়, নিশি না পোহাতে মরে যায় হাওয়া দখিনের জানালায়; বৌ-কথা-কও সুরের আবেশে বধূ ধী...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

দোলের দিনে

রঙ্গময়! এ কী রঙে রাঙাইলে এ নব ভুবন! কোথায় সে রসলীলা, কোথা সে আনন্দ-বৃন্দাবন? চির-সুন্দরের সাথে চির-সুন্দরীর হোরিখেলা- নবীন, বসন্তে আজি কই সেই সুন্দরের মেলা? পথঘাট তরুলতা রাগরক্ত আবিরে-আবিরে, কুঙ্কুমের...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

হর-পার্বতী

পার্বতী বলে, ঘর করি এস, শিব বলে, চল ঘর ছাড়ি,- এমনি করিয়া চির-দিন দোঁহে সংসার পারে সংসারী! ধরায় অধরা গিরি-কৈলাস, মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস, বন্ধ-মুক্তি যুগলমূর্তি ইহ-পরকাল কাণ্ডারী। অন্নপূর্ণা পারে না মি...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ফুলের দণ্ড

শেষ পাপড়িটি ঝরিয়া পড়েছে ভূমিতলে- শেষ রেণুকণা বাতাস নিয়াছে লুটি; কালকে যা ছিল ফুল হয়ে দলে-পরিমলে, আজ তার শুধু বোঁটার মাঝারে ছুটি! প্রজাপতি আর ভুলেও সেথায় নাহি বসে, অলিগুঞ্জন কানে আর নাহি বাজে; উতলা সমী...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আইবুড়ো কালো মেয়ে

সন্ধ্যা-আকাশ নীরবে তখন আঁধার আসিছে ছেয়ে; দাওয়ার উপরে ছায়ার মতন বসে আছে কালো মেয়ে। বিরল বসতি ছোট গৃহখানি, গোটা দুই কোঠা-ঘর; অদূরে তাহারি বহিছে 'তুফানী', সম্মুখে বালুচর। পল্লীর গৃহ-শান্ত রজনী, সাঙ্গ যা-...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কবির গান

বাদরধারা ধরিয়া গেল, উঠিয়া কবি ধীরে নগর ছাড়ি সুদূর মাঠে চলে,- পুরব হতে গগন স্রোতে বহিল মৃদু বায়ু বিছায়ে ছায়া শ্যামল তৃণদলে। বিজনে একা বসিয়া কবি কণ্ঠ দিল ছাড়ি- মধুর ধ্বনি ছাড়িয়া ধরা চলে; মেঘের পথে হাঁস...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

খাঁটি সত্য

আমার প্রিয়ার নয়ন নহেকো হরিনীর চেয়ে ভালো, আঁখিতারা তার কালো বটে, নয় ভ্রমরের চেয়ে কালো! চঞ্চল আঁখি ইঙ্গিতে কভু খঞ্জন নাহি নাচে, বেণীর তুলনা শুনিয়া নাগিনী লাজে না লুকায়ে বাঁচে! মুখখানি দেখে চাঁদ বলে কারো...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শিশুর বাণিজ্য

আমার খোকার নৌকাখানির দাম সে লক্ষটাকা- ঝিনুক-নায়ে পাল তোলা তার প্রজাপতির পাখা; চাঁপার কলি দাঁড় ক-খানি, অপ্রাজিতার হাল, মাস্তুলটি সদ্য গড়া পদ্মফুলের নাল! কোথায় যাবে সোনার খোকা-বাণিজ্যি করতে-দেশবিদেশের ম...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

জেলের মেয়ে

ভুট্টো ক্ষেতের পাশে মোদের ছোট্ট কুটিরখানি; শিয়র দিয়ে যাচ্চে বেয়ে ময়না গাঙের পানি- এক্কেবারে আমাদের ওই মাদার গাছের তলে; গাছের ছায়া আধেক ডাঙায়, আধেক পড়ে জলে। বাবা আমার মস্ত জেলে ময়না গাঙের তীরে- সাঁঝে ব...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বয়ঃসন্ধি

মুকুলের বার্তা বহি তনুলতা আরক্ত পল্লবে, চপল চোখের ভাষা লভিয়াছে বাণীর সন্ধান; গালের গোলাপজাম পরিপুষ্ট গোলাপি গৌরবে, কৃষ্ণসায়রের জলে কালো কেশ করে নিত্যস্নান! মঞ্জরিত বক্ষতলে রহস্যের মন্দার-মঞ্জরি আপন গো...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

জোনাকি

সূর্য গেল অস্তাচলে, দিগন্তরেখায় স্বর্ণ আভা রাখি- বাবলার শাখা হতে নমি তারি পায় কহিল জোনাকি;- তাপহীন তেজোরাশি হে রক্ত গোধূলি কহি মোর সাধ,- আদর্শ তোমার আজি শিরে লব তুলি কর আশীর্বাদ; তুমি যবে চলে যাবে, তব...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কালো আঁখি

কালো আঁখি তব, সখি, সরসীর জল; অতল অপরিমেয় প্রশান্ত নির্মল শোভা তার- তটশোভা, শ্যাম কুঞ্জবন;- উদার আকাশ পট বিম্বিত যেমন সরসীর স্বচ্ছ বারিমাঝে-ওগো প্রিয়ে, তেমনি সুন্দর শোভা রয়েছে ফুটিয়ে তোমার নয়ন মাঝে; স্...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শেষের রাত

ভাদ্রমাস; দূর প্রবাস; পরের দাস; সঙ্গীহীন; দ্বিপ্রহর; শুদ্ধঘর; শূন্যচর; দীর্ঘদিন; গ্রন্থ নাই--কর্ম-ছাই ঘনায় মেঘ; বন্ধদ্বার; বিরামহীন বর্ষাদিন; অন্ধকার-অন্ধকার! রুগ্নকায়; নিদ্রা নাই; দীর্ঘরাত-একলা তায়; ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

'স্বপ্নো নু মায়া নু'

এক ফালি জ্যোৎস্নাসম প্রিয়া মোর রহিয়াছে মিশি শুভ্র শয্যাটির সাথে-মূর্ছাতুরা পূর্ণিমার নিশি! শ্রাবণের আর্দ্রবায়ে কেতকীর গন্ধ ভেসে আসে দক্ষিণের বাতায়নে; নিশীথের নিঃশব্দ আকাশে কথা কও, কথা কও-ক্লিষ্ট কণ্ঠে...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আত্মীয়তা

মুখরা মেদিনী যবে মৌনী হয়ে আসে, সন্ধ্যা অন্ধকার নামি বনান্তের পাশে ধীরে ধীরে ঘিরে বিশ্ব তিমির অঞ্চলে,- আঁখি মোর তারি তরে ভরি আসে জলে। গুরু গুরু মেঘ গর্জে ধ্বনিত ধরণী, ঝর ঝর ঝরে ধারা নিরন্তর-ধ্বনি, তারি...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শেষ

শেষ অঞ্জলি নিঃশেষ আজি- শেষ সাজি যাহা ভরিবার; পরাজিত এই অপরাজিতার সময় হয়েছে ঝরিবার! অন্তরযামী দেবতা, পুষ্পজীবন বৃথা গেল বহি- কেমনে ভুলিব সে কথা! কুঞ্জ ভরিয়া ধ্বনিয়া উঠিল অপরাজিতার পরাজয়; সুদূরে-আঁধারে ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আবেশ

যে দিন সবে সন্ধ্যা নামে দিনের অবসরে, আছে ছেয়ে আঁধার পাতা দিনের আঁখি 'পরে- কর্মহীনের যা কিছু কাজ, সজ্জাহীনের যা কিছু সাজ সাঙ্গ করে বসে আছি সঙ্গীবিহীন ঘরে- সে দিন যবে সন্ধ্যা নামে দিনের অবসরে। সবে তখন ফ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

নেবুফুল

ছোট্ট নেবুর ফুলটি আমার, ছোট্ট নেবুর ফুল-- স্বর্ণ উষার কর্ণ ভূষার বর্ণ তুষার দুল! চন্দ্রধবল সরস কান্তি চন্দনজল পরশ শান্তি; মন্দমারুত বন্দনারত গন্ধ তব অতুল! ছোট্ট নেবুর ফুল- সন্ধ্যামুখের সৌরভী ভাষা, বন্...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

গোধূলি

ছায়া-ঝিকিমিকি স্বর্ণ আলোক আমি সন্ধ্যা-রবির কিরণের অনুগামী, প্রদোষ-নীরবে ধীরে ধীরে আমি নামি- গোধূলি আমার নাম পাখিদের আমি কুলায়ে ভুলায়ে আনি, হাওয়ায় বহাই ফুলের সুরভিখানি, ক্লান্ত গাভীরে গৃহপানে আমি টানি-...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

রথ

কাননের কোলে শ্যামল কোমল পথটি- তাহারি উপরে চলিয়াছে ধীরে রথটি। সমুখে সুদূরে উদিছে প্রভাত রবি, হাসিছে জগৎ মধুর সোনালি ছবি, পথ তরুসারি ভরিয়া রয়েছে ফুলে, শাখায় শাখায় দোয়েল পাপিয়া বুলে; নব উৎসাহে চলেছে নূতন...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

জীবন ও মৃত্যু

জন্মের মাঝে মৃত্যুর বাস, সুখের মাঝারে দুখ; ওরে মন, তুই জেনে-শুনে তবু কেন বিষণ্ণ মুখ? ফুলের কোরকে ফলটি হেরিয়া ব্যথা পেয়েছিস্ কবে? জীবনের মাঝে মরণে দেখিয়া নয়ন মুছিতে হবে। চন্দ্র সূর্য অস্ত যায় সে, আবার ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

খেলা

সিন্ধুতীরে খেলে শিশু বালি নিয়ে খেলা; রচি গৃহ, হাসিমুখে ফিরে সন্ধ্যাবেলা জননীর অঙ্ক'পরে। প্রাতে ফিরে আসি হেরে-তার গৃহখানি কোথা গেছে ভাসি! আবার গড়িতে বসে-সেই তার খেলা, ভাঙা আর গড়া নিয়ে কাটে তার বেলা! এ ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শিশু-রহস্য

কহিতে জানে না কথা-মুখে ভাঙা ভাষ, চলিতে পারে না, সদা চলিবার আশ; হাসি কি জানে না, মুখে হাসি আছে ফুটে, কান্না অর্থহীন, চুম্বনেতে কেঁদে উঠে; ভাবুক নহেকো তবু খেয়ালেতে আছে, আকাশের চাঁদেরে সে মিতা করিয়াছে; ভ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

নাগকেশর

চিত্ততলে যে নাগবালা ছড়িয়ে-ছিঁড়ে কেশের কেশর কাঁদছে- অফুরন্ত অশ্রুধারায় সহস্রবার নাসার বেশর বাঁধছে; মানিকহারা পাগলপারা যে বেদনা বাজছে তাহার বক্ষে, পলে-পলে পলক বেয়ে অলক ছেয়ে ঝরছে যাহা চক্ষে; দুঃখে-ভাঙা ব...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

গঙ্গাস্নান

তাই বলি-গঙ্গাস্নানে কেন এত ঝোঁক! ওইটুকু ছোট্ট মেয়ে-ন-বছরই হোক্, নিতান্ত বালিকা ছাড়া কী বলিব আর- এ বয়সে অন্য কিছু সম্ভবে না আর! প্রত্যহ প্রত্যুষে দেখি, শয্যাখানি ছাড়ি অস্থির হইয়া উঠে যেতে তাড়াতাড়ি নদীর...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কলঙ্ক

কলঙ্ক যতীন্দ্রমোহন বাগচী বাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর------ কলঙ্কী মন, চেয়ে দেখ্ আজি সঙ্গী মিলেছে তোর। দিবা অবসান, রবি হ’ল রাঙা, পশ্চিমাকাশে নট্ কনা -ভাঙা; সঙ্গহীনের যাহা কিছু কাজ সাঙ্গ করেছ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

দোল

কে তোদের দোল দিল, তাই বল্- ও তাল-খেজুর ও বেণুবন, নারিকেলের দল, কে তোদের দোল দিল তাই বল্ শাখায় শাখায় পাতায় পাতায় অমন্ করে কে আজ মাতায়, অচঞ্চলে করলে কে আজ উচ্ছল চঞ্চল! ওপার হতে আষাঢ় এল চিকন কালো বেশে- ই...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

মাধবিকা

দখিন হাওয়া---রঙিন হাওয়া, নূতন রঙের ভাণ্ডারী, জীবন-রসের রসিক বঁধু, যৌবনেরি কাণ্ডারী! সিন্ধু থেকে সদ্দ বুঝি আসছ আজি স্নান করি'--- গাং-চিলেদের পক্ষধ্বনির শন্ শনানির গান্ ধরি'; মৌমাছিদের মনভুলানি গুনগুনান...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শিশুর ব্যথা

বোকা ছেলেটার ভারি মুখ ভার, খেলাধুলা সব মাটি;-হারিয়ে ফেলেছে বাপের-দেওয়া সে রথে কেনা লাল লাঠি! দূর প্রবাসের কাজের তাড়ায় পিতা আজি কাছে নাই, লাঠির সঙ্গে তাঁরি কথাটাই আগে মনে পড়ে তাই; সেই স্নেহমাখা হাসি মু...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

দাসীপুত্র

পরের দুয়ারে দাসী বটে আজি, তবু সে মোদেরই মা,--- ভুলিবারে চাই সতত সে কথা ; ভুলিবারে পারি না। কাঙালের ঘরে যাহা কিছু জোটে, সে যে ধূলিমাখা খুদ, উপবাস ক্ষীণ শীর্ণ বক্ষে শুকায়ে গিয়াছে দুধ,--- তবু তাই খেয়ে বা...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শিশুর নেশা

টলমল টলমল টলিছে চরণ, এই উঠে, এই বুঝি পড়ে! মদহীন মত্ততায় হৃদয়-হরণ কে এল রে মানবের ঘরে অস্পষ্ট জড়িত কণ্ঠে, ভাঙা-ভাঙা বোল, মুখময় ঝরিতেছে লালা, কথার নাহিকো অর্থ-আবোল-তাবোল ভরে তোলে প্রাণের পেয়ালা! না জানে...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

স্বপ্ন দেশ

আজ ফাল্গুনী চাঁদের জ্যোছনা জুয়ারে ভুবন ভাসিয়া যায় ওরে স্বপন দেশের পরী বিহঙ্গী পাখা মেলে উড়ে যায়। এই শ্যামল কোমল ঘাসে এই বিকচ পুন্দরাসে এই বন-মল্লিকা বাসে এই ফুরফুরে মলয়ায়। দেখ ঘাসের ডাঁটায় ফড়িং ঘুমায় ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

দেয়ালা

জননীর কোলে শুয়ে শিশু করে স্বপন-দেয়ালা শূন্য 'পরে চেয়ে কার পানে; কী ক'রে ভরিয়া ওঠে কোথা তার রসের পেয়ালা, কে পিয়ায়-তাই বা কে জানে! কভু হাসে কভু কাঁদে কভু ভয়ে আকুঞ্চিত ভুরু- অভিমানে ঠোঁট দুটি ফুলে; ওইটুক...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অনাহূত

পুঁতেছিলাম লতা একটি ঘরের কোণে, অযতনে। ভেবেছিলাম হয়তো তখন অকারণে, মনে-মনে- আপনা হতে যদিই তাতে ফুলটি ধরে, দু-দিন পরে,- কে আর আছে-দিব তুলে সমাদরে, কাহার করে? আপন বোঁটায় আপনা হতে ক্ষণিক হেসে, দিনের শেষে, ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আবাহন

ধ্বনিছে তোমার নাম আকুল অম্বরে- হে মোর বসন্ত-লক্ষ্মি, কলকণ্ঠস্বরে ডাকাও পাপিয়া পিক হৃদয় নন্দনে, ফুটাও মাধবীপুঞ্জ প্রিয়কুঞ্জবনে। বিশ্বের বসন্ত আজি তোমারে ডাকিছে- তুমি না আসিলে যদি বসন্ত তো মিছে! তব গানে...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

প্রিয়া

প্রিয়ার আবাস খুঁজি, সারাদিন ফিরি সযতনে নাম-ধাম-গোত্র-গৃহ - বাঁধিবারে সহস্র বন্ধনে। না খুঁজিয়া পাই দেখা, খুঁজিয়া সন্ধান নাই যার কি করি তাহারে লয়ে, এ যে বড় বি চিত্র ব্যাপার। শ্রন্ত দেহে ক্লান্ত মনে, অর্...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

মুক্তবেণী

ও কেশ বাঁধিয়া রাখ, মেলিয়ো না আর, কোরো না নূতন সৃষ্টি-ধরা অন্ধকার ভরা দিনে, নিবায়ে এ নয়নের আলো, বর অঙ্গে বেড়া ওই নীলাম্বরী কালো- নীলাঞ্জন মেঘসম-যথেষ্ট কি নয়? মুমূর্ষেরে মারি কিবা শৌর্য-পরিচয়! রমণীর মন ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কেয়াফুল

ফুল চাই ---- চাই কেয়াফুল!---- সহসা পথের ‘পরে আমার এ ভাঙ্গা ঘরে কন্ঠ কার ধ্বনিল আকুল। তখনো শ্রাবণ-সন্ধ্যা নিঃশেষে হয়নি বন্ধ্যা----- থেকে থেকে ঝরিতেছে জল; পবন উঠিছে জেগে, বিজলী ঝলিছে বেগে------ মেঘে ম...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

নিষ্কৃতিহীন

ওগো, যে পল্লীতে বসত আমার-নিত্য সেথায় সাঁঝে ঘরে-ঘরেই, সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টা বাজে! শুধু আমার ঘরেই হায়! কোনো উপকরণ নাই- তবু তাদের পূজার শব্দে আমার চমক ভেঙে যায়- তাই সবার সাথে পূজি আমার প্রাণের দেবতায়। ওগ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

গৃহিণীহীন শ্বশুরালয়ে

শ্যালীসভায় আমি হাসতে চাই তো তোদের মতন পরান খুলে সই,- ভালো বাসতে চাই তো তোদের মতন কিন্তু পারি কই? তোদের সুখে, তোদের ব্যথায়, গল্পে গানে হাসির কথায়, সকল কথা ভুলায়, শুধু একটি কথা কই; আমি তাইতে এমন হাসির হ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কর্ম

শক্তি মায়ের ভৃত্য মোরা- নিত্য খাটি নিত্য খাই, শক্ত বাহু, শক্ত চরণ, চিত্তে সাহস সর্বদাই। ক্ষুদ্র হউক, তুচ্ছ হউক, সর্ব সরম-শঙ্কাহীন--- কর্ম মোদের ধর্ম বলি কর্ম করি রাত্রি দিন। চৌদ্দ পুরুষ নিঃস্ব মোদের -...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

সরোবরে সন্ধ্যা

শরাস্তৃত সরোবর; তীরে তীরে তারি তালিবনশ্রেণী; শ্যামল-সরসী-শিরে পদ্ম-বিভূষণা শৈবালের বেণী। ধীরে নামে সন্ধ্যাসতী ধূসর অঞ্চল অম্বরে লুটায়ে; ঝিল্লির মঞ্জীর মালা ঝিমি-ঝিমি-ঝিমি বাজে পায়ে পায়ে। জনশূন্য দুটি ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ঘুমহারা

তুমি আমায় বকছ কেন, মা! আজকে আমার ঘুম যে আসছে না- ঘুমাই কেমন করে? কী সব কথাই মনে যে-মা, আসে- এইখানেতে বাবা শুতেন পাশে, গলাটি মোর ধরে। আচ্ছা-মা, ওই কালো ঘোড়ায় চড়ে কোথায় গেলেন? যদি, মা-যান পড়ে- ঘোড়া যে ব...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ভালবাসার জয়

ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে- গোলাগুলির গোলাতে নয়, গভীর ভালবেসে। খড়ুগ, সায়ক, শাণিত তরবার, কতটুকুন সাধ্য তাহার, কি বা তাহার ধার? শত্রুকে সে জিনতে পারে, কিনতে নারে যে সে- ও তার স্বভাব সর্বনেশে। ভা...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বিশ্বপ্রাণ

কে বলে ধরণী জড় নির্জীব নীরব? প্রতিক্ষণে উঠে যার রহস্য-উৎসব জলে স্থলে শূন্যে শৈলে ফুলে ফলে গাছে- এ বিশ্ব-অন্তর-বাসী যে জীবন আছে! অহোরাত্রি সিন্ধুবক্ষে যে তরঙ্গ উঠে, ফল হয়ে ফলে যাহা, ফুল হয়ে ফুটে, অন্ধক...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

তবু

ভৈরবী-একতাল খেলিতে হবে এ খেলা- তবু খেলিতে হবে এ খেলা! ভাঙিয়ে গিয়েছে জীবনের হাট, ফুরিয়ে গিয়েছে মেলা। পরের নয়ন ভুলাবার লাগি এ যেন হয়েছে নিশি নিশি জাগি, মরম মাঝারে বেদনা লুকায়ে নয়ন মুছিয়ে ফেলা! সঙ্গী যে ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

দ্বিপ্রহরে

বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খোলা পাতা খোলাই পড়ে’ থাকে, চোখের পাতায় ঘুম আসেনা—- দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলো কা’কে ? কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উত্সাহ নাই তার, চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বিপন্না

কৌরবের সভাতলে বামহস্তে বসন সম্বরি অন্য বাহু ঊর্ধ্বে তুলি শ্রীহরিরে ডাকি বারম্বার, বিহুলা দ্রৌপদী যবে দুটি চক্ষু অশ্রুজলে ভরি ঘৃণায় লজ্জায় ক্ষোভে মেগেছিল মৃত্যু আপনার;- শ্রীকৃষ্ণ তখনো সেই অপূর্ণ নির্ভর...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

প্রদীপ

এ নহে বিলাসদৃপ্ত ধনীর আগারে বিচিত্র স্ফটিক পাত্রে দীপ্ত দীপমালা! শত বিদ্যুতের দ্যুতি শত আলো-জ্বালা- প্রমোদ-উৎসব-গৃহে চারু-তারাহারে জ্বলে না ইহার জ্যোতি ঝলসি নয়ন- বিলাস-লালসা-পুষ্ট ভোগ-হুতাশন! অন্ধকার ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

জন্মভূমি

ঐ যে গাঁ-টি যাচ্ছে দেখা 'আইরি'-ক্ষেতের আড়ে— প্রান্তটি যার আঁধার-করা সবুজ কেয়াঝাড়ে, পূবের দিকে আম-কাঁঠালের বাগান দিয়ে ঘেরা, জটলা করে যাহার তলে রাখাল-বালকেরা— ঐটি আমার গ্রাম— আমার স্বর্গপুরী, ঐখানেতে হৃ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ব্যথার পুজা

বেদনার শুক্তিমাঝে আনন্দের মুক্তাফল ফলে, যে শুক্তির জন্মশয্যা অন্তরের অন্তরশ্রুজলে। ব্যথা মোর থাক্ বক্ষে প্রিয়পদে সঁপি মুক্তাফল, যে প্রিয় আমার সেই গোবিন্দের চরণকমল।...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

তপস্বিনী ভারত

সেদিন ধ্যানের নেত্রে চাহি এই ভারতের পানে, মনে হল, এর চেয়ে পুণ্য মূর্তি ধরণী না জানে! বহু কষ্ট বহু চিন্তা, বহু ধৈর্য বহু ধারণায় বিধাতা করিলা সৃষ্টি তপস্বিনী ভারত মাতায়। শুষ্ক রুক্ষ জটাজাল মেঘসম ঊর্ধ্ব ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

প্রেমের প্রবেশ

প্রেম প্রবেশিল জানালার পথে, ধন প্রবেশিল দ্বারে; ধনেরে দেখিয়া আসিয়াছ বুঝি? শুধালাম আমি তারে। প্রেম পাখা নাড়ি কহিল কাঁদিয়া করুণ মধুর স্বরে,- গরিবের গৃহে যেমন আমার, তেমনি ধনীর ঘরে! ধন বাহিরিল জানালার পথে...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অন্ধ বধূ

পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চলনা ঠাকুর-ঝি — ওমা, এ যে ঝরা-বকুল ! নয়? তাইত বলি, বদোরের পাশে, রাত্তিরে কাল — মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল — কতই মনে হয় । জ্যৈষ্ঠ আসতে কদিন দেরি ভাই — আমের গায়ে বরণ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

চৈত্র-স্মৃতি

কবে কোন্ অতীতের সুমধুর চৈত্র-দ্বিপ্রহরে দুটি কাঁচা আম পেড়ে দিয়েছিনু তার কচি হাতে- স্নিগ্ধ শ্যাম সেই বর্ণ! শেষ-বসন্তের শূন্য ঘরে সেই মৃদু সৌরভের ছন্দটুকু কাঁপে মলয়াতে! তুচ্ছ দুটি ফল পেয়ে কী আনন্দে দীপ্...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আশা

ভাষায় কবে ভাবের কুড়ি ফুটবে ফুলের মতন-_ আশায় তারি আছি ; অফুটন্ত অশোক-কুঞ্জে বীণাপাণির পায়ের পরশ খানি যাচি। বেণুর রন্ধ্রে বায়ুর মতন বাণীর সুধাবাণী ফুটবে আমায় কবে-_ চিত্তকুহর পূর্ণ করে বাজবে বাঁশি ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

প্রতীক্ষা

আমি শুনেছি সে প্রতি সাঁঝে সুদূর আকাশ মাঝে মধুর বাঁশরি বাজে আমারে ডাকি;- তাই প্রতিদিন নিশাকালে সবকাজ দূরে ফেলে মুক্ত জানালামূলে বসিয়া থাকি! আমি জানি যে আমারে ডাকে সে হোথা চাহিয়া থাকে উজল তারার ফাঁকে আঁ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

যৌবন-চাঞ্চল্য

ভুটিয়া যুবতি চলে পথ; আকাশ কালিমামাখা কুয়াশায় দিক ঢাকা। চারিধারে কেবলই পর্বত; যুবতী একেলা চলে পথ। এদিক-ওদিক চায় গুনগুনি গান গায়, কভু বা চমকি চায় ফিরে; গতিতে ঝরে আনন্দ উথলে নৃত্যের ছন্দ আঁকাবাঁকা ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

রেখা

হৃদয়-চেরা রক্তে আজি আঁকিনু রেখা যতনে তোমারি পায়ে পরায়ে দিতে আলতা; জানি না সেকি যোগ্য হবে রক্ত-জবা চরণে, যদিও মাগো জবারি মতো লাল তা। হোক্ না হোক্ তোমারি সে তো, কোথায় পাব অধিক আর, তোমারি সে যে, হোক্ না ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ভুঁইচাঁপা

ভূঁইচাঁপা, তুই ভুঁয়েই ফুটে লুটিয়ে থাকিস্ ভুঁয়ে- তোরে হেরে চিত্ত আমার পড়ছে নুয়ে নুয়ে। নীল আকাশের আলোর পরশ নীলচোখে তোর বুলাক্ হরষ মাটির কোলের মায়া তবু থাকুক তোরে ছুঁয়ে। স্বর্ণচাঁপা বাড়াক বাহু ঊর্ধ্ব আকা...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অপরাজিতা

পরাজিতা তুই সকল ফুলের কাছে, তবু কেন তোর অ-পরাজিতা নাম গন্ধ কি তোর বিন্দুমাত্র আছে ? বর্ণ, সেও তো নয় নয়নাভিরাম ! ক্ষুদ্র শেফালি তারো মধু-সৌরভ, ক্ষুদ্র অতসী, তারো কাঞ্চন-ভাতি; গরবিনি, তোর কিসে তবে গৌরব ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

খেয়া-ডিঙি

(ভাদ্রে) পাটের ক্ষেতের ভিতর দিয়ে ঘাটের ডিঙা বাই- তবু আমার হাটের সাথে কোনো বাঁধন নাই; শিরা-ওঠা ফাটা-হাতে হালের গোড়া ধরি আমি শুধু আপন মনে এপার-ওপার করি। তোমরা ভাবো ক্ষেত আর ফসল, বৃষ্টি বাদল বান, ডুবল কত...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

কাজলা দিদি

বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই? পুকুর ধারে লেবুর তলে, থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই, মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? সেদি...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

হাফিজের স্বপ্ন

অমা যামিনীর গহন আঁধারে চুপি চুপি এল প্রিয়া, দ্বিগুণ আঁধার খর্জুর-বীথি, তাহারি আড়ালে দিয়া! আঙুরের মতো অলকগুচ্ছে গোলাবের মালা পরি, মৃদু উশীরের মদির গন্ধে নিশীথ আকাশ ভরি, কাজল উজল কালো কটাক্ষে হানিয়া বিজ...

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

Loading...